#তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয়
(২য় পর্ব)
পাশের রুমে এসে সৌমিকও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। একে তো জীবনে কোন মেয়ের সাথে সেভাবে কথা বলে নি, তার উপরে একসাথে কত কথা বললো। কিন্তু উপায় ছিলো না। সৌমিককে তো আর নিজের বাসা ছাড়তে হয়। নিজের বেডরুমটা ছেড়েই এখন চিন্তায় আছে – ঘুম হবে কী না! আর মেয়েটাকে পরিবার, ঘর সব ছাড়তে হয়েছে। এসব চিন্তা করেই সৌমিক চেষ্টা করেছে যতোটা পারা যায় মেয়েটাকে ইজি করার। শিক্ষিত, ভালো পরিবারের মেয়ে – নিশ্চয় মানিতে নিতে পারবে।
প্লেটে কিছু ভাত আর মাংস নিয়ে সৌমিকও খেতে থাকে। রান্নাটা ওর নিজেরই করা। হলে, হোস্টেলে থাকতে থাকতে বেঁচে থাকার তাগিদে রান্না বান্না মোটামুটি শিখে নিয়েছে। এতে লাভ দুইটা। এক, এতে স্বাস্থকর খাবার খাওয়া যায়। দুই, তুলনামূলক খরচ কম। চামচ খুন্তি নাড়াচাড়া করতে করতেই কয়েকটা পদ বেশ ভালো রান্না শিখে ফেলেছে।
মুখে কয়েক লোকমা মুখে দিতেই সৌমিকের ফোনে কল আসে। ‘এখন আবার কে কল দিলো!’ ভাবে সৌমিক। ওহ, জাহিদ ভায়ের ফোন। জাহিদ সৌমিকের কলিগ। বেশ রসিক মানুষ। কিন্তু উনার রসিকতা কখনো কখনো ভদ্রতার সীমানা ছাড়িয়ে যায়, যেটা সৌমিকের ভালো লাগে না। এখন ফোন রিসিভ করলেও নানান আদি রসাত্মক কথা শুনতে হবে আবার রিসিভ না করলে আগামীকাল অফিসে উনার যন্ত্রণায় টিকা যাবে না। সৌমিক যে বিয়ে উপলক্ষে মাত্র একদিন ছুটি নিয়েছে, এটা নিয়েই খোঁচার শেষ নেই। কিন্তু ছুটি নিয়ে বাসায় বসে থেকে সৌমিক কি করবে বুঝে পায় না।
দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফোন রিসিভ করে সৌমিক
– আমি তো ভাবলাম তুমি ফোন রিসিভই করবে না ভাইডি, হে হে। ঘরে নতুন বউ বলে কথা!
– আপনার ফোন রিভিস না করে উপায় আছে ভাই?
– তোমাকে বুদ্ধি দিতে ফোন দিলাম ভাইডি। হে হে, বাসর রাতেই কিন্তু বিড়াল মারতে হয়!
– বিড়াল কুকুর কোন কিছুই মারার ইচ্ছা নেই ভাই। আমি খাচ্ছি, রাত হয়েছে আপনি ঘুমান৷ কাল দেখা হচ্ছে।
জাহিদকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিরক্ত মুখে ফোন রেখে দেয় সৌমিক। এসব মানুষের রুচী নিয়ে তার বিরক্ত লাগে। এরা যে কী ভাবে? মানুষ বিয়ে করেই তার প্রবৃত্তি মেটাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে? ঘৃণায় সৌমিকের মুখ বিকৃত হয়ে যায়। খাওয়ার ইচ্ছাটাই চলে যায়। প্লেট সিংকে রেখে হাত ধুয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়৷
সৌমিকের ইচ্ছা এবং রুচীর সাথে বেশিরভাগ মানুষেরই মিল হয় না। সৌমিক বোঝে বিয়ে মানে জীবনে চলার পথে এমন একজনের হাত ধরা যে তার বিপদের দিনে চোখে চোখ রেখে বলবে – ভয় কী, আমি তো আছি!
ঘরে একজন মানুষ থাকাই সৌমিকের একাকী জীবনে অনেক বড় কিছু। ও চায়, ওর বউ বন্ধু হোক। এক কাপ চায়ে সঙ্গী হোক। জানে না, অতসী মেয়েটা ওর সাথে কতটুকু মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু সৌমিক ওর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলো।
সকালের রোদ চোখে পড়তেই অতসীর ঘুম ভেঙে যায়। এতোটা বেলা করে ঘুমালো ও! অবাক হয়ে যায় অতসী। নতুন জায়গায় ওর ঘুম হয় না। কিন্তু গতকাল এতোটাই ক্লান্ত ছিলো যে বেহুঁশের মতো ঘুমিয়েছে!
আড়মোড়া ভেঙে মনে পড়লো – আরে ওর তো একজন বর আছে! গতরাতে তো সে ভাত এনে খাইয়েছিলো? আজ থেকে কী অতসীকেই রান্না করতে হবে! অতসী ওয়াশরুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে ডাইনিং স্পেসে উঁকি দিলো। সেখানে কেউ নেই। রান্নাঘরের দিকে সৌমিকের ছায়া দেখা যাচ্ছে।
– ওহ আপনি! ঘুম হলো? অবশ্য নতুন জায়গায় ভালো ঘুম না হওয়ারই কথা। আমি তো সকালে ফ্রোজেন রুটি পরোটা ভেজে খাই। সাথে ডিম মামলেট বা আলু ভাজি। আপনার জন্যও করে রেখেছি। আপনি খেয়ে নেবেন। আমার অফিস আছে। চলে যাচ্ছি। একটু পরে বুয়া খালা এসে ঘর পরিস্কার করে যাবে।
যাহ বাবা, অতসীর তো কিছুই বলার সুযোগ নেই। এতো দেখি স্টার জলসার সিরিয়ালের মতো জীবন হয়ে গেলো! এখন সৌমিকের কোন এক্স গার্লফ্রেন্ড এসে স্ত্রী দাবী করলেই ষোল আনা সিরিয়ালের গল্প! এসব আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতে অতসী হেসে ফেললো। নাস্তা খেয়ে অতসীর আর কোন কাজ নেই। সারা বাসা ঘুরে দেখতে লাগলো। তেমন কিছুই নেই দেখার মতো। দুই রুমে দুইটা বেড, একটা আলমিরা টিভি, ফ্রিজ আর একটা ডাইনিং টেবিল এছাড়া কিছুই নেই।
একটা ড্রেসিং টেবিলও নেই – নিজের চেহারা দেখবো কোথায়? বেসিনের আয়নায়! অতসী ভাবতে লাগলো। এমন সময় ওর মোবাইলে একটা টুং করে ম্যাসেজ আসলো – ঘরে অনেক কিছুই কেনা নেই। আপনি রাজী থাকলে একসাথে যেয়ে কিনে আনতে পারি।
ছেলেটা বেশ চালাক! আমাকে কেমন সংসারের জড়িয়ে ফেলছে! অবশ্য বাড়িতেও তো শান্তি ছিলো না। মা সারাক্ষণ ক্যাচ ক্যাচ করতো! এখানে বরং শান্তিতে থাকা যাবে। আর ফ্লাটমেট হিসেবে সৌমিকের সাথে কেনাকাটা করাই যায়! ফ্লাটমেট! মনে মনে হাসে অতসী।
এদিকে বান্ধবীরা ম্যাসেঞ্জারে একের পর এক ম্যাসেজ দিচ্ছে। ধ্যুর ওদের এসব আউলা ঝাউলা কথার উত্তর দিয়ে লাভ নাই! সৌমিকের ম্যাসেজের উত্তরে শপিং এ যেতে চায় জানিয়ে নেট অফ করে দেয়। এরপর বেডরুমে থাকা ছোট্ট একটা বই এর ওয়াল ক্যাবিনেট থেকে একটা বই নিয়ে পড়তে থাকে। চোখে কখন জানি আবার ঘুম জড়িয়ে যায়। ধড়ফড় করে ঠেলে উঠে কলিং বেলের শব্দে, এখন আবার কে আসলো?
(চলবে)