@থার্টি ফার্স্ট নাইট
#পর্ব_১৬
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু
বিরক্তিকর কল রিংটোনে অনাহিতার ঘুম নষ্ট হয়ে গেল।মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো অচেনা নাম্বার থেকে ৩টা মিসড কল।
৩টা কল দেখে অনাহিতা নিশ্চিত হলো কেউ রং নাম্বারে ডায়াল করেনি।সঠিক নাম্বারেই কল করেছে।অর্থাৎ সে নিশ্চিত ওপাশের ব্যক্তি তাকেই খুঁজছে।
অলসতা ভেঙে অনাহিতা বিছানায় উঠে বসলো।আরেকবার মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো সময় এগারোটা তেইশ মিনিট।হালকা বিরক্তিতে অনাহিতা ভ্রু কুঁচকে নিলো।
সময়টা এখন কনকনে শীতকাল।চারিদিকটা গা কাঁপানো শীতের রাজ্য।শীত আর বর্ষা দু’টো কালই ভালো ভাবে উপভোগ করা যায় সকাল বেলায়।সকাল বেলা বলতে খুব ভোরের সময়।গাছ-গাছালিকে ঘিরে রাখে কুয়াশার ছাদর।দূর-দূরান্তি অবধি কুয়াশা কী কুয়াশা।এই ভোর দেখার সৌভাগ্য সবার হয় না।যার হয় সে শারীরিক-মানসিক উভয় দিকেই সুস্থ থাকে।
কুয়াশা মাখা সকাল না দেখলে অনাহিতার মন ভরে না।কিন্তু গত দু’দিন ধরে টনসিল হওয়ায় তার ভোরে ঘুম থেকে ওঠা বারণ।অনাহিতার এই একটা সমস্যা।ঠান্ডার আগমনের সাথে সাথে তার টনসিলও চলে আসে।
অনাহিতা ঢোক গিলে বুঝতে পারলো তার গলার ব্যথা নেই।বেশ কয়েকবার সে ঢোক গিললো।তাড়াতাড়ি সে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।আয়নার দিকে হা করে তাকিয়ে বুঝতে পারলো তার টনসিল কমে গেছে।
খুশি খুশি মনে সে ফ্রেশ হয়ে নিলো।এবার থেকে শীতের সকালটা অনুভব করতে পারবে।গরম পানিও পান করতে হবে না।খুব বিরক্ত লাগে তার গরম পানি খেতে।
অনাহিতা বাথরুম থেকে বের হয়ে মোবাইল হাতে নিলো।উপরে স্পষ্ট দেখা যাছে 20 December.ক’দিন পরেই নিশির জন্মদিন।অথচ কিছু প্ল্যান করা হয়নি।
অনাহিতা অচেনা নাম্বারটাতে কল দিলো।পরপর দু’বার রিং হয়েও রিসিভ হলে না।আশ্চর্য!বিড়বিড় করতে করতে অনাহিতা দেখলো তার শ্বাশুড়ি তার রুমে দিকে আসছে।
রোমিলা বেগম তাকে দেখতে পেয়ে বলল,”ও মা!উঠে গেছো?”
অনাহিতা মৃদু হেসে বলল,”হুম।”
-“আসো,কিছু খেয়ে নিবে।”
-“আপনি যান।আমি আসছি।”
-“আচ্ছা।”
অনাহিতা গোসল সেরে নিলো।এতক্ষণ নিজেকে অগোছালো লাগছিল।ফোনটা রেখে দিয়ে অনাহিতা নিচে নেমে গেল।
রোমিলা বেগম তাকে দেখে বললেন,”বসো।গলা ব্যথা কমেছে?”
অনাহিতা চেয়ারে বসে বলল,”গলা ব্যথা একটুও নেই মা।আজ থেকে গরম পানি,ওষুধ বন্ধ।”
রোমিলা বেগম শাসনের সুরে বললেন,”নাহ।আজকেও খেতে হবে।”
অনাহিতা অসহায় মুখ করে বলল,”নাহ,আমার ভালো লাগে না গরম পানি খেতে।প্লিজ মা,প্লিজ, প্লিজ…!”
রোমিলা বেগম হেসে বললেন,”ঠিক আছে মা।কী খাবে এখন?”
অনাহিতা মৃদু স্বরে বলল,”ভাত খাবো।”
-“আচ্ছা।আমি ভাত নিয়ে আসি।তুমি বসো।”
রোমিলা বেগম কথা মতো গরম ভাতের সাথে কাঁচা কলার দিয়ে রান্না করা গরুর মাংস নিয়ে হাজির হলো।সাথে আনলো ফুলকপির ভর্তা,কাঁচা মরিচের ভর্তা।অনাহিতা গত দুইদিন তরল ছাড়া অন্য কোনো কিছু মুখেই দিতে পারেনি।কাল তার কথা মতো কলা দিয়ে রান্না করা হলো।
অনাহিতা খেতে শুরু করলে রোমিলা বেগম বললেন,”শুঁটকি খাবে?দানা দিয়ে রান্না করা।”
অনাহিতা তার দিয়ে তাকিয়ে বলল,”হ্যাঁ।”
রোমিলা বেগম চেয়ার থেকে উঠে চলে গেলেন।অনাহিতার বিপরীত পাশে রুমি সুই-সুতো নিয়ে বেলি ফুলের মালা গাঁথছে।তাকে লক্ষ্য করে অনাহিতা বলল,”শুঁটকি কে আনলো?”
রুমি নিজের কাজ করতে করতে বলল,”ইছিকা।তার গেরাম থেকে আনছে।”
-“ইশিকা কখন এলো?”
-“ভোর বেলায়।”
-“ওর বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে?”
-“পাকা তো হইলো বলল।জানুয়ারিতে হইবো ঠিক হইছে।”
-“যাক,তাহলে আরেকটা বিয়ে খেতে পারবো।”
রুমির সাথে অনাহিতাও হেসে উঠলো।রোমিকা বেগম শুঁটকির তরকারি নিয়ে আনলে তা মুখে দিয়ে সে প্রশ্ন করলো,”কে রেঁধেছে মা?”
রুমি উত্তর দিলো,”ইছিকা করছে রান্না।আমি তো শুটকি রাঁধতে পারি না।”
-“উমমম…অনেক ভালো হয়েছে।”
এ বাড়ির মেয়ে দু’টোকে অনাহিতার অনেক বেশিই ভালো লাগে।ইশিকা মালি হয়েও বাড়ির অনেক কাজে সাহায্য করে।রুমিও দেখা যায় আপন মনে করে সবাইকে।সব বাড়ির কাজের মেয়েরা মনে হয় এমন হয় না।বাড়ির সদস্যরাও তাদের আপনই মনে করে।কাজের মেয়েদের এক চিমটি ভালোবাসা দিলে তারা অঢেল ভালোবাসা ফেরত দিতে দ্বিধা করে না।
রোমিলা বেগম তার পাশে আরামের সহিত বসে বলল,”নিশির জন্মদিন নিয়ে কিছু ভেবেছো অনি?”
অনাহিতা মুখে ভাত দিয়ে বলল,”নাহ মা।ভাবতে পারিনি কিছু।”
-“আমি চাইছি এবারে ওর জন্মদিনটা অন্য রকমভাবে পালন করতে।কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না।”
-“নিশি ডান্স ক্লাসে গেল?”
-“হ্যাঁ,প্রেমশাকেও সাথে নিয়ে গেল।”
-“ওহ।”
অনাহিতার খাওয়া দাওয়া শেষ করে ইচ্ছে হলো পান খাবে।পান খেয়ে মুখের ভেতরের অংশ লাল করে অভিনবের সাথে ভিডিয়ো কলে কথা বলবে।নিজের ভাবনায় অনাহিতা নিজেই হেসে ফেললো।আজকাল তার শহরে বিনা অনুমতিতে ‘অভিনব’ মানুষটা ঘুরঘুর করে।কে জানে,একদিন হয়তো মানুষটা তার পুরো শহর দখল করে নিবে!জিসানের নামটা তার শহর থেকে একেবারে মুছে যাবে।যেভাবে রাবার দিয়ে পেন্সিলের দাগ মুছে যায়!
অনাহিতার রুমির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল,”ইশিকা কোথায়?”
রুমি মালা গাঁথায় মন রেখেই উত্তর দিলো,”বাগানে।কাজ করতেছে মনে হয়।”
-“আচ্ছা।”
অনাহিতা বাগানে গিয়ে দেখলো ইশিকা এক ধ্যানে বসে বাগানের ঘাস কেটে বাগানটা পরিষ্কার করছে।সে চুপিচুপি তার পেছনে দাঁড়ালো।তারপর বাচ্চাদের মতো করে বলল ‘ভোওও’।আচমকা ভয় পেয়ে ইশিকা উঠে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরলো।তার চেহারায় ভয় স্পষ্ট।তা দেখে অনাহিতা হো হো করে হেসে উঠলো।
ইশিকা বুকে হাত দিকে শ্বাস নিতে নিতে বলল,”ভাবিজান আপনে?কী যে ভয় পাইছি…!”
অনাহিতা তখনো হাসতে আছে।ইশিকা তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,”থামেন ভাবিজান।বাগানে কী কাম আছে?”
অনাহিতা হাসি থামিয়ে মুখে গম্ভীর একটা ভাব আনার চেষ্টা করে বলল,”আববব,আমার পান খেতে ইচ্ছে করছে।আমাকে একটা পান বানিয়ে দাও।”
ইশিকার ঠোঁট জোড়া আপন শক্তিতে হা হয়ে গেল।এ কী শোনছে!অতিরিক্ত আশ্চর্য হওয়ায় তার কণ্ঠস্বর নিভে গেল।কথা বলতে চাইছে কিন্তু কোনো শব্দ উচ্চারণ হচ্ছে না।
অনাহিতা কিছুটা জোরে বলল,”কী হলো?পান বানিয়ে দিবে আমাকে।চলো…।”
ইশিকা কোনো মতে ফিসফিস করে বলল,”পান?পান কে খাবে ভাবিজান?”
-“আমি খাবো।উফ,তুমি চলো তো।”
অনাহিতা তার এক হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল।এহেন কান্ডে ইশিকা যেন রোবট হয়ে গেছে।রোবটের মতোই সে অনাহিতার পেছন পেছন পা চালালো।বিষয়টা অনাহিতা খুব উপভোগ করছে।
হুটহাট অদ্ভুত কান্ড করে অন্য কাউকে চমকে দেওয়ার মজাই আলাদা।
.
সুপারি চিবোতে গিয়ে অনাহিতা দাঁতে ভয়ানক আঘাত পেয়েছে।মনে মনে শপথ করেছে,আর কোনোদিন পান খাওয়ার মতো ভুল কাজ করবে না।তাছাড়া পানের পিক ঠোঁট বেয়ে পড়ে যাচ্ছে।খুব বিশ্রী দেখাচ্ছে আয়নায় তাকে।
পিক গিলতে গিয়ে গলায় অদ্ভুত এক ধরণের ব্যথার মতো হচ্ছে।কীভাবে মানুষ খেতে পারে পান?এটাও খাওয়ার জিনিস?তবুও সে পান ফেলে দেয়নি।মনে মনে আরেকটা শপথ করেছে।তা হলো,যেভাবেই হোক এই পান সে শেষ করবেই।
পান চিবোতে চিবোতে রুমে এসে সে মোবাইল হাতে নিলো।স্কিনে দেখলো সকালের অচেনা নাম্বার আর অভিনবের নাম্বার থেকে তিন বারের মতো কল এসেছে।
কিছুক্ষণ সে ভাবলো নাম্বারটা কার হতে পারে।কিন্তু কিছুতেই সমীকরণ মেলাতে পারলো না।ভাবতে ভাবতে সে নাম্বারটিতে ডায়াল করলো।দুই বার রিং হতেই ওপাশে রিসিভ হলো।অনাহিতা ‘হ্যালো’ বলার আগে ওপাশ থেকে চেনা কণ্ঠস্বর বলল,”হ্যালো,অনাহিতা?ঘুম ভেঙেছে?”
অনাহিতা কান থেকে মোবাইল সরিয়ে স্কিনে চোখ রাখলো।সে অভিনবের নাম্বারেই ডায়াল করে ফেলেছে।নিজেকে যথা সম্ভব স্বাভাবিক করে সে উত্তর দিলো,”হ্যাঁ,এক-দেড় ঘণ্টা আগে উঠলাম।”
-“ওহ।খেয়েছো?”
-“হুম।”
-“টনসিলের ব্যথা আছে?ওষুধ নিয়েছো?”
-“নাহ।”
-“কী নাহ?”
-“ব্যথা নেই।তাই ওষুধ খেতে হয়নি।”
-“ওহ।তুমি কী খাচ্ছো?মুখে কী?”
অনাহিতা চমকে উঠলো।পান খাওয়ার কথা অভিনবকে বললে তার রিয়্যাকশন কেমন হবে?বকা দিবে?নাকি বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইবে?
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করেই নেট প্রবলেম শুরু হলো।ওপাশ থেকে অভিনব হ্যালো হ্যালো করতে করতে ফোন কেটে দিলো।অনাহিতার মাথায় তখন অন্য চিন্তা আসলো।মানুষ ফোন ধরে ‘হ্যালো’ কেন বলে?
অনাহিতার মনে পড়লো টেলিফোন আবিষ্কাকর অ্যালেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের গার্লফ্রেন্ডের নাম ছিল ‘হ্যালো’।সবাই তাঁর গার্লফ্রেন্ডের নাম মনে রাখার জন্যই তিনি টেলিফোন ধরে ‘হ্যালো’ বলার সিস্টেম চালু করেন।এতটাই ভালোবাসতো!
অনাহিতা কিছু সময় তার মাথা চেপে ধরলো।আজকাল প্রেমশার অভ্যাস হয়ে গেছে তার।তার মতোই মনে হাজারো জানা-অজানা প্রশ্ন জড়ো হচ্ছে।
এভাবে কিছু সময় পার হওয়ার পর অনাহিতা মোবাইল হাতে নিলো।অচেনার নাম্বারটাতে কল করা উচিত।মানুষটা নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে খোঁজ করছে।
এবারে রিং হওয়ার সাথে সাথে রিসিভ হলো।অনাহিতা ঠোঁটের কোণের পানের রস মুছে ‘হ্যালো’ বলল।তখন ওপাশ থেকে বলল,”হ্যালো,অনাহিতা বলছো?”
-“হ্যাঁ।আপনি কে?সকালেও ফোন করেছন।”
-“আমি…আমি রেশমি বলছি অনাহিতা।”
অনাহিতা কিঞ্চিত চমকালো।এতদিন বাদে রেশমি?রুপমের মৃত্যুর খবরটা সবাই জানে।পুলিশ কয়েকদিন আগে জানিয়েছে রুপমের সাথে নদীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।রেশমি খুব দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।কিন্তু এই তথ্য পাওয়ার পর হুট করেই মেয়েটা আগের মতো কঠিন হয়ে যায়।অনাহিতা নিজ চোখে দেখেছে রুপমের প্রতি রেশমির তীব্র ঘৃণা।
অনাহিতা বাথরুমে গিয়ে পান ফেলে দিলে কুলি করে নিলো।তারপর আবার এসে মোবাইল হাতে নিয়ে বলল,”হ্যাঁ।বলো আপু?”
-“তুমি আমার সাথে দেখা করতে পারবে?আর্জেন্ট।”
-“কখন?”
-“বিকালে।”
অনাহিতা কিছু সময় ভাবলো।সে মাত্র সুস্থ হয়েছে।এর মধ্যে বের হতে দিবে কি’না সন্দেহ।তার ভাবনার মাঝেই রেশমি বলল,”ইম্পর্ট্যান্ট কথা ছিল কিছু।প্লিজ?”
অনাহিতা আর মানা করতে পারলো না।সে উত্তর দিলে,”ঠিক আছে।কোথায় আসবো?”
-“আমার বাসায়।আমি ঠিকানা মেসেজ করছি।আর সাথে করে প্রেমশাকেও আনবে দয়া করে।আর কাউকে আনবে না।ইট’স অ্যা রিকুয়েষ্ট।”
-“আচ্ছা আমি চেষ্টা করবো।”
-“ধন্যবাদ অনাহিতা।”
কল কেটে দিয়ে রেশমি আকাশের পানে তাকালো।এই দুনিয়ায় তার আপন বলতে কেউ রইলো না।আদৌ কী রুপম তার আপন ছিল?মনের ভেতর থেকে একজন উত্তর দিলো, ‘না তো!’।
রেশমির দুনিয়া সব সময় একা।তার গর্ভে থাকা সন্তান আর ইয়ামিনকে নিয়েই তার নতুন যাত্রা শুরু।এই যাত্রায় সফল তাকে হতেই হবে।নিজেকে সে আবারো সুযোগ দিবে।
অনাহিতাকে সে গোপন কিছু কথা শুনাবে।যা এই পৃথিবীর দ্বিতীয় কাকপক্ষীও জানে না।
(চলবে)
বি.দ্র:রি-চেক করিনি।ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন।