থার্টি ফার্স্ট নাইট পর্ব-১৭

0
612

@থার্টি ফার্স্ট নাইট
#পর্ব_১৭
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

বিকালে প্রেমশাকে নিয়ে অনাহিতা বেরিয়ে পড়লো।বাড়িতে বলা হয়েছে দু’জনে ঘুরতে যাচ্ছে।এক ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবে।রোমিলা বেগমও সাথে আসতে চাইছিলেন।কিন্তু অনাহিতা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মানিয়ে নিয়েছে।

রেশমির পাঠানো ঠিকানায় এসে সে কলিং বেল বাজালো।এই জায়গা প্রেমশা চিনতে পেরে বলল,”সুপার মাম্মা,আমরা এখানে কেন আসলাম?আমরা না ঘুরতে যাবো?”

অনাহিতা মৃদুস্বরে উত্তর দিলো,”এখান থেকে ঘুরতে যাবো।”
-“ওহ।”

দরজা খুলে দিলো রেশমি।তাকে দেখতে পেয়ে অনাহিতা কৃত্রিম হাসি হাসলো।মেয়েটা কেমন শুকিয়ে গেছে কয়েক মাসে।অনাহিতা জানে ভালোবাসার মানুষ হারানো কতটা বেদনার।তার চেয়েও বেদনার মানুষটা যখন নিজ ইচ্ছায় তৃতীয় কারো হয়ে যায়।দু’টো কষ্ট-ই অনাহিতা অনুভব করতে পারে।

রেশমি তাদের বসার ঘরের সোফায় বসতে বলল।প্রেমশা তার সুপার মাম্মার বাম হাতের আঙুল ধরে বসে আছে।একটু পর-ই চা-বিস্কুট নিয়ে রেশমি উপস্থিত হলো।তার পিছু পিছু আসছে ইয়ামিন ছেলেটা।

কথা শুরু করলো প্রথমে রেশমি।বলল,”প্রেমশার এক্সাম কেমন হয়েছে?”

প্রেমশা মুখটা থমথমে রেখেই উত্তর দিলো,”গুড।”

অনাহিতা বলল,”বাড়িতে আর কেউ নেই?”
-“মীরা ভাবি বাবার বাড়ি বেড়াতে গেল।বড়ো ভাই কয়েকদিন আগেই দেশ ছেড়েছে।”
-“ওহ।”

প্রেমশার উদ্দেশ্যে রেশমা বলল,”প্রেমশা?ইয়ামিনের সাথে খেলবে?”

প্রেমশা আড়চোখে দেখলো ইয়ামিন রিমোট কন্ট্রোল গাড়িটা নিয়ে খেলছে।এটা নিতে গেলেই ইয়ামিন কেঁদে উঠবে।তখন মাম্মা তাকে বকা দিবে।কিন্তু খেলনাটা হাতে নেওয়ার লোভটা সামলাতে পারছে না।

রেশমি উত্তর না পেয়ে আবার বলল,”ইয়ামিনের মতো সেম খেলনা রুমে আছে।যাও ওটা নিয়ে খেলো।”

প্রেমশার ওষ্ঠদ্বয় প্রশস্ত হলো।দৌড়ে সে মাম্মার রুমের দিকে এগোলো।সে জানে,তার মাম্মা কোন রুমে থাকে।

অনাহিতা বুঝতে পেরেছে রেশমি তাকে এমন কিছু বলবে যেটা প্রেমশাকে শুনাতে চায় না।হয়তোবা সেটা প্রেমশা শুনতে পারার মতো কথা না।সে ততক্ষণ অবধি অপেক্ষা করলো যতক্ষণ অবধি না রেশমি মুখ ফুটে কিছু বলে।

রেশমি মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিতে কিছু পলক সময় নিলো।তারপর বলল,”ইয়ামিনের জন্মের পর থেকে লক্ষ্য করি ও আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে।পালটে যাচ্ছে আমার প্রতি ওর ভালোবাসার রঙটা।সবকিছু ধূসর রঙ ধারণ করেছিল।আমিও তাঁকে মুখ ফোটে কিছু প্রশ্ন করি না।ভেবে ছিলাম ব্যবসার জন্য ব্যস্ত।আমি সাধারণ মেয়ের মতো স্বামী খারাপ হলে মানিয়ে নেওয়ার মতো মেয়ে না।আমার কাছে নিজের আত্ম-সম্মান,আমি’টা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।তবুও আমি মানিয়ে নিলাম।এক সময় সবটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।”

রেশমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো বলল,”এর মধ্যে আমি আস্তে-ধীরে খেয়াল করি নদীর সাথে রুপমের বন্ধুত্ব ছাড়া দ্বিতীয় কোনো সম্পর্ক আছে।আমি খোঁজ নেই সবকিছুর।একসময় আমি সিওর’ও হই যে আমার ধারণা সঠিক।কিন্তু এর মধ্যে আমি প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়।নিজে নিজে ভেবে নেই রুপম দ্বিতীয় বার বাবা হবে শুনলে হয়তোবা ঠিক হয়ে যাবে।”

শেষ কথায় সে তাচ্ছিল্যের সুরে হাসলো।বলল,”কিন্তু আমার পিঠ পেছনে খুব বাজে একটা ষড়যন্ত্র করে সে।আমার সহ্য সীমানা পার হয়ে গিয়েছিল।রুপম…রুপম,পরিকল্পনা করে,আমাকে অন্য একটা ছেলের সাথে জড়িয়ে সমাজের চোখে আমাকেই খারাপ বানাবে।কী সুন্দর!”

রেশমি তাচ্ছিল্যের সুরে বাঁকা হাসতে লাগলো।অনাহিতা জানতো রুপমের মৃতুর পরই রেশমি তাদের পরকিয়ার কথা জেনেছে।কিন্তু রেশমি তো আগে থেকে সবকিছু জানতো!

অনাহিতা মুখ ফোটে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না।রেশমি বলতে শুরু করলো,”পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাকে মাঝরাতে একটা ছেলে কল দিয়ে বিরক্ত করতে শুরু করে।আমি বাড়ি থেকে বের হলে আমার পিছু নিতো অচেনা ছেলেটা।একদিন আমি ছেলেটাকে থাপ্পড় দিয়ে সবটা জিজ্ঞেস করি।সবটা জেনে গেলে আমি রুপমকে বলে দিই ডিভোর্স দিবো।এত নোংরা একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মানে হয় না।কিন্তু নিজের সম্মানের জন্য রুপম আমাকে ডিভোর্স দিতেও রাজি না।”

সামনে থাকা পানির গ্লাসটা অনাহিতা এগিয়ে দিলো।রেশমি গলায় অল্প পানি ঢেলে আবারো বলল,”তোমাকে আমি এসব কেন বলছি জানি না।কিন্তু বলতে ইচ্ছে করছে।রুপম আমাকে ছেড়ে নদীর সাথে ওর ফ্ল্যাটে মাঝেমধ্যে যেতো।আর সহ্য করতে পারছিলাম না আমি।অসহ্য হয়ে উঠছিলো চারপাশ।রুপমকে অতিরিক্ত ভালোবাসি।ও দূরে গেলেও মরে যায়,কাছে আসলে ঘেন্নায় মুখ তুলে তাকাতে পারি না।বিষ হয়ে গেছিলো ও।”

অনাহিতা ঘামতে শুরু করলো।কপাল দেশটা বিন্দু বিন্দু নোনা পানিতে ভরে উঠেছে।রুপমের খুনটা কোনো ভাবে…?

-“নদী মেন্টালি সিক ছিল।ও হঠাৎ হঠাৎ খুব রেগে যেতো।আমি সেটাকে অস্ত্র করি।পুলিশ এখন সন্দেহ করছে রাগের মাথায় নদী করেছে রুপমকে খুন।তারপর নিজে আত্মহত্যা করেছে।কিন্তু ঘটনা সে রকম না।আদৌতে নদী রুপমকে খুন করলেও নদীর খুনটা তৃতীয় জনই করেছে।নদী খুন করেছে কারণ ও কে বিশ্বাস করানো হয় যে রুপম ওর সাথে চিট করছে।”

অস্ফুট স্বরে অনাহিতা বলল,”তৃতীয় জন কে?”
-“মীরা ভাবি!”

পলকে অনাহিতা যেন বজ্রপাতের শব্দ পেল।রেশমির সংসারে মীরা ভাবি?তিনি কেন?

রেশমি বলল,”নদী সম্পর্কে মীরা ভাবি কাজিন।আমাদের সম্পর্কে সবকিছু জানার পর ভাবি আমাকে বলে ‘চিন্তা করো না,পাপীরা শাস্তি পায়।’ব্যাস!ভাবিও শাস্তি দিলো।কিন্তু আদৌ ভাবি এর জন্য…।আমি অতোটা সাহসী নই যে কাউকে খুন করবো।আমি জানি তুমি কাউকে কিছু বলবে না।বললেও তোমার কাছে প্রমাণ নেই কিছুর।”

রেশমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।অনেক দিন পর মনটা হালকা হয়েছে।মীরা ভাবি কী সত্যি তার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে খুন করেছে?নাকি আরো রহস্য রেখেছে তিনি?নদীর সঙ্গে হয়তোবা উনার পূর্ব শত্রুতাও রয়েছে।কে জানে!

অনাহিতা মনে হঠাৎ করেই ভয়,কষ্ট দু’টো অনুভূতিই উদয় হলো।রেশমি তাকে এসব কেন বলল?

-“আমি ইয়ামিনকে নিয়ে আজ রাতেই চলে যাবো।তাই প্রেমশার সাথে শেষ দেখা।”

আচমকা রেশমি সোফা থেকে অনাহিতার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লো।অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে বলল,”প্রেমশাকে আমি খুব ভালোবাসি গো।তাও কেন জানি না,প্রেমশা আমাকে পছন্দ করে না।আমার এতে আর দুঃখ নেই।আমি জানি,তুমি ও কে খুব আদরে আগল রাখবে।মানুষের মতো মানুষ করবে।কিন্তু…কিন্তু তোমার সন্তান হলে আমার মেয়েটাকে অবহেলা করবে না তো?”

রেশমির হাত জোড়া ধরে অনাহিতা বলল,”আমার প্রথম সন্তান প্রেমশা।ওর জায়গা কেউ নিতে পারবে না।আমার বেঁচে থাকার কারণটাও পিচ্চি মা।”

রেশমি হাতের উলটো পিঠ দিয়ে অশ্রু মুছে বলল,”প্রেমশা বড়ো হলে হয়তো ভুলে যাবে মাম্মা বলে তার কেউ ছিল।এতে ওরই ভালো।আমি ওর ভালোই চাই।”
.

দু’পাতা পিন করা কাগজটা দেখে সূর্য ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,”এটা কী?ম্যারেঞ্জ পেপার নাকি?”

নিশি শীতল কণ্ঠে বলল,”প্রেম পেপার!”

এ কথা শোনে সূর্য আকাশ থেকে পড়লো।ম্যারেঞ্জ পেপার,জমি-জামার পেপার,ডিভোর্স পেপার শুনেছে সে।কিন্তু আজ প্রথম শুনলো ‘প্রেম পেপার’!

সূর্য বিস্ময় নিয়ে বলল,”কিহ?প্রেম পেপার কী জিনিস?”
-“কী লেখা আছে পড়ো।”

সূর্য কাগজের পাতায় চোখ বুলিয়ে পড়তে লাগলো।প্রথমে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা ‘প্রেম পেপার’।তারপর লেখা, “এই মর্মে জানানো যাচ্ছে যে,সূর্য আহমেদের সাথে নিশি নূর প্রেমের সম্পর্কে জড়িত।এমনকি তাদের বিয়ের কথাবার্তাও ফাইনাল হয়ে গেছে।১.সূর্য আহমেদ যদি নিজের কাজ(এক্টিং) ছাড়া অন্য সময় কোনো মেয়ের সাথে মিষ্টি কথা বলে, তাহলে নিশি নূরের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তার হাত-পা ভেঙে ফেলার।

২.ফেব্রুয়ারীর এক সপ্তাহ(৮ থেকে ১৪ তারিখ) ধারাবাহিক যে নাটক চলে এতে দু’জনের কেউ অংশ গ্রহণ করবে না।নিশি নূরের মতে এগুলো শুধুমাত্র সময়ের অপচয়।

৩.একজন রেগে গেলে দ্বিতীয় জনকে শান্ত থাকতে হবে।নিশি নূর যদি রাত ১টায় এসে ফুচকা খেতে চায়,তাহলে সূর্য আহমেদ বাধ্য তার প্রেমিকার আবদার পূরণ করতে।

৪.শুটিংয়ের অযুহাত দেখিয়ে বার বার সূর্য আহমেদ কোনো মেয়ের কাছে যেতে পারবে না।কিসিং সিন গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।নয়তো নিশি নূর তার ঠোঁট কেটে ফেলে দিতে পারবে।

৫.সবশেষে,হুট করে কেউ ব্রেক আপ বললে ব্রেক আপ হবে না।ব্রেক আপ করার জন্য দু’জনকেই সাক্ষীদের সম্মতি নিতে হবো।”

কাগজের লেখাগুলো পড়ে সূর্যের চোখ কপালে উঠে গেল।এই মেয়েটা তো ডেঞ্জারাস পাগল!

সাক্ষীর জায়গায় তিনজনের সাক্ষর।প্রথমে লেখা ‘প্রেমশা’।তারপর নিশি দু’টো ছেলে বন্ধুর।

নিশি কঠিন মুখ করে তাকে বলল,”সবকিছুতে রাজী থাকলে নিচে সাইন করে দাও।”

সূর্য তখনো ঘোরের মধ্যে আছে।নিশি তাকে ‘ভালোবাসি’ বলেছে বেশিদিন হয়নি।এর মধ্যেই যদি এত ডেঞ্জারাস শর্ত দেয়,তাহলে সামনের দিনগুলো তো…!

সূর্য মৃদুস্বরে বলল,”আর তুমি যদি কোনো ছেলের সাথে…”

তার কথা কেঁড়ে নিয়ে নিশি বলল,”আমি ছেলেদের সাথে খুব একটা মিশি না।যাদের সাক্ষর আছে ওখানে,ওদের সাথেই কথা হয়।”
-“বলছিলাম এগুলো কোন আইনে লেখা আছে?”
-“নিশির আইনে।বিয়ের,ডিভোর্সের পেপার থাকলে প্রেমের পেপার কেন থাকবে না?প্রেমের পেপারও থাকা উচিত।”
-“কে লিখেছে এগুলো?”
-“আগে সাইন করো।তারপর বলছি।”

বিড়বিড় করতে করতে সূর্য সাক্ষর করে দিলো।তারপর নিশি বলল,”আমার লেখা।”

মুখ ফসকে সূর্য বলে উঠলো,”এত কুৎসিত!”

নিশি এক পলক আড়চোখে তাকিয়ে কাগজটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো।তারপর বলল,”বুদ্ধিমতী মেয়েদের লেখা বিশ্রীই হয়।”
-“বাহ!কে বলেছে?”
-“আমি।আর কে বলবে?”
-“হুম,প্রমাণিত।”

নিশি তার দিকে তাকিয়ে বলল,”সন্ধ্যা হয়ে আসছে।আমাকে ড্রপ করে দাও।”

সূর্য গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল,”আমাদের বিয়ের পরও কী এই রুলস গুলো একই থাকবে?”
-“নাহ,তখন অন্য একটা হবে।”
-“কী লেখা থাকবে ঐটাই?”
-“লেখা থাকবে…কী লেখা যায় বলো তো?”

সূর্য নিশির দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকলো।নিশি হো হো করে হেসে উঠলো।হাসতে হাসতে বলল,”বিয়ের রুলস থাকবে, আমাকে একই রকম ভালোবাসতে হবে।সংসারের প্রতি মনোযোগী হতে হবে।”
-“তারপর?”
-“বিয়ের দিন বলবো।আচ্ছা শোনো,আমি এখন বাড়ি যাবো না।মা’কে একটা কল করে দেই।”

সূর্যকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিশি তার মা’কে কল দিয়ে বলে দিলো বাড়ি ফিরতে রাত হবে।

সূর্য হতভম্ব হয়ে রইলো।এই মেয়েটার মনে কখন কী চলে সেটা কেউ ধারণা করতে পারে না।

নিশি কল কেটে দিয়ে বলল,”চলো,স্ট্রিট ফুড খাবো আজকে।গাড়ি ঘুরাও।”

সূর্য হেসে গাড়ি ঘুরালো।এমন অনেক আবদারই নিশি করতে থাকে।বাইরে রাগ দেখালেও নিশির এই পাগলামি স্বভাবগুলোই তার ভালো লাগে।

(চলবে)