তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয় পর্ব-০৮

0
7

#তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয়

(৮ম পর্ব)

অতসী যতই বলুক সৌমিককে অন্য মেয়ের ব্যাপারে সকালে উঠেই জিজ্ঞাসা করবে কিন্তু বাস্তবে হয়ে উঠে না। নানান চিন্তায় রাতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। সকালে অতসীর যখন ঘুম ভাঙে তখন সকাল হয়ে গিয়েছে, বাইরে পাখির কিচিরমিচির শব্দ। অতসী পাশে তাকিয়ে দেখে সৌমিক গুটিসুটি হয়ে ঘুমাচ্ছে। আগেরদিন অনেক বৃষ্টি হওয়াতে শেষ রাতে বেশ শীত শীত পড়েছে। অতসীর কারণে সৌমিক এই ঘরে আসলেও কোন কাঁথা আনা হয় নি।

অতসীর মায়া লাগে। ওর কাছে থাকা কাঁথাটা আলতো করে সৌমিকের গায়ের উপর দিয়ে বের হয়ে আসে। সৌমিকের বেশ বেলা করেই ঘুম ভাঙে। আজ অফিস ছুটি, এলার্ম দেয়া ছিলো না। গায়ের উপরে কাঁথা দেখে কিছুটা অবাক হয়। ভোরের দিকে বেশ শীতই লাগছিলো। কাঁথা কখন গায়ে দিলো মনে নেই। অতসী ঘরে নেই। ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ যেতেই সৌমিক দেখলো অতসী ভর্তা ভাতের আয়োজন করেছে।

– ফ্রিজে তেমন কিছু নেই। আমার আমার রান্নার দৌড় খুব বেশি না। এজন্য এটুকুই করেছি।

– অতসী, এটুকুই আমার জন্য অনেক বেশি৷ অনেক ধন্যবাদ যে ঘুম থেকে উঠেই এমন ধোঁয়া উঠা গরম ভাতের আয়োজন করার জন্য।

সৌমিকের চোখে মুখে আনন্দের ছটা। নাহ, মনের মধ্যে অন্য মেয়ে থাকলে এতো খুশি হওয়ার কথা না! মনে মনে এসব ভাবে অতসী। সকালে খেয়েই ওরা বের হয়ে যায়। আজ আবহাওয়া ভালো, ওদের অনেক কেনাকাটা বাকি। আগে একটা ড্রেসিং টেবিল, ব্যালকনিতে বসার জন্য দুইটা বেতের চেয়ার কেনে। এরপর পর্দা, ম্যাচিং বেড সিট। আরো কিছু টুকিটাকি। এসব কিনতে কিনতেই দুপুর হয়ে যায়। বাইরেই খেয়ে নেয়। সবকিছুর ফাঁকে অতসী সৌমিককে নজরদারিতে রাখে। ফোনে কতটুকু সময় দিচ্ছে, অতসীর দিকে কতোটুকু নজর – এসব। কিন্তু না, সৌমিকের পুরো মনোযোগ অতসীর দিকেই। আবার কেনাকাটা শেষেও সৌমিক অতসীকে নিয়ে একটা কাপড়ের দোকানে ঢোকে।

– অতসী, আমার কেন জানি মনে হয় তোমাকে শাড়ি পরলে বেশ সুন্দর লাগবে। নিজের পছন্দ মতো একটা শাড়ি নাও।

– তাহলে চুড়িও দেবেন! আমার বহুদিনের শখ হিমুর রূপার মতো নীল শাড়ি আর হাত ভর্তি চুড়ি পরবো।

অতসীর এই উচ্ছ্বাসে সৌমিক খুশি হয়। ওর মনে হয় অতসী ধীরে ধীরে ওর প্রেয়সী হয়ে যাচ্ছে। বিয়ের পরের জীবনটা সবার জন্যই কঠিন। প্রেমের বিয়ে হোক কিংবা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। দুই সংস্কৃতি থেকে উঠে আসা দুইজন মানুষের একই ছাদের নিচে সব সময় বাস করে মানিয়ে নেয়া খুব কঠিন। এক জনের ঠান্ডা পছন্দ তো অপর জনের গরম। কেউ নরম ভাত খায় তো অপর জনের পছন্দ একটু ঝরঝরে কিছুটা শক্ত ভাত। এমন কত শত অমিল থাকে। এজন্যই চীনা প্রবাদে স্বামী স্ত্রীকে রাত দিনের সাথে, সাদা – কালোর সাথে তুলনা করা হয়। বিপরীত কিন্তু পরিপূরক। সৌমিকের আজীবনের লালিত ইচ্ছা একটা নিজের গৃহকোণ, একটা সুখি পরিবার। সেজন্য সে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে রাজী।

অতসীকে নিয়ে ওর খুব ভয় ছিলো – মানিয়ে নিতে পারবে কিনা। কিন্তু আজ অতসীর হাসি মুখ আর সংসারের জিনিস এভাবে আগ্রহ করে কেনা দেখে সৌমিকের ভালো লাগে, নিজেকে হালকা লাগে।

– কিছু কাঁচা বাজারও করা লাগবে। আর তোমাকে তো আমি চালাইদেন টাইপ খাবারের উপরেই রাখছি।

– আরে না, কি বলে। আমি এমন খাবারেই ভালো বোধ করি। আর আমাকে একটু মায়ের ঐখানে যেতে হবে। মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছেন।

– তাই নাকি। চলো তোমাকে আগে নামিয়ে দিয়ে আসি।

– একা না থেকে আমার সাথে থাকলে হয় না?

অতসী এখনো তুমি বলাতে ততোটা অভ্যস্ত হয় নি। আপনি তুমির বাইরে অনেকটা ভাববাচ্যে কথা বলছে। সৌমিক অতসীর আন্তরিকতায় খুশি হয়।

– আমার একটা প্রজেক্টের কাজ নিয়ে বেশ ঝামেলায় আছি। তুমি যাও। আমাকে বললেই আমি তোমাকে নিয়ে আসবো। আর আমি তো আজীবনই একা। হঠাৎ করে তো আর একা থাকা শুরু করছি না।

অতসীর কেন যেন এই লাস্ট কথাগুলো কান্নার মতো শোনায়। সৌমিকের জন্য মন খারাপ হয়। সৌমিক অতসীকে নামিয়ে রাতের খাবার খেয়ে চলে আসে। অতসী মায়ের পাশে বসে। উনার প্রেসারের সমস্যা, হুটহাট বেড়ে যায়।

– এখন তো আমার বিয়ে হয়েছে। এখন কেন অসুস্থ হও আম্মা?

– তোরে নিয়ে আমার দুনিয়ার চিন্তা। কখন না জানি চইলা এসে কস- আম্মা, সংসার করতাম না।

– হ, তোমার কটকটানি শোনার চেয়ে সংসার করা ভালো। আমি কালই চইলা যাবো।

অতসী কপট রাগ দেখিয়ে বলে। অতসীর আম্মা, অভিজ্ঞ মানুষ। অতসীর রাগে হাসে। উনার মনের চিন্তা দূর হয়ে যায়৷ মেয়ে যে ভালো আছে, সেটা ওর চেহারা দেখে বোঝা যায়। আল্লাহ ওদের ভালো রাখুক – মনে মনে দোয়া করে।

আজ অতসী নিজের চিরচেনা ঘরে, নিজের বিছানায়। কিন্তু কেন যেন অতসীর ফাঁকা ফাঁকা লাগে। ঠিক কি যেন নেই নেই। বার বার সৌমিকের কথা মনে পড়ে। খুব ইচ্ছা করে সৌমিককে একটা কল দিতে। আচ্ছা, সৌমিক কি ঘুমিয়ে পড়েছে? কল দিলে কি হ্যাংলামি হবে? অতসী কি করবে বুঝতে পারে না।

(চলবে)