#তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয়
(৬ষ্ট পর্ব)
“প্রেমে পড়া বারণ
কারণে অকারণ
আঙুলে আঙুল রাখলেও
হাত ধরা বারণ”
সৌমিকের মনের মধ্যে অকারণেই এই গান বেজে উঠে। ব্যালকনি থেকে উঠে এসেছে। বৃষ্টিও এখন তেমন নেই, একটু হালকা টিপটপ শব্দ। বেশিরভাগ শব্দই গাছের পাতা থেকে বৃষ্টির পানি পড়ার ছান্দসিক শব্দ। আকাশে মেঘ থাকায় সন্ধ্যা যেন আগেই নেমে অন্ধকার পরিবেশ। সৌমিক ল্যাপটপে অফিসের কিছু কাজ নিয়ে বসে। আজকাল জাহিদ ভায়ের দুষ্টামির জ্বালায় অফিসে কাজ করাই কষ্টকর হয়ে গেছে। ভদ্রতা করে কিছু বলাও যায় না, একই অফিসে কাজ করতে হবে। আবার এতো বেশি ফাজলামি করে হজম করা কষ্টকর।
অতসী ঘরে ফোন নিয়ে ব্যস্ত৷ ওর গার্লস গ্রুপে ম্যাসেজে পরিপূর্ণ যার উত্তর সে দেয় নি। একটা গ্রুপ কল করে। তার আগে রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। বান্ধবীদের হাউকাউ সৌমিকের কানে গেলে ব্যাপারটা ভালো হবে না।
– কি রে বর পেয়ে আমাদের ভুলেই গেলি। একেবারে ফোন বন্ধ। বাব্বাহ কি রোমান্স!
এভাবে একের পর এক আক্রমন। অতসী চুপ করে সবার কথা শোনে। এরপর সবার কথার উত্তরে ধীরে ধীরে বলতে থাকে।
– আমরা মধ্যযুগে বাস করি না। আমাদের যেহেতু অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছে, পরস্পর জানাশোনা জরুরী। এখন সৌমিক মেইন বেড রুম ছেড়ে দিয়েছে, ও তো অন্যরুমে থাকে। আমাদের মাঝে বোঝাপড়াটা আগে হওয়া দরকার।
– লে হালুয়া। এভাবে এক বাসায় ভাড়া থাকার মতো থাকলে বোঝাপড়া কিভাবে হবে বান্ধবী। তোকে নিরস জানতাম, এখন দেখি তোর বরও আরো এক কাঠি উপরে! নিরসের সাথে নিরামিষ!
এক বান্ধবী রাম খোঁচা দেয়। অপরজন সায় দিয়ে বলে
– হ্যাঁ রে তোর বরের আবার অন্য কোথাও ইটিশপিটিশ নাই তো? বিয়ে করা বউকে কেউ আরেক ঘরে রাখে?
বান্ধবীদের খোঁচায় অতিষ্ট হয়ে অতসী কল কেটে ফোন অফ করে দেয়। মেজাজ খিঁচে যায়। আবার ফোন অন করে বড় বোন অনন্যাকে একটা ম্যাসেজ পাঠায়, ফ্রি সময়ে যেন কল দেয়। অনন্যাকে এই সময়ে সচরাচর পাওয়া যায় না। কিন্তু আজ কিভাবে যেন ফ্রি ছিলো। কল দেয় প্রায় সাথে সাথে৷
– কি অবস্থা রে?
– আপু, হাজবেন্ড ওয়াইফ কি একই ঘরে থাকা বাধ্যতামূলক?
– কেন? হঠাৎ এই প্রশ্ন?
– আমি তো আলাদা ঘরে থাকি। মানে আপাততঃ আর কি। এটা নিয়ে বান্ধবীরা কি যে ট্রল করলো!
– আলাদা থাকার এই বিষয়ে নিশ্চয় সৌমিক অফার করেছে?
– হু
– এটা তার ভদ্রতা। তোমাকে নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার জন্য সময় দিয়েছে। এখন তোমার উচিৎ দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে একই রুমে থাকা। কারণ এতে বোঝাপড়াটা আসলেই দ্রুত হয়। আমি মনে করি, হাজবেন্ড ওয়াইফের আলাদা থাকাই ঠিক না। অবশ্য সৌমিককে স্বামী হিসেবে মানতে না পারলে আলাদা কথা!
– সেটা না আপু। সৌমিক ভালো ছেলে সন্দেহ নেই। কিন্তু..
– কিন্তু কি?
– কিন্তু কিভাবে বলবো যে আসেন আমার সাথে থাকেন? বিব্রতকর না, ব্যাপারটা?
– উফ, আমি তোকে বুদ্ধিমান ভাবতাম। বলবি তোর একা থাকতে ভয় লাগছে।
– তা একটু লাগছে আপু। গতরাতে এতোই ক্লান্ত ছিলাম বুঝি নি। আজ বৃষ্টি হওয়াতে আশেপাশে কোন সাড়া শব্দ নাই। কেমন নীরব নীরব।
– তো সেটাই বলবি গাধি।
– তবুও কেমন দ্বিধা লাগছে।
– দেখ, তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস। আর সৌমিক এমন ছেলে না যে তোকে কোন ধরণের অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলবে।
– হু
– হু কি? ফোন রাখ। ওর সাথে কথা বল।
বোনের ধমকে ফোন রেখে অতসী কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। এরপর কিছু একটা ভেবে সৌমিকের রুমে উঁকি দেয়
– রাতে খিচুড়ি খাবেন? বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খেতে মজা
– দারুণ অফার দিলেন। চলেন তুলে দিই।
– আমি খিচুড়ি রাঁধতে পারি।
কিছুটা আমতা আমতা করে বললো অতসী। আসলে সবার কটাক্ষ আর ধমক খেয়ে বুঝতে পারছিলো না কি বলবে।
– বাহ, তাই নাকি? আপনাকে হেল্প করি চলুন। কোথায় কি আছে আপনার তো আর জানা নেই।
এক সাথে রান্নাঘরে ঢোকে অতসী আর সৌমিক। সৌমিকের এমন উদার মন অতসীর খুব ভালো লাগে। ওর বোন বিয়ের আগেই বলেছিলো – সব ছেলে খারাপ না। আমার জীবন দিয়ে তোর জীবন যাচাই করতে যাস না। তবুও অতসীর ট্রমা কাটতে চায় না।
সৌমিক পেঁয়াজ রসুন কেটে দিলো। অতসী খিচুড়ি তুলে দেয়। আবার সেই অখন্ড নি:শব্দ। কি বলবে বুঝতে পারছে না।
– আমাকে তুমি করেই বলবেন। আপনি শুনতে কেমন খটোমটো লাগে। আমি পরিবারের ছোট, এমন আপনি শুনতে অভ্যস্ত না।
অতসী ওড়নার এক অংশ আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলে।
– আমাকে বুঝি খুব মুরব্বি মনে হয়?
দুষ্টুমি কন্ঠে বলে সৌমিক
– জি?
– না মানে আমাকে যেভাবে আপনি, জি বলছেন তাতে মনে হচ্ছে আমি চুল পাকা কোন মুরব্বি। শোনেন মানুষ তো বন্ধুকেও তুই তুমি করে বলে। আমি আপনার হাজবেন্ড, বিরাট ভারিক্কি কিছু এসব না ভেবে স্রেফ বন্ধু ভাবেন আর তুমি করে বলেন। উফ সরি, আমিও তোমাকে তুমি করেই বলি। ব্যাপারটা ইজি লাগবে।
অতসী খুশি হয়। ইজি হয়েই বলে উঠে
– আমার মনে হচ্ছে একা এক রুমে থাকতে ভয় ভয় লাগবে। গতরাতে এতোই ক্লান্ত ছিলাম যে বুঝি নি। আজ কেন জানি বেশি চুপচাপ পরিবেশ মনে হচ্ছে। তুমি কি আমার সাথে থাকবে?
বেশ একটু অনুনয় ভরা কন্ঠে অতসী বলে উঠে। সৌমিকের হার্ট বিট মিস করে। এ কী প্রেয়সীর আহবান নাকি একা থাকতে না পারার ভয়? সৌমিক মনে মনে অনেক কিছু ভাবতে থাকে। ভালোবাসায় অনেক জ্বালা, অন্যের মন নিয়ে খালি নানান রকম চিন্তা করতে হয়। পাছে ভালোবাসার মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে ফেলে!
(চলবে)