#তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয়
(চতুর্থ পর্ব)
খাওয়া শেষ হলো কিন্তু বৃষ্টি শেষ হলো না। বাধ্য হয়ে সৌমিক আর অতসীর বাইরে যাওয়ার প্লান ক্যান্সেল করতে হলো। অতসী রুমে এসে প্রথমে ওর বাবাকে কল করলো।
– বাবা কেমন আছো?
– আমাদের উপর এতোটাই অভিমান করে আছিস মা? ফোন দিলেও রিসিভ করিস না! তোর যদি ভালো নাই লাগে, চলে আয়। জোর করে সংসার করা যায় না। আমাদের মনে হয় ভুলই হয়ে গেছে মা!
বেশ ধরা গলায় কথাগুলো বললেন শফিক হাসান। অতসীর খুব মন খারাপ হলো। ও তো আসলে সেই অর্থে খারাপ নেই। বরং এখানে শ্বশুরবাড়ির কোন ঝামেলাই নেই। ওর বান্ধবীদের মুখে যেসব ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা শুনতে হয়েছে। বিয়ের পরেরদিন রান্নাঘরে ঢুকিয়ে বলেছে, তোমার হাতের রান্না খাবে সবাই। কিংবা বিয়ের কণের অনেক জিনিস, কসমেটিকস বরের বোন বা ননদের মেয়ে ‘পছন্দ হয়েছে’ – এটুকু বলে হাতিয়ে নিয়েছে। এগুলো শুনলে অতসীর ভয়ংকর রাগ হতো। রান্না তো করতেই হয়, একা থাকলেও তো রান্না করেই খেতে হয়। কিন্তু তাই বলে এভাবে পরীক্ষায় ফেলা কেন? আর বিয়ের জিনিস অন্যেরা নেবে কেন? পছন্দ হলে ভাই বা মামাকে বলে কিনে নেবে কিন্তু বউ এর জিনিস কেন নেবে?
সেই হিসেবে অতসী অনেক ভালো আছে। আর তাছাড়া সৌমিক আসলেই অনেক ভদ্র এবং বিবেক বিবেচনা সম্পন্ন ব্যক্তি। অন্তত: এখনো পর্যন্ত তাই মনে হয়েছে। পরেরটা পরে বোঝা যাবে। আমাদের দেশে বিয়ের পরে স্বামী, শ্বশুরবাড়ির সাথে বনিবনা না হলে মেয়ে বাবার বাড়ি ফিরে গেলে কতোটা দুরাবস্থা হতে পারে সেটা অতসী ওর বোন অনন্যাকে দিয়েই বুঝেছে। বেচারীকে তো দেশই ছাড়তে হলো। এজন্য অতসী সেই পথে হাঁটতে চায় না। আর সেই রকম কোন পরিস্থিতিই তৈরী হয় নি।
– বাবা, তোমরা চিন্তা করো না। আমি ভালো আছি।
– তাহলে ফোন ধরিস না। আমাদের কি চিন্তা ভাবনা হয় না? আমরা কি তোর ভালো চাই না? খারাপের জন্যই কি বিয়ে দিলাম?
– বাবা, তুমি ভুল বুঝো না। আসলে হঠাৎ করেই এই বিয়ে হয়ে গেলো। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ। আমি ঠিক বুঝতে পারি নি। আমাকে ক্ষমা করো। আর মা’কে বলো আমি ভালো আছি। সমস্যা নেই। একটু সামলে নিয়ে আমিই ফোন দেবো।
– আচ্ছা মা। তুই ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকি।
বাবার সাথে কথা বলে অতসীর মন’টা হালকা হলো। আসলে বাবা – মা’ও অসহায়। সমাজ তাদেরকে নানান বিষয়ে ক্ষত বিক্ষত করে ছাড়ে।
বৃষ্টির দিনে অতসীর চা খাইতে ইচ্ছা করে। আর তাছাড়া আজ চা বা কফি কিছুই খাওয়া হয় নি! সৌমিক মনে হয় নিজের রুমে ঘুমাচ্ছে। রান্না ঘরে খুঁজলে নিশ্চয় চা কফি পাওয়া যাবে।
এসব ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে এসে দেখে সৌমিক প্লেট গ্লাস ধুয়ে রাখছে। অতসী কিছুটা লজ্জা পেলো। ওর উচিৎ ছিলো নিজের গ্লাস প্লেটটা অন্ততঃ ধুয়ে রাখা। সৌমিক বাবা মা’কে নিয়ে আবেগী কথা বলায় অতসী নিজেও আবেগাক্রান্ত হয়ে খাওয়া শেষ করেই দ্রুত রুমে গিয়েছিলো। গ্লাস প্লেট ধোয়ার কথা মনেই ছিলো না!
– আমি খুব দু:খিত। এসব তো আমারও ধোয়া উচিৎ ছিলো।
– দু:খ প্রকাশের কিছু নেই। আপনি আসলে নতুন জায়গায় এসে হঠাৎ করে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। একটু তো সময় লাগবেই। সমস্যার কিছু নেই।
– একদম ঠিক বলেছেন। আসলে এভাবে হঠাৎ করেই বিয়ে, তারপর এখানে আমি এখনো ঠিক ঘোরের মধ্যেই আছি। আপনি বুঝতে পেরেছেন, এজন্য ধন্যবাদ।
– বোঝাই তো উচিৎ। এখন বলেন, কিছু লাগবে?
– আসলে আজ চা খাওয়া হয় নি। তার উপরে এমন বৃষ্টি। এজন্য রান্নাঘরে এসেছিলাম, যদি চা পাতি থাকে, চা খেতাম।
– চা, চিনি, দুধ সবই আছে। কিন্তু আমার বানানো চা, নিজেরই পছন্দ হয় না।
– আমিই বানাচ্ছি। আপনি খাবেন?
– চা এর নিমন্ত্রণ, মিস করা কি ঠিক? চুলার উপরের ডান পাশে কাবার্ডে সব পাবেন।
– বাহ, সব সুন্দর করে সাজানো তো।
– ধন্যবাদ
বেশ মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললো সৌমিক।
অতসীকে সৌমিক চায়ের পাতিল এগিয়ে দিলো। এরপর একটু দূরে দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকলো। অতসী আপন মনে চা বানাচ্ছে৷ সৌমিকের এই চা বানানো দৃশ্যটা দেখতে ভীষণ ভালো লাগছে। মেরুন রঙের এই ড্রেসটাতে মেয়েটাকে বেশ মানিয়েছে। মাথায় অর্ধেক কাপড় টেনে দেয়া। তাতে বেশ একটু বউ বউ লাগছে। দু গোছা চুল সেই ছোট্ট ঘোমটার ফাঁক দিয়ে বের হয়ে ওর মুখের দুই পাশে ঝুলে আছে৷ সৌমিকের কাছে এটুকুই বেশ স্বপ্নের মতো লাগে। ওর একটা সংসার হবে, এমন বউ রান্নাঘরে, ওর পাশে থাকবে – এটাই তো অনেক বড় কিছু।
চা বানানো হলে সৌমিকই একই ডিজাইনের দুইটা কাপ এগিয়ে দেয়।
– এখানে দাঁড়িয়ে না খেয়ে বরং বারান্দায় বসি? সেখানে কি বসার কিছু আছে?
– না, কিছু নেই। ভাবছিলাম দুইটা বেতের চেয়ার কিনবো। পরে আর কেনা হয় নি। আচ্ছা, ডাইনিং এর দুইটা চেয়ার নিয়ে যায়।
এখন হালকা বৃষ্টি পড়ছে। বেশ একটু ঠান্ডা বাতাস। দুইজন চা নিয়ে বসে।
– বাহ, আপনি তো দারুণ চা বানান।
– ধন্যবাদ। যেদিন কেনাকাটা করতে যাবো, ছোট্ট একটা হামানদিস্তা কিনবো। দুধ চায়ে একটু এলাচ পিষে দিলে দারুণ ঘ্রাণ হয়।
অতসীর এই কথাতে সৌমিক খুব খুশি হয়। ওর চেহারা ঝলমলে হয়ে উঠে। যাক, মেয়েটা আস্তে আস্তে মানিয়ে নিচ্ছে। সৌমিকের খুশি অতসী টের পায়। ছেলেটা দেখতে খারাপ না, আরো ভালো এর আচরণ। অতসীর আশংকা ভয়, আস্তে আস্তে কাটতে থাকে।
– আপনার সম্পর্কে তো তেমন কিছুই জানি না। জানতে চাই।
আমি তোমার সম্পর্কে সবই জানি অতসী – মনে মনে বলে সৌমিক। এরপর চায়ের কাপ নামিয়ে অতসীর দিকে এই প্রথম সরাসরি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিতে তাকায়। অতসীর হঠাৎ কেমন লজ্জা লাগে। মুখ নামিয়ে ফেলে। সৌমিকের চাহনীতে কি একটু প্রেমিকের দৃষ্টি ছিলো? নাকি ভুল দেখলো?
(চলবে)