@থার্টি ফার্স্ট নাইট
পর্ব:১৪+১৫
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু
সকাল হতেই রান্না-বান্নার তোড়জোড় শুরু হলো।এর মূল কারণ হলো নিশিকে দেখতে আসছে।রান্না ঘরে আছে অনাহিতা, রুমি, ইশিকা।রোমিলা বেগম মেয়ের কাছে বিরক্তি নিয়ে বসে আছেন।ঠিক বসে নেই,তাঁকে এক মুহুর্তের জন্যও এক জায়গায় স্থির হতে দিচ্ছে না নিশি।
কয়েক রকমের কানের দুল দেখিয়ে নিশি জিজ্ঞেস করলো,”মা,কোনটা পরবো?”
রোমিলা বেগম অসহায় দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।তিনি যেটা পছন্দ করবেন নিশি সেটা পরবে না।একটা গয়না পছন্দ করতে কম করে হলেও আধ ঘণ্টা সময় নিচ্ছে।
প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে নিশি বিরক্ত হয়ে বলল,”বলো না মা।”
রেগেমেগে রোমিলা বেগম উত্তর দিলেন,”আমি বললে তুই শুনবি?যেকোনো একটা পরে নিলেই তো হয়।আজকে বিয়ে তো না তোর।”
নিশি আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আগের মতো করে বলল,”চাকরি করা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট নাকি ইন্টারভিউ?”
রোমিলা বেগম উত্তর দেওয়ার আগে নিশি বলে উঠলো,”অবশ্যই ইন্টারভিউ।কারণ ইন্টারভিউতে নিজেকে ভালো ভাবে প্রেজেন্ট না করলে তো চাকরিই হবে না।তেমনি বিয়ের দিনের দেখতে আসার দিনটা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।এবার বলো,কোনটা পরবো?”
রোমিলা বেগমের ইচ্ছে করছে নিশিকে দু’গালে দু’টো চড় দিতে।এর রঙ – ঢঙ কবে থেকে শিখেছে মেয়েটা?
লাল পাথরের দুলটা দেখিয়ে দিয়ে রোমিলা বেগম কাবার্ড থেকে শাড়ি বের করতে গেলেন।নিশি তার মায়ের পছন্দ দেখে বলল,”এটা মা?ধ্যুর,মানাবে না এটা।কালো রঙেরটাই পরি।”
কাবার্ড থেকে শাড়ি বের করে রোমিলা বেগম প্রতিত্তোরে বললেন,”তোর যেটা ইচ্ছে,সেটা পর।”
নিশি কানে কালো রঙেরটা পরে বলল,”এটা ভালো মানচ্ছে না মা।লালটাই দেখি…”
রোমিলা বেগম শাড়িগুলো বিছানায় রেখে কোমরে হাত দিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বললেন,”দুল নিয়ে আর একটা কথা বললে তোর বিয়েটা আজই ভেঙে দিবো।ইন্টারভিউ রেজাল্ট আসবে ইউ আর রিজেক্ট।”
-“দিলে দাও ভেঙে।আমি তারপর সূর্যের সাথে…ফুওওও।পালিয়ে যাবো।”
রোমিলা বেগম এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বললেন,”কানের নিচে দিবো একটা।শাড়ি পছন্দ কর।”
হাতের দুল জোড়া রেখে নিশি বিছানায় এসে বসলো।শাড়ি দেখতে দেখতে মায়ের উদ্দেশ্যে সে বলল,”মা শোনো,আমি আর সূর্য যখন ছাদে যাবো,তখন তুমি একটা রোমান্টিক মিউজিক বাজবে।উমমম,আগে থেকে ছাদের এক কোণে রেখে দিবে।ঠিক আছে?”
রোমিলা বেগম বিস্ময় নিয়ে বললেন,”যাহ,ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিক কেন?তোরা কী শুটিং করতে যাবি নাকি?”
-“মা,তুমি বুঝবে না।আমিই ঠিক করবো।”
তাদের কথার মাঝে প্রেমশা আইসক্রিম হাতে দৌড়ে রুমে প্রবেশ করে বলল,”ফুফি, দাদু, সুপার মাম্মাকে বলো না আমি আইসক্রিম খাচ্ছি।ওক্কে?”
বলেই সে আইসক্রিমের বক্সটা টেবিলে এক কোণে রেখে দিলো।মুহুর্তে অনাহিতা রুমে আসলো।রুমে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে সে প্রশ্ন করলো,”প্রেমশা আইসক্রিম খাচ্ছিলো?”
প্রেমশা মুখটাকে গোমড়া করে রাখলো।রোমিলা বেগম নাতনির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,”কই?কিসের আইসক্রিম?”
নিশিও তাল মিলিয়ে বলল,”হ্যাঁ,প্রেমশা কোনো আইসক্রিম আনেনি।তাই না প্রেমশা?”
প্রেমশা হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো।অনাহিতা বলল,”তাই?ঠিক আছে।চলো প্রেমশা,তুমি পাস্তা শেষ করবে।”
অসহায় দৃষ্টিতে ফুফি আর দাদুর দিকে তাকিয়ে রইলো প্রেমশা।তা দেখে নিশি বলল,”ভাবি,একটু পরে যাক।আমার শাড়ি পছন্দ করছি।”
অনাহিতা কিছু বলতে গিয়েও আর বলল না।’ঠিক আছে’ বলে সে চলে আসলো।প্রেমশা তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে আইসক্রিমের বক্সটা টেবিল থেকে হাতে নিলো।বিজয়ের হাসি হেসে সে আইসক্রিম মুখে দিলো।নিশি তা দেখে বলল,”লুকিয়ে লুকিয়ে আইসক্রিম খাস তুই?রাতে না কাশি হলো?”
হাত নেড়ে প্রেমশা হেসে উত্তর দিলো,”গম হয়ে গেছে।”
রোমিলা বেগম হতভম্ব হয়ে বললেন,”গম কী?’ভালো’ বলো।”
দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠলো প্রেমশা।এই নতুন শব্দটা সে ইশিকার কাছ থেকে শিখেছে।শাড়ির দিকে দৃষ্টি পড়তেই সে বলল,”ওয়াও!শাড়ি?আমিও পরবো।হি হি হি!”
নিশি তাকে ভেঙ্গিয়ে বলল,”হি হি হি,তোর জন্য না শাড়ি।”
প্রেমশা মুখ গোমড়া করে বলল,”কার জন্য?আমিও পরবো শাড়ি।”
নিশি গায়ে গোলাপি রঙের শাড়িটা জড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে বলল,”আমার জন্য।আজকে আমার ম্যারেঞ্জ ইন্টারভিউ।”
প্রেমশা কথাটা না বুঝে প্রশ্ন করল,”মেরেজ ইনারভিউ কী?”
নিশি তার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।তার রোমিলা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,”মা,এটা মানাচ্ছে না?”
প্রেমশাকে এড়িয়ে যাওয়ায় সে রেগে গেল।রাগে ফুসফুস করতে করতে রোমিলা বেগমকে বলল,”দাদু,আমি শাড়ি পরবো,এক্ষুণি।”
রোমিলা বেগমও তাকে এড়িয়ে নিশিকে বললেন,”নাহ,এটা দেখ।”
প্রেমশা কিছুক্ষণ তার ফুফি-দাদুর দিকে তাকিয়ে রইলো।সে বুঝতে পারলো এরা দু’জন তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে।গপাগপ সে আইসক্রিম শেষ করে বাব্বার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।বিড়বিড় করে বলল,”সুপার মাম্মার কাছে যাবো না।বাব্বা শাড়ি দিবে।ফুফি পঁচা,দাদু সুপার ডুপার পঁচা।হুহ্!”
নিশি কী কী পরবে সবকিছু ঠিক করে রোমিলা বেগমকে বলল,”মা,তোমার কাজ নেই?আমার রুমে এতক্ষণ কী করছো?”
মেয়ের কথা শোনে রোমিলা বেগম আকাশ থেকে পড়লেন।এতক্ষণ ধরে নিশিই তাঁকে আটকে রেখেছে।আর এখন বলছে…!
রেগেমেগে রোমিলা বেগম বললেন,”তুই বলছিস এটা?”
বিরক্তকর কণ্ঠে নিশি উত্তর দিলো,”হ্যাঁ।তোমাকে কে ডেকেছে বলো তো?”
রোমিলা বেগম কর্কশ কণ্ঠে বললেন,”ঠিক আছে।খবরদার আমাকে আবার ডেকেছিস তো।”
এক মুহুর্তও অপেক্ষা না করে তিনি বেরিয়ে গেলেন।তার মা বের হতেই নিশি হো হো করে হেসে উঠলো।যত ধরণের পাগলামি সে তার মায়ের সাথেই করতে পারে।
.
ফোনের এপাশ থেকে আমিন বেশ রেগেমেগে কথা বলছে।তার রাগার কারণ হচ্ছে খুশি বারবার বিয়ের কথা ঘুরাচ্ছে।আমিন বলেছিল বিয়ের কথা তার ভাই আসার আগে পাকাপাকি করতে।কিন্তু খুশি সেই কথা বারবার এড়িয়ে গেছে।আমিন ক্রোধ স্বরে বলল,”তুমি বারবার বিয়ের কথা কেন এড়িয়ে যাও?
খুশি যথা সম্ভব শীতল কণ্ঠে বলল,”আমি এড়িয়ে যাচ্ছি না।এখন তো সেই টপিকেই কথা বলছি।”
-“না তুমি এড়িয়েই যাও।তোমার বাবা,আমার বাবার কল রিসিভ করেনি।”
-“বাবা ব্যস্ত আছে।কুমিল্লা গিয়েছে।”
এই পর্যায়ে আমিনের রাগ কিছুটা কমে আসলো।তবুও সামান্য ক্রোধ নিয়ে বলল,”কখন আসবে কুমিল্লা থেকে?”
-“গ্রামে কিছু জমি নিয়ে সমস্যা হচ্ছিলো।সেই কাজেই গেছে,কতদিন পর আসবে জানি না।”
-“ওহ।ডিসেম্বরের আগেই কিন্তু বাবা চাইছে বিয়েটা সারিয়ে ফেলতে।”
-“ঠিক আছে বাবা,ডিসেম্বরের আগেই হয়ে যাবে।এখন ফোনটা রাখি?”
-“কেন?”
-“আমার কয়েকজন কাজিন আসছে,ওরা সবাই ছাদে ওয়েট করছে।”
-“আচ্ছা,ঠিক আছে।”
আমিনের কল কেটে দিয়ে খুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।বিড়বিড় করে সে বলল,”ডিসেম্বর আসতে আসতে তুই আমার মেয়েকে বিয়ে করতে পারবি।”
তার পাশে বসে থাকা কাজিন বলল,”তুই এত পাত্তা দিস কেন ছেলেটাকে?বলে দিলেই তো পারিস বিয়ে করবি না।তোর বিয়ে অলরেডি ঠিক হয়ে গেছে।”
হতাশা নিয়ে খুশি বলল,”না রে।এটা বিন্দুমাত্র টের পেলে আমাকে কেটে কেটে বস্তা ভরে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিবে।সো ডেঞ্জারাস!”
.
নিশিকে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছে অনাহিতা।এমনটা না যে নিশি শাড়ি পরতে পারে না,সে ইচ্ছে করেই ভাবির কাছে পরছে।পাশেই দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুমি।হঠাৎ অভিনবের হাত ধরে প্রেমশা রুমে ঢুকলো।প্রেমশার গাল দু’টো গোলাপি হয়ে আছে।তা দেখে অনাহিতা বলল,”কী হয়েছে?প্রেমশা কাঁদছো কেন?”
কথা শেষ হতে না হতেই প্রেমশার কান্নার বেগ বেড়ে গেল। অনাহিতার শাড়ি পরানো শেষ হলে সে মেয়ের দিকে ঘুরে কিছু জিজ্ঞেস করার আগে অভিনব বলল,”আরে,ও শাড়ি পরার জন্য কাঁদছে।”
রুমি তখন খিলখিল করে হেসে উঠলো।অনাহিতা বলল,”শাড়ি?তোমার শাড়ি আছে না-কি?”
প্রেমশা চোখ মুছে উত্তর দিলো,”ফুফিরটা পরবো।আমি শাড়ি পরবো।”
নিশি বলল,”আমার শাড়ি হবে না তোর।”
অনাহিতা বলল,”কী মুশকিল!অতো বড়ো শাড়ি পিচ্চি মা’র হবে নাকি?”
প্রেমশা জেদ ধরে বলল,”হব্বে।আমি শাড়ি পরবো।বাব্বা,বলো না আমি শাড়ি পরবো।”
অভিমব হাঁটু গেড়ে মেয়ের সামনে বসে বলল,”পরবে তো।”
অনাহিতা কোমরে হাত দিয়ে কিঞ্চিত রেগে অভিনবের উদ্দেশ্যে বলল,”কীভাবে পরবে ও শাড়ি?শপিংমলে গিয়ে শাড়ি আনতে হবে।এত ব্যস্ততায় কে যাবে?”
মেয়ের উদ্দেশ্যে অনাহিতা বলল,”এখন কীভাবে পরবে?আমরা কাল আনবো।”
একগুঁয়ে প্রেমশা কোনো কথায় শুনবে না।সে জেদ ধরে রেখেই বলল,”আমি এক্ষুণি পরবো।এক্ষুণি!”
বলতে বলতে সে কেশে উঠলো।গত রাত থেকেই তার কাশি হয়েছে।অনাহিতা তাকে কোলে তুলে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল।অভিনব কিছুক্ষন তাকিয়ে সেও বের হয়ে গেল।নিশি রুমির উদ্দেশ্যে বলল,”মা’কে একটু ডেকে দিয়ো তো।”
রুমি বের হয়ে গেলে সে নিজের মোবাইল হাতে নিলো।মেসেজ বক্সে গিয়ে সূর্যের উদ্দেশ্যে মেসেজ লিখলো,”আসার সময় প্রেমশার জন্য শাড়ি নিয়ে আসবেন।শাড়ি ছাড়া আসবেন না।”
প্রেমশার একটুখানি চোখের জল তার কাছে পাহাড় সমান কষ্ট।
পর্ব-১৫
এক নিমিষের মাঝেই ছেলে পক্ষ উপস্থিত হলো।ছেলে পক্ষ বলতে এসেছে সূর্যের বাবা-মা,ফুফি আর চাচি।সূর্যের আসতে দেরি হবে বলে জানা গেল।
মিনিট কয়েকের মধ্যে নিশিকে তাঁদের সামনে নিয়ে যাওয়া হলো।মুহুর্তে যেন নিশি লজ্জার বেড়াজালে আটকে গেছে।লজ্জায় সে মাথা উঁচু করতে পারছে না।
সূর্যের মা বলল,”মাশা-আল্লাহ!শাড়িতে তোমাকে বেশ মানিয়েছে।দিন কাল কেমন যাচ্ছে?”
নিশি মৃদুস্বরে উত্তর দিলো,”আলহামদুলিল্লাহ,ভালো আন্টি।”
নিশির সাথে কয়েকটা কথার বলার মাঝেই সূর্য উপস্থিত হলো।দু’জনকে একসাথে বসিয়ে সূর্যের চাচি রোমিলা বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,”আপা,আমরা আর কী বলবো?ছেলেমেয়েরা তো নিজেরা পছন্দ করছে।আর নিশি ব্যাপারে আমরা সবটা জানি।আমাদের কিছু বলার নেই।”
সবাই মৃদু হাসলো।অনাহিতা বলল,”ওরা নিজেরা কথা বলুক।”
বড়োরা হ্যাঁ বোধক সম্মতি জানালে নিশি আর সূর্য উঠে গেল।দু’জনের যাওয়ার কথা ছিল ছাদে কিন্তু কী মনে করে নিশি বাগানের দিকে হাঁটা শুরু করলো।
.
সূর্য হাতে কিছু পাতা নিয়ে ছিড়তে ছিঁড়তে বলল,”আমাকে ভালোবাসো না অথচ বিয়ে করতে এক পায়ে খাঁড়া?”
নিশি মৃদুস্বরে বলল,”প্রেমশার জন্য শাড়ি আনতে বলেছিলাম।”
সূর্য এক মুঠো হতাশা নিয়ে বলল,”হাহ্,একটা রোমান্টিক মোমেন্ট…ওমনি তোমার অন্য টপিক নিয়ে কথা বলতে হবে।”
নিশি মিটিমিটি হাসতে হাসতে লাগলো।সূর্য আড়চোখে তাকিয়ে বলল,”গাড়িতে আছে।প্রেমশা কোথায়?”
নিশি উত্তর দিলো,”কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে।”
-“কাঁদছিল কেন?”
-“জেদ ধরেছিল শাড়ি পরবে।আমার শাড়ি তো ওর হবে না।তাই আপনাকে আনতে বললাম।”
-“ওহ।”
নিশিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করে সূর্য বলল,”বাহ!গয়নার,শাড়ি সব তো মিলে গেছে একদম।মন বলছে ‘আমার মন শহরে শুধু এই নারীর বসবাস’।”
দু’জনে এক সাথে হেসে উঠলো।সূর্য আবারো বলল,”অন্য রঙেও তো তোমাকে ভালো মানায়।সবসময় কালো পরো কেন?”
নিশি উত্তর দিলো,”কালো রঙ পছন্দ তাই।”মনে মনে বলল,”যত্তসব ফাউল কথাবার্তা বলিস ক্যান?”
একটু পর আবার বলল,”আজকে ওপেনলি আই মিন উইদাউট মাস্ক,ক্যাপ বের হলেন যে?”
হতভম্ব হয়ে সূর্য উত্তর দিলো,”আজিব ভাই তুমি!বিয়ে করবো বলে পাত্রী দেখতে আসছি।এখানে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কেন আসবো?সবাই জানলে জানবে,আমি তো লুকিয়ে বিয়ে করবো না।”
-“বাট বিয়ে তো করবেন জানুয়ারিতে।”
-“আগে থেকে জানিয়ে রাখলে তোমার দিকে কোনো ছেলে তাকানোর সাহস পাবে না আর।”
নিশি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক পলক তাকিয়ে নজর নিচু করে নিলো।মনে মনে হেসে বলল,”আমি ব্যক্তিগত আপনারই সম্পত্তি।শুধু আপনার!আমার মনের দলিলটা তো আপনার নামে রেজিস্ট্রার করা।”
নিশি আর সূর্যের কথোপকথনের দৃশ্যটা ইশিকা লুকিয়ে লুকিয়ে শোনার চেষ্টা করছিল।যদিও কিছু শুনতে পাচ্ছিলো না।কিন্তু দৃশ্যটা উপভোগ করছিল রান্নাঘর থেকে।হঠাৎ টুংটাং আওয়াজে সে চমকে উঠলো।পেছন ফিরে দেখলো রুমি চায়ের কাপ পরিষ্কার করছে।বুকে থুতু দেওয়ার ভান করে সে বলল,”তুমি?ভয় পাইছি,আল্লাহ!”
রুমি সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,”তুই কী করতেছিলি?”
আমতা আমতা করে ইশিকা বলল,”আমম..আমি?আমি কী করমু?ঐ..আআ..ঐ বাগান দেখতেছিলাম।”
লুকিয়ে লুকিয়ে কোনো কিছু করাটা যতটা লজ্জার,তার থেকেও বেশি লজ্জার সেটা অন্য কেউ দেখে ফেললে।ইশিকা এখন সেই পরিস্থিতিতে আছে।রুমি দেখলো বাগানে নিশি আর সূর্য কথা বলতে বলতে হাঁটছে।এক নজর তাকিয়ে নিজের কাজে মন দিয়ে বলল,”ওওও,তাইলে ঐটা দেখোস?”
-“কিচ্ছু দেখি না আমি।বাজে কথা বলো।”
-“কামাল মিয়ার সাথে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক কইরা ফেল।এমনে আর কতদিন থাকবি?নিজের সংসার তো তৈরি কর।”
ইশিকা লজ্জায় পারছে না মাটি ফাঁক করে নিজেকে লুকাতে।লজ্জাবতী গাছের মতো মাথা নুইয়ে সে বলল,”গ্রামে গিয়া মা-বাবারে রাজী করামু।”
-“তাহলে তো ভালায়।”
.
রাতের বেলা সবাই যখন রান্না ঘরে ব্যস্ত তখন প্রেমশার কাছে ঘেঁষে নিশি বলল,”বুড়ি,মুখ ছোট করে রেখেছিস কেন?”
প্রেমশা খাতায় কলম নিয়ে দাগ দিচ্ছে।তার যত রাগ ওসব খাতার উপরই ঝাড়ছে।যেন খাতা,কলম অপরাধী আর প্রেমশা আইনের লোক।সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে এ বাড়ির কারো সাথেই সে কথা বলবে না।
কোনো উত্তর না পেয়ে নিশি তার হাত থেকে কলম কেড়ে নিলো।প্রেমশা তবুও জায়গা থেকে নড়লো না।নিশি আবারো বলল,”শাড়ি পরবে?নতুন শাড়ি?”
প্রেমশা একবার আড়চোখে তাকালো।পলকে নজর নামিয়ে মুখ ভার করে উত্তর দিলো,”নাহ।”
নিশি হেসে বলল,”ওরে বাপরে!এত রাগ?কাতুকুতু, কাতুকুতু।”
খিলখিল করে হাসতে লাগলো প্রেমশা।নিশি সেই ফাঁকে তাকে কোলে তুলে নিলো।অনাহিতা ড্রয়িংরুম থেকে তাদের দু’জনকে দেখে উঁচু স্বরে প্রশ্ন করল,”কই যাও তোমরা?”
নিশি হাসতে হাসতে বলল,”প্রেমশা শাড়ি পরবে ভাবি।”
নিশি তাকে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলল,”এক সেকেন্ড অপেক্ষা কর,তিন সেকেন্ডে আসছি।”
পলকে সে শাড়ি,তার সাইজের গয়না,মেকাপ নিয়ে হাজির হলো।প্রেমশা তা দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো।তার জেদ,রাগ যেন নিমিষে ভেনিস হয়ে গেছে।নিশি তার হাতে চকলেট ধরিয়ে দিলো ফাঁকে।
প্রেমশার কথা বলার রেডিও চালু হয়ে গেছে।নিশি তাকে শাড়ি পরাচ্ছে।বিনিময়ে প্রেমশা কথা বলেই যাচ্ছে।এক পর্যায়ে সে বলে উঠলো,”জানো ফুফি?আমি তো এত্তগুলা রাগ করেছিলাম।বাড়ির সব্বাই পঁচা।শুধু তুমি ভালো।আই লাভ ইউ।”
প্রেমশা তার চকলেটে কামড় দিয়ে নিশির গালে চুমু দিলো।নিশি হেসে বলল,”হয়েছে।আর এত পাম দিতে হবে না।”
প্রেমশা বরাবরের মতো খিলখিল করে হেসে প্রশ্ন করল,”পাম কী ফুফি?”
নিশি উত্তর দিলো,”পাম মানে প্রসংশা।মানে তোর এত প্রসংশা করতে হবে না।”
কোনো কঠিন অংক বুঝার মতো করে প্রেমশা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,”ওওও।আচ্ছা,শোনো না ফুফি?”
আনমনে নিশি প্রেমশার শাড়ির কুচি কোমরে গুঁজে দিয়ে বলল,”হুহ্।”
প্রেমশা গালে এক হাত দিয়ে বলল,”ইশু আপ্পুর মোবাইলে না হিরোর ছবি দেখেছি।তোমার সাথে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের বাসায়।”
নিশি তার কথায় ভালো করে না শুনেই প্রশ্ন করলো,”হিরো কে?”
-“আরে ফুফি,হিরো ঐ যে ব্যাড বয়।”
নিশি তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।প্রেমশা মুখ গোমড়া করে বলল,”নামটা চাঁদ না কী মনে হয়।”
নিশি ফিক করে হেসে উঠলো।প্রেমশা গলায় ছোট হারটা পরিয়ে দিয়ে বলল,”সূর্য।ওরা সবাই আসছিল।আর শাড়িটাও ও আনছে।”
প্রেমশা বিস্ময়কর কণ্ঠে বলল,”কখন?আমি দেখিনি।”
নিশি তার নাক টেনে বলল,”আপনি তখন ঘুমে ছিলেন।”
প্রেমশা কপালে হাত দিয়ে বলল,”এই যাহ।আমি হিরোকে মিস করে ফেললাম।”
-“প্রেবলেম নেই।কয়েকদিন পর দেখা করাবো।”
-“ওক্কে।আমি লিপস্টিক দিবো।ঐ যে পিংক কালারটা।”
প্রেমশা হা করে রইলো।নিশি তার দেখানো লিপস্টিকটা ঠোঁটে লাগিয়ে দিলো।তাকে পুরোপুরি তৈরি করে নিশি বলল,”এবার চল,সবাইকে দেখিয়ে আসি।”
প্রেমশা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বলল,”হায়!প্রেমশা তোমাকে পরী লাগছে পরী।এঞ্জেল!”
.
অভিনব প্রেমশাকে রুমে না পেয়ে ড্রয়িংরুমে এলো।তখন রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা অনাহিতার কণ্ঠস্বর শোনে সে এগিয়ে গেল।পেছনে দাঁড়িয়ে সে কাজকর্ম দেখলো মিনিক কয়েক।অনাহিতা পেছন ঘুরতেই তাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো।
নিজেকে সামলে নিয়ে অনাহিতা বলল,”আল্লাহ!এভাবে কেউ পেছনে দাড়িয়ে থাকে?ভূতের মতো!”
অভিনব বিড়বিড় করে বলল,”আমি ভূতের মতো না।নিজে ভূত ইমাজিন করে ভয় পেয়েছে।ভীতু!”
অনাহিতা শেষ কথা শুনতে পেয়ে বলল,”এক্সকিউজ মি!কে ভীতু?কাকে ভীতু বললেন?রাত ন’টায় রান্না ঘরে একা একা কাজ করছি।এটা আপনার কাছে ‘ভীতু’?”
অভিনব আবারো বিড়বিড় করে বলল,”আমি যা ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড় করে বলি সব কীভাবে বুঝে যায়?”
অনাহিতা চুলা বন্ধ করে দিয়ে বলল,”মনে মনে কে কী বলে আমি সব শুনতে পারি।আই হ্যাভ অ্যা স্পেশাল পাওয়ার!”
অভিনব আবারো বিড়বিড় করে বলল,”বিজ্ঞানীরা এত কিছু আবিষ্কার করল অথচ মনে মনে কী বলে সেটা জানতে পারার মেশিন আবিষ্কার করলো না।স্ট্রেঞ্জ!”
অনাহিতা হালকা ধমকের সুরে বলল,”আজিব মানুষ তো আপনি!সব কথা বিড়বিড় করেই বলছেন।অফিস থেকে কখন ফিরলেন?”
অভিনব নড়েচড়ে উঠলো।গলা ঝাড়া দিয়ে উত্তর দিলো,”একটু আগেই।প্রেমশাকে দেখছি না।কোথায় ও?”
অনাহিতা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বলল,”নিশি নিয়ে গেল।ওর রুমে মনে হয়।মিটিং ঠিকঠাক হয়েছে?”
-“একদম পারফেক্ট।মা কোথায়?”
-“টিভি দেখছিল।”
তাদের কথার মাঝে প্রেমশাকে নিয়ে নিশি উপস্থিত হলো।প্রেমশাকে দেখে দু’জনের চোখের পলক যেন থেমে গেল।অনাহিতা অস্ফুটে বলল,”মাশা-আল্লাহ!”
নিশি উঁচু স্বরে বলে উঠলো,”মা,মা?আরে এদিকে আসো।”
রোমিলা বেগম,ইশিকা,রুমি সবাই উপস্থিত হলে যখন হা করে তাকিয়ে রইলো তখন প্রেমশা খিলখিল করে হেসে উঠলো।তার হাসির শব্দে সবার ধ্যান ভাঙলো।রোমিলা বেগম প্রশ্ন করলেন,”শাড়ি কোথা থেকে আনলি?”
নিশি উত্তরে হেসে বলল,”ম্যাজিক!তাই না প্রেমশা?”
প্রেমশা তার ফুফির তাকিয়ে বলল,”ইয়েস।”
রোমিলা বেগম আবেগে আপ্লুত হয়ে চোখের কোণে জল তৈরি করলো।তার মেয়ে বাইরের হেয়ালির ভান করলেও সত্যিকার অর্থে সে সবার খেয়াল রাখে।সবার ছোটো ছোটো আবদার পূরণ করা যেন তার দায়িত্ব।এই পরিবারের সুখটা তার কাছে স্বর্গ!
অনাহিতার সম্পর্কে ভালো খোঁজ খবর নিশিই তাকে দিয়েছিল।সবার ভালো-মন্দের খেয়াল রাখে মেয়েটা।কয়েকদিন পরেই নাকি মেয়েটা চলে যাবে!তার নিজের সংসার হবে।রোমিলা বেগমের মেয়েটা অন্য পরিবারের সদস্য হয়ে যাবে।মেয়েরা বিয়ের পর অন্যের বাড়ি চলে যাওয়ার বাধ্যতামূলক নিয়মটা কেন তৈরি করা?
সবার কথা বলার শব্দ পেয়ে রোমিলা বেগম ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে এলেন।প্রেমশার কপালে চুমু দিয়ে তিনি বললেন,”অনেক সুন্দর লাগছে।”
অনাহিতা শাড়ির আঁচলটা মেয়ের মাথায় দিয়ে বলল,”পারফেক্ট একদম!এখন রাগ কমেছে আপনার?”
প্রেমশা হেসে উত্তর দিলো,”আমার রাগ নেই সুপার মাম্মা।”
রুমি উঁচু স্বরে বলল,”আল্লাহ!প্রেমশার উপর কারো নজর পড়তে দিয়ো না।”
ইশিকা তাল মিলিয়ে বলল,”আমিন।”
.
কলিং বেল বেজে উঠায় রেশমি ধড়ফড়িয়ে উঠতে দিয়ে আবার পড়ে গেল।শেষ ক’দিন ঠিক মতো না খাওয়ায় শরীর দুর্বল হয়ে গেছে।মীরা তা দূর থেকে দেখতে পেয়ে দরজা খুলতে গেল।
রেশমি বিস্ময়কর দৃষ্টি নিয়ে দেখলো তার বাড়িতে চারজন পুলিশ ঢুকছে।এটা দেখে পলকেই গায়ের দুর্বল বাতাসে হারিয়ে গেল।কোনো বাড়িতে পুলিশ আসা মানে খারাপ খবর আসছে।পুলিশেরা ভালো খবর কমই নিয়ে আসে না।
রুপম গত রাত বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল।তার কোনো খবর এনেছে ভেবে রেশমি নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল।
পুলিশ মীরাকে বলল,”আমরা মিসেস সরকারের সাথে কথা বলতে চাই।”
মীরা তাদের সোফায় বসার জায়গা করে দিলো।রেশমি তাদের সামনে গিয়ে বসলো।পুলিশ তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,”আপনি মি.রুপমের স্ত্রী?”
মৃদুস্বরে রেশমি উত্তর দিলো,”হ্যাঁ।আপনারা?”
-“আমি ইন্সপেক্টর ইমান।মিস.নদী আপনার বা আপনার স্বামীর কী হয়?”
-“নদী?নদী রুপমের বন্ধু।কলেজ লাইফ থেকে ওরা একসাথে।”
-“মি.রুপম কী বাড়িতে?”
-“নাহ,ও কাল রাত থেকে বাড়িতে নেই।ব্যবসার কাজে বাইরে গেছে।কেন?”
রেশমি মিথ্যা বলছে।রুপম ব্যবসার কাজে নয়,তার সাথে ঝগড়া করে বেরিয়ে গেছে।অন্য লোকের সামনে সেটা বলতে দ্বিধা লাগছে।তাছাড়া পুলিশ হাজারটা প্রশ্ন করতে পারে।যার উত্তর রেশমি দিবে না।
ইন্সপেক্টর অন্য পুলিশদের দিকে তাকালেন।তারপর মৃদুস্বরে বললেন,”আমরা মিস.নদী ফ্ল্যাট থেকে মি.রুপম আর নদীর লাশ উদ্ধার করেছি।এখনো খুন নাকি আত্মহত্যা সেটা বলা যাচ্ছে না।আমরা উনার রুমটা সার্চ করবো।কনস্টেবল?”
(চলবে)