তোমাতেই বসবাস পর্ব-০১

0
845

#তোমাতেই_বসবাস
লেখিকাঃনওশিন আদ্রিতা
#পর্বঃ১

আমার বিয়ের আসরে আমার সামনেই আমার হবু স্বামি তার প্রাক্তন প্রেমিকার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।এই মুহূর্তে আমার কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিৎ আমি তা ভেবে উঠতে পারছিনা।শরীর টা আসার হয়ে আসতেই শরীরের ভাড় ছেড়ে দিলাম চেয়ারের উপরে।শরীরে যেনো বিন্দু মাত্র শক্তি আমার অবশিষ্ট নেই।চোখের পাপড়ি গুলোও ইতিমধ্যে ভিজে উঠেছে তা বেস টের পাচ্ছি। হয়তো এতো সাধনার পরে পাওয়া প্রিয় মানুষ টিকে পেয়েও হারানোর যন্ত্রণাই। হঠাৎ কানে এলো বড় আব্বুর গর্জন

—আবির এমন অসভ্যতামোর কারন কি।লিনা এখানে কি করছে???

বড় আব্বুর গম্ভীর রাগী সরে আবির ভাইয়া ছেড়ে দিলেন তার প্রাক্তনের হাত।

—আব্বু আমি লিনা একে অপরকে ভালোবাসি।আমাদের মাঝে কিছু ভুল বুঝাবুঝি হওয়াই আমি বিয়েতে মত দিয়েছিলাম কিন্তু লিনার গর্ভে আমার সন্তান আমি চাইলেও পারবোনা তার থেকে দূরে সরে আসতে।

কথাটা যেনো সবার মাথায় বাজ ফেললো। কেউ যেনো এমন টা কল্পনা করেনি। আমি ধীর কন্ঠে আমার পাশে দাড়ানো আমার কাজিন হিমানিকে উদ্দেশ্য করে বললাম

—বোন আমাকে একটু কষ্ট করে আমার রুম অব্দি রেখে আসবি।

হিমানি বিনা বাক্য বেয় করে আবিরের দিকে ঘৃণিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই আমাকে নিয়ে উঠে দাড়ালো।রুমে প্রবেশ করেই দরজা লাগিয়ে দিয়ে দরজার সাথে ঠেসে বসে পড়লাম।নিচ থেকে চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ ও এক সময় কমে আসলো হয়তো সবাই রাজি হয়ে গেছে হবেও না কেন বংশের বড় ছেলে আর মেয়েটাও ত আমার একমাত্র ফুফির।তিন ভাইয়ের জান তার একমাত্র মেয়েকে আর যায়হোক কষ্টে দেখতে পারবেনা কেউ। তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো ঠোঁটের ভাজে। হাতের টানে ঘোমটা খুলে ঢুকে পড়লাম শাওয়ার নিতে।

এতোক্ষন যার কথা শুনলেন সে হলো আদ্রিতা খান। আজ তার বিয়ে ছিলো। বিয়েটা পরিবার ঠিক করলেও আদ্রিতা অনেক আগে থেকেই আবিরকে পছন্দ করতো। কিন্তু সে কখনো তা প্রকাশ করেনি কারন আবির তার ফুফাতো বোন লিনাকে পছন্দ করতো।কিন্তু তাদের ব্রেকআপ আর পরিবারের এমন সিদ্ধান্ত আবিরের হ্যা বলা সব মিলিয়ে আদ্রিতা ভেবেই নিয়েছিলো হয়তো নিয়তির বেড়াজালে আবির এবার তার হবে।
আদ্রিতা মূলত জয়েন্ট ফ্যামিলিতেই থাকে আদ্রিতার বাবারা তিনভাই এক বোন। নাহিদ খান নাজমুল খান নাজির খান আর তাদের একমাত্র বোন নাজিনা আহমেদ। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় হলেন নাজমুল খান তারপর আদ্রিতার বাবা নাহিদ খান আর ছোট হলেন নাজির খান আর সবার ছোট নাজিনা খান। নাজমুল খান এর দুই ছেলে মেয়ে আবির খান আর হিমানি খান। হিমানি এবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে আর আবির পড়াশুনা শেষ করে এবার বাবার ব্যবসায় যোগ দিয়েছে।নাহিদ খান এর একটাই মেয়ে আদ্রিতা খান। আদ্রিতা বর্তমানে অনার্স প্রথম বর্ষে। আর নাজির খান এর এক ছেলে সে ক্লাস এইট এ পরে হিমাদ্র খান। আর আদ্রিতার ফুফির এক মেয়ে লিনা। সেও এবার অনার্স প্রথম বর্ষে।

এলোকেশ ছড়িয়ে এলোমেলো হয়েই বসে পড়লো বিছানাই। পাশে থাকা ডয়ার থেকে ঘুমের ঔষধ দুইটা হাতে নিয়ে পানি দিয়ে গিলে ফেললো। কারন সে জানে একটু পরেই তার মা আর বাবা তার দরজার কাছে হাজির হবে। আদ্রিতা এই মুহূর্তে চাচ্ছে না তাদেরকে ফেস করতে। কারন সে জানে আদ্রিতার বাবা কতোটা বোন পাগল আর নিজের মেয়ের থেকে বোনকে বেশি ভালোবাসে সেটাও তার অজানা নয়।কিন্তু সে জানেনা তার জীবনের নতুন ঝড় সমন্ধে।

ঘুমের ঔষধ এর ইফেক্টে আদ্রিতার ঘুম ভাংগতে ভাংগতে ১১ টা বেজে গেলো ঘুমের চোখেই ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই চোখ পড়লো নবদম্পতির দিকে আর বাকিদের হাস্যজ্বল মুখের দিকে।আদ্রিতার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো তপ্ত দীর্ঘশ্বাস।ধীর পায়ে হেটে ডাইনিং টেবিলে বসতে নিলেই কেউ একজন তার হাত ধরে টেনে সামনে দাড় করায়ে সজরে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। আদ্রিতা সামনে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। স্বয়ং তার জন্মদাত্রী মা দাঁড়িয়ে আছে।চোখে মুখে ঘৃণা রাগ স্পষ্ট। আদ্রিতা কিছু বলার আগেই মিসেস রেনু (আদ্রিতার মা) পুনরায় আদ্রিতার গালে থাপ্পড় মেরে দিলেন।আদ্রিতা হতদম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
আদ্রিতার কানে এলো তার মায়ের কর্কশ বানী:

—কেমন নির্লজ্জ মেয়ে তুই হ্যা লজ্জা করলোনা আমাদের মাথা নিচু করতে কিভাবে পারলি আমাদের সম্মান ডুবাতে ছি তোর মতো মেয়ে থাকার চেয়ে আমি নিসন্তানই ভালো ছিলো।মরে যেতে পারলিনা।

আদ্রিতা কিছু না বুঝেই তাকিয়ে রয়েছে।তার কিছুক্ষনের মাঝেই তিনি নিজের ফোন বের করে তার দিকে ধরলেন ফোনের স্ক্রীনের দিকে তাকাতেই তার চোখ লজ্জাই নিচু হয়ে গেলো। ফোনের পর্দায় স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে তার আর এক ছেলের অন্তরঙ মুহূর্ত।

—কাল লিনা আমাদের এই ছবি না দেখালে জানতেও পারতাম না এতোদিন আমি এক দু*শচরিৎাকে নিজের আচলে রেখে বড় করচ্ছিলাম।

আদ্রিতা শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো লিনার দিকে। লিনা বাকা একটা হাসি দিয়ে ফল খাওয়াই মন দিলো।আদ্রিতা এবার চোখ ঘুরিয়ে নিজের আব্বুকে খুজতে লাগলো আর পেয়েও গেলো তিনি এক কোণাই দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে।আদ্রি তার মায়ের সামনে থেকে সরে তার আব্বুর সামনে দাড়াতেই নাহিদ খান চোখ তুললেন

—আব্বু আমি জানি হয়তো তুমিও আমাকে বাকীদের মতোই ভাবছো।কিন্তু বিশ্বাস করো আব্বু তোমার প্রিন্সেস কখনোই তোমার সম্মানহানী করবেনা। তোমার চোখ নিচু হবে এমন কাজ করার আগেই আমার মৃত্যু কামনা করি আব্বু।এই ঘরে উপস্থিত সবাই আমার ব্যাপারে কি ভাবলো তাতে আমার কিছু যায় আসেনা আব্বু কিন্তু তোমার চোখে ঘৃণা আমার সহ্যক্ষমতার বাহিরে।

—লিনা মিথ্যা বলবেনা।

আদ্রিতা অবাক চোখে তাকালো নিজের বাবা মা আর পরিবারের দিকে মহূর্তের মধ্যে যেনো চিনা পরিবার টা অচেনা ঠেকলো। যেখানে নিজের বাবা মায়ের বিশ্বাস এতো আবছা সেখানে অন্যকারো বিশ্বাস আদৌও কিছু আসে যায়।সে জানতো তার বাবা তার ফুফু আর তার মেয়েকে একটু বেশিই ভালোবাসে। কিন্তু নিজের মেয়ের উপরে তিনি অন্যকাউকে রাখবেন কখনোই ভাবেনি।

আদ্রিতা আর কিছু না বলেই বেরিয়ে যেতে নিলেই আদ্রিতা হাত ধরে ফেলে আদ্রির বড় আম্মু

—কই যাচ্ছিস না আর কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক আমি করি আমার ছোট মা কখনোই এমন কাজ করবেনা।

হিমানি আদ্রির অপর হাত ধরে বললো
—হ্যা আমি আমিও জানি আমার আপু কখনোই এমন কিছু করবেনা।

আদ্রি কিছু বলার আগেই তার মাথায় কারো স্পর্শ পেলো মাথা তুলে দেখলো তার বড় আব্বু

—আমার মা কেমন তা আমরা জানি তুই কোথাও যাবি না এই বাড়ি তোর

—আমি এই বাড়িতে থাকতে পারবোনা বড় আব্বু যেখানে আমার বাবা আমাকে বিশ্বাস করেনা যেখানে তার চোখে ঘৃণা স্পষ্ট সেখানে আমি কিভাবে থাকি বলো।

—কই যাবি তুই।

—জানিনা বড় আব্বু। কিন্তু এখান থেকে এতোদূরে যতোদূরে গেলে আমার এই মুখ আমার বাবা মায়ের দেখতে নাহয় কোনদিন।

কেউ কিছু বলার আগেই আদ্রি বলে উঠে

—তোমাদের আমার কসম লাগে না আমার পিছনে আসবা না আমাকে আটকাবা আর নাতো খুজার চেষ্টা করবা।

কাউকে আর কিছু বলতে না দিয়েই বেরিয়ে পড়লো। রাস্তাই পা রাখতেই আকাশ ভেংগে গড়াতে লাগলো ঝুম বৃষ্টি। অবেলার বৃষ্টিতে ঝাপসা চোখে হাটতে শুরু করলো অজানা পথে সে জানেনা এখান থেকে কই যাবে কোথায় যাবে রাতে খালি পেটে ঘুমের ঔষধ সকালে এতোসব এর প্রেশার আদ্রিতার দ্বারা বহন করা সম্ভব হলোনা। চোখ দুইটা বুজে আসার আগাই চোখের সামনে পড়লো সাদা গাড়ি তার দিকে ধেয়ে আসছে। আদ্রিতা নিজের মৃত্যু নিকটে ভেবেই চোখ জোড়া বুঝে নিলো।

চলবে?