তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব-২৪+২৫

0
508

#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(২৪)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

সূর্যের তাপ এখন রয়ে গেছে। গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের আলোক রশ্মি উঁকি দিচ্ছে। পরিবেশটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে। চারিদিকে ছোট বড় গাছ গাছালি পরিবেশকে মনমুগ্ধকর করে তুলে সর্বদা।

নজরাত যখন হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে সূর্যের তাপ থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা চালায় ঠিক তখনি রাদ বলে,
–” রূপকথার ব্যাপারে তোমাকে কিছু জানানোর আছে!

ভীষণ চমকায় নজরাত। এই রুপকথা নামক মেয়েটিকে সে কখনো শ’ত্রু ভাবে না। তবুও মেয়েটার কারণেই তো যত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আবার নতুন করে কি বলতে চাইছে রাদ? টেনশনে পড়ে যায় নজরাত। বড় বড় নেত্রজোড়া মেলে মায়াবী চোখে চেয়ে থাকে রাদে’র দিকে। তার এমন চাহনিতে রাদ অস্বস্তিতে পড়ে। যা দেখে নজরাত মুখ নত করল। হাসি নেই মুখে, তবে একটু স্মিত ভাব। চোখের দৃষ্টি কাঁচের মতো ভাবলেশহীন, মুখ সাদা।

রাদ স্বগতোক্তির মতো বলতে শুরু করে,
–” আমি ওর শা’স্তির ব্যবস্থা করে এসেছি!

এ কথা শুনে নজরাত দ্রুত মাথা তুলে তাকায় রাদ এর দিকে। থমথমে মুখ করে চেয়ে বলে,
–” শা’স্তি! কেমন শা’স্তি?
–” পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে! জে’লে আটক করে রেখেছে!

নজরাত খানিকক্ষণ সময় নিয়ে বলে,
–” তাহলে তো আপনাকে ও জে’লে থাকা উচিৎ!
রাদ চাপা রা’গের গনগনে গলায় বলল,
–” আমি জে’লে! কিন্তু কেন? কি অপরাধ করেছি আমি? এমনটা বলতে পারলে তুমি?
–” আপনিও তো সমান অপরাধী ছিলেন। শুনেছি মেয়েটাকে প্রথমে আপনি ই নক করেছিলেন। যদিও অন্য কেউ ভেবে করেছেন তবুও শুরুটা তো আপনি করেছিলেন। তা কি অস্বীকার করতে পারবেন?

রাদ এর মেজাজটা কিছু চড়া হলো। মুখে রক্তোচ্ছাস ভাব ফুটিয়ে হঠাৎ জ্বলে ওঠে বলল,
–” মেয়েটা একটা চরিত্রহীন। ছেলেদের বরাবরই ধোঁকা দিয়ে টাকা পয়সা হাতিয়ে, সেই টাকায় ন*ষ্টা*মি করে বেড়ায়। তার সাথে আমার তুলনা করলে তুমি?

চোখে মুখ রা’গে অপমানে অস্বাভাবিক জ্বলজ্বল করতে লাগল রাদ এর। আবারো নজরাত এর দিকে তেজী চোখে চেয়ে বলল,
–” আমি তো প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, সে কি লেখিকা রুপকথা কিনা? তখন মিথ্যা বলল কেন? কেন দিনের পর দিন আমার সাথে নাটক করে গেল? লেখিকা রুপকথা সেজে বসেছিল কেন? ও যা চেয়েছে তাই দিয়েছি আমি। এগুলো আমার অপরাধ ছিল? তাকে বিশ্বাস করা আমার অপরাধ ছিল?

রাদ এর প্রত্যেকটা উচ্চ বাক্যে কেঁপে কেঁপে উঠে নজরাত। রাদ এর কথার প্রতিউত্তর করার সাহস পায় না। আর প্রতিউত্তর করবেই বা কি? রাদ তো ভুল কিছু বলছে না। নজরাত তো ঐ মেয়েটার নামে এতো কথা জানতো না। জানলে নিশ্চ‌ই ওর হয় কিছু বলতো না। বিষন্ন গলায় নজরাত কিছু বলতে যাবে তার আগেই রাদ উঠে দাঁড়ায়। নজরাত শশব্যস্তে বলল,
–” আমাকে মাফ করুন..
রাদ তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে একটু চেয়ে থেকে মৃদু কঠিন সুরে বলল,
–” আমাকে একটু একা থাকতে দাও।

নজরাত নতচক্ষু নিয়ে অকপটে গভীর গলায় বলল,
–” আমার জ্ঞানের পরিধি খুবই নগণ্য। তাই আমার কথায় আপনি কষ্ট পেলে আমি সইতে পারবো না।
তারপর ধীর পায়ে ঘরে চলে যায় নজরাত। অত্যন্ত বিতৃষ্ণার সঙ্গে রাদ মুখশ্রী ঢেকে বসে থাকে বেঞ্চে। বার কয়েক দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভ্র নীলাভ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
________

রাতে খাবার টেবিলে রাহার ফোনে কল আসলে সে কল রিসিভ করে বলে,
–” খাবার খাচ্ছি রে তাই সালামের জবাব দিলাম না। তো বল কি খবর তোর?
.
.
তিন মিনিট পর রাহা কল কেটে খাবার খেতে মনোযোগী হলে সাজ্জাদ হোসেন বললেন,
–” বৌমা একটা কথা ভুল বললে তুমি।
রাহা একটু ঘাবড়ে গেল! উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
–” কি বাবা? যদি একটু বলে দিতেন?
সাজ্জাদ হোসেন মুখে সৌজন্য মূলক হাঁসি ফুটিয়ে বললেন,
–” নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পরিবার, সমাজসহ জীবনঘনিষ্ঠ ইসলামবিষয়ক প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান ‘আপনার জিজ্ঞাসা’। জয়নুল আবেদীন আজাদের উপস্থাপনায় এনটিভির জনপ্রিয় এ অনুষ্ঠানে দ‍র্শকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিশিষ্ট আলেম ড.মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ। তো একজন প্রশ্ন করেন আমাদের সমাজে প্রচলন আছে, খাওয়ার সময় সালাম দিতে হয় না। এটা কি ঠিক?

তিনি উত্তরে বলেন : না, এ কাজটি শুদ্ধ নয়। খাওয়ার সময় সালাম দেওয়া জায়েজ, আবার সালামের জবাব দেওয়াও জায়েজ। কারণ, খাওয়ার সময় অন্য সব কথা বলা হচ্ছে। সব কথা বলা জায়েজ রয়েছে, তাহলে সালাম দেওয়া কেন নিষেধ থাকবে। কে বা কারা নিষেধ করেছে সালাম দিতে?

যদি সালামকৃত ব্যক্তির মুখে লুকমা হয়। এমতাবস্থায় তার জন্য সালামের উত্তর দেয়া কষ্টকর হয়, তাহলে খানারত ব্যক্তিকে সালাম দেয়া মাকরূহ। কিন্তু যদি মুখে লুকমা না হয়, বা উত্তর দিতে কোন কষ্ট না হয়, তাহলে খানারত ব্যক্তিকে সালাম দিতে কোন সমস্যা নেই। [ফাতাওয়া উসমানী-৪/৪৩৫]

বলা হয়, আপনি খাওয়া-দাওয়া করছেন, তাই সালাম দিতে পারলাম না। এ ক্ষেত্রে কথা কিন্তু বলা হয়েই গেল। এটি আমাদের একটি ভুল কাজ এবং ভুল ধারণা। বুঝলে মা?

রাহা মাথা দুলিয়ে হেসে বলল,
–” জ্বি বাবা বুঝতে পেরেছি। আসলে এভাবে কখনো ভেবে দেখিনি। তবে একটা বইয়ে এরকম পড়েছিলাম। যাই হোক জেনে উপকৃত হলাম। জাযাকাল্লাহু খাইরান বাবা।
বিনিময়ে সাজ্জাদ হোসেন বললেন,
–” ওয়া আনতুম ফা জাযাকিল্লাহু খাইরান বৌমা।

শ্বশুর আর বৌমার মধ্যে এতো সুন্দর সম্পর্ক দেখে আনন্দের সঞ্চালন ঘটে রূপক এর। ভীষণ ভালো লাগে তার। আপনজন বা প্রিয় মানুষ গুলো যখন এভাবে মিলেমিশে আনন্দে থাকে তখন ই জীবনের আসল স্বার্থকতা।
________

সপ্তাহ খানেক পার হলো।
রাহা রূপক কে অভিযোগের গলায় বলল,
–” তুমি এখন আর আমাকে ঐ ভাষাটা বলো না কেন?
রূপক সকৌতুকে প্রশ্ন করে,
–” কোন ভাষার কথা বলছো বলো তো?
–” ঐ যে ইতালিয়ান ভাষা।
রূপক প্রাণ ভরে হাসে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–” তোমার হাতটা বাড়াও দেখি?
রাহা ভ্রকুটি করে বসে থাকলে রূপক নিজেই তার বাম হাতটা টেনে নিয়ে এলো। রাহা নির্বিকার মুখে চেয়ে থাকে চুপটি করে। দেখা যাক কি করে রূপক।

পড়ন্ত বিকেলে রাজধানীর বাহিরে নদীর পাশ ঘেঁষে সবুজ ঘাসের প্রকৃতিতে বেড়াতে বের হয় রূপক তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে। মানুষের কোলাহল বিহীন নির্জন নিহারিকা এই স্থানটি ভীষণ প্রিয় রূপক এর। যখন খুব বেশি মন খারাপ হতো, আবার খুব বেশি আনন্দ হতো তখনি এখানে এসে একাকী সময় অতিবাহিত করতো রূপক।

সবুজ ঘাস মোড়িয়ে ব্রেসলেট বানিয়ে রাহার হাতে পড়িয়ে দেয় রূপক। ফর্সা গোলগাল হাতে বেশ মানিয়েছে সবুজ ঘাসের ব্রেসলেট টা। রাহা মনমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে র‌ইলে তাকে অবাক করে দিয়ে রূপক তার হাতে কিসি দিয়ে দেয়! যার ফলে লজ্জায় বরফের মতো জমে যায় রাহা। লাজুক হেসে নদীর টলমলে পানির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। পাশে তাকালেই যেন দম বন্ধ হয়ে যাবে এমন অনুভূতিরা ঘিরে ধরে তাকে।
এর মধ্যে আবার রূপক তার কোলে মাথা রেখে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। রাহার হাত দুটো নিয়ে খেলা করতে করতে বলল,
–” ভালোবাসি প্রিয়।
উত্তরে রাহা বলে,
–” আমিও।
________

রাদ ইদানিং বড্ড বেশি ব্যস্ত সময় পার করছে। অফিসে যেমন কাজ তেমনি বাসায় ফিরেও ল্যাপটপ সামনে নিয়ে বসে থাকে। এতে প্রচুর বিরক্ত নজরাত। কিছুক্ষণ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে আবার হাঁটাহাঁটি করে কাহিল হয়ে পড়ে ঘুমিয়ে থাকে। এমনি করে সময় অতিবাহিত হচ্ছে তার।

আজকে দূর আকাশের চাঁদটা তুলনায় অনেকটা বড় এবং গোলাকার আকৃতি। হয়ত পূর্ণিমা রাত। পূর্ণিমা রাত সম্পর্কে অবগত নয় নজরাত। তাই অত কিছু না ভেবে অনিমেষ চাহনিতে চেয়ে থাকে চাঁদের দিকে। কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে চাঁদটা “সুবহান আল্লাহ”। ইচ্ছে করছে একটা গজল গাইতে। কতোদিন হলো নজরাত গজল গায় না। হয়তো ভুলে বসেছে।
তাই মুহূর্তটার সাথে মিলিয়ে গাইল,
” তোমার দুনিয়াতে আমি যে দিকে তাকাই,
অথ‌ই নিয়ামতে ডুবে আছি সবাই”

নজরাত এর মনটা বিষন্নতার চাদর ছেড়ে একটু ফুরফুরে হলো। খোলে যা‌ওয়া চুল গুলো হাতখোপা করে বেলকনি থেকে রুমে এসে দেখলো তখনো রাদ ল্যাপটপ মুখে নিয়ে বসে আছে। নজরাত বিরক্ত হয়ে ঠাস করে ল্যাপটপ বন্ধ করে দেয়। রাদ বিষ্ময় নিয়ে তাকালে, তাকে অবাক করে দিয়ে তার কোলে বসে পড়ল নজরাত। রাদ মুখে বিরক্তিকর ছাপ ফুটিয়ে বলল,
–” আমার অনেক কাজ আছে। প্রিজ কাজ গুলো করতে দাও?
–” একটা কবিতা শুনবে?
–” কি কবিতা?
“বিষাদ ছুঁয়েছে মনে,
তাই তো মুখশ্রী জুড়ে
কেমন পাংশুটে ভাব”।

রাদ মুচকি হেসে বলে,
–” এতটুকুই?
নজরাত অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
–” আমার মাথায় কবিতা আসে না। কি করবো?
এ কথা শুনে হেসে ফেলল রাদ।

#চলবে…. ইনশা আল্লাহ।

#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(২৫)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

রাদ এর ভুবন ভোলানো হাসি, মনমুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে নজরাত। যা লক্ষ্য করে রাদ ভ্রু জোড়া নাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–” কি দেখছো অমন করে?
–” দেখছি আমার নিরামিষ মার্কা বর টা হাসলে কত্ত কিউট লাগে!
–” তোমার বর মোটেও নিরামিষ মার্কা না। বরং আমিষ বলতে পারো।
–” তাই না?
–” হুম, এবার তুমি শুয়ে যাও। আর আমাকে কাজ করতে দাও প্লিজ?

নজরাত প্রশ্নাতুর চোখে চেয়ে বলে,
–” ঐ দিনের জন্য আপনি কি এখনো রে’গে আছেন আমার উপর?

রাদ আচমকা নজরাত কে তার বক্ষপটে টেনে নিল। খুবই উষ্ণ, খুবই আন্তরিকভাবে আদর করল। তারপর আলতো ভাবে দু গালে দুটো করতল চেপে ধরে। মুখখানা তুলে খুব বিবিষ্টভাবে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
–” আমি তোমাকে একেক সময় একেক রকম কথা শুনিয়েছিলাম। ঘরে ব‌উ রেখে অন্য নারীতে আসক্ত ছিলাম। তবুও বিন্দুমাত্র ঘৃণা তোমার চোখে আমার জন্য দেখতে পাইনি আমি। সেখানে তোমার একটা কথা কি করে মনে গেঁথে রাখি বলো? তাছাড়া তোমার মায়ার শরীর। তাই তো নারী হয়ে আরেকটা নারীর হয়ে কথা বলেছো। এখানে অন্যায়ের কিছু নেই। তখন তোমার আকষ্মিক কথাটা আমার মস্তিষ্ক নিতে পারেনি তাই হয়তো রে’গে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো পরে নিজেকে সামলে নিয়েছি, বুঝিয়েছি।
–” তাহলে আমার সাথে আগের মত কথা বলেন না কেন? অফিস থেকে এসেই ওটা (ল্যাপটপ) নিয়ে বসে থাকেন।

রাদ শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে বলল,
–” আচ্ছা এ জন্য তুমি ভেবে নিয়েছো যে আমি তোমার সাথে রে’গে আছি? বোকা মেয়ে, আজকাল অফিসে ভীষণ চাপ বুঝলে? এই তো গতকাল ও অডিট ছিল। কোথাও কোন ভুল ত্রুটি থাকলে সেগুলোর সব দায় আমাকেই বহন করতে হবে।
–” তুমি না বস? শুনেছি অফিসের বস দের তেমন কাজ থাকে না। তবে তোমার এতো কাজ কেন শুনি?
–” সেগুলো নাটক সিনেমায় দেখা যায়। বাস্তবিক অর্থে সবার চেয়ে বেশি দায়িত্ব থাকে বস দের। আচ্ছা বাদ দাও, রাত বেড়ে যাচ্ছে তুমি শুয়ে যাও।

নজরাত বাচ্চাদের মত ঠোঁট উল্টে বসে রইল। তখন রাদ অনুচ্চ স্বরে বলল,
–” কি ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে?

নজরাত দুষ্টু হেসে উপর নিচ মাথা নাড়ে। তখন রাদ করুণ চোখে চেয়ে বলে,
–” তাহলে আমার কাজ গুলো কে করবে?
–” আমি কি জানি? তুমি এখন আমার সাথে ঘুমোবে ব্যাস।

অগত্যা রাদ কে নজরাত এর সাথে শুয়ে যেতে হল। না হয় বিনা মেঘে বজ্রপাতের আশংঙ্কা আছে হা হা হা।
_________

রূপক এর ছুটির মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। সাজ্জাদ হোসেন কে কতো করে বুঝিয়ে বলল তার কাছে বিদেশে চলে যেতে। কিন্তু তিনি যেতে নারাজ। তিনি বলেন, দেশের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাই। তাছাড়া আমার মেয়েকে এখানে একা রেখে আমি যাই কি করে? মেয়েটা যে বড্ড একা হয়ে পড়বে। মাঝে মাঝে মন খারাপ হলে তো আমার কাছে এসে নিঃশ্বাস ফেলতে পারে।

রূপক বোনের কথা ভেবে আর জোর করল না। ভেবেছিল বাবা রাজি হলে রাহা কে ও তার কাছে নিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু এখন তো বাবা কে একা রেখে রাহা কে নিয়ে যেতে পারে না।
________

আজকে রূপক আর রাহা আসবে বলে মণি আর নজরাত মিলে রান্না বান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাজেদা চৌধুরী রাদ কে বলে সমস্ত বাজার সদাই আনিয়েছেন।

রাদ ড্রয়িং রুমে বসে পত্রিকা পড়ছে তখন নজরাত তার জন্য কফি নিয়ে আসে। রাদ পত্রিকা রেখে নজরাত কে পাশে বসিয়ে বলল,
–” লাইব্রেরী রুমে তোমার একটা ডায়েরী আছে না?

নজরাত আকস্মিক বিচলিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–” হ্যাঁ ওটা কি করেছো তুমি?
–” আরে আমি যাস্ট একটু..

নজরাত নির্বিকার মুখে বলল,
–” যাস্ট একটু কি?
–” আরে বলতে তো দিবে?

নজরাত করুণ চোখে চেয়ে থাকলে রাদ বোকা হেসে বলল,
–” একটা পেইজের কিছু অংশ ছিঁড়ে নিয়েছি। বিশ্বাস করো অল্প‌ই নিয়েছি।
–” কি! আমার এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা ডায়েরী আমাকে না বলে ছিঁড়তে পারলে তুমি?
–” আরো শুন?

নজরাত উঠে দৌড়ে যেতে নিলে সিঁড়ির কোনায় লেগে খুব ব্যথা পেল। আর্তনাদ করে বসে পড়লে রাদ দ্রুত এসে বলল,
–” কি হয়েছে তোমার?

নজরাত কাঁদো কাঁদো মুখশ্রী করে বলল,
–” কথা বলবে না তুমি আমার সাথে। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস না করে এমনটা করতে পারলে? আমার কতো জরুরি লেখা আছে ওটাতে তুমি জানো নাকি?
–” আরে আমি একটা ফ্রেশ পাতা ছিঁড়েছি। লেখা ছিল না ওটাতে।
–” তবুও কেন ছিঁড়বে তুমি?
রাদ কাতর স্বরে বলল,
–” ল্যাপটপ নিয়ে ডিবানে বসে কাজ করতে গিয়ে দেখি ওখানে টিকটিকি পটি করে রেখেছে। হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে, তোমার ডায়েরী দেখতে পেয়ে পেইজের পাতা নিয়ে ওটা পরিষ্কার করেছি। আমি কি ভুল কিছু করেছি বলো?

সাজেদা চৌধুরী আর মণি চলে আসে এর মধ্যে। নজরাত কে ওভাবে ফ্লোরে বসে থাকতে দেখে বিচলিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে ব‌উমা?
নজরাত কাঁদো কাঁদো মুখে বলল,
–” ব্যথা পেয়েছি মা। এর সব দোষ আপনার ছেলের।
রাদ অবুঝের মতো বলে,
–” আমার! আমি কি করলাম? তুমি নিজেই তো দৌড়াতে গিয়ে ব্যথা পেলে?
–” তুমি যদি আমার ডায়েরীর পেইজ না ছিঁড়তে তবে কি আমাকে দৌড়াতে হতো? নিশ্চয়ই না। তবে কার দোষ বলো?

সাজেদা চৌধুরী বললেন,
–” রাদ যেহেতু দোষী তো রাদ? বৌমাকে সোফায় বসিয়ে দেখ কোথায় ব্যথা পেল? লাগলে বরফের কিউব লাগিয়ে দে।

সাজেদা চৌধুরী চলে গেলে রাদ বলল,
–” চলেন ম্যাডাম?
নজরাত গলা খাটো করে বলল,
–” আমি হেঁটে যেতে পারবো নাকি? পায়ে ব্যথা পেয়েছি কিনা?

রাত বিগলিত হয়ে হেসে বলল,
–” কোলে উঠার ধান্দামি তাই না?
নজরাত বালিকার মতো সরল অকপটে গলায় বলল,
–” বুঝতেই যখন পারছেন তখন দাঁড়িয়ে আছেন কেন? তুলুন আমাকে।

রাদ হেসে নজরাত কে কোলে নিয়ে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বলল,
–” দেখি কোথায় ব্যথা পেয়েছো?
–” থাক আপনাকে দেখতে হবে না।
–” কেন?
–” পায়ে ব্যথা পেয়েছি কিনা। আমার পা ছুঁতে হবে না। আপনি বরফের কিউব নিয়ে আসুন। আমি লাগিয়ে নিব।

রাদ কথা শুনলো না। জোর করে পা টেনে দেখতে লাগল। তখন নজরাত চিন্তিত মুখে বলল,
–” আপনি কি ডায়েরী খুলে দেখেছিলেন?
রাদ তার দিকে তাকালে নজরাত আমতা আমতা করে বলল,
–” না মানে ভালো করে খেয়াল করেছিলেন তো ওই পাতায় লেখা ছিল না তো?
রাদ ছোট্ট করে জবাব দেয়, না।
_______

রূপক আর রাহা আসলে সবাই একসাথে লাঞ্চ করতে বসে। তখন রাহা ফিসফিস করে নজরাত কে বলে,
–” ভাবীমণি তুমি কবে ভাইয়া কে বলবে? যে তুমি সেই লেখিকা রুপকথা! তুমি তোমার পরিকল্পনা মাফিক বলবে বলে আমি কিছু বলছি না ভাইয়া কে। কিন্তু না বলে থাকতেও পারছি না। কেমন যেন পেটের মধ্যে কথা গুলো ঠিক হজম হচ্ছে না জানো?

নজরাত ক্ষীণ একটু হেসে বলল,
–” আর একটু সবুর কর ননদিনী ভাবীমণি। ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয় বুঝলে?
রাহা মুখে কান্নার ভাব ফুটিয়ে তোলে বলে,
–” আর কতদিন?
হঠাৎ তাকে রাদ খেয়াল করে ভ্রু কুঁচকে বলল,
–” তোর আবার কি হয়েছে? মুখচোখ এরকম করছিস কেন?
রাদ এর সাথে সাথে রূপক সহ সবাই তাকায় তার দিকে। সবার এমন প্রশ্নাতুর চাহনিতে বিষম খেয়ে গেল রাহা। নজরাত পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,
–” মন খারাপ করো না। দেখবে মাস খানেক পরেই ভাইয়া আবার চলে আসবে।

এ কথা শুনে রাহা মুখ চোখে বিহ্বল ভাব ফুটিয়ে তোলে বলল,
–” কিসের মধ্যে কি?
নজরাত ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝায় বেশি কথা আর না বলতে।
________

মাস খানেক পর,
নজরাত অসুস্থ হয়ে পড়লে রাহা কল করে ইমিডিয়েটলি রাদ কে বাড়ি আসতে বলে। রাদ অস্থির হয়ে পড়ে। বলে, ডাক্তার সাথে নিয়ে আসবে কিনা? অ্যাম্বুলেন্স কল করবে কিনা? রাহা কেন বসে আছে সে কেন ডাক্তার কে কল করেছে না?….

#চলবে… ইনশা আল্লাহ।