থার্টি ফার্স্ট নাইট পর্ব-০৭

0
646

@থার্টি ফার্স্ট নাইট
#পর্ব_০৭
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

অনাহিতা কয়েকবার মোবাইল নড়াচড়া করল।অভিনবকে কল করার সাহসটা হচ্ছে না।কল করাটা খুব একটা জরুরি না,কিন্তু করতে পারলে ভালো হতো।রুমের ভেতর বিছানায় বসে অনেকক্ষণ ভাবলো সে।

ফোনটা করতেই যাবে তখন ইশিকা হাঁপাতে হাঁপাতে রুমে প্রবেশ করলো।স্মিত হেসে অনাহিতা বলল,”কী হয়েছে?এভাবে দৌড়ে আসছো কেন?”

ইশিকা বলল,”ভাবিজান,আপনারে সিদ্রাতুল নাম ধরে একজন খুঁজতে আইছিল।”

এই কথা শুনে অনাহিতার হাত থেকে আপনা-আপনি ফোনটা বিছানায় পড়ে গেল।সিদ্রাতুল নাম ধরে তার খুব কাছের একজন ডাকে।খুব কাছের!

অনাহিতার অস্থিরতা বেড়ে গেল।সে জানতে চাইলো কে খুঁজ করেছে।ইশিকা বলল,”নাম নাকি জিসান কইলো।”

চোখজোড়ায় অশ্রু নিয়ে অনাহিতা পাগলের মতো করে ইশিকার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল,”দেখতে কেমন ছিল?সত্যি ও ছিল?”

ইশিকা এই পর্যায়ে বেশ অবাক হলো।একটা ছেলের জন্য তার ভাবিজান অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে?কেসটা তো বেশ জটিল লাগছে।

ইশিকা অনাহিতার হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,”ভাবিজান,এমন করছেন ক্যান আপনি?কামাল মিয়া কইলো চোখ ছোট ছোট…”

অনাহিতা বাক্য পূর্ণ করতে দিলো না।মুহুর্তের জন্য ভুলে গেল সে বিবাহিত।নিজ চোখের কোণে লেগে থাকা অশ্রুমালা মুছে নিলো।ইশিকার উদ্দেশ্যে বলল,”তুমি যাও।”

সমীকরণটা মিলানোর পূর্ণ চেষ্টা করছে ইশিকা।ছেলেটা তার কে হতে পারে?যার জন্য ভাবিজান এতটা অস্থিরতা দেখাচ্ছে।

অনাহিতা খানিকটা সময় পায়চারি করলো।জিসান তার খোঁজে এসেছে?কেন এসেছে?ও কী তাকে ছাড়া থাকতে পারছে না?

সে মোবাইল হাতে তুলে নিলো।ব্লকলিস্টে গিয়ে জিসানের নাম্বারটা আনব্লক করলো।তার মন জানার জন্য ছটফট করছে,জিসান কেন এসেছিল?

জিসানে নাম্বারটায় বেশ কয়েকবার ডায়াল করলো।কিন্তু রিসিভ হলো।অনাহিতা বেশ অবাক হলো,কল রিসিভ না করার মতো অসুখ তো জিসানে আগে ছিল না।নাকি অনাহিতাকে এড়িয়ে যাচ্ছে?

বেলকনিতে চুপটি করে বসে অনাহিতা অনেকক্ষণ ভাবলো।অতীতের পাতাগুলো আপনা-আপনি উলটে যেতে লাগলো।জিসানের সাথে তার ছয় বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল।দু’জনে ক্লাসমেট ছিল বিধায় জিসানের চাকরি হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হয়।এর মধ্যে অনাহিতার পরিবার তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে।অনাহিতা জেদ ধরে জিসানকে ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে সে বিয়ে করবে না।কিন্তু তার বাবাও যথেষ্ট জেদি।তিনিও বলে দেন অপ্রতিষ্ঠিত ছেলের সাথে তিনি বিয়ে দিবেন না।অনাহিতা প্রায়ই দু-তিন দিন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে রাখে।যার ফলে অসুস্থ হয়ে যায়।তখন তার বাবার মন গলে।তিনি বলেন জিসানের চাকরি হলে তবেই বিয়ে হবে।

তার দু’বছর পরই জিসানের চাকরি হলো।চাকরি হওয়ার কয়েকমাস পরেই দেখা যায় জিসান তাকে আগের মতো ভালোবাসছে না।সবটা চাকরির ব্যস্ততা বলে অনাহিতা এড়িয়ে যায়।তারপর বিয়ের কথা বললে জিসান তাকে বলে,”তোমার বয়স কত জানো?২৬+।আমার বয়স ২৭ বছর।আমি চাইলেই ১৮-১৯ বছরের কাউকে বিয়ে করতে পারবো।আমার পরিবার তোমাকে মানবে না।”

অনাহিতা খুব ভেঙে পড়ে সেদিন।জিসানের জন্য সে পাগল ছিল।অনাহিতা বিশ্বাস করতে পারেনি কথাগুলো।সে তার সাথে দেখা করতে চাইছিল।কিন্তু সুযোগ হয়নি দেখা করার।এরপর অনাহিতার বিয়ের সম্বন্ধ বারবার ভেঙে যায় বয়স বেশি বলে।সে নিজেকে সামলে নেওয়ার যতবার চেষ্টা সে করেছে ততোবারই ব্যর্থ হয়েছে।

এরমধ্যে আমিনের এনগেজমেন্ট ঠিক হয় খুশির সাথে।সেদিন বাড়ির সবাই ব্যস্ত ছিল,সুযোগ বুঝে অনাহিতা জিসানের সাথে দেখা করার জন্য তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।সে চেয়েছিল একটি বার জিসান যেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলুক।

অনাহিতা জিসানের বাড়িতে পৌঁছে গেলে দূর্ভাগ্যবশত সে প্রথমে জিসানের বাবা-মা’র নজরে পড়ে যায়।আর শুরু হয় জীবনে কালো অধ্যায়ের দ্বিতীয় খন্ড।জিসানের বাবা-মা তাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে।আর বাড়ি ভর্তি লোকের সামনে অনাহিতার পরিবারকে অপমান করে।যার ফলে আমিনের বিয়ে ভেঙে যায়।

সেদিন থেকে আজ অবধি অনাহিতার সাথে জিসানের কখনো সাক্ষাৎ হয়নি।জিসান তাহলে হঠাৎ তার সাথে দেখা করার জন্য এ বাড়িতে কেন এলো?অনাহিতা মনেপ্রাণে চাইছে জিসান একবার বলুক ‘সিদ্রাতুল,আমি সবকিছু মায়ের চাপে পড়ে বলেছি।তুমি বুড়ি হলেও আমি তোমাকেই ভালোবাসি।’

কিন্তু আদৌ কী বলবে কোনোকিছু?অনাহিতা এক ধ্যানে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইলো।একটু বাদেই তার ফোন বেজে উঠলো স্কিনে জিসানের নাম্বার নিয়ে।

ধড়ফড়িয়ে অনাহিতা কল রিসিভ করলো।অস্পষ্ট স্বরে সে বলল,”হ্যালো,জিসান?”

ওপাশ থেকে সে চিরচেনা কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেল।সে জন বলল,”হ্যাঁ।সিদ্রাতুল বলছো নাকি?”
-“হুহ্।”
-“কেমন আছো?শুনেছি বিয়ে করেছো।”

কান্নারা সব দলবেঁধে জড়ো হলো।এই বুঝি বাঁধ ভাঙ্গা নদীর মতো গাড়িয়ে পড়বে।ঠোঁট চেপে সে বলল,”ভালো আছি।হুম,বিয়ে করেছি।”
-“বেশ,বেশ! আমিও বিয়ের জন্য কিছু টুকটাক বাজার করতে বেড়িয়ে ছিলাম।”

চমকে উঠলো অনাহিতা।কার বিয়ের কথা বলছে জিসান?সে প্রশ্ন করল,”কার বিয়ের?”
-“ওহ,তোমাকে জানানো হয়নি।কাল আমার বিয়ে।”

অনাহিতা ভুলেই গেল তার কী রিয়াকশন দেখানো উচিত।অভিনন্দন জানানো উচিৎ নাকি মন ভরে কান্না করা?

তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বলল,”বাহ!মেয়ের বয়স কত?”
-“উনিশ।”
-“বেস্ট অফ লাক।”

অনাহিতা কল কেটে দিয়ে জিসানের নাম্বারটা আবারো ব্লক লিস্টে ঢুকিয়ে দিলো।এতটা নিষ্ঠুর কী করে হতে পারলো জিসান?সময়ের সাথে সাথে সব মানুষ কী বদলে যায়?

হয়তোবা হ্যাঁ।সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে মানুষ বদলে যায়,শুধু রয়ে যায় কিছু পিছুটান।যা না চাওয়া সত্ত্বেও পিছু করে বেড়ায়।

এই যেমন অনাহিতাও বিয়ে করে নিয়েছে,তারও একটা নিজস্ব জীবন হয়ে গিয়েছে।কিন্তু জিসানের সাথে কাটানো স্মৃতিরা তাকে পিছু করে বেড়াচ্ছে।

সে ভুল মানুষকে ভালোবেসে ভুল করেছে।কিন্তু ভালোবাসাটা ভুল ছিল না।এই ভালোবাসার জন্যই সে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।

দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অনাহিতার দুই দন্ড সময় কেটে গেল।তার একটুও ইচ্ছে করছে রুমে গিয়ে যেতে।কোথা থেকে প্রেমশা এসে বলল,”সুপার মাম্মা,ফুফি কেক বানাচ্ছে।চলো না…”

মৃদুস্বরে অনাহিতা বলল,”মা আমার ভালো লাগছে না।তুমি যাও।”

এ কথা শুনে প্রেমশার কপাল আপনা-আপনি কুঁচকে গেল।সে অনাহিতার কপালে হাত রাখে বড়দের মতো করে বলল,”জ্বর জ্বর লাগছে।ডাক্তার আঙ্কেলকে কল করতে হবে।”
-“না প্রেমশা।আমি একা থাকি কিছুক্ষণ।তুমি কাউকে কিছু বলো না।”
-“কেন?”
-“সুপার মাম্মা বলেছে তাই।”
-“সুপার মাম্মা কেন বলছে?”
-“প্লিজ যাও…”

মুখ গোমড়া করে প্রেমশা চলে যেতে লাগলে অনাহিতা তাকে টেনে ধরে কয়েক পলক জড়িয়ে ধরলো।তারপর কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,”সুপার মাম্মা ঠিক হয়ে যাবে।তুমি লাইট অফ করে যাও।”

হ্যাঁ ভঙ্গিতে প্রেমশা মাথা নেড়ে চলে যেতেই অনাহিতা বিনা বিধায় কাঁদতে শুরু করলো।ঠোঁটজোড়া এত জোরে চেপে ধরলো যে দাঁতের আঘাতে রক্ত বের হলো।কিন্তু তাতেও তার হুস নেই।সে কাঁদছে তো কাঁদছে!
.

রেশমি অদ্ভুত দৃষ্টিতে রুপমের হাতে থাকা ডায়মন্ডের ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে আছে।রুপম হেসে বলল,”আরে তুমি এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?এটা তোমার জন্যই।”

রেমশি উত্তরে কিছু বলল না।এই ব্রেসলেট সে আগে কোথাও দেখেছে।কিন্তু কোথায় সেটা মনে পড়ছে না।রুপম আবারো বলল,”কাম অন রেশমি!এই ব্রেসলেটটা আমি সত্যি কাল রাতে অফিসে ফেলে রেখে এসেছিলাম।প্ল্যান করে রেখেছিলাম তোমাকে মাঝরাতে সারপ্রাইজ দিবো।কিন্তু রাতে মনে পড়ে ওটা অফিসেই রেখে এসেছি।সত্যি তাই রাতেই আমি অফিসে গিয়ে সেটা নিয়ে আসি।ট্রাস্ট মি!”

সন্দেহের দৃষ্টিতে রেশমি আলতো হেসে বলল,”আমি কখন বললাম তোমাকে বিশ্বাস করছি না।বারবার ট্রাস্ট মি,সত্যি এগুলা কেন বলছো?”

রুপম থতমত হয়ে গেল।পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিলো,”এমনি জাস্ট,কথার কথা।তুমিও না…দাও তো ব্রেসলেটটা পরিয়ে দিই।”

ব্রেসলেটের উজ্জ্বল স্টার দেখে রেশমির মনে পড়লো এই ব্রেসলেট সে কোথায় দেখেছে।গত সপ্তাহে রুপমের বান্ধবী নদীর হাতে দেখেছিল সেম ব্রেসলেট।মিলে যাওয়াটা কী সম্পূর্ণ কাকতালীয়?
.

অভিনব নিজ কক্ষে প্রবেশ করে বিস্মিত হয়ে গেল।পুরো কক্ষটা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে।সে লাইট অন করতে চাইলে বেলকনি থেকে অনাহিতা বলে উঠলো,”লাইটটা অফ করা থাকুক।”

শব্দ অনুসরণ করে অভিনব বেলকনিতে গিয়ে দেখলে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ‘দ’ ভঙ্গিতে বসে আছে।অভিনব বিস্মিত স্বরে বলল,”অনাহিতা,কী হয়েছে তোমার?ঠিক আছো?”

স্বাভাবিক কণ্ঠে সে উত্তর দিলো,”হ্যাঁ,আমি ঠিক আছি।”বলেই সে রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো।বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অভিনব!অনাহিতা এরকম আচরণ কেন করছে?

.
সূর্য তখন চারিদিকের হতাশাগ্রস্ত পরিবেশ নিয়ে ডুবু ডুবু।প্রকৃতির চারপাশে ফিনফিনে নিরবতা।কাকপক্ষীও নিজ বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে।দিনমজুরদের বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা।

নিশি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দুঃখী দুঃখী আননে দর্পণের সামনে নিজের বাহ্যিক রুপ দেখছে।এই আয়না জানে না মোটেও তার মনের গহীনে কী চলছে।সে তো শুধু বাহ্যিক রুপটাই দেখায়।মানব খিলখিল করে হাসলে সে হাসে,মানব অশ্রু বির্সজন দিয়ে কাঁদলে সে কাঁদে।কখনো মনের কান্না-হাসি সে দেখায় না।

সে মনেপ্রাণে চাইছে সূর্য একটা মেসেজ দিক।অন্ত্যত একটা ‘লাইক’।কিন্তু…নিশি আর কিছু ভাবার আগেই টুং করে শব্দ হলো।সে দেখলো সূর্য আহমেদ মেসেজ করেছে,”রাগের তাপমাত্রা কত?’নিশি মনে মনে শান্তি পেল।তারমানে ছেলেটা সত্যি তাকে ভালোবাসে।

মেসেজটা সিন করেই নিশি উত্তর দেওয়ার সময় পেল না।তার আগেই রুম থেকে প্রেমশার চিৎকার ভেসে আসলো।সে তাড়াতাড়ি মোবাইলটা বিছানায় ছুঁড়ে মেরে রুম থেকে বের হয়ে গেল।

(চলবে)