তোমার জন্য এক পৃথিবী
রেশমী রফিক
১।
পুরো বাড়ি জুড়ে উৎসবের আমেজ। চারদিকে ছুটাছুটি হচ্ছে। আমিরাকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ। তাই নিয়ে মা-বোনদের অস্থিরতার শেষ নেই। শুধু আমিরাই চুপচাপ বসে আছে। তার অত অস্থির লাগছে না। তবে মনের মধ্যে গুমোট একটা অনুভূতি বিরাজ করছে। অবশ্য প্রতিবার এমন হয়। পাত্রপক্ষের সামনে যাবার আগে বুকের মধ্যে কামড়ে ধরে। পেটের ভেতর গুড়গুড় করে। এ যেন অদ্ভুত পরীক্ষা। পাত্রপক্ষের সামনে নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করার। তারা পাশ মার্ক দিলে তবেই স্বস্তি! এখন অব্দি এই স্বস্তিটুকু মেলেনি। বেশ অনেকদিন ধরে পাত্র দেখা হচ্ছে। যতগুলো প্রস্তাব এসেছে, যতবার পাত্রপক্ষের সামনে গেছে আমিরা, ওইটুকুই। বিয়ের কথাবার্তা আর এগোয়নি। কারণ পাত্রপক্ষের চাহিদার সাথে আমিরাদের ব্যাটেবলে মেলেনি।
এমন না, আমিরার পরিবারের চাহিদা অনেক বেশি। আমিরা খুব আহামরি ধরনের মেয়ে নয়। পরিবারও মধ্যবিত্ত। তার জন্য নুন্যতম শিক্ষিত আর চাকুরিজীবি পাত্র হলেই চলে। সেরকম অবশ্য কয়েকজনকে পাওয়া গেছিল। কিন্তু ছেলেপক্ষ কী কারণে যেন আর এগোল না। আমিরাকে হয়তো তাদের পছন্দ হয়নি। যদিও তারা আমিরাকে পছন্দ করেছিল। সামনাসামনিই বলেছে, মেয়ে তাদের মনে ধরেছে। কিন্তু বাড়ি ফিরে কথা এগোনোর আগ্রহ দেখায়নি। কারণটা মুখে না বললেও সহজে অনুমান করা যায়। আজকালকার দুনিয়ায় ছেলেপক্ষের যেসব চাহিদা থাকে, আমিরার বাবা-মায়ের তা পূরণ করার সামর্থ্য নেই। আবার হতে পারে, মেয়ে পছন্দ হলেও নানা পারিপার্শ্বিকতা বিচার করে এই পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করতে তাদের মন সায় দেয়নি। ভালো একটা শ্বশুরবাড়ি তো সবাই আশা করে।
কিন্তু আজকের বিষয়টা আলাদা। এই প্রস্তাব বড় খালা এনেছেন। পাত্র নাকি খালুর অফিসে চাকুরি করে। জুনিয়র অফিসার। নাম শফিক। আমিরার বড় খালা বেশ আশাবাদি। কারণ পাত্রের ‘না’ বলার কোনো কারণ নেই। ছেলে নিজেও ছাপোষা ধরনের। সহজ-সরল তার জীবনযাপন। উচ্চাভিলাষ বলতে যা বুঝায়, তার মধ্যে একদমই নেই বলা যায়। খালা প্রথমদিনই আমিরাদের বাড়িতে এসে বোনের সাথে গল্প করেছেন। ছেলে নাকি খুব সৎ। একারণে বড় খালুর খুব পছন্দের কর্মচারী সে। বিয়েটা এক প্রকার ঠিক হয়েই আছে, বলা চলে। আজ শুধু আনুষ্ঠানিক দেখাদেখি হবে। শফিক আসবে। সবার সাথে পরিচিত হবে। চাইলে আমিরার সাথেও কথা বলতে পারে। আমিরার ছবি সে আগেই দেখেছে। তার পছন্দ হয়েছে মেয়ে। বড় খালু নিজে আমিরার পরিবার আর পারিপার্শ্বিক বৃত্তান্ত জানিয়েছেন। শফিকের এগুলো নিয়ে আপত্তি নেই। তার শুধু একটা বউ হলেই চলে।
হয়তো একারণেই আমিরার মধ্যেকার গুমোট অনুভূতি আজ মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। সময় গড়াচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে। আর মনের মধ্যে একটু পর পর খামচে ধরছে। শফিককে এখনও দেখা হয়নি ওর। আজই প্রথম দেখবে। এই দেখাদেখির পর্বটা কেমন হবে, ছেলেটা কেমন দেখতে, কিছুই জানে না সে। অবশ্য জেনেও কাজ নেই। এই ছেলেকে ওর পছন্দ না হলেও বিয়েটা হয়ে যাবে। খালা নিশ্চয়তা দিয়েই রেখেছেন।
আমিরা ঘড়ির দিকে তাকাল। এই নিয়ে কমসে কম পঞ্চাশবারের উপর দেখল সে। পাঁচটায় আসার কথা। এখনো পাঁচ মিনিট বাকি আছে। আচ্ছা, ছেলেটা ঠিক পাঁচটায় আসবে তো? নাকি আসতে দেরি করবে? জানালার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ওর মাথার উপর চিন্তাভাবনারা ছুটাছুটি করছে। দৃষ্টি রাস্তার দিকে। খুব ভালোমতো দেখা না গেলেও বড় রাস্তা থেকে কোনো গাড়ি বা রিকশা ঢুকলেই এখান থেকে দেখা যায়। আমিরা এজন্যই দাঁড়িয়ে আছে। তার ইচ্ছে, সবার আগে শফিককে সে দেখবে। অবশ্য বাড়ির সামনে গাড়ি বা রিকশা দাঁড়াল কি না, তা দেখতে পাবে না। এই ঘরের জানালা বাড়ির পুর্ব পাশে আর সদর গেট দক্ষিনমুখী। তাই গলির ভেতর যেই ঢুকুক না কেন, ওর নিশ্চিতভাবে জানার উপায় নেই ওটাই পাত্র কি না। তবু সে অপেক্ষা করছে। পাত্র যেমনই হোক দেখতে, বেশভূষা আলাদা করে চেনা যাবে। আচ্ছা, শফিক কি গাড়িতে চড়ে আসবে? নাকি রিকশায়? মা আর বোনের কাছ থেকে যতটুকু শুনেছে, মনে হয় না নিজের গাড়ি আছে। সেক্ষেত্রে রিকশায় আসার সম্ভাবনা বেশি। বড়জোর সিএনজি চড়ে আসতে পারে। যদিও মনে হয় না, পাত্রী দেখা বাবদ যাওয়া-আসায় ঘটা করার কথা।
সাতপাঁচ ভাবনার মাঝেই একটা সিএনজির দিকে চোখ পড়ল আমিরার। পাশের বাসার সামনে থেমেছে। সিএনজি থেকে একটা ছেলে নামল। বেশ লম্বা আর সুদর্শন দেখতে। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা নাকি ফরসা এই মুহূর্তে বুঝা যাচ্ছে না দূর থেকে। কারণ ছেলেটার মুখ প্রায় লাল হয়ে আছে। গরমে ঘেমেনেয়ে একাকার। সিএনজি থেকে নেমেই পকেট থেকে রুমাল বের করেছে। রাস্তার উল্টোপাশে একটা ছোট চায়ের দোকান। সেখান থেকে পানির বোতল কিনেছে। তারপর হাতমুখ ভিজিয়ে নিল। রুমাল দিয়ে মুখটা মুছল। এর ফাঁকে চায়ের দোকানকারকে কিছু জিজ্ঞেস করছে। তখনো ভালোমতো ছেলেটাকে লক্ষ করেনি আমিরা। তার মন চলে গেছিল দূর সীমানায়। বিয়ের পর কী হবে, কী করবে, কেমন সংসার পাতবে, এসব আবোলতাবোল ভাবছিল। সংবিৎ ফিরল, যখন ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাল। হয়তো আলাদা ভাবে লক্ষ করেনি। দোকানকারকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করেছিল। সে আঙুল তুলে এই বাড়িটা দেখিয়েছে। তখনই ছেলেটার চোখ গেছে দোতলার জানালার দিকে। এক ঝলক তাকিয়েই মুচকি হাসল যেন। আমিরাও চোখ সরায়নি। হতবাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার হাসি চওড়া হলো। অদ্ভুতভাবে আমিরার ঠোঁটের কোণেও আবছা হাসি ফুটল। তারপরই ছেলেটা উধাও হয়ে গেল। সামনে এগিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকেছে বোধহয়। এর কয়েক মিনিট পরই কলিংবেল বাজল। দরজার এপাশে চাপা গুঞ্জন। পাত্র চলে এসেছে! আমিরার বুকের ভেতর খামচে ধরল কেউ। এই ছেলেটাই কি শফিক? সত্যি?
চলবে।
তোমার জন্য এক পৃথিবী
রেশমী রফিক
২।
আমিরাদের পরিবারটাকে মধ্যবিত্ত না বলে নিম্ন-মধ্যবিত্তই বলা চলে। ওর বাবা আজগর আলী অনেকদিন যাবত পঙ্গু হয়ে পড়ে আছেন বিছানায়। সরকারি চাকুরি করতেন। দুই হাত না ভরে আয় না করলেও মোটামুটি সচ্ছ্বল ছিলেন। তিন মেয়ে তার। আমিনা আমিরা আর আনিসা। কোনো ছেলে নেই। একটা ছেলেসন্তানের শখ মনের মধ্যে আজীবন পুষে রাখলেও মেয়েদের লালনপালনে অবশ্য্ কোনোরকম কার্পন্য করেননি। সামর্থ্যের মধ্যে সবটুকু উজাড় করে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ওই সময়ে এই পরিবারটাকে মধ্যবিত্ত বলে চালানো যেত। বছর দশেক আগে আচানক বিপর্যয় নেমে এলো ওদের উপর। আজগর আলী সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হারালেন। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিটি যদি পঙ্গু হয়ে ঘরবন্দি হয়, এর থেকে বড় বিপদ বুঝি আর হয় না দুনিয়াতে! তবে এই যাত্রায় আল্লাহ ওদের সহায় ছিলেন। আমিরার বড় খালা, শাহীনা বানু দায়িত্ব নিলেন পুরো পরিবারের। তার নিজের বেশ ভালো অবস্থা। স্বামী একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে কর্মরত। বেতনের অঙ্কটা লোভনীয় পর্যায়ের। এছাড়াও পৈতৃক সয়সম্পত্তি আছে। সব মিলে সমাজের উচ্চ-মধ্যবিত্ত স্তরে তাদের বসবাস। শাহীনা বানু নিজে সমাজসেবায় নিয়োজিত। দুই হাত ভরে দানখয়রাত করেন। নারীসমাজের উন্নতি নিয়ে তার বেশ কিছু সক্রিয় পদক্ষেপ আছে। গেল বছর এই উপলক্ষে বড় পুরস্কারও পেলেন। এই সমাজসেবারই অংশ হিসেবে ছোট বোনের পরিবারের হাল ধরেছেন। বোনকে তিনিই বিয়ে দিয়েছিলেন সরকারি পাত্র দেখে। বিয়ের আগপর্যন্ত তার সংসারে বোন খেয়েছে, পরেছে। আল্লাহর ইশারায় আবারও দায়িত্ব নিতে হয়েছে।
এরকম একটা পরিবারকে বোধহয় মধ্যবিত্ত বলা যায় না। হাত পেতে নেয়ার অভ্যেস আসলে মধ্যবিত্তদের থাকে না। তাদের আর্থিক সচ্ছ্বলতা খুব না থাকলেও আত্মমর্যাদা টনটনে। পারলে এক বেলা না খেয়ে, কী আধপেটা খেয়ে দিন পার করে। তাও অন্যের দুয়ারে হাত পাতবে না। আমিরাদের পরিবার এই ধাপ থেকে নিচে নেমে এসেছে। মূলত বড় খালার দয়াদাক্ষিণ্যের উপরই ওদের ভরসা। এখন অবশ্য আমিরার পরিবার তার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। আমিনা বর্তমানে একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করছে। ডিভোর্সী। তবে সন্তান নেই। স্কুলের বেতন দিয়ে সংসার না চললেও তার নিজের খাওয়াপরা হয়ে যায়। বাড়তি কিছু টাকা মায়ের হাতেও দিতে পারে। আমিরাও ক্লাশ নাইন-টেনে পড়াকালীন সময় থেকেই একটা-দুটো টিউশনি করছে। বাসা থেকে কোনো হাতখরচ নেয় না। পড়াশুনার খরচ বড় খালা দেয়। এর বাইরে সে চেষ্টা করে আর খরচ না করতে। খালাকে বললে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু হাত পেতে নিতে তার কুন্ঠা হয় খুব। আজীবন কি খালার ঘাড়ে বসে খাওয়া সম্ভব? আমিরা এখন কলেজ প্রথম বর্ষে। তার ইচ্ছে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর খালার কাছ থেকে পড়াশুনার খরচ আর নিবে না। এখন দুটো টিউশনি করে। তখন আরও দুই-তিনটা জোগাড় করবে। একজনের কাছে সে শুনেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা নাকি টিউশনি করিয়ে ভালো আয় করতে পারে। তারা দেশের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে, এজন্য তাদের বেতন বেশি। আমিরার দুচোখ ভর্তি অনেক স্বপ্ন। মেধাবী ছাত্রী সে। নিশ্চিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবেই। তারপর পড়াশুনা শেষ করে ভালো চাকুরি করবে। নিজ পায়ে দাঁড়াবে। পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিবে।
আনিসা এখনো স্কুলের গন্ডি পার হয়নি। ক্লাশ নাইনে ভর্তি পড়ছে। ইদানীংকালে সে টিউশনি করতে চায়। কিন্তু বাসা থেকে অনুমতি নেই। মা একবার বড় খালার কানে দিয়েছিল কথাটা। খালা কড়া সুরে মানা করেছেন, যেন ওই পথে পা না বাড়ায়। আমিরার টিউশনি করাতেও তিনি আপত্তি করেছেন। প্রথমবার তো শোনামাত্রই হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। বাসায় পা দিয়েই কী অভিমান ভরা কথা! হ্যাঁ, আমি কি মরে গেছি যে তোরা টিউশনি করবি? তোদের কি আমি অভাবে রেখেছি?
আমিরা কোনো উত্তর দেয়নি। মাথা নিচু করে রেখেছিল। এরপর খালা চলে যেতেই মায়ের সাথে তুমুল ঝগড়া লাগিয়ে দিল। যতদিন তাদের সামর্থ্য ছিল না কিছু করার, ততদিন খালা সমর্থন দিয়েছেন। সেটা আলাদা বিষয়। তাই বলে সারাজীবনই হাত পাততে হবে, এটা কেমন কথা? পড়াশুনার পাশাপাশি টিউশনি করতে পারলে সমস্যাটা কোথায়? পড়াশুনার বাইরেও কত আনুষঙ্গিক দরকার থাকে। সবটাই কেন খালা দেবে? তার কি অফুরন্ত রাজভান্ডার আছে? আজগর আলী মেয়ের কথায় সায় দিলেন। স্ত্রীকে তিরস্কার করলেন মেরুদন্ডহীন বলে। হাত পেতে নেয়াটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেলে কপালে দুর্গতি বৈ আর কিছুই থাকবে না। নাসিমা বানু কথা বাড়াননি। আমিরার টিউশনি করা নিয়ে বোনের সাথে আর কিছু বলেননি। এখন আনিসার টিউশনি করাতে আমিনাই বাগড়া দিয়েছে। স্নেহের সুরে বলেছে,
– আমি তো আছি। তাই না? তোর যখন যা লাগে, আমাকে বলবি। তুই শুধু স্কুলটা পাশ কর। পড়াশুনা কর মন দিয়ে। এরপর টিউশনি করিস।
কেউ মুখে বলে না, কিন্তু তারা তিনবোনই বুঝতে পারে এই দুনিয়াতে তাদের সামাজিক অবস্থান অনেকখানি নিচে নেমে গেছে। বড় খালার আশ্রিত বলা যায় ওদের। খালাও যে খুব বড় মন নিয়ে ওদের পেছনে টাকাপয়সা খরচ করেন, তা না। তিনি আসলে নিজের ইমেজ দাঁড় করাতে চান। নিজেকে শ্রেষ্ঠ সমাজ সেবিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কথায় আছে, চ্যারিটি স্টার্টস ফ্রম হোম। এজন্য বোনের অসহায় দুস্থ পরিবারকে দিয়েই তার এই পদচারণার শুরু। তাছাড়া যতটুকু করেন, করুণা থেকেই আসে। চোখের সামনে একই মায়ের পেটের ছোট বোনকে জীবনযুদ্ধে সংগ্রাম করতে দেখতে কারওই ভালো লাগে না। তাই বলে নিজের সামাজিক অবস্থানের সাথে মিলমিশ করে ফেলাটাও বোকামি। এই কথাগুলো আমিরাকে কেউ বলেনি। কিন্তু চোখ দিয়ে অনেক কিছু সে দেখেছে। যেমন খালাত বোনের তুচ্ছতাচ্ছিল্য। ওদের বাসায় গেলেই তার ফাইফরমায়েশ খাটতে হয়। আবার বান্ধবীদের সামনে না-চেনার ভান করে। খালাত ভাইও কম যায় না। তার আচরণ দেখলে মনে হবে যেন কাজের মেয়ে। সবথেকে বড় কথা, খালার বাসায় তখনি আমিরাদের দাওয়াত বা ডাক পড়ে, যখন বিশাল অনুষ্ঠান হয়। নামিদামি অনেক মানুষ আসে। গৃহকর্মীরা এদের আপ্যায়ন করে কুলিয়ে উঠতে পারে না। তখন আমিনা, আমিরা আর আনিসাকে হাত মেলাতে হয়। খালা নিমন্ত্রণের কথা বললেও আমিরার মাঝেমধ্যে মনে হয়, গৃহকর্মীদের সাথে হাত মিলিয়ে আপ্যায়নের কাজে সাহায্য করতেই মূলত ওদেরকে ডাকা হয়। সপরিবারে নিমন্ত্রণ হলেও বাবা পঙ্গু। তাই তার যাবার প্রশ্নই আসে না। তাকে একা ফেলেও মাও যায় না।
শুধু এই আপ্যায়নের বিষয়টাই না, আমিরা আরও কিছু ব্যাপারে বৈষম্য লক্ষ করেছে। প্রতি ঈদে খালা ব্যাগভর্তি জামাকাপড় কিনে পাঠান। ওগুলো কখনোই মানসম্মত হয় না। গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে কিনে আনা। কাপড় থেকে রঙ উঠে, অথবা একবার ধুয়ে ফেললেই রঙ চটে যায়। কাপড় ত্যানা হয়ে যায়। খালার দেয়া কাপড়চোপড় বেশিদিন পরা যায় না। মাঝেমধ্যে খালাত বোনের ব্যবহৃত জামাকাপড়, জুতা, কসমেটিকস আসে। এগুলো পরেই তিন বোনের দিনকাল যায়। আমিনা অবশ্য এখন কেনাকাটা করে। অল্প বেতন, শুধু হাতখরচ আর যাতায়াতেই অনেকটা চলে যায়। তবু সে চেষ্টা করে সংসারের জন্য এটা-সেটা কিনতে। ভালোমন্দ খাবারের আয়োজন করতে। বিভিন্ন উপলক্ষে বাবা-মা আর বোনদের জন্য জামাকাপড়ও কিনে আনে। ওসব যে খুব দামি, তা নয়। কিন্তু আমিরার ধারণা, বড় খালার কিনে পাঠানো জামাকাপড়ের চেয়ে বড় আপার কেনা জামার কোয়ালিটি বেশ ভালো। এজন্য আমিরা চায়, আগে পড়াশুনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তারপর বিয়ে করবে। বড় খালার নাগাল থেকে যত তাড়াতাড়ি মুক্ত হওয়া যায়, তত ভালো। কিন্তু তা বোধহয় হবার জো নেই। বাসা থেকে এখনই বিয়ে দেবার পায়তারা চলছে। একটা প্রবাদ আছে, বড়জন যেদিকে যায়, ছোটগুলোও ওদিকের লাইন ধরে। এই প্রবাদের জের ধরে এই অবস্থা।
========