#তুমি_শুধু_গল্প_না_আমার_ভালোবাসা
#আমেনা_আক্তার
#পর্ব_৮
ভাইয়া,
নূরের করুন কন্ঠ শুনে নিলয় মাথা তুলে চাইল তার দিকে। নিজের ভাইয়ের এমন করুন অবস্থা দেখে বুক ধক করে উঠল নূরের। ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে নূরের ভিতরটা ছারখার হয়ে যাওয়ার পরেও। নূরের চোখে অশ্রু দেখা যাচ্ছে না। হয়তো অশ্রু রাও কান্ত হয়ে গেছে। নূর কারো সামনে এখন আর নিজের অশ্রু ব্যায় করে না। যদি কারো সামনে ব্যয় করে তাহলে তারা নূরের সামনে তাকে সহানুভূতি দেখালেও নূরের পিছে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে।কিন্তু যখন বেশি কষ্টে থাকে নূর তখন ওর বন্ধুদের সামনে নিজেকে প্রকাশ করে। কারণ তাদের ছাড়া তো এখন আর কেউ নেই।ওদের মাধ্যমেই নূর নিজের মনের কষ্ট কে হালকা করে। নূর নিলয়ের উদ্দেশ্যে বলল।
তুমি দুপুরে খাবার খাওনি কেনো ভাইয়া।
নূরের কথা শুনে নিলয় বাচ্চামো কন্ঠে বলল।
তোকে কে বলেছে ওই মিনা,আমি খাবার খেয়েছি ও শুধু আমার নামে মিথ্যা কথা বলে।
ভাইয়ের কথা শুনে নূর শান্ত কন্ঠে বলল।
মিনা মিথ্যে বলছে না ভাইয়া,আমি তোমার জন্য যেই খাবার রেখে গিয়েছিলাম। সেই খাবার এখানো পরে রয়েছে।
নিলয় নূরের কথায় মুখ ছোট করে বলল।
আমার খেতে ভালো লাগে না,
খেতে ভালো না লাগলেও খেতে হবে,
না আমি খাবো না ,
কথাটি বলেই মুখ ঘুরিয়ে নেয় নিলয়। তখন নূর নিলয় কে উদ্দেশ্য করে বলল।
তুমি যানো তুমি কিছু খাওনি দেখে আমিও এখনো খাইনি।আর তুমি যেই পর্যন্ত না খাবে আমিও খাবো না।
নূরের কথা শুনে নিলয় নূরের দিকে তাকিয়ে বড়ো করে হা করলো।নিলয় হা করতেই নূর পরম যত্নে নিলয় কে খাওয়াতে লাগলো। একসময় নূরকে তার ভাই এভাবে খাওয়াতো।আজ নূরের তার ভাইকে খাবার খাওয়াতে আফসোস না থাকলেও। ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে ঠিকই আফসোস হয়।
___________________________________
আরশাদের ফোন বেজে চলেছে সেই কখন থেকে। কিন্তু আরশাদ ফোনের সামনে থাকতেও ফোন ধরছে না। কারন সে জানে এখন কে ফোন করেছে ও কেনো করেছে। আরশাদ গেইম খেলছে বসে বসে আব্রাহাম এর সাথে। আরশাদের ফোন বাজছে কিন্তু ফোন তুলছে না দেখে আব্রাহাম বলল।
তুই কি ভয় পাচ্ছিস হৃদয় কে?
আব্রাহামের কথায় আরশাদ তার দিকে ব্লু কুঁচকে তাকিয়ে বলল।
ওকে আমি ভয় পাবো কেনো?
এটা তো তুই যানিস ভয় না পেলে তো আর ওর ফোন কলকে ইগনোর করতি না।
আরশাদ আব্রাহামের কথা শুনে খেলা ছেড়ে উঠে যায় এবং হৃদিতার ফোন রিসিভ করে।
শয়তা*ন, কু*ত্তা,ইবলিশ,হারামি, গন্ডার….
হৃদিতা আর কিছু বলার আগেই আরশাদ তার কানের কাছ থেকে ফোনটি একটু দূরে ধরে।আর এদিকে আব্রাহাম বসে বসে হাসছে। আব্রাহাম ভালোভাবে জানে হৃদিতা এখন তার বিশেষ বকা গুলো আরশাদের উপর ঝারছে। কিছুক্ষণ পর আরশাদ ফোন পূর্ণ রায় তার কানে ধরে। হৃদিতা ফোনের উপাস থেকে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিচ্ছে। মূলত সে আরশাদ কে বকা দিতে দিতে ক্লান্ত। আরশাদ হৃদিতার এই আচরণ করার মূল কারণ জানার পরেও তাকে জিজ্ঞেস করলো।
কি হয়েছে তোর এভাবে আমাকে বকলি কেনো।
আরশাদের কথা শুনে হৃদিতার শরীর রাগে কাঁপছে। হৃদিতা ভালোভাবে জানে আরশাদ তার রাগের কারণ জানে তবুও এখন এমন ভাব ধরেছে যেনো কিছুই জানে না। হৃদিতা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল।
তুই জানিস না কি হয়েছে, আচ্ছা না জানলে আমিই বলে দিচ্ছি। তুই শিহাব কে মেরেছিস কেনো।ও এখন হসপিটালে ভর্তি।
আরশাদ ভাব অলসহীন ভাবে উত্তর দিলো।
তোকে কে বলেছে আমি ওকে মেরেছি ও নিজে বলেছে তোকে?
শয়তান ও কিভাবে বলবে ওকে তুই মেরেছিস?ওর চোখে তো তুই কাপড় বেঁধে তারপর মেরেছিস।আমি ভালোভাবে জানি এই কাজটি তোর ছাড়া আর কারও হতে পারে না। তুই ওকে মেরেছিস কেনো এখন এটা বল।
হ্যা আমি মেরেছি তো কি হয়েছে?
হারামি, শয়তান ,খচ্চর..
এই তুই আমাকে আর বকবি না।
একশ বার বকবো তুই কি করবি আমার ?
তোর কিছুই করবো না , তুই আমার বান্ধবী কিন্তু ওর সাথে অনেক কিছু করতে পারবো। এখন তো মাত্র ও হসপিটালে হাত পা ভেঙ্গে পরে আছে পরের বার কোমায় থাকবে।
কথাটি বলেই ফোন কেটে দেয় আরশাদ, ফোন কেটেই এসে আব্রাহাম কে একটি লাথি মারে। কেননা এতক্ষণ আব্রাহাম আরশাদ কে বকা খেতে দেখে হাসছিল।
___________________________________কেটে গেছে এক সপ্তাহ সিরাত এখন খুব ব্যস্ত থাকে। প্রতিদিন সময় মতো অফিসে যায় ও সময় মতো আছে। অফিসের মালিক সিরাত অনেক পছন্দ করে নিজের মেয়ের মতো সিরাত কে দেখে।তার একটি কারণ হলো সিরাত মুখের উপর সত্য কথা বলে দেয়। দ্বিতীয় কারণ হলো সিরাত কাজ নিয়ে কেনো অবহেলা করে না, প্রয়োজন ব্যতীত কারো সাথে একটি কথাও বলে না।
সাইরা রোজ কলেজে আসে ,কলেজে এসে সাইরার পড়ালেখার চেয়ে ও বড়ো কাজ রাজ কে দেখা।সাইরা নিজেও জানে না কেনো যেনো রাজের প্রত্যেক জিনিস সাইরা কে মুগ্ধ করে।এই সকল কথা ভাবতে ভাবতে সাইরা রাজের দিকে তাকিয়ে ছিল। নিজের ভাবনাতে রাজ কখন তার সামনে এসে বসেছে টের পাইনি।
রাজ সাইরার সামনে এসে বলল।
আমার কথা ভাবছ?
হঠাৎ রাজ সাইরার সামনে এসে প্রশ্ন করায় সাইরা থতমত খেয়ে যায়।
না..ন..নাহ আমি আপনার কথা ভাবছি না।
রাজ সাইরার একটু কাছে এসে সামিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল।
তাহলে কার কথা ভাবছিলে?
ক…কা…কারও কথা না।
বলেই সাইরা সেখান থেকে একদৌড়ে চলে যায়।আর সাইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে রাজ।
কিরে তোকে ভুতে ধরেছে নাকি একা একা হাহছিস।
নূরের কথায় রাজ হেসে বলল।
ভুতে ধরেছে নাকি জানিনা কিন্তু এইটা ঠিকই বুঝতে পারছি। আমাকে প্রেম রোগে ধরছে।
কার প্রেমে পড়লি আবার।
আব্রাহামের কথার প্রতি উত্তরে হৃদিতা বলল।
কার আবার আমাদের রুদ্রের নতুন শত্রু সিরাতের ছোট বোন সাইরার।
আব্রাহামের কথায় রুদ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
ওই বেয়াদব মেয়ের কথা আমার সামনে বলবি না।
আব্রাহাম রাজ কে হাসি মুখে বলল।
ভাই তুই সিরাতের ছোট বোনের প্রেমে পরেছিস। মাথা খাটিয়ে সব কিছু করিস নাহলে সিরাত যেই মেয়ে তোর হাড় ভেঙে ফেলবে।
আব্রাহামের কথার প্রতি উত্তরে রাজ ও ঠাট্টার ছলে বলল।
সালা তুই কখনো প্রেম করেছিস যে জানবি। প্রেম মাথা দিয়ে না মন দিয়ে হয়।
রাজের কথা শুনে আব্রাহামের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। হঠাৎ মনের ভিতর তীব্র যন্ত্রণা এসে হানা দেয় আব্রাহামের।তাই সে কেনো কথা না বলে সেই স্থান ত্যাগ করে। আব্রাহামের এইরুপ আচরণের কারণ সকলে জানলেও রাজ জানে না।তাই সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
আব্রাহাম এভাবে চলে গেল কেনো।ও কি আমার কথায় কষ্ট পেয়েছে। আব্রাহাম তো কখনো এমন আচরণ করে না।
রাজের কথার প্রতি উত্তরে রুদ্র বলল।
এমন কিছুই না ওর হয়তো কেনো কাজের কথা মনে পড়ে গেছে তাই চলে গিয়েছে।
রুদ্রের কথা রাজের বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সে বিশ্বাস করে নেই। কারন তাদের ফ্রেন্ডের ভিতরে এমন কেনো কথা নেই যে একজন আরেকজনেরটা না জানে।তাই রাজ আর মাথা ঘামালো না।
এদিকে আব্রাহাম সবার কাছ থেকে চলে এসে একটি খালি রুমে বসে আছে। আব্রাহাম এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে একটি ছবির দিকে। আব্রাহামের ব্যাধিত নয়নে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ আব্রাহামের মনে পড়লো রমনীটির হাসি মুখে বলা কথা।
আই লাভ ইউ আব্রাহাম ভাই আমি আপনাকে অনেক অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি।
কথাটি মনে পড়তেই আব্রাহামের মুখে হাসি চলে আসলো। কিন্তু সেই হাসি মুহূর্তের বিলিন হয়ে যায়।যখন আব্রাহামের মনে পরে কত নিষ্ঠুর ভাবে আব্রাহাম সেই রমনীর হৃদয় ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ করেছিল।তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরেও সে হার মানেনি। সকল প্রকার চেষ্টাই করেছে আব্রাহাম কে নিজের ভালোবাসা বুঝাবার। কিন্তু আব্রাহাম তার কেনো কথা শুনে নি কথা শুনা তো দূরের কথা। আব্রাহাম এমন কিছু করেছিল সেই মেয়েটি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যা করার পর মেয়েটি পুরো পুরি ভেঙে পরেছিল। এখনো আব্রাহামের সাথে সেই রমনীর দেখা হয় ঠিকই। কিন্তু আব্রাহাম তার চোখে শুধু নিজের জন্য ঘৃণা দেখতে পায়। এখন আব্রাহাম বুঝতে পারে সে কি হারিয়েছে। মেয়েটির চোখে ঘৃণা দেখে আব্রাহামের ভিতরটা ছারখার হয়ে যায়। আব্রাহাম সহ্য করতে পারে না তার সেই চাওনি। আব্রাহাম এখন ছটফট করে মেয়েটিকে পাওয়ার জন্য।আগে সেই মেয়ে আব্রাহামের পিছে ঘুরে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে চাইতো।আর এখন আব্রাহাম ঘুরে তার পিছে তার করা ভুলের জন্য ক্ষমা চায়। ক্ষমা করা তো দূরের কথা মেয়েটি তার দিকে ফিরেও তাকায় না। আব্রাহাম আরো কিছুক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে যায়।
___________________________________
সিরাত ফিরেছে অফিস থেকে বেশ কিছুক্ষণ আগে। খাবার শেষ সিরাত রেহানা বেগমের রুমে গিয়ে রেহানা বেগমের কুলে মাথা রেখে শুয়ে পরে। রেহানা বেগম ও পরম মমতায় মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ সিরাত রেহানা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল।
ওই লোকগুলো কাল জায়গা দখল করতে যাবে।
সিরাতের কথা শুনে রেহানা বেগম অবাক হয়ে বলল।
উনাদের না সামনের সপ্তাহে যাওয়ার কথা।
হ্যা যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু আমি বলেছি যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের জায়গা বুঝে নিতে। আচ্ছা মা তোমার কি কষ্ট হচ্ছে।
সিরাতের কথায় রেহানা বেগম ব্লু কুঁচকে বলল।
আমার কষ্ট লাগবে কেনো?
এইযে তোমার এত বছরের ভালোবাসা, তোমার স্বামীর ধ্বংস কাল থেকে শুরু।
সিরাতের কথায় মা মেয়ে দুজনই একসাথে হেসে উঠলো। রেহানা বেগম হাসতে হাসতে বলল।
আমি কাল শুধু কেনো ভাবে ওর চেহারা দেখতে চাই।
তুমি চিন্তা করো না মা আমি সেই ব্যবস্থা ও করে দিবো।
#চলবে……