#তুহে_তো_দিল_ধারাকতা_হ্যাঁয়
(৯ম পর্ব)
সৌমিক বলা যায় সেই ছোট থেকেই একা থাকে। একা থাকাতে সে অভ্যস্ত, এখন খুব একটা খারাপ লাগে না। বরং বেশি মানুষজন, হৈ চৈ – এসবে অস্বস্তি বোধ করে। কিন্তু মানুষের জীবনে কখন কোন পরিবর্তন আসে, তা বলা কঠিন। এই যেমন অতসীকে রেখে ওর ফ্লাটে পা রাখতেই কেমন যেন মন খারাপ হয়। মনে হয় কী যেন নেই! ঘরের বাতাসে যেন অতসীর গায়ের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে।
নিজের বেডরুমে ইচ্ছে করেই যায় না। সেখানে অতসীর কাপড় চোপড়, জিনিসপত্র আছে। সেগুলো দেখলে আরো মন খারাপ হবে। অন্য সে ঘরে থাকতো সেখানে ঢোকে। ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে। কাজে যেন ব্যাঘাত না হয় এজন্য ফোন বন্ধ করে রাখে। ল্যাপটপ ওপেন করলেও মাথায় একটা চিন্তা হঠাৎ এসে সৌমিককে তোলপাড় করে দেয়। অতসী যদি আর ফিরে না আসে? মানে ভদ্র মেয়ে হয়তো বলতে পারে নি কিন্তু দেখা গেলো কোন কারণে এখানে ভালো লাগে নি কিংবা সৌমিকের কোন আচরণ পছন্দ হয় নি। তারপর বলে দিলো – সে আর ফিরে আসবে না! এমন তো কতোই হয়!
এই চিন্তা মাথায় আসতেই সৌমিকের কাজ কর্মে আর মন বসলো না। লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো। হঠাৎ যেন মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে৷
এদিকে অতসীরও মন খারাপ। সৌমিকের নাম্বারে কল করলো কিন্তু ফোন সুইচ অফ। সৌমিক আসলেই ওকে পছন্দ করে তো? অতসী জীবনে প্রেম করে নি। বিয়েও করতে চায় নি। এখন বিয়ে করে যদি সংসার না টিকে তাহলে লোকলজ্জার বিষয়। আর তাছাড়া ওর আত্মসম্মানেরও বিষয়। ওর কি এমন কোয়ালিটিই নেই যে সৌমিক পছন্দ করলো না! – এমন নানা চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমাতে গেলো অতসী।
পরেরদিন সকালে সৌমিক ফোন অন করতেই একটা কল দেখলো – অতসী! নিজের উপরে নিজেরই রাগ হলো সৌমিকের। ওর অন্ততঃ ফোন করে জানানো উচিৎ ছিলো যে, সে ঠিকমতো পৌঁছেছে। উলটো নানান অদ্ভুত চিন্তা করে রাতে ভালো ঘুম হলো না আবার কাজের কাজ কিছুই হলো না। সৌমিক সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে অতসীকে ছোট্ট একটা ম্যাসেজ পাঠালো – “তাড়াতাড়ি চলে এসো, পুরো ফ্লাটই কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে!”
অতসীর ঘুম ভাঙলো বেশ বেলা করে। কারণ রাতে ভালো ঘুম হয় নি। ঘুম ভেঙে ফোন হাতে নিয়ে দেখলো সৌমিক ম্যাসেজ করেছে। ছোট্ট একটা ম্যাসেজ অতসী কতো বার করে যে পড়লো! ওর মুখে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠলো। মনের মধ্যে যে দ্বিধা ছিলো, তা যেন নিমিষেই কেটে গেলো। ভাবলো আজই বিকালে চলে যাবে।
অতসীর বাবার বাড়িতে আসার কথা ওর বান্ধবীদের কানে কিভাবে যেন চলে গেছে । দুপুরের দিকে হৈ হৈ করতে করতে ৩/৪ জন চলে আসলো। ওদের মধ্যে নীলিমাকে দেখে অতসীর ভালো লাগলো। এই মেয়েটা খুব শান্ত এবং বাস্তববাদী একটা মেয়ে। অন্যদের মতো না। বান্ধবীদের মধ্যে শ্রেয়সী সব সময় একটু খোঁচা দিয়ে কথা বলে। এটাই ওর স্টাইল বলা যায়। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের খাতিরে সবাই সেটা মেনেই নেয়।
– কি ব্যাপার বান্ধবী, তোর নিরামিষ বর কি একটু রসিক হলো?
– সৌমিক মোটেও নিরামিষ নয়!
রাগ হলো অতসীর। তীব্রভাবে প্রতিবাদ করলো।
– তাই? তা তোকে তো দেখে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েলই মনে হচ্ছে!
নিজের রসিকতায় অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লো শ্রেয়সী। অতসীর খুব মেজাজ খারাপ হলো। এমন বেয়াদপ টাইপ রসিকতা অতসীর সহ্য হয় না। নিজের বাড়িতে শ্রেয়সীকে অপমান করবে কিনা বুঝতে পারছে না। নীলিমা মুখ খুললো।
– আমি মনে করি এমন কিছু হলে অতসী নি:সন্দেহে ভাগ্যবতী। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে এভাবে সময় দেয়া অতসীর বরের ভদ্রতা প্রকাশ পায়। আমাদের দেশের ছেলেদের মধ্যে যে মধ্যযুগীয় বর্বর মানসিকতা আছে, সেটার বাইরে অতসীর সৌমিক। বিয়ে মানে শুধু যে স্ত্রীর দেহ ভোগ নয়, বরং একটা বন্ধন, একটা আত্মীক সম্পর্কে নিজেদের বেঁধে ফেলা – এটা যারা প্রকৃতই শিক্ষিত তারাই জানে। এটা মোটেও দূর্বলতা নয় বরং প্রকৃত ব্যক্তিত্বের অধিকারী সেটাই বোঝায়।
নীলিমার কথা একদম সত্য। অতসীর খুব ভালো লাগে। কিন্তু শ্রেয়সী হেরে যাওয়া মেয়ে নয়। অন্যকে আঘাত করে কিছু মানুষ পৈচাশিক আনন্দ পায়। শ্রেয়সী হলো সেই ধরণের মানুষ। সে দুম করে বলে বসে
– কী জানি বাপু, এখন আবার অনেক ছেলেরাই শারীরিকভাবে দূর্বল হয়! তেমন কিছু হলে অতসী বান্ধবী তোমার কপালে দু:খ আছে।
অতসীর এবার সহ্য হয় না। কিন্তু অতসী যেমন ভালো তেমনি খারাপ হতেও জানে। কিভাবে কাকে কোথায় ঘায়েল করতে হয়, সেটা ওর ভালোই জানা। অতসী শ্রেয়সীর কথায় বেশ একটা চওড়া হাসি দেয়। এরপর শ্রেয়সীর হাতের কনুই এর দিকে বেশ পুরাতন একটা আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে বলে
– ঠিক বলেছিস শ্রেয়সী আমার স্বামী দূর্বল। সবলের চিহ্ন তো এভাবেই বউ বা প্রেমিকার শরীরে রেখে দিতে হয়!
শ্রেয়সীর মুখ এবার অন্ধকার হয়ে যায়। শ্রেয়সী একটা ছেলের সাথে প্রেম করতো কিন্তু ছেলেটা শ্রেয়সীর সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থাতেই অপর একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। শ্রেয়সী সেটা জানতে পেরে খুব হৈ চৈ শুরু করে দেয়। প্রথমে কথা কাটাকাটি হতে হতে সেই ছেলেটা শ্রেয়সীর গায়ে হাত তোলে আর তার চিহ্ন হলো হাতের এই আঘাত৷
অতসী কিংবা ওর বান্ধবীরা সব সময় শ্রেয়সীকে মানসিক সাপোর্ট দিয়েছে এবং কখনোই এই বিষয়টা তোলে নি। আজ শ্রেয়সী এতো জঘন্যভাবে অতসীকে আঘাত করেছে যে অতসী আর সামলাতে পারে নি।
নীলিমা পরিস্থিতি বুঝে ওদের নিয়ে অতসীদের বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
অতসী রাগে ফুঁসতে থাকে। অদ্ভুত এই সমাজের মানুষ। এখানে একান্ত ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই! যা ইচ্ছা তাই বলা যায়!
(চলবে)