তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয় পর্ব-০৫

0
8

#তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয়

(পঞ্চম পর্ব)

ভালোবাসা জিনিসটাকে কখনোই কোন ভাষায় বোঝানো যায় না। যতো ভালো লেখক হোক কিংবা যত ভালো কথা শিল্পীই হোক, আসল ভালোবাসা সেটাই যার অধিকাংশ কথাই না বলা থাকে।

সৌমিক অতসীকে ভীষণ পছন্দ করে। অতসী কিছুটা মেজাজী এটা জানে। অতসীর সাথে কথা না হলেও ওর বড় বোন অনন্যার সাথে ওদের বিয়ের কথা শুরু হওয়া থেকেই নিয়মিত কথা হয়। অতসীর পছন্দ অপছন্দ অনন্যার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। অনন্যাই প্রথম আলাপ শুরু করে ছোট বোনকে কার হাতে দিচ্ছে সেটা একটু যাচাই করতে। নিজে তো ধরা খেয়েছেই, আদরের ছোট বোন ভালো থাকুক, এটাই ওর বড় চাওয়া।

সৌমিকের সাথে কথা বলে অনন্যা খুব খুশি। ছেলেটা আসলেই অনেক ভালো। ভদ্র, বিনয়ী। অতসীর অনেক ছবি সৌমিককে দেয়। যা দিয়ে সৌমিক কল্পনার জগতে রঙিন ভালোবাসার স্বপ্ন বুনে।

সৌমিক জানে অতসী বিয়েতে নিম রাজী ছিলো। এজন্য ও অতসীর সাথে কথা বলে খুব ভেবে চিন্তে। আবার নিজের খোলস ভেঙে টুকটাক কথা বলে অতসীকে সহজ করে নেয়ার জন্য। সৌমিককে স্বামী হিসেবে না মানুক যেন একজন বন্ধু হিসেবে মানতে পারে।

কিন্তু আজ এই বৃষ্টিমুখর দুপুরে কেমন যেন হৃদয় আলোড়িত হয়। এ যেন সেই বৃষ্টিমুখর ক্ষণ যখন

“এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘন ঘোর বরিষায়”

কিন্তু সৌমিক যখন বুঝতে পারে অতসী অস্বস্তি বোধ করতে পারে, দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। অতসী ওর স্ত্রী, তার মন জয় করা সবচেয়ে বড় মিশন। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বাইরে তাকিয়ে কিছুটা উদাসী কন্ঠে বলে

– আসলে আমার নিজের জীবনে তেমন কোন বৈচিত্র নেই। ছোটবেলায় বাবা মা হারা। অন্যের দয়া অনুগ্রহে বড় হয়েছি। হলে হোস্টেলেই কেটেছে জীবন। বাবা, মা, আপন জন, সংসার – এসব আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। মনে হয় যেন রূপকথা। আমি জীবনে খাওয়ার কষ্ট করেছি, বেঁচে থাকার জন্য কঠিন সংগ্রাম করেছি। এরপর যখন টাকা উপার্জন করা শুরু করেছি, প্রথমেই সঞ্চয় করা শুরু করেছি যেন ছোট্ট একটা বাসা আমার নিজের নামে থাকে। আমার যদি কখনও কোন পরিবার হয়, তারা যেন ভালো থাকে। আমি তো কখনও মেয়েদের সাথে মিশি নি, আমার ব্যবহার অনেক সময় অসংলগ্ন হতে পারে। কিছু মনে করবেন না।

কথা বলতে বলতে সৌমিকের গলা ধরে আসে। জীবনের নানা কষ্টের কথা মনে পড়ে। অতসীর কেন যেন খুব মায়া হয়। ওর মনে হয়, ওর থেকে একটু দূরে বসে থাকা ছেলেটা মনে মনে বড্ড একা, দু:খী আর ভালোবাসার কাঙাল।

– আমার কথাই বললাম। আপনার কথা কিছু বলুন। আপনার পছন্দ, অপছন্দ এসব।

– আমার জীবন আপনার চেয়েও নিরামিষ। টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। এই করা যাবে না, সেই করা যাবে না – এর মধ্যে বেড়ে উঠা। তারপরে বড় বোনের জীবনে কালো অধ্যায়ের কারণে আমার জীবনে আরো বিধি নিষেধ জারী হলো। অনার্স শেষ করলাম৷ তারপর এই তো এইখানে, এভাবে।

– এই বিধি নিষেধে নিশ্চয় আপনার কোন স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। বেশ কষ্ট নিয়ে বললেন কিনা।

এই প্রশ্নে অতসী কিছুটা থমকে গেলো। সামান্য পরিচয়ে এতোসব বলা কি ঠিক হবে। পরে মনে হলো, বিয়েই তো হয়ে গেছে, এখন বলেও বা কি।

– আমি খুব গান ভালোবাসতাম। টুকটাক শিখেছিলাম। স্কুল কলেজের অনুষ্ঠানে একটু আধটু গাইতাম। কিন্তু ভার্সিটিতে উঠার পরে মা কঠিনভাবে নিষেধ করে দেয়। এমনকি বাড়িতেও গাইতে দিতো না। এটাতে খুব কষ্ট পাই।

– কি বলেন! এটা তো দারুণ একটা গুণ। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। মা কেন নিষেধ করলেন বুঝলাম না।

– মায়ের পুরোটা দোষ দিই না। আপুর ডিভোর্সের পরে আমরা যেন সমাজে এক ঘরে হয়ে যাই। আমাদের চলা ফেরা, কথা বার্তা সবই যেন দোষের কারণ। আত্মীয় স্বজনরাই বেশি সমালোচনা করে। এজন্যই কটূ কথায় ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে মা এমন করে।

– আপনাকে একটা কথা বলি। মাইন্ড করবেন না। আপনার কন্ঠের গান দুই এক লাইন শোনা যাবে? কেন জানি খুব কৌতূহল হচ্ছে।

– আপনার প্রস্তাবটা অস্বস্তিকর কিন্তু কৌতূহলটা অস্বাভাবিক না। আর আমি গাইতে পছন্দ করি। যদিও রেওয়াজ নেই বহুদিন। কিন্তু এই পরিবেশটাই গানের পক্ষে।

একটু চুপ করে অতসী গাইতে থাকে

“শাওন–রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে।। ভুলিও স্মৃতি মম, নিশীথ–স্বপন সম আঁচলের গাঁথা মালা ফেলিও পথ ‘পরে”

অতসীর কন্ঠ অদ্ভুত সুন্দর, স্বপ্নের মতো। আস্তে আস্তে গাইছে তবুও কি যে মাদকতা ছড়ানো কন্ঠ! অনন্যা বলেছে, অতসীর এই শখের কথা। আজই যে সৌমিক গান শুনতে চাইবে ভাবেও নাই। কথা প্রসঙ্গে চলে এসেছে। অতসীও রাজী হওয়াতে সৌমিক খুব খুশি।

বাইরে বৃষ্টি, হাতে চায়ের কাপ আর সামনে অদ্ভুত সুন্দর গান গাইছে অপূর্ব এক নারী।

প্রেমে পড়া বারণ থাকলেও চুপি চুপি প্রেমে না পড়ার কোন কারণ নেই। সৌমিক বৃষ্টির ফোঁটার মতো টুপ করে প্রেমে পড়ে। এবার সৌমিক চিন্তিত। এই রোগের কোন ওষুধ নেই। নিরাময় একটাই – অতসীকেও এভাবেই প্রেমে রোগে আক্রান্ত করতে হবে। সাদাসিধা সৌমিক কী সেটা পারবে?

(চলবে)