@থার্টি_ফার্স্ট_নাইট
#পর্ব_০৪
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু
নিশি ঠোঁট চেপে হেঁসেই যাচ্ছে।এই গরমেও সূর্য আহমেদ মাথায় ক্যাপ পরে আছে যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে।নিশি হাসি আটকানো জন্য বিভিন্ন ভঙ্গিতে ঠোঁট নাড়াচ্ছে,দৃষ্টি এদিক ওদিক ফেলছে।
সূর্য আহমেদ স্মিথ হেঁসে বলল,”তা রেস্টুরেন্টে কেন আসা হলো হঠাৎ?”
এহেন প্রশ্নে নিশি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো।সে জানতো এই প্রশ্নের সম্মুখীন তাকে হতেই হবে।কিছুটা ভাব নিয়ে বলল,”বান্ধবীর সাথে ঘুরতে বেরিয়ে ছিলাম।তারপর আপনার কথা মনে পড়ায়,ভাবলাম দেখাটা করেই যাই।”
বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে সূর্য বললো,”যাক,নিশি রাণীর মনে আমার নাম এসেছে বলে;এ জীবন ধন্য!”
নিশি আবারো ঠোঁট নাড়তে লাগতো।এটা মূলত তার হাসি আটকানোর নিজস্ব টেকনিক।মেসেঞ্জারে চ্যাট করার সময় যখন মা’য়ের সামনে হাসি পায়,তখন সে এই টেকনিকটায় কাজে লাগায়।যাক,আজ এটা কাজে লাগছে।
সূর্য আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,”বলো,কী খাবে?”
-“কিছু খাওয়ার মন,ইচ্ছে কোনোটাই নেই।”
-“বাট এসেছি যখন কিছু তো খেতে হবে।”
-“সো,ইট’স কফি অর পেস্ট্রি।”
-“ওকে,ওয়েটার…”
নিজেকে যতটা সম্ভব আড়াল করে সূর্য আহমেদ ওয়েটারকে অর্ডার দিলো।তারপর নিশির উদ্দেশ্যে বললো,”প্রেমশা কেমন আছে?”
নিশি মনে মনে বললো,”মি.সেলিব্রিটি,আমি কেমন আছি সেটা জিজ্ঞেস করতে পারছেন না?”।কিন্তু মুখে বললো,”টু গুড।”
-“তারপর,তুমি মিডিয়া জগতে আবার জয়েন করছো কখন?”
নিশি মনে মনে বিরক্তি নিয়ে বললো,”ছিঃ,এমন প্রশ্ন করার জন্য ডেট করছি আমরা?চুলে যে বেলিফুল বাঁধলাম, শাড়ি পরলাম এসব নজরে পড়ছে না?”
ঠোঁট নেড়ে সূর্যের প্রশ্নের উত্তর দিলো,”নতুন বছর থেকে।”
-“কিন্তু নতুন বছর আসতে তো আরো চার কী পাঁচ মাস আছে।”
এর মাঝে ওয়েটার এসে অর্ডারকৃত খাবার দিয়ে গেল।নিশি পেস্ট্রি মুখে দিয়ে বললো,”এখন আপাতত কোনো কাজ করছি না।”
ক্ষণকাল বাদে সূর্য মৃদুস্বরে বলল,”শাড়িতে না-কি পূর্ণ নারী?কথাটা যেন বরাবরই সত্য মনে হচ্ছে।”
নিশি হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,”তারমানে আমি শাড়ি না পরলে পূর্ণ না?সুন্দর দেখায় না?”
ভাবশূন্যের ভান করে সূর্য উত্তর দিলো,”তেমনটা না।বাট ইউ লুক নাউ বিউটিফুল মোর দ্যান অ্যানেদার ড্রেস।”
কফিতে চুমুক দিয়ে নিশি নিজের হাসি আড়াল করলো।মনে মনে একটায় চাইছে, সূর্য যেন তার ঝুটিতে আবদ্ধ বেলিফুল নজরে রাখে।তার রিয়েকশন কী হবে দেখে?হার্ট অ্যাটাক করবে?নাকি ধরে নিবে,নিশিও তার প্রতি ইন্টারেস্টেড?
.
রাত আটটার দিকে প্রেমশা নিজের স্কুল খাতা নিয়ে বসলো।অনাহিতা তার পাশে বসে বললো,”হোমওয়ার্ক হয়েছে?”
প্রেমশা মুখ গোমড়া করে বললো,”নো,বাব্বা করে দিবে।”
-“কিন্তু বাবা তো কাজ করছে।”
-“বাব্বার ওয়ার্ক ফিনিশ হলে, হোমওয়ার্ক করে দিবে।”
-“সুপার মাম্মা করে দিবে হোমওয়ার্ক?”
প্রেমশা থুতনিতে কলম ঠেকিয়ে কিছু সেকেন্ড ভাবলো।তারপর আড়চোখে তাকিয়ে বললো,”বাব্বার মতো পারবে তো?”
অনাহিতা স্মিথ হেঁসে প্রেমশার খাতা-কলম নিয়ে বললো,”তোমার বাবা চেয়ে সুপার পারবো।স্কুলে ফার্স্ট গার্ল ছিলাম।হুহ্!”
প্রেমশা দাঁত দেখিয়ে হাসলো।অনাহিতা বললো,”নোট খাতা দাও।আর এই ওয়ার্ডগুলো দেখ…”
দুই মা-মেয়ে হোমওয়ার্ক করায় মন দিলো।মাঝে দু’জনে খিলখিল করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠছে।আবার কখনো মা,মেয়েকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে একজন শিক্ষিকার মতো।আচ্ছা,সৎ অর্থ তো ভালো।তাহলে সৎমা শব্দটির অর্থ সবাই ‘খারাপ মা’ কেন ভাবে?অর্থ তো হওয়া উচিৎ ‘ভালো মা’।
হয়ত কর্ম এমনটা বলেই ‘খারাপ মা’ সিল বসে গেছে।ক’জন হতে পারে ‘অনাহিতা’?একটা বাচ্চাকে তারা কী বাচ্চা ভাবতে পারে না?পারে না ‘সে আমার সতিনের নই,আমার স্বামীর সন্তান’ বলে মনে জয়গা করে দিতে?বাচ্চাদের এক চিমটি ভালোবেসে দেখো,তারা প্রকৃতির মতো তোমাকে এক সমুদ্র ভালোবাসা ফিরিয়ে দিবে।
.
রাতে খাবারের পর্ব শেষ করার পর ইসমি বেগম মুখ ভার করে রইলেন।খাবার টেবিলে তিনি যে দুই লোকমা ভাত ছাড়া আর কিছু খাননি সেটা তার বর-ছেলের কারো নজরে আবদ্ধ হয়নি।
এই সময় অনাহিতা থাকলে কত কী করতো!চকলেট,আইসক্রিম নিয়ে উনার মন ভালো করার চেষ্টা করতো।কিন্তু এখন উনার মেয়ে অন্য কারো স্ত্রী হয়ে গিয়েছে।তার অন্য মা হয়েছে।
এদিক ওদিক তাকিয়ে তিনি স্বামীর উদ্দেশ্যে বললেন,”অনাহিতাকে আরেকবার কল করে দেখেন না।”
শেখ আহমেদ বড্ড জেদি মানুষ।তিনি সবসময় নিজের জেদকে মূল্য দেন।এখন তিনি জেদ ধরেছেন অনাহিতা যতক্ষণ না নিজ থেকে কল করছে তিনি নিজ কথা বলবেন না।মেয়েটা দিন দিন বেশি বেয়াদব হচ্ছে।
তিনি স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন,”ওর সাথে আমি কথা বলছি না।তুমি কল করো…”
ইসমি আক্তার চুপ করে রইলেন।তার ফোনে ব্যালেন্স নেই দেখে তিনি স্বামীকে বললেন।না-হয় গাছ স্বরুপ এই কঠিন মানুষটার সাথে কথার বলার মানে হয় না।
তিনি উঠে চলে গেলেন।আজ রাতে অশ্রু বিসর্জনের সাক্ষী হবে বালিশ আর বিছানা।
.
ইশিকা পানের থালা নিয়ে বসেছে।এ বাড়িতে নিত্যদিনের একটা নিয়ম হলো খাবার পর্ব শেষ করে পানের পর্ব শুরু হবে।পান খায় রোমিলা বেগম,ইশিকা আর কাজের মেয়ে রুমি।
টিভিতে ‘সন্ধ্যাময় উপসংহার’ নামে একটা নাটক চলছে।দেখা যায় নাটকে নায়িকা, নায়কের সাথে যোগাযোগ করতে না পেয়ে বাথরুমে বসে কাঁদছে।
একই সাথে কাঁদছে রোমিলা বেগম আর রুমি।মাঝেমধ্যে রোমিলা বেগম ‘আহারে,ইশ,কত কান্না’ ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করছে।ইশিকা পান নিয়ে আসলে তিনি বললেন,”আমাকে পান তিনটা দিস।’
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ইশিকা বললো,”ঠিক আছে খালা।”
রোমিলা বেগম শাড়ির আঁচলে নাকের পানি মুছে বলল,”কত কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা।আহারে…”
উনার সাথে তাল মিলিয়ে রুমি বলল,”ঠিক কইছেন খালা,মাইয়াডা আসলেই কছ্টে(কষ্ট) আছে।”
টিভিতে দৃষ্টি স্থির রেখে ইশিকা পান বানিয়ে রোমিলা বেগমের হাতে দিলো।রোমিলা বেগমও টিভিতে চোখ রেখে পান মুখে ভরে দিলো।
অনাহিতার দিকে পান এগিয়ে দিয়ে ইশিকা বলল,”ভাবিজান,খাবেননি পান?”
অনাহিতা মাথা নেড়ে না উত্তর দিলো।সোফার এক পাশে অভিনব ল্যাপটপে কাজ করছে, অন্যপাশে অনাহিতা বসেছে।মাঝখানের জায়গা দখল করেছে প্রেমশা।তার হাতে পপকর্ণের বাটি।মাঝে মধ্যে অনাহিতাও সে বাটি থেকে পপকর্ণ তুলে নিচ্ছে।
পান মুখে দেওয়ার একটু পর রোমিলা বেগম বললেন,”ইশু,জর্দা দিয়েছিস না-কি তুই?ইশ,নায়কটাকে কীভাবে মারছে!”
টিভির দিকে তাকিয়ে আনমনে ইশিকা উত্তর দিলো,”হু।”
রোমিলা বেগম রেগেমেগে বললেন,”মানে?তুই জর্দা দিয়েছিস?”
ইশিকার হুস এলো।সে তাড়াহুড়ো করে বললো,”না না খালা,আমি তো নাটকের কথা বলছি।”
রোমিলা বেগমের মুখের ভেতরটা ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগলো।মনে হচ্ছে মুখের ভেতর কেউ রান্নার মশলা ঢুকিয়ে নাড়ছে।উনি কিন্তু মুখ খুলে হা করলেন।
ইশিকা মিথ্যা কথা বলেছে।সে পানে জর্দা দিয়েছে।তার মতে নুন ছাড়া তরকারি খাওয়া আর জর্দা ছাড়া পান খাওয়া একই ব্যাপার।কিন্তু রোমিলা বেগম জর্দা খেতে চায় না।
রুমি ইশিকার উদ্দেশ্য বললো,”আম্রে একটা দে তো পান,ইছিকা।”
তেলে পানি পড়ার মতো শব্দে গলা ঝেড়ে ইশিকা বললো,”তোমারে ক্যান দিমু?আমি বাগানে একটু সাহায্য করতে কইছিলাম,করছিলা?হুহ্।”
অপমানে রুমির মুখটা থমথমে হয়ে গেল।মনে মনে ইশিকাকে অভিশাপ দিলো রাতে ঘুমানোর সময় ইশিকার বিছানায় যেন তেলাপোকা উঠে।
মোবাইলের দিকে তাকিয়ে নিশি মিটিমিটি হাসছে।একটা সংবাদ চ্যানেলে খবর ছাপানো হয়েছে,”সূর্য আহমেদকে নদীর ধারে একটা মেয়ের সাথে দেখা গিয়েছে।তাদের কথাবার্তার ভঙ্গিমা প্রেম-প্রণয় স্বরুপ।তবে কী মেয়েটি সূর্য আহমেদের গার্লফ্রেন্ড?”
পাশে দুই তিনটা ছবিও আছে।নিশির চেহেরা দেখা যাচ্ছে না কারণ সে অতিরিক্ত রোদ ছিল বলে শাড়ির আঁচল ঘোমটা দিয়ে রেখেছিল।সূর্য আহমেদও ভালোভাবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না,কিন্তু বুঝা যায় মানুষটি কে!এসব খবর দেখে সূর্য একটু আগে মেসেজ করেছে,”ধ্যুর,পরের বার থেকে কালি মেখে দেখা করবো।”এই মেসেজ পড়েই নিশি হেসে খুন।
প্রেমশা অনেকক্ষণ ধরে তার দাদি,রুমির কান্না দেখলো।তারপর বিরক্ত হয়ে পপকর্ণে বাটি অভিনবের কোলে রাখলো।তখনি আঙ্গুলের চাপ পড়ে অভিনবের মাত্র রেডি করা ফাইলটা ডিলিট হয়ে গেল।
রেগেমেগে অভিনব ধমক দিয়ে বললো,”প্রেমশা,কী করলে এটা তুমি?”
এত জোরে ধমক দিলো যে প্রেমশা কেঁদে ফেলল।অনাহিতা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।রোমিলা বেগম ছেলেকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।অভিনবের রাগ অত্যাধিক বেশি।
অভিনব ল্যাপটপ নিয়ে উঠে চলে যেতে লাগলে প্রেমশা বলে উঠলো,”আ’ম স্যরি বাব্বা।”কিন্তু তার কথা এড়িয়ে অভিনব চলে গেল।অনাহিতা অল্পক্ষণ প্রেমশাকে জড়িয়ে ধরে তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো।বাকিরা তাদের কর্মে মনোযোগী হলো।
নিশি কিছুক্ষণ অনাহিতা-প্রেমশার দিকে তাকিয়ে রুমে চলে গেল।প্রেমশাকে কত সুন্দর করেই না অনাহিতা সামাল দিচ্ছে!
কিছুক্ষণ পর প্রেমশা কান্না থামালো।অনাহিতা তার বাম হাতের পাঁচটি আঙ্গুল দেখিয়ে বললো,”এটা ভাত খায়,এটা সাপ খায়,এটা ফল খায়,এটা মাছ খায়ৃআর এটা?এটা প্রেমশাকে কাতুকুতু দিতে যায়, কাতুকুতু দিতে যায়।”বলেই সে প্রেমশাকে কাতুকুতু দিতে লাগলো।প্রেমশাও খিলখিল করে হাসছে।
প্রেমশা মোটামোটি স্বাভাবিক হলে অনাহিতা বলে,”বাবাকে কী জিজ্ঞেস করতে চেয়ে ছিলে?”
-“ওও,মানুষ কাঁদলে নাকও কেন কাঁদে?নাক দিয়ে কেন পানি বের হয়?”
অনাহিতা তাকে আলতো জড়িয়ে ধরে বললো,”কারণ,আমাদের একটা চোখে ছোট্ট একটা ছিদ্র থাকে।এই যে নিচে,এই ছিদ্র দিয়ে চোখের জল নাকে নেমে আসে।”
-“আমার আছে কি-না দেখ তো,দেখ দেখ…”
.
মাঝরাতে ধড়ফড়িয়ে উঠলো রেশমি।পাশের গ্লাসে থাকা জল এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেললো।বেশ ভয়ংকর একটা স্বপ্ন দেখেছে।এসির পাওয়ার সে কিছুটা বাড়িয়ে দিলো।
পাশ ফিরে সে ঘুমানো চেষ্টা করলে দেখলো বিছানায় রুপম নেই।শুধু সে আর তার ছেলেটি আছে।রুপম কোথায় গেল?
সে বাথরুম থেকে শুরু করে পুরো ঘর খুঁজলো।কিন্তু রুপমের দেখা নেই।রেশমি স্বামীর মোবাইল আর মানিব্যাগ খুঁজলো।কিন্তু সে জিনিস দুটোও নেই।
শেষমেশ নিজের ফোন থেকে রুপমের নাম্বারে ডায়াল করলো।দুই তিন বার কল পড়ে কেটে গেল।পলকে মেসেজ এলো, ” Now,I am busy.i will call you later.”
মেসেজটা দেখে রেশমি স্বস্তি ফেলো।যাক,তাহলে রুপম ঠিক আছে!রুপমের অপেক্ষা প্রহর গুনতে গুনতে সে চা বানাতে গেল।মধ্যরাতে চায়ের স্বাদ ভিন্ন হয়!
(চলবে)
বি.দ্র:গল্পের উল্লিখিত ‘সন্ধ্যাময় উপসংহার’ নামে কোনো নাটক নেই। রি-চেক করিনি।ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন!