তুহে তো দিল ধারাকতা হ্যাঁয় পর্ব-০১

0
7

#তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয়

(প্রথম পর্ব)

সৌমিক ভাবে নি যে কখনো ওর বিয়ে হবে, ঘরে বউ আসবে এবং ওর সংসার হবে। কারণ ঘরই তো ছিলো না কখনো। বুঝতে শেখার আগেই সৌমিক বাবা হারা। এরপর যখন কিছুটা বুঝতে শিখলো, কেবল ঠোঁটের উপর গোঁফের সরু রেখা, ঠিক তখনই ওকে একদম একা করে দিয়ে মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো। সেই তখন থেকেই সৌমিক একা, একদম একা।

পড়াশোনায় সৌমিক বরাবরই ভালো। চাচা, মামাদের সাহায্য সহযোগিতায় সেই সাথে কিছু স্কলারশিপ আর টিউশনি সব মিলিয়ে পড়াশোনাটা শেষ করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় নি। তবে কীনা সৌমিক একটু চুপচাপ স্বভাবে যাকে বর্তমানে একটু স্টাইল করে বলা হয় – ইন্ট্রোভার্ট, ঠিক এজন্যই বন্ধু বান্ধব কম। আর ঘরে এবং মনে জমাট বাঁধা একাকীত্ব।

পৃথিবীতে মানুষের সাহায্যে মানুষই এগিয়ে আসে, এজন্যই পৃথিবী টিকে আছে। মানুষ নামক প্রজাতি টিকে আছে। তেমনি কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীরা এগিয়ে এসে সৌমিকের বেশ ভালো একটা চাকরির ব্যবস্থা করে। তা সৌমিক তো পরিশ্রমী ছেলে, বিনয়ী, ভদ্র। কাজে কর্মে বুঝিয়ে দেয় ওকে যারা নিয়োগ দিয়েছে, মোটেও ভুল করে নি।

গোল বাঁধে বিয়ের ক্ষেত্রে। বাবা মা হীন হওয়ায় কিছু ভালো প্রস্তাব এসেও ঠিকঠাক ক্লিক করলো না। এদিকে সৌমিক সারাজীবন নিজের পড়াশোনা আর রুটি রুজির চিন্তায় ব্যস্ত থাকায় মেয়েদের নিয়ে ভাবার সুযোগ হয় নি৷ এখন বিয়ের কথা উঠাতে ভয় পাচ্ছে। তার উপরে বনধু বান্ধব, কলিগদের বিয়ে নিয়ে রিভিউটা ঠিক সুবিধার না! যেন জেলে যাওয়ার মতো ব্যাপার কিংবা সেধে গলায় রশি দেয়া!

তবুও এই যারা বিয়ে নিয়ে যারা এমন ভয়ংকর কথা বলে, তারাই উঠে পড়ে লাগে সৌমিকের বিয়ের জন্য। এ যেন আবহমান কাল ধরে লেজ কাটা শেয়ালদের দৌরাত্ম! নিজেদের লেজ কাটা বলেই কীনা, অন্যদের লেজ এরা ঠিক সহ্য করতে পারে না। সেই লেজকাটাদের কারণের আজ সৌমিকের বিয়ে হয়ে গেলো অতসীর সাথে।

এদিকে অতসীও কখনো ভাবে নি ওর বিয়ে হবে! উহু অতসির কারণটা কিঞ্চিৎ ভিন্ন। বিয়ে, সংসার এসবের প্রতি অতসীর চরম অনীহা। ওর বড় বোন অনন্যার খুব ঘটা করেই তারই ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই সেই ভালোবাসার রঙ ফিকে হয় কুৎসিত বাস্তবতা বের হয়ে পড়ে। অনন্যার শ্বশুরবাড়ি থেকে বিশেষ করে ওরই স্বামী বার বার চাপ দেয় বাপের কাছ থেকে টাকা আনার জন্য। ব্যবসার নাম করে টাকা নিলেও দুই চারদিনে সেই টাকা উড়িয়ে আবার অনন্যাকে চাপ দেয় টাকার জন্য। ততোদিনে অনন্যা অন্ত:সত্ত্বা। অসুস্থ এবং বিরক্ত অনন্যা বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনতে অস্বীকার করে। ঠিক তখনই অনন্যা জীবনের আরো কুৎসিত অংশটা দেখতে পায়। স্বামী নামক দু পেয়ে জানোয়ার নিজের অন্ত:স্বত্ত্বা বউ এর গায়ে হাত উঠাতে পিছপা হয় না। নিজের আর অনাগত সন্তানের জীবন বাঁচাতে অনন্যা বাধ্য হয়ে ফিরে আসে পিতার বাড়ি৷

অনন্যাদের পিতা শফিক হাসান এমন অন্যায় মানা মানুষ না। নিতান্তই নিজের সন্তানের মান সম্মান আর খোয়াতে চান না, এজন্য কোন মামলা মোকদ্দমা করেন নি। কিন্তু পরের দিনই ডিভোর্স লেটার পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। আরেকটা কাজ করেছেন শফিক হাসান, নিজের আত্নীয় স্বজনদের হাহাকার থেকে অনন্যাকে বাঁচাতে অতি দ্রুত দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনন্যার এক খালা থাকে ইউকে তে, সেখানেই উঠে পরে অনন্যা নিজের পথ ঠিকই খুঁজে বের করেছে। এখন মা সন্তান বেশ ভালো সময় পার করছে।

কিন্তু এসব কিছুর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে অতসীর উপর। সে অনেকটা চির কুমারী হওয়ার ব্রত নিয়ে বসেই ছিলো। শফিক হাসানের খুব একটা আপত্তিও ছিলো না। কিন্তু বাঁধ সাধলেন অতসীর মা তাসলিমা বেগম। চিরায়ত বাঙালি মায়ের রূপ। বড় মেয়ের একে তো এমন জীবন, তার উপর ছোট মেয়ে যখন সংসার করবে না ঘোষণা দিলো, তাসলিমা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কোন ওষুধে কিছুতেই কাজ হয় না, হাই প্রেসার মোটে কমে না। শেষে বাধ্য হয়ে অতসী তিতো করলা মুখে দেয়ার মতো বিয়ের জন্য রাজী হলো। কিন্তু বিয়ের আগে কে বর আর কেমন ঘর জিদ ধরে কিছুই দেখলো না।

শফিক হাসান বুদ্ধিমান মানুষ। মেয়েকে ভালো রকমই চিনেন। এজন্য শান্ত, ভদ্র আর তিন কূলে কেউ না থাকা সৌমিককে বেছে নিলেন। স্বার্থপরতা হলেও ভাবলেন, শ্বশুর শাশুড়ি না থাকলে মেয়ে কিছুটা উল্টাপাল্টা আচরণ করলেও সৌমিক নিশ্চয় সামলে নেবে। শফিকের ভায়ের অফিসেরই জুনিয়র সৌমিক। ওর অনেক গুণের বর্ণনা বহুবার শুনেছেন।

এই হলো সৌমিক অতসীর বিয়ের প্রাক ইতিহাস। কেউই ভাবে নি সংসার করবে কিন্তু আজ নিয়তির খেলায় বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একই ছাদের নিচে। সৌমিক অতসীকে নিয়ে যখন ওর নতুন কেনা ফ্লাটে ঢুকলো নাম মুখ কুঁচকে থাকা অতসীর কুঁচকানো চেহারা অনেকটাই স্বাভাবিক হলো। তিন রুমের মাঝারী সাইজের ফ্লাটে খুব বেশি ফার্নিচার না থাকলেও ঝকঝকে তকতকে পরিস্কার। বেডসিট টান টান করে পাতা। ফুল দিয়ে জবড়জং করে সাজানো নেই। বেড রুমের সাইড টেবিলে একটা ফুলদানিতে কিছু দোলনচাঁপা ফুল হালকা মিষ্টি সুবাস ছাড়াচ্ছে।

– আসলে আমার তেমন কেউ নেই তো। চাচা চাচী যারা এসেছিলেন, কমিউনিটি সেন্টার থেকেই বিদায় নিয়েছেন। আপনাকে বরণ করে নেয়ার কেউ নেই। আপনার নিজের ঘর মনে করে নেবেন প্লিজ। আমি জরুরী কিছু ফার্নিচার ছাড়া তেমন কিছুই কিনি নি। বুঝি না তেমন। আপনি রুমে যান, ফ্রেশ হয়ে নিন। অনেক ধকল গেছে। আর ফুল দিয়ে বেশি সাজাই নি কারণ অনেকের ফুলে এলার্জি হয়। আমি তো আপনার বিষয়ে বলতে গেলে কিছুই জানি না। আপনিও তাই। একটু মানিয়ে নিন প্লিজ।

চোখ নিচু করে খুব নরম গলায় কথাগুলো বলেই সৌমিক অন্য আরেকটা রুমে ঢোকে। অনেকটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে অতসী। আগেভাগে তেমন খোঁজ না নিলেও এটুকু শুনেছিলো, ছেলেটা বেশ ভদ্র। এখন তার প্রমাণ পেলো। অতসী একটু মেজাজী টাইপের কঠিন মেয়ে হলেও মনে মনে ঠিকই নার্ভাস ছিলো, না জানি কি পরিস্থিতি ফেস করতে হয়!

যাক, এখন ফ্রেশ হই – এই ভেবে একটা অফ হোয়াইট কালারের থ্রি পিচ নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো অতসী। মেকাপ তুলতে যেয়ে আবারও মেজাজ খারাপ হলো। চৌদ্দ স্তরের এই ব্রাইডাল মেকাপ করার কোনই ইচ্ছা ছিলো না। কিন্তু চাচাতো ভাবী জোর করে নিয়ে গেলো, সাথে অতসীদের টাকায় নিজেও ফ্রি সেজে আসলো। আসল উদ্দেশ্য সেটাই ছিলো – মনে মনে ভাবে অতসী। গোসলই করে ফেললো। শরতের এই সময়ে বেশ গরমই পড়ে। তারপরে সারাদিন নানা আনুষ্ঠানিকতা আর ভারী শাড়ী মেকাপে দমবন্ধই লাগছিলো।

রুমে এসে বসতেই ছোট্ট করে নক করে সৌমিক ঢুকলো। হাতে একটা প্লেটে গরম ধোঁয়া উঠা ভাত, মুরগীর মাংস।

– এটা এখন রান্না না। গতকাল রাতে করেছিলাম। ক্ষুধা লাগার কথা। এজন্য ফ্রিজ থেকে বের করে গরম করলাম। খেয়ে নিন।

কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই সৌমিক ফিরে গেলো। সত্যি বলতে গোসল করতেই অতসীর বেশ ক্ষুধা লেগেছে। দুপুরে নানান চিন্তা ভাবনায় খাওয়াই হয় নি। সকালেও তেমন খাওয়া হয় নি।

বেশি চিন্তা ভাবনা না করে খাওয়া শুরু করলো। বাহ, রান্নাটা তো বেশ মজার! বুয়াদের রান্না তো এমন হয় না। তেল ঝালে ভরা থাকে। এটা অনেকটা মায়েদের রান্নার মতো৷ তেল, মশলা পরিমাণ মতো কিন্তু স্বাদে ষোল আনা।

এসব ভাবতে ভাবতেই খেয়ে ফেললো।

– আপনি শুয়ে পড়ুন। আমি পাশের রুমেই আছি। কোন প্রয়োজন হলে জানাবেন।

প্লেট নিয়ে এটুকু বলেই সৌমিক বের হয়ে গেলো।

– লে বাবা, এতো বেশ জামাই আদর দেখা যাচ্ছে। যাক ভালোই হলো ঘুমিয়ে পড়ি।

আবার মনে মনে বলতে থাকলো অতসী।

বিয়ে আর বাসর রাত সম্পর্কে আমাদের দেশে এতো রসভরা গল্প প্রচলিত যে সেখানে সৌমিকের এমন আচরণ অনেকটাই কাচ্চির পাশে নিরামিষ সবজীর মতো।

(চলবে)