তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব-২০+২১

0
473

#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(২০)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

গভীর রাত পর্যন্ত ঘুম পাখি ধরা দিল না রাহার নেত্রজোড়ায়। তার মাথায় শুধু নজরাত রুপকথা ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাখি হলে সেই কখন উড়ে গিয়ে তার ভাইটি কে গিয়ে বলতো, ভাইয়া এইতো তোমার সেই রুপকথা! যাকে ভালোবেসে এতো গুলো দিন নজরাত নামক মেয়েটিকে অবহেলায় ফেলে রেখেছিল। কিন্তু বলতে হলে সেই সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এখন যদি রাহা কে জিজ্ঞাসা করা হত রাহা তুমি তো কলেও জানাতে পারতে? তবে কল করে জানালে না কেন?
তখন রাহার জবাব হতো, দূর এমন গুরুত্বপূর্ণ আবেগি কথা কি কলে বলা যায়? কলে বললে তো সেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস থাকতো না। তার প্রিয় ভাইটির আনন্দ চক্ষু দেখা হবে না।

রাহার ছটফটানি দেখে রূপক আর মৌন থাকতে পারলো না। আচমকা রাহা কে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে আদর করল। খুবই উষ্ণ, খুবই আন্তরিকভাবে। তারপর নিজের প্রশস্ত বুকে জরিয়ে রেখে বলল,
—” ”তি আমো”।

রাহা এতোক্ষণ লজ্জা রাঙা হয়ে থাকলেও এবার মুখ খুলল। বলল,
—” এর মানে কি?
—” ঘুমাও।
রাহা আর প্রতিউত্তর করার সাহস পেল না। এবার সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে গেল।
_______

সাজেদা চৌধুরী গাড়ি নিয়ে বাসায় চলে গেছেন সেই কখন। যাওয়ার আগে ছেলে আর ছেলে ব‌উকে কিছু সুন্নাত সম্পর্কে অবগত করে গিয়েছেন। বলেছেন,
—” ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সবথেকে বেশি বন্ধুত্বের যেমন..
“বাইরে থেকে বাসায় ফিরে স্ত্রীকে সালাম ও কিছু হাদিয়া দেয়া সুন্নাত”।
“স্ত্রীর মুখে খাবারের লোকমা তুলে দেয়া সুন্নাত”।
“স্ত্রীর মেসওয়াক দিয়ে মেসওয়াক করা সুন্নাত”।
“স্ত্রীর সাথে এক প্লেটে বসে খাওয়া সুন্নাত”।
“পানির পাত্রে স্ত্রীর ঠোঁট লাগানো স্থানে ঠোঁট লাগিয়ে পানি পান করা সুন্নাত”।
“স্ত্রীর মুখের থেকে খাবার নিয়ে সেটা খাওয়া সুন্নাত”।
“নামাজে যাওয়ার আগে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরা ও চুমু দেয়া সুন্নাত”।
“স্ত্রীর সাথে সালাত আদায় করা সুন্নাত”।
“স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে কোরআন তিলাওয়াত করা সুন্নাত”।
“স্ত্রীকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া ও সময় কাটানো সুন্নাত”।
“স্ত্রীর সাথে রাতের বেলা হাঁটতে হাঁটতে গল্প করা সুন্নাত”।
“দুজন একসাথে খেলার প্রতিযোগিতা করা সুন্নাত”।
“স্ত্রীর সাথে সৎ ব্যবহার করা সুন্নাত”।
“বিয়ের সময় স্ত্রীর মহরানা পরিশোধ করা ফরজ”।
“স্ত্রীর হক আদায় ও তাকে পর্দায় রাখা ফরজ”।
“স্ত্রীর ইজ্জতের হেফাজত করা ফরজ”।

সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম,যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে থাকে আল্লাহর রহমত। স্বামী স্ত্রী দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলে, আল্লাহ্ তা’আলাও তাদের দিকে তাকিয়ে হাসেন.. সুবহান আল্লাহ!
তোমাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার রহমত দান করুক, আমিন..!

নজরাত তখন বলল,
—” সুম্মা আমিন!
তার থেকে শুনে রাদ শাহমাত ও বলল।
নজরাত এখান থেকে বেশিরভাগ সম্পর্কেই আগে থেকে অবগত ছিল। তবুও শ্বাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে শুনতে খুব ভালো লাগে তার। বিয়ের পূর্বে বাবার থেকে হাদীস সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছে, শিখেছে।

তারপর সাজেদা চৌধুরী বিদায় নিয়ে চলে যান। বলে যান তার জন্য তো তারা আলাদা সময় অতিবাহিত করতে পারেনি তাই এখন করুক। তার কথা মতই নজরাত আর রাদ শাহমাত একটি ঝিলের ধারে হাতে হাত রেখে পাশাপাশি হাঁটে। শীতের মৌসুম শেষের দিকে হলেও রাতের বেলা বাহিরে ঠান্ডা অনুভব হয়। পানিতে যেন ধোঁয়া ওঠে। শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। রাদ শাহমাত নজরাত এর ঠান্ডা হাত দুটো তার হাতের মুঠোয় নিয়ে, ঘসে গরম করার প্রয়াস চালায়। এতে সুরসুরি অনুভবে হাসে নজরাত।
_________

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই রাহা থ্রিপিস চেঞ্জ করে কালো রঙের সাথে সবুজ মিশেল কাতান শাড়ি পড়ে তৈরি হয়ে নেয়। রূপক তখনো ঘুমিয়ে আছে। তাই রাহা ইতস্তত বোধ করে কি বলে ডাকবে সেই নিয়ে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে ভাবল এভাবে বসে থাকলে তো হবে না। তাই কাছে গিয়ে বলল,
—” এই শুনছেন? না না এই শুনছো?
রাহার এমন ভুল করে আবার শুধরে নেওয়া দেখে মুচকি হাসে রূপক। রাহা যখন চুল চিরনি করে তৈরি হচ্ছিল তখন তার চুড়ির ঝনঝন শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় রূপক এর। তাই তো রাহার এমন বাচ্চামো কান্ড শুনতে পেল। তবে তার মাথা এখনও ঘুমের ধোঁয়াটে ভাবটা কাটিয়ে ওঠেনি।

রাহা ফের আবারো ডাকলে রূপক অস্ফুট গলায় বলল,
—” কয়টা বাজে বলতো? এত সকাল সকাল কেউ শ্বশুরবাড়ি যায় নাকি? লোকে কি বলবে? বলবে নতুন জামাই ঘুম থেকে উঠেই শ্বশুরবাড়ি দৌড় দিয়েছে।
রাহা বিরস মুখে বলল,
—” এমন কথা বলার মত আমাদের বাসায় কেউ নেই, প্লিজ চলো না?
রূপক গা ছাড়া ভাব ফুটিয়ে তোলে বলল,
—” আচ্ছা তাহলে আমাকে টেনে তুল দেখি! তবে আমি উঠবো এর আগে নয়।
—” কি! আমি তোমাকে টেনে তুলবো?
রাহার গলার স্বর হঠাৎ আতঙ্কিত একটা আর্তনাদের মতো শোনাল। আসলে সে তো রূপক এর এই আলসেমি রোগে অভ্যস্থ নয় তাই আর কি। নজরাত হলে এতক্ষণ কাজে নেমে যেত। কিন্তু রাহা বিছানার বসে হতাশ গলায় বলল,
—” তুমি এরকম করছ কেন? প্লিজ উঠ না? আমাদের যেতে হবে তো নাকি?
—” তুমিও গুটিয়ে বসে আছো কেন? আমাকে টেনে তুললেই তো আমি উঠে যাই নাকি?

অগত্যা রাহাকে নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে টেনে তুলতে হল লম্বা চওড়া পেশীবহুল ভারী শক্তিশালী দেহের অধিকারী রূপক কে। রাহা যেন ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে যেন সে এভারেস্ট জয় করার মত কাজ করেছে। যা দেখে মজা পাওয়ার হাঁসি হেঁসে রূপক বলল,
—” তোমার ভাবীমণি কি তোমাকে শিখিয়ে খাইয়ে, পড়িয়ে শক্তি করে পাঠায়নি?
রাহা কটমট দৃষ্টিতে তাকায় যা দেখে রূপক আমতা আমতা করে বলল,
—” না মানে, আচ্ছা থাক।
তারপর সে বাথরুমে ঢুকে।
_________

নজরাত গার্ডেনে হেঁটে হেঁটে ফুলের কথা বলছে। এতো দিনে এই বাগানের ফুল গুলোর সাথে তার একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ফুল গুলো কথা না বললেও তার একাই কথা বলতে ভালো লাগে। তার মনে হয় ফুল গুলো কথা বলতে না পারলেও তার কথা গুলো যেন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে। আরেকটি কাজ হলো লজ্জাবতী গাছের পাতা গুলো ছুঁয়ে দিলে যখন পাতা গুলো নুইয়ে পড়ে তখন খুব আনন্দ উপভোগ করে নজরাত। এটা তার কাছে একটা দুষ্টুমি খেলার মতো লাগে। তাই এই একটা কাজ সে করেই।
বাড়ির পশ্চিম দিকে নুইয়ে এই কাজ করছে সে। তখন গাড়ির হর্ণ শুনতে পেয়ে চকিতে পিছনে ফিরে দাঁড়ায়। এই সকাল বেলা কে এসেছে? দেখার জন্য।

গতকাল অনেক রাতে বাসায় ফিরে তারা, যার ফলে রাদ শাহমাত এখনো ঘুমিয়ে আছে। ফযর নামায এর পর নজরাত এর ঘুমানোর অভ্যাস নেই তাই সে ভোরের আলো ফুটতেই গার্ডেনে হাঁটতে চলে আসে। এখন তার দৃষ্টি গাড়িটার দিকে নিবদ্ধ। গাড়িটা পার্ক করার পর রাহা কে নামতে দেখে নজরাত খুশী হ‌ওয়ার বদলে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। এতো সকাল বেলা কোন খবর না দিয়ে এসেছে যে কেউ বিষ্মিত হবে স্বাভাবিক।

নজরাত দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে রাহার হাত ধরে বলল,
—” আসবে আগে বললে না যে?
রাহা মুখ চোখে গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তোলে বলল,
—” তোমার সাথে আমার কোন কথা নেই ভাবীমণি! ভাইয়া কোথায়? ভাইয়ার সাথে আমার জরুরি কথা আছে।
নজরাত বিষন্ন মুখশ্রী করে, অবিশ্বাসের গলায় বলল,
—” আমি কি করেছি বলো না? আমার ভীষণ টেনশন হচ্ছে। প্লিজ বলো?

রূপক গাড়ি থেকে নেমে আসে। বোনের মাথায় সস্নেহে হাত রেখে বলে,
—” কেমন আছিস বোনু?
নজরাত জোরপূর্বক হেসে বলল,
—” আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো ভাইয়া? আব্বু কেমন আছে?
—” আলহামদুলিল্লাহ ভালো।

তাদের দুজনের কথার মাঝে রাহা গটগট পায়ে ঘরের ভেতরে চলে যায়। এদিকে রূপক আর নজরাত কথা বলতে বলতে ভিতরে ঢুকে। রাহা ভাইয়া ভাইয়া বলে চেঁচাচ্ছে। তার চেঁচামেচি শুনে সাজেদা চৌধুরী তার ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। এমন সাজ সকালে মেয়েকে দেখতে পেয়ে চোখ বিস্ফোরিত হয়ে উঠে। খারাপ কিছু ভাবনার আগেই সাথে রূপক কে দেখতে পেয়ে সস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কাছে এসে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু রাহার একটাই ভাবনা সব সত্যি রাদ শাহমাত কে বলা…..

#চলবে…. ইনশা আল্লাহ।

#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(২১)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

একটা কলের জন্য সকালের মিষ্টি ঘুমটা নষ্ট হয়ে গেল রাদ শাহমাত এর। বিরক্তিতে ভ্রু জোড়া কুঁচকে বসে থেকে কিছুক্ষণ নিজেকে শান্ত করল। তারপর বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে গায়ে যেই পোশাক পরিধান ছিল সেই পোশাকেই রুম থেকে বের হয়ে গেল।

নিচে নেমে কারো সাথে কোন কথা না বলে গটগট পায়ে ঘরের বাইরে বের হয়ে গেল! পিছন থেকে রাহা ভাইয়া বলে ডাকল তবুও তার কোন রেসপন্স পাওয়া যায়নি! আদৌও তার ডাক শুনেছে নাকি শুনেনি কে জানে? তবে নজরাত দৌড়ে পিছন পিছন আসে। যদিও রাদ শাহমাত এর দেখা পায়নি তবে তাকে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যেতে দেখেছে। এই সকাল সকাল তার কি কাজ থাকতে পারে? নজরাত এর অজানা।

নজরাত দাঁড়িয়ে থেকে রাদ শাহমাত এর যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। পিছন থেকে রাহা এসে অভিমানী কন্ঠে বলল,
—” ভাইয়া এই সাজ সকালে কোথায় গেল বলো তো? আমি এসেছি দেখেও ভাইয়া আমার সাথে কথা না বলে চলে গেল!
নজরাত রাহার মুখোমুখি হয়ে ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তোলে বলল,
—” তুমি ভুল বুঝো না, উনি হয়ত তোমাকে খেয়াল করেনি। তাছাড়া জরুরি কাজে বেরিয়ে গিয়েছেন সম্ভবত। তুমি ভিতরে এসো, বোরকা খুলে নাস্তা করবে চলো? মণি আপু হয়তো তোমাকে দেখে এতোক্ষণে নাস্তা তৈরি করে নিয়েছেন।
রাহা আর দ্বিরুক্তি না করে বলল, চলো।
তারপর রাহার রুমে আসে তারা। নজরাত খুশি মনে বলল,
—” ভাবীমণি বোরকাতে কিন্তু তোমাকে মা শা আল্লাহ অনেক সুন্দর লাগছে। আমি কিন্তু তোমাকে বোরকা পরিহিত দেখে পুরাই সারপ্রাইজ হয়েছি এবং ভীষণ খুশি হয়েছি। তোমাকে যেন আল্লাহ তা’আলা এমনি করে সবসময় পর্দা মেনে চলার তৌফিক দান করেন আমীন, সুম্মা আমীন!

রাহা বোরকা খুলে হ্যাংগারে ঝুলিয়ে রেখে নজরাত এর পাশে সোফায় বসে। তারপর খানিকটা লজ্জা রাঙা হয়ে বলে,
—” কি হয়েছে জানো? আমি তো তোমার ভাইয়ার আগে তৈরি হয়ে বসে ছিলাম। পরে তোমার ভাইয়া তৈরি হয়ে নিলে বের হব ঠিক তখন তোমার ভাইয়া গম্ভীর মুখে বলল, এভাবে শাড়ি পরে সেজেগুজে যেতে পারবে না!
আমি তখন কাঁদো কাঁদো মুখশ্রী করে বললাম, কি বলছো তুমি? দেখ আমার যাওয়াটা ভীষণ জরুরি। প্লিজ এরকম করো না চলো?
তখন তোমার ভাইয়া বলে, কাবার্ডে সাদা রঙের একটা প্যাকেট আছে। প্যাকেট খুলে যেটা দেখবে ঐটা পরে তৈরি হয়ে এসো। আমি নিচে অপেক্ষা করছি।
তারপর, শপিং ব্যাগ খুলে দেখি এই কালো বোরকা!

নজরাত তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল,
—” দেখলে তোমার প্রতি ভাইয়ার কত্ত কেয়ার?
রাহা লজ্জায় লাল রঙা হয়ে যায়। তারপর কিছু একটা মনে করে বলল,
—” আচ্ছা ভাবীমণি “তি আমো” মানে কি তুমি জানো? এই কথাটা দুই দিন তোমার ভাইয়ার মুখ থেকে শুনেছি। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না।
নজরাত এক্সাইটেড হয়ে বলল,
—” আলহামদুলিল্লাহ। তুমি এটা গুগল সার্চ করে দেখ তাহলে বুঝতে পারবে।
—” আচ্ছা দাঁড়াও এখনি দিচ্ছি।
তারপর পার্স থেকে ফোন বের করে সাথে সাথে গুগল সার্চ করে যা দেখল তাতে রাহার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। হাঁ করে মুখে হাত চাপা দেয় রাহা। এদিকে নজরাত হেসে চলেছে। ননদিনী ভাবী কে টিপ্পনী কেটে বলে,
—” তোমার বর কত্ত রোমান্টিক হায় আল্লাহ! আর আমার বর আস্ত একটা নিরামিষ মার্কা।

রাহা লজ্জায় মুখ লুকাতে নজরাত কে জরিয়ে ধরে। যেন সে আড়ালে যেতে পারে। কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিয়ে বলল,
—” তুমি যে লেখিকা রুপকথা এটা লুকিয়ে রাখলে কেন?
নজরাত খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। থতমত খেয়ে বলল,
—” তুমি কিভাবে জানলে?
—” সে জেনেছি কোন ভাবে। আমি ভাইয়া কে সবটা বলে দিব। না হয় তুমি সবটা বলো, কেন লুকিয়ে রেখেছ? যেখানে তুমি জানতে রুপকথা কে ভাইয়া পাগলের মত ভালবাসে। তবুও কেন ভাইয়াকে কষ্ট দিলে? সাথে নিজেও কষ্ট পেলে?

নজরাত কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” মনে আছে আমাদের বিয়ের আগে তুমি আমার সাথে দেখা করেছিলে?
রাহা মাথা দুলিয়ে বলল,
—” হ্যাঁ সেদিন ই তো তোমাকে আমি ভাইয়ার ব্যাপারে সবটা জানিয়েছিলাম। জানিয়েছিলাম যে ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড আছে। এবং সে একজন লেখিকা। নাম রুপকথা। তুমি যেন ভাইয়া কে বিয়ে না করো! তারপর ও সবটা জেনে শুনে এভাবে মুখ বুজে সহ্য করলে! কেন?
নজরাত বিষন্ন গলায় বলল,
—” হুম, তোমার থেকেই জানতে পারি প্রথমে। কিন্তু এটা জানার পর আমি শিউর হতে পারিনি যে উনি আমাকেই পছন্দ করেন। আজকাল হাজার হাজার মানুষ ফেবুতে লেখালেখি করে। এক‌ই নাম থাকতে পারে অসম্ভবের কিছু নেই। তবে তোমার ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড আছে এ কথা জানার পর
আব্বু কে বলতে গিয়েছিলাম যে আব্বু আমি এই বিয়ে করবো না! কিন্তু আমি ব্যর্থ হ‌ই! তার আগেই আব্বু তার প্রবাসে কাটানো জীবন যাপন আমাকে বলে। যেখানে তোমার বাবা নিজে না খেয়েও আমার আব্বু কে খাইয়েছে। আরো কতো কি সাহায্য করেছেন তা বললে শেষ হবে না। আব্বু সেদিন চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছিল। এতো কিছুর পর তোমার মাকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি আব্বু। তাছাড়া তোমার পরিবারের ব্যাকরাউন্ড ও ভালো। তাই আমাকে এখানে বিয়ে দিতে রাজি হয় তিনি।
সেদিন খুব ভেবেছিলাম, কেঁদেছিলাম। সারারাত জেগে নিজেকে মানিয়েছি যে আব্বুর জন্য আমি সবকিছু করতে পারি। এবং কি নিজেকে ও অনিশ্চিত জীবনে ঠেলে দিতে পারি।

রাহা সবটা শুনে ক্ষীণ স্বরে বলল,
—” তারপর? কবে, কখন জানতে পারল? তুমি ই যে সেই রুপকথা!
—” যেদিন আমার প্রথম ব‌ই “ছায়া সঙ্গিনী” এর প্রচ্ছদ পাবলিক হয় সেদিন। তোমার মনে আছে? সেদিন তোমার ভাইয়া বাসায় মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন। ভীষণ আনন্দিত ছিলেন তিনি। তারপর আমি ব‌ইয়ের নাম জিজ্ঞেস করতে বলেছিলেন “ছায়া সঙ্গিনী”! আমি তো নাম শুনে আকাশ সম বিষ্ময় নিয়ে দৌড়ে যাই আমার প্রকাশনিতে কল করি। জিজ্ঞাসা করি এক‌ই নামে অন্য কোন ব‌ই বের হয়েছে বা হচ্ছে কিনা? তারপর ফুল কনফিডেন্স এর সাথে বলে না এরকম কোন দ্বিতীয় ব‌ই নেই। আমি নিশ্চিন্তের শ্বাস ত্যাগ করি। এরকম ই আমার মাথায় ঢুকে যে তোমার ভাইয়া ফেইক একজন কে ভালোবাসেন।
—” তবুও তুমি চুপ ছিলে?
—” হুম ছিলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম তোমার ভাইয়া লেখালেখির কারণে মেয়েটির সাথে জড়িত হয়েছিল ঠিক কিন্তু এখন নিশ্চয়ই মেয়েটির সুন্দর্যো এবং ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়ে গেছে। কারণ মেয়েটি যে ভীষণ সুন্দর সেটা কিন্তু তুমি অস্বিকার করতে পারবে না।
—” তারপর যখন ভাইয়া বুঝতে পারে ঐ মেয়েটা আসল রুপকথা না। তখন তো তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটে। তখনো কেন চুপ করে ছিলে? ইনফেক্ট এখনো অবধি চুপ করেই আছো। কেন ভাবীমণি কেন?

নজরাত উঠে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে বাহিরে ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, মুখ চোখে সরল ভাব। চাঁপা শ্বাস ফেলে বলল,
—” আমি চাইনি শুধুমাত্র লেখিকা বলে তোমার ভাইয়া আমাকে মেনে নিক, স্ত্রী বলে স্বীকার করুক। আমি চেয়েছি আমার আমিটাকে তিনি বুঝুন, ভালোবাসুন। তাই এরপরেও আমি বলছি না।
রাহা হতাশ গলায় বলল,
—” এভাবে আর কত কষ্ট পাবে? তোমার কি এই কষ্ট গুলো গায়ে লাগে না? ভাইয়া যদি তোমাকে সারাজীবন ও না বুঝে? না ভালোবাসে তাহলে কি এভাবেই চলতে দিবে? আমি আর সহ্য করতে পারছি না তোমার কষ্ট গুলো।

নিচে সাজেদা চৌধুরী রূপক এর সাথে গল্প করছেন। তাঁরা সেই কখন থেকে নজরাত আর রাহা কে খুঁজছেন। তাদের কথার মাঝে
এ কথা মণি এসে জানালো। এবং তাদের নাস্তা খেতে বলে গেল। তাই নজরাত তারা দিয়ে বলল,
—” চলো নাস্তা করবে?
—” আমার কথা এরিয়ে যেতে চাইছ?
নজরাত মুচকি হেসে বলে,
—” তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে ননদিনী ভাবীমণি!
_______

রাদ শাহমাত পুলিশ স্টেশনে এসেছে। গতকাল রাতে পুলিশ রুপকথা নামক মেয়েটিকে গ্রেফ’তার করেছে। যেদিন থেকে মেয়েটা নিখোঁজ হয় তার দুদিন পর থানায় মামলা করে রাদ শাহমাত। আর তাই পুলিশ তাকে গতকাল রাতে গ্রেফ’তার করে। রাদ শাহমাত পুলিশ কে জিজ্ঞাসা করে যে এই মেয়েটার ব্যাপারে তারা কি কি ইনফরমেশন পেয়েছে?…..

#চলবে… ইনশা আল্লাহ।