তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয় পর্ব-০৩

0
8

#তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয়

(৩য় পর্ব)

অতসী ফ্লাটের দরজা খুলে দিতেই মধ্য বয়সী একজন মহিলা কল কল করে কথা বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো

– আরে সৌমিক বাপজান তো সেই মিষ্টি একখান মাইয়াকে বিয়া কইরা আনছে! আহা রে বাপের দুক্ষু এইবার যাবো গা। একা একা হাত পুড়ায়ে খায়। আমি কতো কইরা কই – বাপ আমি রান্না কইরা দিই। তা সে কয় – না খালা, কারুর উপর নিভভর করুম না। পোলার জীবনে তো শোক আর শোক। মা গো আপনি একটু দেইখ্যা রাইখেন।

মহিলা ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, একটা প্রিন্টের শাড়ি পেঁচিয়ে পরা। কিন্তু চেহারায় অদ্ভুত একটা মায়া। উনার মুখ আর হাত একসাথে চলতে লাগলো। দ্রুত হাতে রান্নাঘর পরিস্কার করে, ঝাড়ু হাতে ঘর ঝাড়ু দেয়া শুরু করে।

– ঘরে কিন্তুক তেমন কিছু নাই কইলাম। আমি কই অ বাপ, তুমি আরো কিছুক কিনো। তা কয় – খালা, আমার পচন্দে তুমাদের বউ এর পচন্দ হয় কিনা, তাই কিনি নাই। কী যে ভালো পোলা। আমাকে যকন খালা কয়ে ডাক দেয়, পরাণডা জুড়ায়ে যায়। কিন্তুক আজ কি রান্না হবে আম্মা?

– খালা, আমাকে তো কিছু বলে নি।

– খাড়াও, আমি শুইনা লই।

খালা তার কোমরে গোঁজা একটা বাটন মোবাইল বের করে, ফোনে কথা বললো। তখনই অতসীর মনে হলো- আরেহ, সৌমিকের ফোন নাম্বার তো অতসীই জানে না! এটা কেমন একটা ব্যাপার হয়ে গেলো!

– আম্মা, আজ রান্না হবে না নাকি। আমাকে কইলো, তুমরা নাকি বাইরে খাইবা।

অতসী কিছু বলতে পারলো না। আসলে ও তো কিছু জানেই না। খালি মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগলো – দুপুরে খাবে কী?

বুয়া খালা নিজের মতো করে বকতে বকতে কাজ শেষ করে চলে গেলো। অতসী আবার একা হয়ে গেলো। ফোনে রিং বেজেই চলেছে। ফোনে ‘মা’ লেখা, মানে মা কল দিয়েছে। অতসীর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। ফোন রিসিভ করে না। শাওয়ার নিয়ে আরেকটা নতুন মেরুন রঙের থ্রি পিচ পরে। এই থ্রি পিচটা বেশ সুন্দর। কোন একটা দেশীয় ব্যান্ডের৷ পরার পরে মনে হয় সুন্দর লাগছে যদিও আয়না না থাকায় ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না। এই ড্রেসটা সৌমিকের দেয়া।

এদিকে দুপুর দুটোয় আকাশ কালো করে মেঘ জমা হয়। একা ফ্লাটে নতুন জায়গায় অতসীর কেমন যেন লাগে। ঠিক ভয় না, কেমন শূন্যতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝমে বৃষ্টি। আজকাল আবহাওয়ার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। যদিও অতসীর বৃষ্টি ভালো লাগে। কিন্তু এখন বৃষ্টি হলে সৌমিক কিভাবে আসবে, সেই চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে।

বেশ বৃষ্টির মধ্যেই বাসায় কলিং বেল বাজে। একটু ভীতসন্ত্রস্ত অতসী, আই হোলে চোখ রাখে। নাহ সৌমিকই এসেছে – যাক বাবা বাঁচা গেলো। এখন সৌমিকই ওর কাছে সবচেয়ে আরাধ্য।

সৌমিক ঘরে ঢোকে একদম ভিজে জবজবা হয়ে। তার মধ্যে বড় একটা পলিথিনে খাবারের প্যাকেট।

– আপনার নিশ্চয় ক্ষুধা লেগেছে। বৃষ্টির জন্য দেরি হয়ে গেলো। তারপরেও খুঁজে পেতে দুই প্যাকেট বিরিয়ানি আনলাম।

– খাওয়ার চিন্তা পরে হবে। আগে যান কাপড় পালটে আসেন। পরে অসুস্থ হয়ে যাবেন।

অতসীর কন্ঠে প্রকৃতই আন্তরিকতা ছিলো। বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়লে মাটি যেমন নরম হয়ে যায়, অতসীর এটুকু আন্তরিকতায় সৌমিকের মনও নরম পেলব হয়ে যায়। সৌমিক দ্রুত ওর রুমে ঢুকে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢোকে।

সৌমিক এসে খাবারের প্যাকেট খুলে প্লেটে বাড়বে – এই জন্য অপেক্ষা করতে অতসীর খারাপ লাগে। সে তো একেবারে অক্ষম নয়। আর বিয়ে জিনিসটা তার পছন্দ নয় সত্য কিন্তু সৌমিক যেখানে এতোটাই ভদ্র ব্যবহার করছে, সেখানে তার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করবে, অতসী এতোটা খারাপ নয়।

প্লেট নিয়ে ওদের ছোট্ট ডাইনিং এ রাখে। রান্নাঘরের ফ্লিটার থেকে বোতলে পানি আনে। বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে প্লেটের পাশে রাখে। সাথে রাখা শশা, টমেটোর সালাদ আলাদা একটা প্লেটে রাখে। আরেকটা পকেটে রাখে দুইটা চামচ। কাঁচের গ্লাস এনে রাখে ঠিক প্লেটের বাম পাশে।

সৌমিক ডাইনিং এ ঢুকে কিছুটা অবাক হয়। অতসী খুব সুন্দর করে টেবিলে সব খাবার গুছিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। সৌমিকের ভীষণ ভালো লাগে। সেই ভালো লাগা থেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে।

প্লেট নিয়ে বসার পরেও খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে।

– আপনি বুঝি বাইরের খাবার মোটেও খেতে পারেন না?

সৌমিকের খাবার নাড়াচাড়া করতে দেখে অতসী প্রশ্ন করে।

– না, না তা কেন? বাইরে তো প্রায়ই খাই। সব সময় রান্না করার সময় হয় না।

– তাহলে খাচ্ছেন না কেন? বিরিয়ানিটা তো ভালোই।

– আসলে অন্য একটা কারণে খেতে পারছি না।

– অসুবিধা না হলে বলতে পারেন।

– না, না অসুবিধার কিছু নেই। মা মারা গিয়েছেন সেই ক্লাস নাইনে যখন পড়ি। তারপর আজ এতো বছর পরে কেউ আমার জন্য খাবার টেবিল গুছিয়ে অপেক্ষা করছিলো। এজন্য বেশ নস্টালজিক হয়ে গিয়েছি। আপনি খান, আমিও খাচ্ছি।

অতসী খুবই অবাক হয়। এতো ছোট্ট একটা বিষয় কারো জীবনে বড় কোন বিষয় হতে পারে, ওর জানা ছিলো না। আপনজন হারা জীবন কেমন হতে পারে, এই ব্যাপারে ওর কোন আইডিয়াই নেই। মা বাবার ফোন রিসিভ না করার জন্য ওর ভীষণ অনুতপ্ত লাগে।

(চলবে)