থার্টি ফার্স্ট নাইট পর্ব-১৯

0
658

@থার্টি ফার্স্ট নাইট
#পর্ব_১৯
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

নিশির ঘুম ভাঙতে ভাঙতে প্রায় ১১টা বেজে যায়।তাও ভেঙেছে মোবাইলের বিরক্তিকর মেসেজের শব্দে।সে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো।কী করে মনে করে মোবাইলটা আর নিলো না।

সূর্যের সাথে রাত্রিবিলাস করে বাড়ি ফিরিছে ভোরে।দেরি করে ঘুম থেকে উঠা তো মানন সয়।সে ফ্রেশ হয়ে নিচে গেলে রোমিলা বেগম তাকে দেখে বলল,”আসেন মহারাণী।প্রতিদিন ১২ টায় উঠা তো আপনার ফ্যাশন হয়ে গিয়েছে।আসেন আসেন,আপনারই অপেক্ষা হচ্ছিলো।”

নিশি মনে মনে এটারই ভয় পাচ্ছিলো।সে কিছুটা মৃদুস্বরে বলল,”এখন এগারোটা।এক ঘণ্টা বাড়ায় বলছো কেন?”

এ কথা শোনে রোমিলা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন।নিশির থেকে একটা বাক্যই যেন শোনার অপেক্ষা চলছিল।তিনি হাতে চামচ নিয়ে বললেন,”তুই আমাকে টাইম-টেবিল শেখাবি?প্রতিদিন এত দেরি করে ঘুম থেকে কেন উঠিস?রাতে কী চুরি করতে যাস?”

নিশি বিড়বিড় করে বলল,”নাহ,প্রেম করতে যাই।”

বুঝতে না পেরে রোমিলা বেগম বললেন,”কী বললি তুই?ফিসফিস করে বলছিস কেন?”

নিশি ড্রয়িংরুমে উপস্থিত থাকার সবার উপর নজর বুলিয়ে নিলো।আজকে বাড়ির সবাই উপস্থিত আছে।অভিনব খবরের কাগজ পড়ছে,প্রেমশাকে দুধে মেশানো বুন্দিয়া খাওয়াচ্ছে অনাহিতা।কামাল মিয়া কথা বলছে ইশিকার সাথে।রুমিকে দেখা যাচ্ছে না।হয়তো রান্নাঘরে।

রোমিলা বেগম উত্তর না পেয়ে আবারো বললেন,”বলছিস না কেন?আমি বুড়ো হয়ে গেছি দেখে এখন আর দাম দিচ্ছিস না,তাই তো?”

নিশি হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল,”মা,এমন করো না তো।ভোরে নামাজ পড়ে তারপর ঘুমিয়েছি।”

প্রেমশা মুখে বুন্দিয়া নিয়ে বলল,”উমম,ফুফি আসো।আমরা সব্বাই ঘুরতে যাবো।”

রোমিলা বেগম আরো কিছু বলতে চাইছিলেন কিন্তু মাঝে প্রেমশা বাধা দেওয়ায় বলতে পারলো না।

অনাহিতার পাশের চেয়ারে নিশি বসে বলল,”কোথায় ঘুরতে যাচ্ছি ভাবি?”

অনাহিতা উত্তর দিলো,”আজকে রাতেই আমরা সবাই সিলেট যাচ্ছি।তুমি খেয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নাও।”
-“হঠাৎ সিলেট কেন?”
-“প্রেমশার এক্সাম শেষ,তোমারও শেষ।এদিকে শীতকাল চলে যাচ্ছে।তাই আর কী।”
-“ওহ।আচ্ছা আমি কফি নিয়ে আসছি।”

নিশি চেয়ার ছেড়ে উঠার আগেই রুমি কফি নিয়ে উপস্থিত হলো।নিশি তাকে দেখে বলল,”খুব ভালো করেছিস নিয়ে আনলি।”

শোনতে পেয়ে রোমিলা বেগম আবারো বললেন,”হ্যাঁ,ভালো তো করবেই।তুই যত কাজ না করতে পারিস,ততই তো ভালো।”

নিশি প্রতিত্তোরে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলো না।সে অভিনবের উদ্দেশ্যে বলল,”ভাইয়া,আমরা সত্যি যাচ্ছি?”

অভিনব খবরের কাগজ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলল,”হ্যাঁ।তুই ব্যাগ গুছিয়ে নিস।নয়তো শপিংয়ে যাস।”
-“আচ্ছা, ঠিক আছে।ক’দিন থাকবো?”
-“সপ্তাহ খানিক।”
-“ওহ।”

নিশি এবারে অনাহিতার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,”ভাবি,আমার শপিং করা দরকার।তুমি যাবে?”

অনাহিতা বলল,”হ্যাঁ,তুমি নাস্তা করে নাও।দু’জনে বেরিয়ে পড়বো।”

প্রেমশার আশেপাশে মশা ঘুরঘুর করছিল।সে মশাকে মারার চেষ্টা করতে করতে বলল,”উফ,এই মশা অন্নেক খারাপ দাদু।”

রোমিলা বেগম বিপরীতে বললেন,”স্প্রে করেও মশা গেল না।”

প্রেমশা বিজ্ঞদের মতো বলল,”স্প্রে করলে যাবে না দাদু।মশার ঘর ভেঙে দিতে হবে।”

ইশিকা তার পাশের চেয়ারে বসে বলল,”মশার ঘর কী আবার?”

প্রেমশা দুঃখী ভাব নিয়ে কপালে হাত রেখে বলল,”তোমরা তো কিছুই জানো না।ঐ যে লাইট আছে না?লাইটে মশারা থাকে।লাইট ভেঙে দিলে মশাও চলে যাবে।”

তার কথা শোনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।সবার সাথে তাল মিলিয়ে প্রেমশাও হেসে ফেললো।
.

নিশি নিজের রুমে এসে দেখে মোবাইলটা একাধারে বেজেই চলছে।নাম্বারটা তার অচেনা।বাধ্য হয়ে সে কল রিসিভ করলো।বলল,”হ্যালো,কে আপনি?”

ওপাশ থেমে অজ্ঞাত ব্যক্তি নারী কণ্ঠে বলল,”আমি শ্রদ্ধা।”

নিশির ভ্রু জোড়া আপন শক্তিকে কুঁচকে গেল।শ্রদ্ধা নামের কাউকে তো সে চিনে না।সেই সূত্রেই নিশি প্রশ্ন করলো,”স্যরি,আমি তোমাকে চিনতে পারলাম না।”
-“শ্রদ্ধা হাসান সুনিদ্রা।এবার চিনতে পেরেছো?আমার নেক্সট মুভি সূর্যের সাথে রিলিজ হচ্ছে।”

পলকেই নিশি তাকে চিনে ফেললো।এই হিরোইন তাকে কেন কল করলো?মনের কথা অনুযায়ী নিশি প্রশ্ন করলো,”হ্যাঁ,চিনতে পেরেছি।কিন্তু তুমি আমাকে কেন কল করছো?”

ওপাশের ব্যক্তি এমন বাক্যে সন্তুষ্ট হলো না।সে আশা করেছিল নিশি তার নাম শোনা মাত্র খুশিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বলবে ‘ও মাই গড,ম্যাম আপনি আমাকে কল করেছেন?আপনি জানেন আমি আপনার কত বড়ো ফ্যান?আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না আপনি…’ইত্যাদি,ইত্যাদি।কিন্তু মেয়েটা সরকারি বলছে ‘কেন কল করেছ?’!সূর্যের বউ অবশ্য তার মতোই তো হবে।তাছাড়া শ্রদ্ধা শুনেছে মেয়েটা আগে নাটকে কাজ করেছিল।ভাব তো থাকবেই।

কোনো উত্তর না পেয়ে নিশি আবারো বলল,”হ্যালো?শুনতে পাচ্ছো?”
-“তুমিই তো নিশি?ওরফে সূর্যের গার্লফ্রেন্ড।সামনেই তো তোমাদের বিয়ে।”
-“হ্যাঁ,আমার সাথে তোমার লেনদেন?”
-“লেনদেন তো আছেই।কারণ তুমি তো আমারই রিজেক্ট করা ছেলেকে বিয়ে করছো।”
-“হুয়াট ডু ইউ মিন?”
-“মিন করছি এটাই যে সূর্যের সাথে আমার এনগেজড হয়েছিল।পরে ওর চরিত্র দেখে আমি সেটা ভেঙে দেই।”

এ কথা শুনে নিশির মুখ হা হয়ে গেল।সূর্য তার থেকে কিছুই লুকিয়ে রাখেনি।তাহলে এসব কী?নিজের বিস্ময় সামলে নিয়ে নিশি বলল,”মাথা ঠিক আছে মিস.শ্রদ্ধা?দু’জন এক্টারের এনগেজড হলো অথচ কেউ কিছু জানতো না?”
-“কারণ এনগেজড ফ্যামেলিভাবে হয়েছিল।”
-“আমি তোমার কথা কেন ট্রাস্ট করবো?”
-“প্রুফ দিয়েছি তোমাকে।হোয়াটসঅ্যাপ চেক করো।ফর ইউর গুড লাক,আমি তোমাকে সবটা বলছি।বাকিটা এজ ইউর উইশ।বেস্ট অফ লাক!”

কল কেটে গেলে নিশি হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো।আশ্চর্য হয়ে নিশি দেখলো সূর্যের সাথে প্রায় তিন-চারটা মেয়ের অশ্লীল কিছু ছবি।ধপ করে সে বিছানায় বসে পড়লো।কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো শ্রদ্ধার সাথে এনগেজডেরও দু’টো ছবি।অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে আবিস্কার করলো ছবিগুলো ইডিট করা নয়।
.

অভিনব তার মায়ের রুমে ঠোকা দিলো।রোমিলা বেগম তাকে আসার অনুমতি দিলে সে ভেতরে ঢুকলো।তিনি প্রথমেই প্রশ্ন করলেন,”সূর্যের সাথে কথা হয়েছে?”

অভিনব পাশের চেয়ারে বসে বলল,”হ্যাঁ,মা।আজকে রাতে না-কি ও ব্যস্ত।থার্টি ফার্স্ট নাইটের পার্টি আছে ওদের।উলটা আমাদের নিমন্ত্রণ করলো।”

রোমিলা বেগম বললেন,”আমরা যাবো না বলিসনি?”
-“বলেছি।ও আমাদের সাথে যেতে পারবে না।”
-“তাহলে আমরা আমরাই গেলাম।বাড়ি থেকে কয় টায় বের হবো?”
-“সাত টার দিকে আর কী।”
-“অনাহিতা আর নিশি কী শপিংমলে গেল?”
-“অনাহিতা তৈরি হচ্ছে।নিশি বলল যাবে না।”
-“কেন?”
-“ওর নাকি মাথা ধরেছে।অনাহিতাকে বলল ওর শপিং করতে।”
-“মেয়েটার আবার কী হলো?আচ্ছা তোরা যা।দেরি করিস না।”
-“হুম।তুমি যাবে না-কি?”
-“না।”

অনাহিতা,অভিনব এবং প্রেমশা বেরিয়ে গেলে রোমিলা বেগম মেয়ের রুমে আসলেন।নিশি কখনোই কথার নড়চড় করে না।এমন করার কারণ নিশ্চয়ই আছে।

তিনি মেয়ের রুমে ঢুকে দেখলেন পুরো রুমটা অন্ধকার।নিশির নাম ধরে তিনি দু’বার ডাকলেন।কিন্তু কোনো সাড়া শব্দ এলো না।তিনি অন্ধকার কাটাতে বাল্ব জ্বালাতে গেলে চেনা কণ্ঠস্বর বলে উঠলো,”লাইট দিয়ো না মা।”

কণ্ঠ অনুসরণ করে তিনি খাটের শেষ কোণায় গিয়ে বসলেন।জানালা দিয়ে আসা মৃদু আলোতে তিনি নিশিকে দেখতে পেয়ে বললেন,”কী হয়েছে তোর?এভাবে আছিস কেন?”

নিশি আগের মতোই শীতল কণ্ঠে উত্তর দিলো,”এমনি মা।কিছু না।”

রোমিলা বেগম জানেন তাঁর মেয়ের মন খারাপ হলেই সে অন্ধকারে ডুবে থাকে।কারো সাথে যোগাযোগ করে না।তিনি আন্দাজ করে বললেন,”সূর্যের সাথে কিছু হয়েছে?”

নিশি চুপ হয়ে রইলো।তার মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা স্থির নেই।এই মনে হচ্ছে সূর্য তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না।মুহুর্তে চোখের পাতায় ছবিগুলো ভেসে উঠলে তার প্রতি তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি হচ্ছে।

রোমিলা বেগম নিশির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,”বল কী হয়েছে?”

নিশি মনে হয় এই স্পর্শের অপেক্ষায় ছিল।হুড়মুড়িয়ে সে মায়ের কোলে শুয়ে পড়লো।তারপর বাঁধ ভাঙ্গা নদীর মতো হু হু করে কেঁদে উঠলো।রোমিলা বেগমের অন্তর্দেশ কেঁপে উঠে।নিশি কাঁদে খুব কম।বছরে একবার কাঁদেও কি’না সন্দেহ।আর মেয়ের কান্না সহ্য করার মতো রোমিলা বেগমের নেই।

তিনি কিছ সময় অপেক্ষা করলেন।নিশি এক এক করে সবটা বলল।সব শোনে রোমিলা বেগম বললেন,”কী হয়েছে তোর?প্রেমের পড়ে সব বুদ্ধি কী লোপ পেয়ে গেছে?”

নিশি কোনো উত্তর দিলো না।তিনি আবারো বললেন,”তুই শ্রদ্ধাকে চিনিস কত দিন?”

মৃদুস্বরে উত্তর আসলো,”আমি কেন চিনবো?”
-“তাহলে তুই অজানা একটা মেয়ের কথা বিশ্বাস করে নিলি?তুই তো জানিস সূর্য কেমন।”
-“ছবিগুলো তো ইডিট না।”
-“ইডিট না হলে নিশ্চয়ই অন্য কিছু আছে।শ্রদ্ধাই যে তাদের এনগেজড ভেঙেছে এটা প্রুফ কী?সূর্যই হয়তোবা ভেঙেছে।আবার হয়তো এনগেজডই হয়নি।”

নিশি তার মায়ের কোল থেকে উঠে বসলো।শেষ কথাগুলো নিশির মাথায় ঢুকলো।সে চুপ করেই রইলো।বুদ্ধি দিয়ে না ভেবে,আবেগ দিয়ে ভাবাটা অন্যায়।

রোমিলা বেগম বললেন,”তুই সূর্যের সাথে কথা বলেছিস?”
-“নাহ।”
-“কল রিসিভ করিসনি।তাই না?”
-“হু।”
-“আগে তুই সূর্যের সাথে সরাসরি কথা বল।ওর বক্তব্য শোন।তারপর ডিসিশন নিস।রুম বন্ধ করে কাঁদতে চাইলেও কাঁদিস।”

নিশি চোখের জল মুছে নিলো।মনে এবার একটু আধটু সাহস এসেছে।তার মাথায় হাত বুলিয়ে রোমিলা বেগম বললেন,”দেখ নিশি,আমি জানি তুই যেমন প্রেমশার জন্য সঠিক মানুষকে মা করেছিস তেমনি তোর জন্যও কোনো ভুল মানুষকে পছন্দ করবি না।তোর উপর আমার এটুকু বিশ্বাস আছে।তাই তোর এক কথায় আমি সূর্যের সাথে বিয়ে ঠিক করেছি।তুই সবসময় বুদ্ধি দিয়ে ভাবিস।নিজেকে একটু সময় দে,সবটার উত্তর পেয়ে যাবি।”

নিশি তার মায়ের হাত ধরে বলল,”মা,অনাহিতাকে তোমার পুরোপুরি পছন্দ?”
-“পুরোপুরি কী আছে আবার?ও অনেক ভালো মেয়ে।”
-“তোমার মনে আছে,একবার বলেছিলাম অনাহিতার কোনো অতীত জানলে…?”
-“অতীত বর্তমানে না আসলে হলো।”
-“বাহ, মা।তোমারও তাহলে বুদ্ধি হচ্ছে।শোনো,অনাহিতা অতীতে কোনো খারাপ কাজ করেনি।ওর সাথে একটা ছেলের সম্পর্ক ছিল।ছেলেটা ওর ট্রাস্ট ভেঙেছে।”
-“তুই কী করে জানলি?”
-“সব খবর নিয়েছি।এটাও জানি যে ওর ভাই এখন যেই মেয়ের পেছনে দৌড়াচ্ছে আজ ঐ মেয়ের বিয়ে।”
-“কার সাথে?”
-“একটা ডক্টরের সাথে।”
-“তোকে গোয়েন্দা বানালে বেশি ভালো হতো।”
-“ধ্যুর,আমরা কখন বেরুবো?”
-“সাত টায়।তুই সূর্যের সাথে কথা বল।”
-“এখন না। রাতেই বলবো।”
-“তোর ইচ্ছে।”

রোমিলা বেগম উঠে গিয়ে লাইট জ্বালালেন।তারপর নিজে কথা বলতে বলতে মেয়ের ব্যাগ গুছিয়ে দিলেন।

(চলবে)