@থার্টি ফার্স্ট নাইট
#পর্ব_০৫
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু
অভিনব বেলকনি থেকে রুমে ঢুকে দেখলো বিছানায় অনাহিতার গলা জড়িয়ে প্রেমশা আর সে উভয় ঘুমিয়ে আছে।সে এগিয়ে গিয়ে প্রেমশার কপালে চুমু খেলো।
মেয়েটাকে সে বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসে।ব্যবসা সামলাতে গিয়ে প্রেমশার প্রতি সে দিন দিন অবহেলা দেখাচ্ছে।বাচ্চাদের ছোটবেলাটা মা’ময় হতে হয়।৬ বছরের পরে, বাচ্চারা হাজারো প্রশ্ন করে।নিজের কাজ নিজে করতে চায়,পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখায়।
অনাহিতাকে সে দেখে ছিল সেদিন,যেদিন প্রেমশার সাথে স্কুলে দেখেছিল।এর আগেও তার মা-বোনের কাছ থেকে অনাহিতা সম্পর্কে শুনেছিল।সে দেখেছিল কত যত্নে তার মেয়ে অনাহিতা আগলে রেখেছিল,হেঁসে হেঁসে কত গল্প করছিল।প্রেমশার চোখে-মুখে ছিল হাজারো আনন্দের মেলা।
সেদিন বাড়ি ফিরে প্রেমশা তাকে বলে,”বাব্বা,সুপার গার্লকে আমাদের সাথে রাখতে পারি না?সুপার গার্ল অন্নেক ভালো।”
মেয়ের খুশি জন্য অভিনব শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে রাজী হয়।কিন্তু কে জানতো…অনাহিতাকে তারা কোনোকিছু না জানিয়ে অজ্ঞাতে বিয়ের আসরের বসাবে!
কী আশ্চর্য!অনাহিতার বাড়ির লোকজনের কোনো খবর নেই।তারা কী সবকিছু জানতো?না-কি বিয়ে হয়ে গেছে বলে ভাগ্যকে মেনে নিচ্ছে?
অভিনব দূরে সরে দাঁড়ালো।ডিম লাইটের আবছা আলোয় অনাহিতার মুখের রঙ নীলচে লাগছে।সে লক্ষ্য করে দেখলো,অনাহিতার মুখমণ্ডল গোল,চোখ জোড়া আকারে একটু বড়।কপালের ডান পাশে বড়সড় একটা তিল।
দৃষ্টি সরিয়ে নিলো অভিনব।এতক্ষণ ধরে অনাহিতার মুখখানায় সে রেশমির চেহারা খুঁজলো।তিল চিহ্ন ছাড়া বাকি আর কোনো কিছুই তার সাথে মিলে না।এভাবে বর্তমান স্ত্রীর চেহারায় প্রাক্তনের মিল খুঁজা পাপ।ঘোর পাপ!
.
রেশমি একে একে তিন কাপ চা শেষ করে ফেলল।সময় এখন ১:০৩।রুপমের আসার নাম গন্ধ সে দেখছে না।বাড়ির মূল দরজা খুলে সে বারান্দায় বসে আছে।
আরো এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু আলসেমিটা বেড়ে চলেছে।উঠে যেতে ইচ্ছে করছে না।বাধ্য হয়ে সে দরজায় হেলান দিয়ে গেটের দিকে তাকিয়ে রইলো।রুপম কখন আসবে?
-“রেশমি?তুমি এখানে কী করছো?”
আচমকা পেছন থেকে কারো কণ্ঠস্বর শুনে রেশমি ধড়ফড়িয়ে উঠলো।সে পেছন ফিরে দেখলো, তার ভাসুরের বউ দাঁড়িয়ে আছে।বুকে থুথু দিয়ে সে বলল,”ভাবি?ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
বিরক্তিতে মীরা ভ্রু কুঁচকে ফেলল।কারণে-অকারণে ভ্রু কুঁচকে ফেলা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।তিনি বললেন,”এত রাতে এখানে বসে আছো কেন?সমস্যা হয়েছে কোনো?”
রেশমি ভেবে ফেলো না মীরাকে সঠিক তথ্য বলবে কি’না।বললে হয়তো হাজারো প্রশ্ন করবে,আবার না বললেও দোষারোপ করবে।
রেশমি আমতা আমতা করে বলল,”ওও ভাবি,রুপম বাইরে গেল।তাই…”
-“রুপম বাইরে গেল মানে?রাত ১টায় বাইরে কী?”
-“তা তো জানি না।ও বললো এক্ষুণি আসছে।”
-“কী আজিব!রাত-বিরেতে একজন বাইরে গেল,অন্যজন অপেক্ষা করছে।”
রেশমি কথা ঘুরাতে মীরাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন করলো,”তুমি কী করছো?”
-“বাবুর পেট ব্যথা শুরু হয়েছে।তাই গরম পানি করতে আসছিলাম।”
-“ওহ।পানি গরম করেছ?”
-“হ্যাঁ,চুলোয় বসিয়েছি।আচ্ছা,আমি দেখে আসছি।”
মীরা চলে গেলে রেশমি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।ফোন নিয়ে রুপমের উদ্দেশ্যে আবারো ডায়াল করলো।তখন ওপাশ থেকে বার বার লাইন কেটে আসছে।
মিনিট কয়েকের মধ্যে কালো রঙের গাড়িটা উঠোনে এসে থামলো।রেশমির চোখে লেগে থাকা আধো ঘুম গাড়ির শব্দে ছুটে গেল।তাড়াতাড়ি সে উঠে দাড়ালো।
রুপম এগিয়ে এসে বললো,”তুমি এখনো বসে আছো?অস্থিরতার স্বরে রেশমি উলটো প্রশ্ন করলো,”তুমি মাঝ রাতে গিয়েছিলে কোথায়?সমস্যা হয়েছে কোনো?”
বাড়িতে ঢুকে রুপম উত্তর দিলো,”অফিসে সমস্যা হয়েছিল।”
-“কী সমস্যা?”
-“তুমি বুঝবে না।চলো ঘুমুতে যায়…”
রুপমের কাছাকাছি যেতে রেশমি অন্য রকম একটা গন্ধ পেলো।এই গন্ধ অজ্ঞাত কারো হবে।এর আগে গন্ধটা পেয়েছিল রুপমের টি-শার্টে।আজকেও একই গন্ধ?
রেশমি আপনা-আপনি দাঁড়িয়ে গেলে রুপম ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,”কী হলো?চলো…”
.
এলার্মটা অনবরত বেজেই যাচ্ছে।নিশির কর্ণে খুব নিখুঁত ভাবে সেই শব্দ ঢুকছে।পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর শব্দগুলোর একটি হলো এলার্মের শব্দ।খুব বিরক্তিকর!
সহ্যের সীমানা পেরিয়ে গেলে নিশি হাজারো বিরক্তির মেলা নিয়ে উঠে বসলো।ইচ্ছে করছে এলার্মটা হাতুড়ি দিয়ে চুরমার করতে।
কী সুন্দর রং-বেরঙের একটা স্বপ্ন দেখছিল! নিশি স্বপ্নের কিছু অংশ মনে করার চেষ্টা করলো।কিন্তু দুভার্গ্যবশতঃ তার কোনো স্বপ্নই মনে থাকে না।শুধু এটুকু জানে আজকের স্বপ্নটা আনন্দের ছিল।বলা হয়ে থাকে মানুষ স্বপ্ন দেখে সর্বোচ্চ ৫ সেকেন্ড।কিন্তু এই ৫ সেকেন্ডে আমরা পুরো পৃথিবীও ভ্রমণ করে আসি।নিশির বিরক্ত লাগছে।সুন্দর স্বপ্নগুলো তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে যায় কেন?
আজকে সোমবার! নিশির ডান্স ক্লাস আছে।সপ্তাহে শুক্রবার এবং সোমবার দুই দিন নৃত্য শেখানো হয়।নিশির ক্লাস সোমবার।সে ছোট ছোট বাচ্চাদের নৃত্য শেখায়।
বিছানা ছেড়ে নিশি উঠে দাঁড়ালো।মোবাইল নিয়ে দেখলো সূর্যের কোনো মেসেজ এসেছে কি’না।কিন্তুর মেসেজ বক্স ফাঁকা।আজিব!মানুষটা মাঝেমধ্যে এত প্রেম দেখায় আবার অনেক সময় পাত্তায় নেই।
.
নাস্তার টেবিলটা সবসময় খুশিতে ভরপুর থাকতো যখন অনাহিতা এ বাড়িতে ছিল।আজকে যেন চারদিকের আনন্দগুলো লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছে।সবাই নিরবতা পালন করেই নাস্তা করছে।যেন কথা বললেই জরিমানা পড়বে।
ইসমি বেগমের গলা দিয়ে খাবার নামছে না।গত রাত থেকে গলা ব্যথা করছে।হয়তো টনসিল হয়েছে।কিন্তু সেটা দেখবে কে?
-“তোর শ্বশুরবাড়ির লোক কী বললো?”ফিনফিনে নীরবতায় বাক্যটি বজ্রপাতের মতো প্রভাব ফেলল।আমিন রুটির টুকরো মুখে দিয়ে বললো,”তিন মাস পর খুশির পরিবার আবার সম্বন্ধ নিয়ে আসবে বললো।”
ভ্রু কুঁচকে ফেললেন শেখ আহমেদ।ছেলেকে বললেন,”এই তিন মাস কেন আবার?”
-” খুশির ভাই বিদেশ থেকে তিন মাস পর আসবে।”
-“বিয়েটা খুশি করবে, ওর ভাই না।আমরা কিন্তু অন্য সম্বন্ধ দেখবো।”
আমিন কিছু না বলে খেতে লাগলো।কষ্টে ইসমি আক্তারের বুকটা ফেটে যাচ্ছে।এই টেবিলে একটা মহিলা যে উপস্থিত আছে তা এরা বাপ-ছেলে কেউ দেখছে না।এতটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়লো সে?
.
প্রেমশাকে চুল বেঁধে দিয়ে অনাহিতা বললো,”ক্লাসে কিন্তু গুড গার্ল হয়ে থাকবে।”
মিষ্টি হেঁসে প্রেমশা বললো,”আমি গুড গার্ল।বাবাকেও গুড বয় হয়ে থাকতে বলো…”
আয়নার সামনে অভিনব টাই ঠিক করছিল।প্রেমশা কথা শুনে অভিনব বললো,”খুব দুষ্টু হয়ে গেছ মা তুমি।”
মুখে হাত দিয়ে প্রেমশা হাসলো।অনাহিতাকে আহ্লাদী স্বরে আবারো বললো,”সুপার মাম্মা,বলো না বাব্বাকে গুড বয় হয়ে থাকতে।”
অনাহিতা আড়চোখে অভিনবের দিকে তাকালো।প্রেমশা একই স্বরে বলেই যাচ্ছে এক কথা।অভিনব তাকে ধমক দিতে চাইলে অনাহিতা বলে উঠলো,”প্রেমশার বাবা,আপনিও গুড বয় হয়ে থাকবেন।”
প্রেমশা লাফিয়ে হাত তালি দিলো।অভিনব বিস্ময়ে হা করে রইলো।বিনিময়ে অনাহিতা মিটিমিটি হাসলো।
প্রেমশাকে ব্যাগ পরিয়ে দিয়ে অনাহিতার মনে পড়লো আজকে তার ইন্টারভিউর রেজাল্ট দেওয়ার কথা।কিছু সমস্যার কারণে রেজাল্ট অনেক পিছিয়ে গেছে।
মূলত প্রেমশার স্কুলেই সে অস্থায়ী শিক্ষিকার পদের জন্য ইন্টারভিউ দিতে চেয়েছিল।তখন এত ভেঙ্গে পড়েছিল যে, শুধু বাচ্চাদের মাঝে থাকতে চেয়েছিল।
গাড়িতে করে নিশি,অভিনব,প্রেমশা তিনজনে বেরিয়ে গেল।অনাহিতার চারপাশটা হঠাৎ করে যেন খালি খালি হয়ে গেল।বাচ্চাদের সঙ্গই এমন।যখন তারা খিলখিল করে হাসতে থাকে,মনে হয় প্রকৃতিও বুঝি তাদের হাসিতে হাসছে।চারপাশটা সুন্দর মনে হয়।কিন্তু হুট করে বাচ্চারা চুপ হয়ে গেলে, তার অনুপস্থিতি ভালোই উপভোগ করা যায়।
রোমিলা বেগম বললেন,”অনি,দুপুরে কী খাবে রুমিকে বলো।”
-“আমি বলবো মা?”
-“হ্যাঁ।তোমার যেটা পছন্দ বলো ও কে।”
-“রান্নাটা আমি করতে পারবো না মা?”
রোমিলা বেগম আশ্চর্য হয়ে বললেন,”তুমি রান্না করবে?”
-“হ্যাঁ।প্রেমশার কী পছন্দ?”
-“চিংড়ি ভুনা,বেগুন ভর্তা।”
-“ঠিক আছে মা।”
অনাহিতা চলে গেলে আবেগে বিপ্লুত হয়ে রোমিলা বেগমের চোখ জোড়া ভিজে উঠলো।মেয়েটা এত ভালো কেন!
.
নিশি ডান্স ক্লাস শেষ করে বাইরে বের হয়ে দেখলো সূর্য আহমেদ গাড়িতে হেলান দিয়ে।তাকে দেখে নিশির অভিমান আকাশ ছুঁই ছুঁই।অজ্ঞাত কারণেই এই অভিমানে তার কান্না পাচ্ছে।কিন্তু সহজে কাঁদার মেয়ে নিশি না।না-কি প্রেমে পড়লে সবাই আবেগী হয়ে যায়?
নিশি তাকে দেখেও এড়িয়ে যেতে চাইলে সূর্য তার হাত ধরে ফেলল।ভ্রু কুঁচকে সূর্য বললো,”ইগনোর করছো নাকি?”
নিশি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,”আমাকে বিরক্ত করা ছাড়া আপনার আর কাজ নেই?এই গরমেও মাস্ক,ক্যাপ পড়েছেন।আজিব!”
অসহায় কণ্ঠে সূর্য বললো,”গতবার তো ধরা খেলাম।এবার ফুল সেফটি নিয়ে এসেছি।”
নিশি চুপ করে রইলো।সূর্য আবারো বললো,”রাগ করেছো না-কি?”
-“করেছি।”
-“কেন করেছো?”
-“বলবো না।”
-“আচ্ছা চলো,প্রেমশার স্কুল ছুটি হয়ে যাবে।”
নিশি চুপচার সূর্যের গাড়িতে গিয়ে বসলো।প্রেমশাকে সাথে নিয়েই সে বাসায় যাবে।
(চলবে)