থার্টি ফার্স্ট নাইট পর্ব-১২

0
653

@থার্টি ফার্স্ট নাইট
#পর্ব_১২
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

অনাহিতা,রেশমি এবং প্রেমশা স্কুলের কাছেই কফি হাউসে বসে আছে।প্রেমশা বেশ শক্ত করেই তার সুপার মাম্মার হাত ধরে আছে।রেশমি ঠোঁট ভিজিয়ে কফিতে চুমুক দিলো।

অনাহিতা মৃদুস্বরে বলল,”আপনি আমার সাথে কথা বলতে চান?

এ কথা শুনে রেশমি গম্ভীরভাবে হেসে বলল,”আমরা কিন্তু সতিন নই অনাহিতা।বয়সে ছোট হবে তুমি,তাই নাম ধরে ডাকলাম।অভিনবের সাথে আমার বিচ্ছেদটাতে কোনো খুঁত নেই।”

আশ্চর্য!কী বললো এটা সে?বিচ্ছেদেও বুঝি খুঁত থাকে?হ্যাঁ,থাকে তো।যখন সম্পর্ক বিচ্ছেদের পরেও দু’জনের মনে ভালোবাসা,অনুশোচনা থেকে যায় তখন সেটা খুঁত-ই।আর যে সম্পর্ক থেকে বিচ্ছেদ দ্বারা নিজেকে মুক্ত মনে হয় সেটা নিখুঁত।

আজ ছ’বছর পর!গুনে গুনে ৭২ মাস পর রেশমির মনে হচ্ছে বিচ্ছেদ করিয়ে সে ভুল কাজ করেছে।অনেক বড়ো ভুল করেছে!তার আনন মেঘের ছায়ায় ঢেকে গেল।

রেশমির উত্তরে অনাহিতা থতমত খেলো।সে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না।বার বার মনে হচ্ছে, প্রেমশাকে তার কাছ থেকে রেশমি কেড়ে নিবে।কিন্তু অনাহিতা তো কিছুতেই প্রেমশার ভাগ কাউকে দিতে পারবে না!আড়চোখে অনাহিতা মেয়ের দিকে তাকালো।তার বাহু ধরে রেখে মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঠোঁটের রেখায় হাসি ঝুলিয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে।এত হাসে কেন মেয়েটা!

রেশমি গলা ঝেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,”আমাদের ডিভোর্স কারণ হয়তো অভিনব তোমাকে জানায়নি।”

এই বাক্য শুনে অনাহিতা মনোযোগী শ্রোতা হওয়ার চেষ্টা করলো।রেশমি ডিভোর্সের কারণ কী বলবে?

রেশমি একই স্বরে বলল,”যতটুকু অভিনবকে আমি জানি ও কখনো ডিভোর্সের কারণ তোমার সামনে আনবে না।কারণ ভুলটা আমি ছিলাম।রুপমের সাথে আমার অনেক আগে থেকে সম্পর্ক ছিল।কিন্তু যখন অভিনবের সাথে যখন আমার বিয়ে ঠিক হয়,তার কয়েকমাস আগে রুপম উধাও হয়ে যায়।বাধ্য হয়ে বিয়েটা আমার অভিনবকে করতে হয়।কিন্তু আমার বিয়ের একবছরের মাথায় রুপম ফিরে আসে।”

রেশমি কিছুক্ষণের জন্য থামলো।তারপর তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে আবারো বলল,”এক্স ফিরে আসায় আমি সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।অতিরিক্ত পরিমাণে আমাদের ঝগড়া হতো।একদিন অভিনবও আমার গায়ে হাত তুলে।আর সেদিনই আমি ও কে রুপমের সম্পর্কে বলি।তারপর ডিভোর্সটা সহজেই হয়ে যায়।”

অনাহিতা কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো।রেশমি বলল,”অভিনব কখনো ডিভোর্সের কারণটা কাউকে বলেনি।ও চায় না,আমাকে নিয়ে কেউ খারাপ কিছু বলুক।আমিই রুপমের প্রেমে অন্ধ হয়ে…যাক;এখন আমরা দু’জনে মুভ অন করেছি।তুমিও সংসারকে গুছিয়ে নাও।তোমাকে এসব কেন বলতে মন চাইলো জানি না।কিন্তু বলে ভালো লাগছে।”

ভদ্রতার সহিত অনাহিতা কৃত্রিম হাসলো।তার মনে এখনো খচখচ করেছে,কোথাও প্রেমশাকে ইনি নিয়ে যাবে না তো?

তার ধারণায় সঠিক হলো।রেশমি শেষাংশে বলল,”প্রেমশা আমি কয়েক ঘণ্টার জন্য নিয়ে যাবো।ওর সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে।”

এতক্ষণ ধরে তাদের কথায় প্রেমশা কর্ণপাত না করলেও শেষ কথাটা কানে বাজলো।সে অসহায় দৃষ্টিতে সুপার মাম্মার দিকে তাকালো।এই মহিলা তাকে সারাক্ষণ বকা দেয়।বাব্বাকেও এ কথা বলতে পারেনি।

অনাহিতা প্রেমশার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো।মুখটা কাচুমাচু করছে সে।অনাহিতা আমতা আমতা করে বলল,”প্রেমশার বাবাকে…না মানে উনি বললে…”

রেশমি মৃদু হেসে বলল,”অভিনবকে আমি কল করে দিবো।”

রেশমি তার মেয়ের হাত ধরলে প্রেমশা এক পানে তার সুপার মাম্মার দিকে তাকিয়ে রইলো।এই দৃষ্টিড অর্থ হলো ‘সুপার মাম্মা,আমি যাবো না।’অনাহিতা বোধহয় এর অর্থ বুঝলো।মৃদুস্বরে সে প্রেমশার উদ্দ্যেশে বলল,”মা তুমি যাবে?”

প্রেমশার উত্তরের অপেক্ষা না করে রেশমিকে সে বলল,”আসলে আজকে আমার মা আসবে ও কে দেখতে।তাই বলছিলাম…প্রেমশা,তুমি যাবে?”

উত্তরে সে ‘না’ বোধক মাথা নাড়লো।অনাহিতার মন আকাশটা তৃপ্তির হাসি হাসলো।

রেশমি অবাক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।অনাহিতা তার এত প্রিয় হয়ে গেল যে,মাম্মাকে ছেড়ে দিচ্ছে।

রেশমি কিছুটা কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,”কেন যাবে না তুমি?”

প্রেমশার মুখটা চুপসে গেল।কেউ তার সাথে উঁচু স্বরে কথা বললেও তার কান্না পায়।অথচ মাম্মা সবসময় এমন করেই কথা বলে।প্রেমশা কিছুটা সাহস নিয়ে বলল,”তুমি আমাকে সবসময় বকা দাও।ইয়ামিনকে বেশি ভালোবাস তুমি।ইয়ামিনের খেলনা আমাকে নিতে দাও না।তোমার সাথে যে আঙ্কেল থাকে,উনিও আমাকে বকা দেয়।মারেও!”

অনাহিতার বুকটা কেঁপে উঠলো।অবাক হলো রেশমিও।এই মেয়েকে সে ফুলে টোকাও পড়তে দিতে চায় না।অথচ,তার কারণে মেয়েটা এত কষ্টে আছে?ইয়ামিন ছোটো বলে ঝগড়ার সবটা সময় তার পক্ষ নিতো রেশমি।রুপম তার আড়ালে প্রেমশার গায়ে হাত তুলেছে?

এক দৃষ্টিতে রেশমি তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।হঠাৎ করেই তার কান্না পাচ্ছে।গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।হাত জোড়া দিয়ে সে নিজের মুখমন্ডল আড়াল করলো।

অনাহিতা জিজ্ঞেস করল,”ইয়ামিন কে?”

রেশমি মুখ থেকে হাত সরিয়ে বলল,”আমার ছেলে।প্রেমশার ছোটো।আচ্ছা,তোমাদের মনে হয় দেরি হয়ে যাচ্ছে।স্কুল থেকে আগেই বেরিয়েছো।কোথাও যাবে নাকি?”

অনাহিতা উত্তর দিলো,”আমার মা আসবে বাড়িতে।”
-“আচ্ছা ঠিক আছে।ভালো থেকো।”

প্রেমশার হাত ধরে অনাহিতা উঠে দাঁড়ালো।চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই রেশমি বলে উঠলো,”অনাহিতা,আমার মেয়েটাকে দেখো।আমার সাথে ওর দেখা হবে না হয়তো।তুমি একটু সংসারটাকে গুছিয়ে রেখো।”

অনাহিতা সম্মতি জানিয়ে সামনে এগোতে চাইলে পরক্ষণে ঘুরে বলল,”প্রেমশার বাবা ডিভোর্সের ব্যাপারে সবটাই আমাকে জানিয়েছে।উনাকে বুঝতে বোধহয় আপনার সামান্য ভুল হয়েছে।”

অনাহিতাকে অভিনব সবটা তিন-চার দিন আগেই জানিয়েছে।তাহলে কী অভিনবের প্রিয় মানুষটা সে হয়ে যাচ্ছে?

রেশমি এক ধ্যানে যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো।হঠাৎ করেই সে চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা দেখতে লাগলো।চোখ থেকে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।পরক্ষণে জল মুছে নিয়ে উঁচু স্বরে বলল,”ওয়েটার?”
.

ইসমি বেগম মেয়ের এমন সুখের সংসার দেখে তৃপ্ত হলো।দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সময় অনাহিতা মেয়েটার সাথে কত সুন্দর করেই না হাসলো।অনেকদিন অনাহিতাকে এভাবে হাসতে দেখেননি তিনি।

তিনি সোফায় বসে রোমিলা বেগমের সাথে গল্প করছিলো।রোমিলা বেগম বলে উঠলেন,”দেখেছেন আফা?অনাহিতার এখানে কোনো কষ্ট হচ্ছে না।ও তো আমারই মেয়ে।”

রোমিলা বেগমের খুশি আকাশ ছুঁই ছুঁই।ইসমি বেগম একা এসেছেন।মহিলাকে ঝামেলার মানুষ বলে মনে হচ্ছে না।কোনো ঝামেলাই তিনি করবেন না।রোমিলা বেগম অত্যাধিক খুশি হয়ে কেউ এলেন না কেন তাও জানতে চাননি।

ইসমির আক্তার ঠোঁটের রেখা প্রশস্ত করলেন।রোমিলা বেগম মানুষটা মন থেকে ভালো।একটু পরই স্কুলের পোশাক পরিবর্তন করে প্রেমশা তাদের কাছে আসলো।তিনি দেখতে পেয়ে তাকে কাছে ডাকলেন।

হাতে বল নিয়ে প্রেমশা কাছে এলো।ইসমি আক্তার জিজ্ঞেস করলেন,”নাম কী তোমার?”

স্বভাবগত প্রেমশা হেসে বলল,”আমার নাম প্রেমশা হোসেন রুপা।তোমার নাম কী?”

ইসমি বেগম স্মিথ হেসে বললেন,”আমার নাম ইসমি আক্তার।তুমি আমাকে নানু বলে ডাকবে।”
-“কেন?”
-“আমি তোমার নানু তাই।”
-“কিন্তু তোমার নাম তো ইসমি।তুমি আমাকে কী বলে ডাকবে?”

ইসমি আক্তার ভেবাচেকা খেলেন।আজ-কাল কার ছোটো ছোটো বাচ্চারাও চালাক।তিনি উত্তরে বললেন,”প্রেমশা বলে ডাকবো।”

দৃঢ়তার সাথে প্রেমশা বলল,”তাহলে আমি কেন নানু ডাকবো?”

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুমি,ইশিকা,নিশি হো হো করে হেসে উঠলো।ইসমি আক্তারও একটু বাদে হাসলেন।তিনি মনে মনে পণ করেছেন, যে করে হোক প্রেমশাকে কথায় হার মানাবে।তিনি বললেন,”আমি তোমার দাদু বয়সী।তুমি উনাকে নাম ধরে ডাকো?”
-“নাহ।দাদু বলে ডাকি।”
-“আমিও বয়সে বড় বলে আমাকে নানু বলে ডাকবে।”
-“দাদুর বয়সী হলে দাদু ডাকবো।নানু কেন ডাকবো?”

ইসমি আক্তার হার মেনে নিয়ে কপালে হাত রাখলেন।সবাই এক সুরে হেসে যাচ্ছে।তিনি আবারো বললেন,”আচ্ছা ঠিক আছে।দাদু বলে ডাকবে।”

প্রেমশা খিলখিল করে হেসে উঠলো।বেশ মজা লাগছে তার।ইসমি আক্তারকেও পছন্দ হয়েছে।যে তাকে বকা দেয় না,তাকে তার পছন্দ হয়ে যায়।

অনাহিতা রুম থেকে বের হয়ে হেসে তার মা’কে বলল,”মা,তুমি ওর সাথে কথায় পারবে না।পাকনা বুড়ি।”
ইসমি আক্তার হেসে বললেন,”আমি তো হার মেনে নিয়েছি।”

অনাহিতা নিশির দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো,”তোমার ভাইয়ার আসতে লেট হবে।চলো আমরা খেয়ে নেই।রুমি,তরকারি গরম করেছো?”

রুমি রান্নাঘরে যেতে যেতে বলল,”হ ভাবিজান।শুধু টেবিলে আইনা দিলে হইবো।”

.
অনাহিতা তার মা’কে প্রশ্ন করলো,”বাবা,ভাই আসতে চায়নি?”

ইসমি আক্তার আচারের প্লেটে চামচ নেড়ে বললেন,”ওরা তোর ডিভোর্স চাইছে।তুই যদি এই সংসার করতে না চাস তাহলে ডিভোর্স করিয়ে দিবে।”

অনাহিতার বুক কেঁপে উঠলো।এই সংসারে যেমন সে আজীবন থাকবে বলে পণ করেনি তেমনি চলে যাবে বলেও দু’ দন্ড ভাবেনি।বরং সে এই কথা ভাবতেই পারে না।

অনাহিতা প্রেমশার চুলে ক্লিপ বেঁধে দিয়ে তার মায়ের উদ্দ্যেশে বলল,”আমার জীবনটা ছেলেখেলা নই মা।এবার থেকে আমার ইচ্ছায় সবকিছু হবে।”

ইসমি আক্তার এই বাড়ির সদস্যদের কাজ দ্বারা বুঝেছে তার মেয়ে সুখে আছে।তিনি বললেন,”তুই যেটা চাস, সেটাই হবে।তুই সুখে আছিস তো?”

অনাহিতা ইশারায় প্রেমশাকে চলে যেতে বললো।মায়ের ইশারায় সম্মতি জানিয়ে সে চলে গেল।অনাহিতা তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,”আমি তোমার সুখের জন্য কিংবা নিজে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বলছি না মা।আমি যথেষ্ট ভালো আছি।জিসানের দেওয়া ধাক্কাটা আমি সামলাতে পারতাম না।কিন্তু এই যে মেয়েটা,প্রেমশা? ও আমার খুশির কারণ।এত ভালো লাগে মেয়েটাকে…!তোমার রুপ দেখি আমি ওর মাঝে।”

ইসমি আক্তার বুক ভরে শ্বাস নিলেন।প্রতিটি মা-ই চায় তার মেয়েটা ভালো থাকুক।সেটা কোনো সন্তানের বাবার সাথে হলেও আপত্তি নেই।

ইসমি বেগম প্রশ্ন করলেন,”আর অভিনব?ও তোর সাথে চিট করেনি?”
-“মা,উনিও জানতেন না।আমাদের মাঝে ভালোবাসা হয়তো নেই মা,কিন্তু যথেষ্ট সম্মান আছে।সত্যি বলতে,জিসানের সাথেও আমি এতো ভালো থাকতাম কি’না জানা নেই।আল্লাহ যা করেন,ভালোর জন্যই করেন।”

(চলবে)