থার্টি ফার্স্ট নাইট পর্ব-২১ এবং শেষ পর্ব

0
1026

@থার্টি ফার্স্ট নাইট
#পর্ব_২১(অন্তিম পর্ব)
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

অনাহিতা চারপাশটা বেলুন দিয়ে সাজিয়ে ফেলেছে।বলতে গেলে কেবিনটা পুরোপুরি সাজানো হয়েছে।সে বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে আসা কেকে চকলেট,ক্রিম দিয়ে ডেকোরেশন করছে।তা দেখে প্রেমশা বলল,”সুপার মাম্মা বেস্ট।”

অনাহিতা তার দিকে উড়ো চুমু পাঠিয়ে বলল,”লাভ ইউ।”

একইভাবে প্রেমশাও তাকে চুমু দিলো।অভিনব এক কোণে বসে আছে।তার কোনো কাজই নেই।কিন্তু অনাহিতা তাকে নিয়ে মজা করবে ভেবে সে নড়তেও পারছে না।অলস ভঙ্গিতে সে ইশিকাকে বলল,”কয়টা বাজে দেখো তো?”

শুনতে পেয়ে অনাহিতা বলল,”নিজে কী কাজ করছেন?হাত ঘড়িটা কী সৌন্দর্য রক্ষার্থে পড়েছেন?”
-“না,হুট করে ঘড়িটা স্থির হয়ে গেছে।”

তার কথা শোনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।ইশিকা মোবাইল দেখে বলল,”এগারোটা বত্রিশ।”

অনাহিতার কাজ শেষ হলে কামাল মিয়ার উদ্দেশ্যে সে প্রশ্ন করলো,”নিশি কী করছে?”
-“আফাই তো বইয়া রইছে।কার লগে জানি কথা কয় ফোনে।”
-“ইশিকা,তুমি জিনিসগুলো গোছগাছ করে নাও।আমি গিয়ে দেখে আসছি।”

প্রেমশা বলল,”আমি যাবো সুপার মাম্মা।”
-“আসো।”

অভিনবের মুখটা চুপসে গেল।তা দেখে অনাহিতা বলল,”আপনিও আসেন।”

অনুমতি পেয়ে সে তাদের পিছু পিছু বেরিয়ে গেল।সুখী পরিবারখানা দেখে ইশিকা বলে উঠলো,”হত গম না ইতেঁরা?(কত ভালো না ওঁরা?)”

কামাল মিয়া বসে বলল,”হ।আঁরার মতো!”(আমাদের মতো!)

ইশিকা বলল,”হুহ্,সিলেট এত্তুন ঘুরি আঁয় বিয়ে গরিবান।”(হুহ,সিলেট থেকে ঘুরে এসে বিয়ে করবেন।)
.

শেখ আহমেদ বাড়িতে প্রবেশ করলেন অগ্নি মূর্তি হয়ে।উঁচু স্বরে বেশ কয়েকবার তিনি স্ত্রীর নাম ধরে ডাকলেন।শুনতে পেয়ে ইসমি আক্তার বেগম দৌড়ে এসে উপস্থিত হলেন।

ক্রোধ স্বরেই তিনি বললেন,”তোমার ছেলে কোথায়?তোমার ছেলের নামে মামলা করেছে।”

এ কথা শোনে ইসমি আক্তার হতভম্ব হয়ে গেলেন।আমিন কী এমন কাজ করলো?তারমানে সে জেলে?

তিনি প্রশ্ন করলেন,” বলো কী!কোথায় ও এখন? কে করলো?”

চেয়ারে বসে পড়ে শেখ আহমেদ বললেন,”পালিয়ে গেছে।বউ নিয়ে পালিয়েছে।চরিত্র খারাপ মেয়ে একটা।”

ইসমি আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বললেন,”কার কথা বলছেন?আমিন কোথায়?ঠিক আছে?”

এক পলক তাকিয়ে তার স্বামী বলল,”খুশি নামের মেয়েটাকে নিয়ে তোমার ছেলে পালিয়ে গেছে।মেয়েটার অন্য একজনের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।তারা এখন মামলা করেছে তোমার ছেলের নামে।”

ছেলের এমন দশা শুনে ইসমি আক্তারের ক্রন্দন বেড়ে গেল।হাজার হোক,ছেলেই তো!যদি পুলিশের হাতে পড়ে তাহলে তো…!

তিনি এসব ভেবে অস্থির কণ্ঠে বললেন,”আমিনের খোঁজ পেয়েছে?পুলিশের হাতে পড়েছে?”
-“নাহ,কেউ খুঁজে পায়নি।”
-“সব আপনার জন্য।ছেলেটাকে প্রশয় দিয়ে দিয়ে আপনি মাথায় তুলেছেন।”
-“ইসমি…!”
-“একদম ধমকাবেন না।আগেই বলেছিলাম মেয়েটা ঠিক না।তবুও ছেলেকে উস্কালেন।আমার ছেলের কিছু হলে আপনাকে আমি ছেড়ে দিবো না।”
-“অনাহিতার মা,মুখ সামলে কথা বলো।বেশি বলছো।”

ইসমি বেগম স্থান ত্যাগ করলেন।আজ সত্যি সত্যি মুখের উপর কথা বলতে পেরেছেন।তিনি ফোন খুঁজে আমিনের নাম্বারে কল দিলো।কিন্তু ওপাশ থেকে নারী কণ্ঠ বন্ধ বলছে।এবার তিনি সত্যিই চিন্তায় ডুব দিলেন।ছেলেটা উধাও হয়ে গেল?

.
মীরা ধীর কণ্ঠে বলল,”তোমার শরীর ঠিক আছে?”

রেশমি নিজের গর্ভে হাত রেখে বলল,”হ্যাঁ,ভাবি।তুমি কেমন আছো?”
-“এই তো চলছে।”
-“পুলিশ কিছু বলেছে?কোনো…”
-“আমি এখনো বাবার বাড়িতেই।তবে পুলিশ এখনো চুপচাপই আছেন।”
-“যাক তাহলে।”
-“হুম।ইয়ামিন কী করছে?”
-“ঘুমিয়ে পড়েছে।তুমি সাবধানে থেকো।”

স্মিথ হেসো মীরা বলল,”তুমি কী আমার জন্য ভয় পাচ্ছো বোন?”

রেশমি নিরুত্তর হয়ে রইলো।ভয় পাবেই না বা কেন?মীরাকে সে নিজের বড়ো বোন মানে!

মীরা বলল,”আমার কিছু হবে না।”

রেশমি হঠাৎ সন্দিহান কণ্ঠে বলল,”ভাবি,তোমার ভাইয়ের আত্মহত্যার কারণটা কী…কারণটা কী কোনোভাবে নদী ছিল?”

মীরা এতেও হাসলো।সে জানতো রেশমি ঠিকই বের করবে।মেয়েটা সত্যি বুদ্ধিমতী।রুপম কেন মেয়েটাকে ছেড়ে দিলো?

রেশমি উত্তর না পেয়ে বলল,”আমি কী ঠিক ভাবি?”
-“পরের বার এমন কথা আর বলবে না।রাখছি এখন,নিজের খেয়াল রেখো।”
-“ভাবি?”
-“বলো।”
-“প্রেমশা,প্রেমশার খোঁজ নিয়েছিলে?”
-“হ্যাঁ,ওরা সবাই সিলেট যাচ্ছে।”
-“ওহ।”
-“বাচ্চাটাকে এত মিস করলে তাকে সাথে নিলে গেলেও পারতে।কেস করলে তুমিই তো পেতে।”
-“না ভাবি,প্রেমশা এখন ভালো আছে।আমার সুখের চেয়েও আমার মেয়ের সুখ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
-“হুম।নিজের খেয়াল রাখবে কিন্তু।”
-“হ্যাঁ।”

রেশমি কেঁদে উঠলো।নিজের ভাগ্যের উপরই সে বারে বার আফসোস করে।রুপমের দেওয়া ব্যথা,প্রেমশাকে দূরে রাখার ব্যথা সব মিলে যেন বিষাক্ত হয়ে উঠে চারপাশ।মনে হচ্ছে পৃথিবীতে তার আর জায়গা নেই।কিন্তু তাঁকে বাঁচতে হবে।পৃথিবীতে জায়গা করে নিতে হবে।কোনো কিছুই এমনি এমনি আসে না,সেটা অর্জন করে নিতে হয়।
.

অনাহিতা তার মায়ের সাথে কথা বলে চিন্তায় পড়ে গেল। আমিন কোথায় যেতে পারে?ছেলেটা এত রাগী!

অনাহিতা কিছু একটার খোঁজে ট্রেনে হাঁটাহাটি করছিল।তখনি নজরে পড়লো আমিনকে।সে দ্রুত তার ভাইয়ের কাছে গেল।

তাকে দেখে আমিন বিচলিত হয়ে পড়লো।সামনে কেরোসিন ফেলে দেওয়ার জন্য একটা লোককে সে ঝাড়ি দিচ্ছিলো।অনাহিতাকে দেখে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল,”আরে তুই?ট্রেনে কী করিস?”

অনাহিতা দেখলো পাশের সিটেই খুশি বসে আছে।তার সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করলো না অনাহিতা।সে মোবাইল নিয়ে কল করে আমিনের সামনেই বলল,”মা,ভইয়া ট্রেনে।সিলেট যাচ্ছে।ঠিক আছে।”

ওপাশ থেকে বলা কথা আমিন শুনলো না।বিয়ের পর আজই প্রথম সে অনাহিতাকে দেখছে।বেশ স্বাস্থ্যবতী হয়েছে।ভালো লাগছে দেখতে!

অনাহিতা বলল,”ভাইয়া,এভাবে তুলে আনাটা…”
-“তোর থেকে কিছু শুনতে চাইছি না।আমি ভালোই করেছি।”

অনাহিতা বুঝতে পারলো এখন কোনো কথায় কাজ হবে না।সে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই আমিন বলল,”তুই এখানে?”

অনাহিতা বুকে আড়াআড়িভাবে দু’হাত রেখে বলল,”স্বামী সংসার নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছি।”
-“লজ্জা করে না তোর?অন্যে…”
-“সবটা জেনেও বিয়ে তো তুমিই দিয়েছো।আবার তুমিই এসব বলছো?”
-“ফালতু কথা বলিস না।আমি মোটেও এসব জানতাম না।”
-“তাহলে…”
-“অনি, তুই জানিস আমি মিথ্যা বলি না।হ্যাঁ,তোর বরের খোঁজ নেইনি কিন্তু…”
-“থ্যাংক গড যে তুমি খোঁজ খবর নাওনি।আমি খুব খুব ভালো আছি এখন।”

আর কিছু না বলে অনাহিতা উলটো দিকে ফিরলো।তবে সে জানে তার ভাই রাগী হতে পারে কিন্তু মিথ্যা কথা বলে না।অবশ্য রাগী মানুষরা মিথ্যা বলেই কম।

তার মানে রোমিলা বেগম মিথ্যা বলেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এ তার কিছু আসে যায় না।কিন্তু উত্তর জানার জন্য মনটা খচখচ করছে।জন্মদিন পালনের পর রোমিলা বেগমকে জিজ্ঞেস করা যায়।

উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলে রোমিলা বেগম এমনটা করার কারণ হবে প্রেমশার খুশি।এটা তার নিজের ভাবনা।
.

নিশি তার মা’কে বলল,”ছবিগুলো একটা অ্যাডের জন্য তুলে ছিল মা।কয়েকটা মেয়ের সাথে।শ্রদ্ধা আমাকে ওগুলোই দেখিয়েছে।”

রোমিলা বেগম বললেন,”বলেছিলাম তোকে আমি।”

নিশি মোবাইলের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,”হুহ্।মা,আজকে ৩০ তারিখ?কাল না ৩০ তারিখ গেল?”

রোমিলা বেগম ঠোঁট চেপে হাসলেন।নিশির ফোনের ডেট’টা তিনিই এলোমেলো করেছেন।এমনিতেও সূর্যের টেনশনে সে সবটাই ভুলে গিয়েছিল।নিশিকে তিনি বললেন,”কই?আজকে ৩০ তারিখ।”
-“সিওর তুমি?”
-“হুম।”
-“ওহ।আমারই ভুল মনে হয়।”

রোমিলা বেগমের পাশে বসে প্রেমশা জানালার বাইরে চোখ রেখেছিল।সে তার ফুফিকে বলল,”ফুফি,দেখো দেখো,গাছ দৌড়াচ্ছে।”

নিশি মৃদু হেসে বলল,”গাছ দৌড়াচ্ছে না,আমরা দৌড়াচ্ছি।”

ভাবুক হয়ে প্রেমশা বলল,”কই?আমি তো বসেই আছি।তাই না দাদু?”

নিশি তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলে রোমিলা বেগম বললেন,”আহা,বাচ্চা মানুষ যা বুঝার বুঝে নিক।বড়ো হলে ঠিকই শুধরে নিবে।”

প্রেমশা বুঝে না বুঝে খিলখিল করে হাসলো।ট্রেন জার্নি তার অনেক ভালো লাগছে।মনে মনে ঠিক করে নিয়ে স্কুল যাওয়ার সময়ও ট্রেনে করে যাবে।সেই অনুযায়ী সে দাদুকে বলল,”দাদু,আমি স্কুলেও ট্রেনে করে যাবো।ওক্কে?”
-“স্কুলে ট্রেনে করে যেতে পারে না।”
-“কেন দাদু?”
-“দূরে কোথাও গেলে তখন ট্রেন নিতে হয়।এখন দূরে যাচ্ছি তাই।”
-“ওওও।তাহলে প্রতিবার থার্টি ফার্স্ট নাইটে আমরা ট্রেনে করে ঘুরতে যাবো।ওক্কে?”

রোমিলা বেগম হেসে বললেন,”ওক্কে।”

সে আবারো ট্রেনের বাইরের শহর দেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো।রোমিলা বেগম মোবাইলে তাকিয়ে দেখলেন সময় ১১:৫৫।ট্রেনের অর্ধেক মানুষ এখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

এর মাঝে অনাহিতা-অভিনব আসলো।অনাহিতা নিশির উদ্দেশ্যে বলল,”নিশি,কেবিনে চলো।”

এমন কথায় নিশি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।এতক্ষণ ধরে যেতে চেয়েছিল,কিন্তু যেতে দেয়নি।আর এখন?

সে অভিমান করে বলল,”নাহ,যাবো না।”

অভিনব কোনো কথা না শুনে তার চোখ চেপে ধরলো জোর করে কেবিনে নিয়ে গেল।ঠিক বারোটা বাজতেই তার চোখ খুলে দিলো অভিনব।ওমনি তার মাথার উপর ফুলের পাপড়ি পড়তে লাগলো।

নিশি অবাক হয়ে চারপাশ দেখতে লাগলো।একদম বাড়ির মতো করে সাজিয়েছে।এক পাশে আর্ট করে রাখা ‘Happy Birthday Nishi’।

খুশিতে নিশি বলে উঠলো,”ওয়াও!তোমরা এত কিছু প্ল্যান করেছো?কী সুন্দর!”

তৈরি করে রাখা কেকটা কাটা হলো।একটা সুখি পরিবার বুঝি এমনই হয়।ছোটো থেকে বড়ো আনন্দগুলো সবাই মিলে পালন করা।সব সমস্যা পেছনে রেখে দাঁত কেলিয়ে হাসা।সবার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে।এমন একটা পরিবারের অংশ হতে পেরে অনাহিতা তৃপ্তির হাসি হাসলো।

.
এক কোণে খুশি আরামের সাথে ঘুমিয়ে আছে।আমিন বিড়বিড় করে লোকটাকে গালাগাল করছে।কেরোসিন ফেলে দিয়ে কী না করলো!অনেক দূর অবধি কেরোসিন গড়িয়ে চলে গেছে।

সে কয়েক সেকেন্ড খুশির দিকে তাকালো।এই মেয়েটার উপর তার চরম ঘৃণা হচ্ছে।এর জন্য অনাহিতার বরের খোঁজ খবর না নিয়ে কোনো মতে বিয়ে দিয়েছে।আর এই মেয়েটা?ইচ্ছে করছে কয়েকটা চড় লাগাতে।

আমিন দরজার সামনে দাড়িয়ে সিগারেট ধরাতে চাইলে তার পাশে একটা লোক এসে দাঁড়ালো।লোকটাকে সে কোথাও যেন দেখেছে।অনুমানেই সে বলল,”আপনাকে চেনা চেনা লাগছে।”

লোকটি বলল,”আমারে?আমি কী নায়ক নাকি আমারে চিনবেন?হা হা হা!”
-“আপনি কী দারওয়ান?”
-“হ ভাই,কামাল মিয়া নাম।”
-“ওহ।অভিনবের…”
-“হ,ভাইজানের বাসায় থাকি,দারওয়ানি করি।এহন ঘুরতে যাচ্ছি।”

আমিন কিছু বললো না।নিজের মতো করে সে সিগারেট জ্বালালো।কামাল মিয়া দেশলাইকাঠি দিয়ে সিগারেট জ্বালিয়ে জলন্ত কাঠিটা ভুলক্রমে উলটোদিকে ট্রেনের ভেতরেই ফেললো।
.

প্রেমশা আবারো জেদ ধরেছে ড্রেস পালটাবে।তাকে বকা-ঝকা করে রোমিলা বেগম বাথরুমে নিয়ে গিয়েছেন।ততক্ষণে অনাহিতা,অভিনব,ইশিকা গভীর ঘুমে হারিয়ে গিয়েছে।

নিশি কেবিন থেকে বের হয়ে সূর্যের সাথে কথা বলছে।কেবিনের দরজা খুলাই আছে।সে ফোনের ওপাশে থাকা সূর্যের উদ্দেশ্যে বলল,”আই ক্যান নট বিলিভ দ্যাট ওরা এত বড়ো সারপ্রাইজ প্ল্যান করলো।আ’ম রিয়্যালি হ্যাপি।”

সূর্য বলল,”হ্যাঁ,আমি জানলে তোমাদের সাথেই থাকতাম।আমাকে ভাইয়া বলেছে শুধু ঘুরতে যাচ্ছো।তুমিও কোনোদিন তোমার বার্থডে ডেট বলোনি।”
-“আমার জন্য নিজের খুশি নষ্ট করার দরকার নেই।তোমাদের পার্টি শেষ?”
-“এখনো চলছে।আমি রুমে চলে এলাম।”
-“মেয়েদের সাথে ডান্স করেছো নিশ্চয়ই?”
-“না মানে,একটু…”
-“আমি জানতাম তুমি এমনটাই করবে।দেখা হোক একবার…”

বলতে বলতে কালো ধোঁয়া তার মুখে ঢুকতেই কেশে উঠলো।নিশি তখনও নিজে কথা বলতেই ব্যস্ত।সূর্য ওপাশ থেকে বলল,”নিশি শোনো?”

নিশি আবারো কেশে কোনো মতে বলল,”হু?”

আবেগ মাখা কণ্ঠে সূর্য বলল,”অতিরিক্ত ভালোবাসি তোমাকে।তোমাকে আলিঙ্গন করার পূর্ণ অধিকার নিয়ে আমার মৃত্যু হোক।এর আগে যেন নয়!”

নিশি কিছু বলার সুযোগ পেলো না।এর মাঝের ট্রেনের যাত্রীদের কান্নাকাটির শব্দ পাওয়া গেল।একে একে সব মানুষের ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে।সূর্য উত্তর না পেয়ে বলল,”হ্যালো,হ্যালো?নিশি?”

নিশির চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল একটু দূরের আগুন দেখে।কথা বলতে ভুলে গেল সে।অস্ফুটস্বরে কাঁদো কাঁদো করে বলে উঠলো,”মা,মা,ভাইয়া?”

কিন্তু শত মানুষের আর্তনাদে তার কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে গেল।কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো অনাহিতা।সামনের দৃশ্য দেখে তার গলা শুকিয়ে এলো।এ কেমন দৃশ্য!ঘুম ভেঙে গেল অভিনব এবং ইশিকার।ট্রেনের গতি কমে গেল।কিন্তু আগুনের গতি কমলো না।হঠাৎ যেন দৌড়ে এসে স্পর্শ করলো সুখি পরিবারটাকে।

.
রোমিলা বেগম প্রেমশাকে নিয়ে দরজার পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন।কিন্তু তার গায়ের উপর পাইপের মতো লম্বা কিছু একটা পড়ায় টাল সামলাতে না পেরে তিনি প্রেমশাকে নিয়ে ট্রেন থেকে পড়ে গেলেন।চোখের সামনে দেখলেন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।জ্বলছে স্থির থাকা ট্রেনটা।অস্ফুটস্বরে তিনি নিশির নাম ধরে ডাকলেন।আচমকা বুকে ব্যথা অনুভব হওয়ায় তিনি বাঁ পাশে হাত রাখলেন।২-৩ সেকেন্ডের ব্যবধানে তিনি চারপাশ ঝাপসা দেখলেন।একসময় তাঁর কাছে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো।লোকজন চারপাশ থেকে জড়ো হয়ে গেছে।

প্রেমশা তার দাদুর শরীর ধরে ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে।কাঁদতে কাঁদতে বলছে,”দাদু,দাদু উঠো না।সুপার মাম্মা!মাম্মা,বাব্বা!”

থেমে থেমে সে কেঁদেই যাচ্ছে।আর বলছে,”বাব্বা,বাব্বা,দাদু কথা বলছে না।ফুফি,ফুফি আমার ভয় করছে।ইশু আপ্পু…সুপার মাম্মা…মাম্মা।”

ছোটো ছয় বছরের বাচ্চার আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল হাজারো মানুষের আর্তনাদে।কারো কর্ণ অবধি পৌঁছাচ্ছে না তার ডাক।কিন্তু অবুঝ প্রেমশা তো অবুঝ।সে জানে না তার পরিবার ডাক শুনছে না!তবুও সে ট্রেনে উঠার চেষ্টা করলো।কিন্তু যখন পারলো না,তখন সে কাঁদতে কাঁদতে চারপাশে হাঁটতে লাগলো।

.
আমিন আধো আধো দৃষ্টিতে চারপাশের নিহত,আহত লাশগুলোর দিকে তাকালো।একটু দূরে স্থির থাকা খুশির দেহটা পড়ে আছে।সে হাত বাড়িয়ে খুশির পোড়া দেহটাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করছে।কিন্তু সে ব্যর্থ!ব্যর্থ আজ ট্রেনে অবস্থিত হাজারো পরিবার।সবাই একটা বাক্যই কামনা করছে।তা হলো ‘রক্ষা করো আমাদের’।আজকের মতো যেন বেঁচে যায়।কিন্তু…কিন্তু মৃত্যু কী নিয়ন্ত্রণ দিয়ে আসে?দূর্ঘটনা কী আগে থেকে সিগন্যাল দেয়?

নিশি এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে হাত থেকে ছিটকে পড়ে থাকা মোবাইলটার দিকে।সূর্যের ইচ্ছেটা পূরণ হলো না।নিশি তাকে অধিকার নিয়ে আলিঙ্গন করার পূর্বের মৃত্যু তার দরজায় কড়া নেড়েছে।হবে না জুতো হাতে নিয়ো রাত্রি বিলাস না।সূর্যকে কারণে-অকারণে শাস্তি দেওয়ার পর্বও এখানে সমাপ্তি।নিশি কেঁদে উঠলো।দূরেই ভাইয়া,ভাবি,ইশিকা,কামাল মিয়া পড়ে আছে।মা আর প্রেমশাকে দেখা যাচ্ছে না কেন?কোথায় আছে ওরা?কতটুকু ভালো আছে?

একবার শেষ দেখা হলেও পাগল দু’টোকে দেখতে চায় সে।মা মানুষটাও তো পাগলই!নিশি মনে মনে চিৎকার করে বলল,”মা,ও মা,কোথায় তুমি?তোমাদের দেখবো আমি।মা!”

এত ছোটো কেন হলো জীবনটা?

.
অভিনব পড়ে আছে অনাহিতার গায়ের উপর।চাইলেও সে নড়তে পারছে না।পুরো শরীর যে জ্বালা করছে!সে শুধু চোখ মেলে দেখে, ইশিকার কাছাকাছি এসে কামাল মিয়া কেঁদে কেঁদে বলছে,”ইশু রে,আঁরা বিয়ে গইরগম।উঠ না,সংসার অইবো না আঁরার?ইশিকা,কী অইলো ইন?”(ইশু রে,আমরা বিয়ে করবো।উঠ না,সংসার হবে না আমাদের?ইশিকা,কী হলো এগুলা?”

বলতে বলতে সে ইশিকার দেহটাকে জড়িয়ে ধরলো।অভিনব শুধু হাসলো।ভালোবাসার মানুষটা চলে যাওয়ার কষ্ট এত ধারালো কেন?সে অনাহিতার দিকে তাকালো।বুঝায় যাচ্ছে না এটা তারই স্ত্রী।কয়েক মাস…মাত্র কয়েকমাস আগে সবুজ শাড়িতে বউ হয়ে এসেছিল।বিয়ের শপিংয়ে নাকি অনাহিতা বলেছিল সে সবুজ শাড়ি পরবে।পরেছে তো ঠিকই!

অভিনব তাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরলো।এত আবেগ নিয়ে তার স্ত্রীকে কোনোদিন জড়িয়ে ধরেনি।শেষ সময়টা কেন কেড়ে নিলো আল্লাহ?তার চোখ থেকে অনাবরত জল গড়িয়ে পড়ছে।তার মেয়েটা কোথায়?ভালো আছে?

আচমকা তাদের গায়ের উপর ভারি লোহার কিছু একটা পড়লো।অভিনবের মুখ থেকে রক্ত বের হয়ে এলো।হুট করে অনাহিতা শ্বাস নিতে শুরু করলো।সে বুঝতে পারলো উঠার শক্তি তার মধ্যে নেই।চোখ বুলালো চারপাশে শুধু সে!

তখন নজরে আবদ্ধ কালি মাখা চাঁদের মতো গোল মুখ খানা।তার মেয়েটা কাঁদছে।কাঁদলেও কী সুন্দর লাগে প্রেমশাকে!

অনাহিতা ধীর কণ্ঠে শুনতে পাচ্ছে,”সুপা..প মাম্মা,মাম্মা!আমি তোমার সাথে যাবো।বাব্বা,বাব্বা… ”

অনাহিতা হাসছে,কারণ তার মেয়েটা তো ভালো আছে!মেয়েটা ভালো আছে!আবারো তার ট্রেনে উঠা হবে।থার্টি ফার্স্ট নাইট তার জীবনে আবারো আসবে!
অনাহিতার তার মা’কে মনে পড়ছে।খুব মনে পড়ছে!
.

নিয়ম করে পাখিরা ভোর হতেই কিচিরমিচির শব্দ শুরু করলো।কিন্তু মানুষের হৃদয় কাঁপানো শব্দ বাণীতে সব কিছুই আজ থেমে গেছে।সারি করে বিছানো হয়েছে শত লাশ।আবার আহত মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।

রোমিলা বেগমের পাশে বসে প্রেমশা কেঁদে চলছে।সে তার সুপার মাম্মা,বাব্বা,ফুফিকে এখনো খুঁজে পায়নি।সাদা পোশাক পরা একটা লোক রোমিলা বেগমকে নিয়ে যেতে চাইলে প্রেমশা কেঁদে কেঁদে বলে উঠলো,”নো আঙ্কেল,আঙ্কেল দাদুকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?দাদু কথা বলছে না কেন?”

লোকটা বলল,”কথা বলবে বাচ্চা।হাসপাতালে নিয়ে গেলে কথা বলবে।”
-“কেন?দাদু কথা বলবে।দাদু…আঙ্কেল,সুপার মাম্মা কোথায়?তাঁকেও হাসপাতালে নিয়ে গেছো?”

লোকটা তার মাথায় হাত রেখে বলল,”কে তোমার সুপার মাম্মা?”
-“সুপার মাম্মা,বাব্বা।মাম্মা সুন্দর,পুতুল!”

লোকটা তার হাত ধরে বলল,”চলো,দেখবে।”

প্রেমশা লোকটার হাত ধরেই সারি করে রাখা লাশগুলো সামনে গেল।সবার চেহেরা দেখা যাচ্ছে।একটার পর একটা দেখে সে হুট করে কেঁদে উঠলো।অনাহিতার লাশ ধরে বলল,”সুপার মাম্মা,মাম্মা উঠো না।দাদু কথা বলছে না।মাম্মা…”

কিছুদূর গিয়েই সে সবার লাশ চিনতে পারলো।একে একে সবাইকে ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলো,”বাব্বা,ফুফি উঠো না।আমরা সিলেট যাবো।হিরো আসবে।ইশু আপ্পু,তোমার আমার বিয়ের হবে না?সুপার মাম্মা,কথা বলছো না কেন?আমি পাস্তা প্রতি…প্রতিদিন খাবো।তুমি কথা বলো,আমি স্কুলে যাবো।তোমার সব কথা শুনবো।মাম্মা…”

পরক্ষণে তার পাশে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,”আঙ্কেল?আঙ্কেল,মাম্মা-বাব্বা কথা বলছে না কেন?সুপার মাম্মাকে পোকা ধরেছে?দে…দেখো না,ফুফিও কথা বলছে না।ও ফুফি…!”

লোকটার চোখে জল নেমে এলো।কতক্ষণ সহ্য করা যায় একটা বাচ্চার আর্তনাদ?

প্রেমশার পাশে এসে বসলো চেনা একটি মুখ।তাকে দেখতে পেয়ে প্রেমশা গলা জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,”মাম্মা,মাম্মা দেখো না,ওরা কথা বলছে না।তুমি বাব্বাকে বলো না,আমি কোনোদিন…”

হেঁচকি তুলে সে আবারো বলল,”কোনোদিন ডিস্টার্ব করবো না।গুড গার্ল হয়ে থাকবো।ফুফিকে বলো,আমি হোমওয়ার্ক করবো।ও মাম্মা,বলো না সুপার মা…মাম্মাকে কথা বলতে।”

রেশমি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো।এত কান্না তার রুপমের মৃত্যুর সময়ও পায়নি।দূর্ঘটনার ঘটনা শোনে সে ঢাকা থেকে রাতেই রওনা দিয়েছে।ভাগ্যিস ততদিনেও ঢাকার বাইরে যায়নি!

সূর্য কোত্থেকে উড়ে এসে নিশির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।প্রেমশা তাকে দেখে দৌড়ে তার কাছে গেল।সূর্যের উদ্দেশ্যে বলল,”ওদের কী হয়েছে?কেউ কথা বলছে না।সুপার মাম্মা,ফুফি!হিরো, তুমি ফুফিকে বলো না কথা বলতে।তুমি বললে বলবে।”

সূর্য নির্বাক শ্রোতা!সে দেখছে তার কল্পনার রাণী চোখ বন্ধ করে আছে।অন্য সময় তাকে খুব সুন্দর লাগে!কিন্তু এখন…এখন ভয়ংকর লাগছে!এত কুৎসিত দৃশ্য সে তার জীবনে দেখেনি।এটা কোনো দুঃস্বপ্ন হতে পারে না?পারে না নিশি আবার উঠলো!তার পাশে বসে বলল,”আমার তো কিছু হয়নি পাগল!”

ইসমি বেগম ছেলে-মেয়ের লাশ দেখে জ্ঞান হারাচ্ছেন।সন্তানের লাশ দেখা কোন বাবা-মা সইতে পারে?কার এত ক্ষমতা?তিনি তো দুই সন্তানের এক সাথে দেখছেন!এতটা দুর্ভাগা হতে হলো?এতটা!সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনা মায়ের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে না?

সবাই প্রেমশার দিকে তাকিয়ে আছে এক ধ্যানে।কত ছোট একটা মেয়ে…অথচ তার কাঁধে কত কষ্টের বোঝা!সে একদিন বড়ো হবে,অনেক বড়ো হবে।কিন্তু মস্তিষ্কে অভিশাপ হয়ে থেকে যাবে ট্রেনযাত্রা!মনে ঘৃণার জন্ম নিবে ‘থার্টি ফার্স্ট নাই’ দিনটি।ভু্লতে পারবে না এই নির্মম সত্য,না পারবে না!

মিলিয়ে যাবে তার ওষ্ঠজোড়ায় লেগে থাকা হাসি।তার হাসির কারণ তো,কারণ তো কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল।প্রশ্নের ঝুড়িটাও খালি হয়ে যাবে।কারণ তার উত্তর দেওয়ার মানুষগুলো তো নেই!

পরিশিষ্ট:দূর্ঘটনা!এমন একটা দূর্ঘটনায় হারিয়ে যায় লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো।কারো সমাপ্তি তো কারো অসমাপ্তি!একটা দিন,মাত্র একটা মুহুর্তে কেড়ে নিলো কয়েক শত পরিবার।ভেনিস করে দিলো এমন হাজারো পরিবারের গল্প।সবাই ভুলে যায় দিনটি,মুহুর্তটি!কিন্তু সেই বেঁচে যাওয়া একজন,একজন মনে রাখে মনে দাগ কাটা দিনটি।ইট’স থার্টি ফার্স্ট নাইট!

(সমাপ্ত)