#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(২২)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)
রুপকথা নামক মেয়েটির সমস্ত ইনফরমেশন থেকে জানা গেছে, মেয়েটি বিভিন্ন ছেলেদের কে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে টাকা পয়সা
আত্মসাৎ করে। তারপর বিভিন্ন নাইট ক্লাবে পার্টি থ্রু করে যত্তসব উৎশৃংখল ছেলে মেয়েদের সাথে নে’শা করে বেরায়! রুপকথা মেয়েটির বাবা মা এমনকি পুরো পরিবার কোন এক দূর্ঘ’টনায় নি’হত হন! বর্তমানে আপনজন বলতে তার মামা মামী আছেন। যাদের অবহেলায় মেয়েটা এমন উৎচ্ছন্নে গিয়েছে।
পুলিশের থেকে এসব ইনফরমেশন জানতে পেরেছে রাদ। তার সাথে বন্ধু শিহাব ও আছে। সে রাদ এর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” তুই কি মেয়েটার সাথে দেখা করতে চাস?
রাদ মুখশ্রী বিকৃতি করে বলল,
—” জীবনেও ওই মেয়ের মুখ দেখতে চাই না আমি। মেয়েটা যতদিন না নিজেকে সুদরাবে ততদিন যেন এই জে’লে থেকে প’চে! তার ব্যবস্থা করে বাসায় ফিরবি। যত টাকা লাগবে আমি দিব।
এই বলে রাদ গটগট পায়ে থানা থেকে বের হয়ে যায়। শিহাব সেই দিকে অসহায় ভঙ্গিতে চেয়ে থাকে।
_______
নাস্তা খাওয়া শেষে সাজেদা চৌধুরী রাহা কে বললেন, রূপক কে তার রুমে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এতোটা পথ এসেছে তার বিশ্রামের প্রয়োজন তাই। রাহা ও বাধ্য মেয়ের মত তাই করল। রূপক কে সাথে নিয়ে উপরে তার রুমে এল। রূপক হাই তুলে অলস ভঙ্গিতে বলল,
—” এই সকাল সকাল কত্ত পরিশ্রম করলাম ভাবা যায়? তাও আবার ঘুমটা পরিপূর্ণ হয়নি। শরীরটা কেমন ব্যথা করছে। একটু টিপে দাও তো!
এই বলে সে ঠুস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। রাহার বিষ্ময়ের যেন অন্ত নেই। কি বলে এই ছেলে? একটু ড্রাইভিং করেছে, এই নাকি কত্ত পরিশ্রম করে ফেলেছে! এই অলস ছেলে বিদেশে থাকে কিভাবে? আবার বলছে তার শরীর মালিশ করে দিতে! হায় আল্লাহ এই কি আইলসা ছেলের পাল্লায় পড়লাম আমি?
রাহা কে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রূপক ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” কি হল দাঁড়িয়ে আছো কেন? দেখ তোমার কারণেই কিন্তু আমার এই অবস্থা বুঝলে? তাই এইটুকু করতে পারবে না তুমি?
রাহা আর কথা বাড়ালো না ঠোঁট উল্টে মালিশ করার জন্য গেল। রূপক হাত বাড়িয়ে দিল। তারপর একে একে পুরো শরীর টিপে দিতে বলে। রাহার অবস্থা এখন এমন, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। আর রূপক পাজি আড়ালে মজা পাওয়ার হাঁসি হেঁসে বলে,
—” আরো জোরে টিপে দাও না? যেভাবে করছো মনে হচ্ছে আরো ব্যথা করে দিচ্ছ।
রাহা মুখ চোখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে ওঠে। ইচ্ছে করছে তার রূপক এর গ’লা টিপে দিতে!
_______
নজরাত না খেয়ে বসে আছে। সবাই বলা সত্ত্বেও সে নাস্তা করেনি। বলেছে রাদ আসলে তার সাথে খাবে। এখন সবাই সবার নিজ ঘরে। শুধু নজরাত বসে আছে ড্রয়িং রুমে। বার বার দরজার দিকে তাকাচ্ছে রাদ এলো কিনা এই ভেবে। তারপর আর অপেক্ষা করতে না পেরে রাদ এর ফোনে কল করে। প্রথম বার কেটে গেল। পরের বার আবার কল করতে নিবে তখন রাদ নিজেই কল করে। নজরাত উত্তেজিত কন্ঠে বলে,
—” আপনি এখনো আসছেন না কেন? আর এই সাজ সকালে কোথায় গিয়েছেন? এখন কিছু খাওয়া ও হয়নি আপনার।
রাদ চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠোঁটে হালকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
—” আমি এক্ষুনি আসছি।
—” আচ্ছা।
কল রেখে নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেলে নজরাত। ঘড়িতে টিক টিক করে সময় বয়ে যাচ্ছে। নজরাত পায়চারি করছে আর ঘড়িতে সময় দেখছে। এর প্রায় পনেরো মিনিট পর কলিং বেল বেজে ওঠে। নজরাত দ্রত গিয়ে দরজা খুলে দিল। নজরাত খেয়াল করে রাদ এর মুখশ্রী কেমন শুকনো লাগছে, চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। নজরাত তারা দিয়ে বলল,
—” আপনি ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে আসুন। আমি খালার গুলো গরম করে নিচ্ছি। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ঠান্ডা হয়ে গেছে।
রাদ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। তারপর সে উপরে উঠে। নজরাত সেদিকে তাকিয়ে থেকে কিচেনে আসে। ডিমের স্যান্ডউইচ আর পাস্তা তৈরি করেছিল মণি। সেগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। তাই নজরাত ওভেন অন করে গরমের সময় দিল। তারপর খাবার গুলো দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে সময় দেখছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক করতেই রাদ চলে আসে। চেয়ার টেনে বসে বলল,
—” খুব খিদে পেয়েছে।
নজরাত তার প্লেট এগিয়ে দিয়ে পাশের চেয়ারে বসে। যখন তার খাবার নিয়ে খাবে তখন রাদ অবাক চোখে চেয়ে বলে,
—” তুমি এখনো খাওনি? কিন্তু কেন?
—” আপনি খেয়েছেন কিনা এই ভেবে ইচ্ছে করছিল না তাই।
এমন সহজ সিকারক্তি কেউ করে? রাদ এর প্রতিউত্তর করতে পারলো না। চামচে করে পাস্তা নিয়ে নজরাত এর মুখের সামনে ধরল। নজরাত একটু ভরকালো। তবে মুচকি হেসে খেয়ে নিল। রাদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। ভাবে মেয়েটার এমন সরল মনের অধিকারী বলেই হয়তো সে তাকে ভালোবাসতে বাধ্য হয়েছে।
রাদ এর এমন অনিমেষ চাহনিতে চেয়ে থাকা দেখে নজরাত ভ্রু জোড়া নাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে কি হয়েছে? রাদ হেসে মাথা দুই দিকে নাড়িয়ে বুঝায় কিছু না। তখন নজরাত খাবারের দিকে ইঙ্গিত করে বুঝায় খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। রাদ খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দিতে নজরাত মৃদুস্বরে বলল,
—” তখন কোথায় গিয়েছিলেন এভাবে? রাহা আপনাকে কতো ডাকল তবুও আপনি রেসপন্স করলেন না। ওর সাথে কথা বলে অন্তত যেতে পারতেন?
রাদ সকৌতুকে প্রশ্ন করলো,
—” বোন এসেছে! কখন?
—” আপনি বেরিয়ে যাওয়ার সময় ই তো ও আপনাকে কত করে ডাকল। আপনি কথা না বলাতে রাগ করেছে।
রাদ বিষন্ন গলায় বলল,
—” বিশ্বাস করো, সত্যি বলছি একদম শুনতে পাইনি।
—” সেটা আমিও বুঝতে পেরেছিলাম। রাহা কে বলেছিও। আপনি ওকে বুঝিয়ে বলবেন।
—” আচ্ছা ঠিক আছে, কোথায় ও ? ও আসবে বলে নি তো! সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো নাকি?
—” ঠিক আছে আলহামদুলিল্লাহ।
_______
ঘন্টা খানেক পর রূপক বলল,
—” যাও আর মালিশ করতে হবে না। তোমার শরীরে কোন শক্তি ই নেই। মনে হচ্ছে আরো ব্যথা বানিয়ে দিয়েছ!
রাহা এবার খুব রে’গে গেল। উঠে গিয়ে তে’জি গলায় বলল,
—” আর যদি আমাকে টিপে দেওয়ার কথা বলেছ তো দেখবে..
—” কি করবে শুনি?
রাহা দুই হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,
—” গ’লা টিপে দিব!
—” অমাগো তুমি কি পে’তনি নাকি!
রাহা রা’গে ফুঁসে ওঠে বলে,
—” আর একটা কথা বলবে না তুমি।
রূপক ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল,
—” “তি-আমো”।
—” এর মানে কিন্তু জানি আমি।
—” কি বলো দেখি?
—” আই লাভ ইউ!
রাহা মুখে হাত দিয়ে বোকা বনে গেল। সে এখন বুঝতে পারছে রূপক তার মুখ থেকে শোনার জন্য পরিকল্পনা করে এমনটা করেছে। এদিকে রূপক সেই হাসি। রাহা লজ্জায় মুখ লুকাতে রুপ ত্যাগ করে দৌড়ে নীচে নেমে আসে।
খাবার খাওয়া শেষে নজরাত সব কিছু গুছিয়ে রাখছিল আর রাদ তাকে সাহায্য করছে। রাহা কে এমনি করে দৌড়ে আসতে দেখে দু’জনেই কৌতূহল নিয়ে তাকায়। রাহা তাদের দেখতে পেয়ে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বোকা হেসে বলে,
—” তোমরা এখানে কি করছ?
নজরাত সন্দিহান চোখে চেয়ে বলল,
—” তোমার কি হয়েছে বলো তো?
তোতলাতে তোতলাতে রাহা বলল,
—” আমার আবার কি হবে? কই কিছু না তো। ভাইয়া তুমি কখন এসেছ? তোমার উপর যে আমি চরমভাবে রেগে আছি ভাবীমণি বলেছে?
রাদ তার হাতে থাকা ডিস টা নজরাত এর হাতে দিয়ে এগিয়ে আসে রাহার কাছে। এসে করুন কন্ঠে বলে,
—” আমি অনেক সরি বোন। তখন একদম তোকে খেয়াল করিনি। তোর ভাবীমণি কে জিজ্ঞাসা করে দেখ?
তখন নজরাত এসে বলল,
—” আমিও সেই কথাই বলেছি ওকে।
সবকিছুর মাঝে রাহা খেয়াল করল। তার ভাই আর নজরাত এর সম্পর্ক টা আগের থেকে অনেকটা উন্নত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে তার কাছে। দুজন কি সুন্দর একসাথে আছে। কথা বলার মাঝেও জরতা কাজ করছে না।….
#চলবে…. ইনশা আল্লাহ।
#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(২৩)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)
বেলকনির গ্রিল গলিয়ে সূর্যের একফালি রোদ এসেছে। সেই রোদ্দুরের উষ্ণতায় নজরাত তার মাথার ঘন কোঁকড়ানো চুল গুলো শুকিয়ে নিতে সূর্য কে পিছনে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। চুল ভিজে থাকা অবস্থায় একটুও ভালো লাগে না নজরাত এর। যতক্ষন পর্যন্ত চুল গুলো শুকিয়ে হাতখোপা করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কেমন একটা বোঝা মনে হয়।
ছোট বেলা থেকেই চুল বেঁধে ঘোমটার আড়ালে রাখতে পছন্দ করে সে। অন্যান্য মেয়েদের মত খোলা চুলে ঘুরে বেড়ায় না।
শীতের মৌসুম শেষ যার ফলে কিছুক্ষণ রোদ্দুরে দাড়াতেই প্রচুর গরম অনুভব হতে নজরাত রুমে চলে আসে। রাদ সদ্যই শাওয়ার নিয়ে বের হল। নজরাত তাকে দেখতে পেয়ে দুষ্টুমি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। দুষ্টু হেসে কাছে গিয়ে জরিয়ে ধরে বলল,
–” আহ্ ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল!
নজরাত এর আকস্মিক ঘটনায় রাদ বোকার মত দুই হাত উপরে তুলে রাখে। যেন সে একজন আসামি। তখন নজরাত এর ভীষণ হাসি পায়। রাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে,
–” কি ব্যাপার বলো তো? আজকে নিজ থেকে আমায় জড়িয়ে ধরেছো! সূর্যোদয় কোন দিকে হল?
–” আপনি ও বলেন আজকে আমাকে হঠাৎ “তুমি” সম্বোধনের কারণ কি?
–” সত্যিটা বলব?
–” হুম বলেন?
রাদ হাত নামিয়ে নজরাত এর কাধে রাখতে বলল,
–” তোমার শরীর এত গরম কেন? তুমি না একটু আগেই শাওয়ার নিলে? জ্বর আসেনি তো?
নজরাত রাদ কে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালো। চুল গুলো একটু ঝেড়ে বলল,
–” রোদে দাঁড়ানোর কারণে এরকম হয়েছে। আর তাই তো আপনাকে জরিয়ে নিলাম। যেন আপনার শরীরের শীতলতায় শীতল হতে পারি।
–” তোমার পেটে এতো দুষ্টুমি?
–” হা হা হা। এবার বলেন তো তুমি সম্বোধনের কারণ কি?
রাদ কাবার্ড খুলে একটা মরিচ গুঁড়া রঙের টি-শার্ট পড়তে পড়তে বলল,
–” লেখিকা ইসরাত বিনতে ইসহাক এর পাঠক/পাঠিকারা কানাঘুষো করছিল! আমি এখনো কেন তোমাকে আপনি সম্বোধন করি? এটা তাদের পছন্দ নয়। তাই ওদের কথা ভেবেই তোমাকে তুমি সম্বোধন করা।
নজরাত থুতনিতে হাত রেখে গভীর ভাবনার ভঙ্গিতে বলল,
–” আচ্ছা এই ব্যাপার? তাহলে আপনি নিজ থেকে বা মন থেকে ভালোবেসে বলেন নাই? তাই তো?
রাদ ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে নজরাত এর চুল গুলো কাঁধের পিছনে ফেলে, নরম তুলতুলে গাল দুটো আঁকড়ে ধরে বলল,
–” সে তো একটা বাহানা মাত্র। প্রত্যেকটা পুরুষ মানুষ চায় তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে তুমি বলে সম্বোধন করতে। কারণ “তুমি” বলাটা খুব কাছের মনে হয়। যেখানে কোন দূরত্ব থাকে না। “আপনি” সম্বোধন তো যে কেউ যে কাউকে বলতে পারে। কিন্তু “তুমি” করে বলতে কজন পারে?
–” আপনি ঠিক বলেছেন। এমনি করে কখনো ভেবে দেখিনি আমি। সবসময় একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেত। ছেলেরা তুমি সম্বোধন কে এতো পছন্দ করে কেন? আজকে বুঝলাম এটাই সেই কারণ তাই না?
–” ইয়েস ম্যাডাম।
আচ্ছা এই ঘটনা ঘটে গেছে! অথচ আমি জানতেই পারলাম না?
রাহার এহেন কথায় নজরাত আর রাদ দুজনে দুই দিকে ছিটকে দাঁড়ায়। রাহা জানে তাদের সম্পর্কটা এখনো জোড়া লাগেনি তবে লাগার পথে তাই জানতো। তাই রুমে ঢুকার আগে নক করার প্রয়োজন মনে করেনি।
অথচ তাদের সম্পর্ক আল্লাহর রহমতে জোড়া লেগে গেছে। যা দেখে উপরিউক্ত কথাটা বলে রাহা।
বোনের অসময়ে আগমনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল রাদ। লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে মাথা চুলকে বলল,
–” আমি মসজিদে গেলাম।
তারপর তাড়াহুড়ো করে যেতে নিলে নজরাত বলল,
–” এই টুপিটা তো নিয়ে যান?
তারপর কোন রকম টুপি নিয়ে পালালো রাদ।
রাহা কোমরে হাত রেখে বলল,
–” কি ব্যাপার? এখনো তো আযান ই হলো না! ভাইয়া এভাবে তাড়াহুড়ো করে চলল কেন?
নজরাত চুপ করে থাকলে রাহা দুষ্টু হেসে বলল,
–” তা ভাবীমণি তোমরা কি দুজনে মিলে কি করছিলে বলো তো? এভাবে ভর দুপুরে দরজা খুলে…
নজরাত লজ্জা পেয়ে বলল,
–” ননদিনী ভাবীমণি তুমি চুপ করবে? কি সব লাগামহীন কথাবার্তা বলে চলেছ?
রাহা নজরাত এর দুই কাঁধে দুই হাত ভর করে রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
–” তাহলে বলো? তোমাদের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে কিনা? আমি শুনে প্রাণ জুড়াই।
–” তোমাকে বলেছিলাম না সারপ্রাইজ আছে? এটাই তার সারপ্রাইজ। বুঝলে কিছু?
রাহা খুশি হয়ে বলল,
–” আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ এবং আলহামদুলিল্লাহ। উফফ আমি যে কি খুশি হয়েছি তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না। এর জন্য আমি দুই রাকাত নফল নামায আদায় করব ইনশা আল্লাহ।
_______
নজরাত চুল চিরনী করার সময় রাহা বলল,
–” তোমার চুল গুলো আমার অনেক ভালো লাগে। মা শা আল্লাহ কি সুন্দর দেখতে। এরকম আঁকাবাঁকা কোঁকড়ানো চুল ভালো লাগে। অথচ তুমি কিনা এগুলো লুকিয়ে রেখে দাও। আমি হলে খুব সুন্দর করে স্ট্র্যাইল করে ছেড়ে দিয়ে কলেজে যেতাম। শাড়ির সাথে তো আরো জোস লাগবে।
রাহার এমন কথায় মন খারাপ হয় নজরাত এর। রাহা কে টেনে নিয়ে বেডে বসিয়ে পাশে নিজেও বসে। তারপর রাহার হাতটা ধরে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলল,
–” আমরা নারী আমাদের পরপুরুষ কে জানতে দেওয়া যাবে না। তারা ফেতনায় পড়ে যাবে, আমরা একজনের জন্য নির্ধারিত এবং তার জন্যই রহমত,বাকি সবার জন্য গজব!!
❝নিঃসন্দেহে নারীদের ছলনা
খুবই মারাত্মক❞ [১]
রাহা চোখ জোড়া বড় বড় করে করুন চোখে চেয়ে থাকে। নজরাত আরো বলে,
–” নারীদের চুলে বেণি বা ঝুঁটি গেঁথে মাথা বাঁধা উত্তম। চুল বেশি বা লম্বার আন্দাজ যেন পরপুরুষ না করতে পারে, সেদিকে লক্ষ রাখা নারীর কর্তব্য। কারণ নারীর সুকেশ এক সৌন্দর্য, যা পরপুরুষের সামনে প্রকাশ করা হারাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘শেষ জমানার আমার উম্মতের মধ্যে কিছু এমন লোক হবে, যাদের নারীরা হবে অর্ধনগ্ন। তাদের মাথা কৃশ (খোঁপা) উটের কুঁজের মতো হবে। তোমরা তাদের অভিশাপ করো, কারণ তারা অভিশপ্ত।’
চুল বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে কৃত্রিম চুল বা পরচুলা ব্যবহার করা হারাম। স্বামী চাইলেও তা মাথায় লাগানো যাবে না। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
অভিসম্পাত করেছেন ওই সব নারীর ওপর, যারা পরচুলা লাগিয়ে দেয় এবং যে পরচুলা লাগাতে বলে। [২]
খেজাবের বিধান সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নারীরা কালো খেজাব ছাড়া অন্যান্য খেজাব দিয়ে চুল রাঙাতে পারে। ফ্যাশনের জন্য চুল ছোট ছোট করে কাটা বৈধ নয়। তবে চুলের অগ্রভাগ এলোমেলো হলে সামান্য কাটতে পারে। কিন্তু না কাটাই উত্তম। কেননা বেশি চুল নারীর সৌন্দর্য।
ভ্রু প্লাক ও নকশা আঁকা স্বামী চাইলেও কপালের পশম চাঁছা ও ভ্রু প্লাক করা জায়েজ নেই। কেননা এর দ্বারা আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করা হয়, যার অনুমতি ইসলামে নেই। এভাবে মুখে বা হাতে সুই ফুটিয়ে নকশা আঁকা বা ট্যাটু করা বৈধ নয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক ওই নারীদের ওপর, যারা দেহাঙ্গে উল্কি উত্কীর্ণ করে এবং যারা করায়, যারা ভ্রু চেঁছে সরু (প্লাক) করে ও যারা সৌন্দর্য বৃদ্ধির মানসে দাঁতের মধ্যে ফাঁক সৃষ্টি করে এবং যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন আনে। [৩]
তবে পুরুষের দাড়ি-গোঁফের মতো নারীর গালে বা ঠোঁটের ওপর পশম থাকলে তা তুলতে দোষ নেই।
এমন অনেক কিছুই আছে যেগুলো ছোট মনে করে আমরা করে যাই। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না এই ছোট ছোট গুনাহ গুলো একসময় আমাদের জাহান্নামের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা আমাদের সেই বুঝ বোঝার তৌফিক দান করুন আমীন, সুম্মা আমীন!
রাহার চোখে পানি টলটল করে। নজরাত কে জরিয়ে ধরে ইস্তেগফার পাঠ করে। ক্ষমা চায় মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। “আলহামদুলিল্লাহ”।
________
দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে বিশ্রাম নিয়ে রাহা আর রূপক চলে যায় তাদের বাসায়।
রাদ আর নজরাত তাদের এগিয়ে দিয়ে গার্ডেনের একটি গাছের নিচে বেঞ্চে বসে। তখন রাদ ইতস্তত বোধ করে বলে,
–” রূপকথার ব্যাপারে তোমাকে কিছু জানানোর আছে!…..
________
রেফারেন্স:-
[১](সূরা : ইউসুফ -১২ঃ২৮)
[২](বুখারি, হাদিস : ৫৯৩৭)
[৩](বুখারি, হাদিস : ৪৮৮৬)
________
#চলবে… ইনশা আল্লাহ।