থার্টি ফার্স্ট নাইট পর্ব-০৯

0
644

@থার্টি ফার্স্ট নাইট
#পর্ব_০৯
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

ছাঁদে থাকা বেঞ্চে দু’পাশে বসে আছে অভিনব-অনাহিতা।তাদের মাঝখানে উপস্থিত আছে প্রেমশা।চারিদিকে চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে।প্রেমশা এক ধ্যানে চাঁদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,”সুপার মাম্মা,পূর্ণিমা কী?”

অনাহিতার গা থেকে জ্বর চলে গিয়েছে।এখন তার শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক।৯৮.৬ ফারেনহাইট।প্রেমশার প্রশ্নের উত্তরে সে বলল,”চাঁদ যেদিন গোল হয়ে যায় তখন সেদিন পূর্ণিমা।”
-“ওও।”

অভিনব মেয়ের উদ্দেশ্যে বলল,”প্রেমশা,তুমি বেশি বেশি প্রশ্ন করো।”

প্রেমশা তার বাবার কথা শুনে হেসে উঠলো।বাবার উদ্দেশ্যে বলল,”তুমি বলো বাব্বা,ড্রয়িংরুমে ড্রয়িং হয় না।তারপরও সেটা ড্রয়িংরুম নাম কেন?”

অভিনব কয়েকবার বলার চেষ্টা করেও উত্তর দিতে পারলো না।প্রেমশা তার অবস্থা দেখে খিলখিল হাসছে।

অনাহিতা এক ধ্যানে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে।যে চাঁদের অসীম সৌন্দর্যে চারপাশ আলোকিত,সে চাঁদের নিজস্ব আলো নেই।চাঁদের গায়েও কালো দাগ থাকে।এর দ্বারা প্রমাণিত কোনো কিছুই নিখুঁত না।

কথা বলতে বলতে প্রেমশা এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।ততক্ষণেও অনাহিতা-অভিনব নিশ্চুপ।নিরবতা ভেঙে অনাহিতা তার চাকরির বিষয়ে সবটা খুলে বলল।বিপরীতে অভিনব উত্তর দিলো,”তুমি চাকরি করতে চাইলে সমস্যা নেই।কখন থেকে জয়েনিং?”
-“এক তারিখ।মানে পরশু থেকেই।”
-“ওহ।”

দূর থেকে ঝিঁঝিঁ ডাক ভেসে আসছে।অভিনব জড়তা নিয়ে প্রশ্ন করলো,”তোমার ঠোঁটের নিচে…কী হয়েছে?”

অনাহিতা কিঞ্চিত চমকে উঠলো।কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে গিয়ে কী হাল করেছে সে নিজের!অভিনবকে এখন বলতে গেলে পুরো ঘটনা বর্ণনা করতে হবে।যেটা এই মুহুর্তে অনাহিতা চাইছে না।সে ক্ষণকাল চুপ করেই রইলো।

কোনো উত্তর না পেয়ে অভিনব বুঝতে পারলো এই বিষয়টা অনাহিতা গোপন রাখতে চাইছে।প্রসঙ্গ এড়াতে অভিনব বলল,”রাত হয়েছে।ঘুমাতে চলো…”

বাক্য অসম্পূর্ণ রেখে অভিনব মেয়েকে কাঁধে তুলে নিলো।অনাহিতা তাদের পিছু পিছু সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেল।

প্রেমশা বিছানায় শুয়ে দিতেই সে নড়েচড়ে উঠলো।আধোঘুমে অভিনবের উদ্দেশ্যে বলল,”বাব্বা,তুমিও আমার সাথে ঘুমাও।”

গত দু’দিন অভিনব সোফায় ঘুমিয়েছে।প্রেমশা তার বাহু শক্ত করে ধরে রাখলো।মৃদুস্বরে অনাহিতা বলল,”আপনার সমস্যা না হলে প্রেমশা পাশে শুয়ে পড়ুন।”

ব্যস!এই এক বাক্যে অভিনব সম্মতি জানালো।নিজের মেয়েকে ছাড়া থাকতে তারও ভালো লাগছিল না।অভিনব মেয়ের পাশেই শুয়ে চোখ বন্ধ করল।

অনাহিতা কয়েক পলক বাবা-মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।এরা দু’জন আগে থেকে সুখি ছিল,শুধু অপূর্ণতা ছিল একজন মায়ের।তাকে প্রেমশা সেই জায়গায় বসিয়েছে।অনাহিতার হঠাৎ মনে হলো,জীবনটা এত সুন্দর কেন!
.

নিশিকে নামিয়ে দিয়ে সূর্য উলটো দিকে গাড়ি ঘুরালো। নিশি ততক্ষণ অবধি তাকিয়ে রইলো যতক্ষণ না অবধি গাড়িটা অদৃশ্য হয়।বেশিরভাগ প্রেমিকায় এই কাজটা করে।

প্রেমিকের চলে যাওয়ার পানে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে ততক্ষণ অবধি যতক্ষণ না অবধি অদৃশ্য হয়।কেন তাকিয়ে থাকে প্রেমিকা?

নিশি গেইট পেরিয়ে উঠানে পদার্পণ করতেই ‘টুং’ শব্দ জানান দিলো মেসেজ এসেছে।স্থির হয়ে নিশি হস্তে থাকা মোবাইলের দিকে দৃষ্টি তাক করে দেখলো সূর্যের মেসেজ।মেসেজে লেখা “এভাবে তাকিয়ে থেকো না নিশিরাণী।তোমার মাদকা চাহনি আমার অন্তর্দেশে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করে।প্রত্যেক প্রেমিকার চাহনি প্রেমিকার জন্য নিষিদ্ধ করা হোক!”

ঠোঁট চেপে হাসলো নিশি।কী উদ্ভট কথাবার্তা!নিশি মনের ডায়েরিতে লিখে রাখলো…

প্রিয় প্রেমিক,
তোমার চক্ষু শুধু আমার নামে উৎসর্গ করা হোক।অন্য নারীর দিকে দৃষ্টি পড়া মাত্র তোমার চোখ অগ্নিতে ঝলসে যাক!
ইতি,
প্রেমিকা

নিশির মোবাইলটা সূর্য সাথে করেই নিয়ে গিয়েছিল।ফিরার সময় ফোনটা দিয়েছে।সে বাড়ি প্রবেশ করতে গিয়ে দেখে রুমি মূল দরজায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।কিঞ্চিত অবাক হয়ে নিশি তার নাম ধরে দু’বার ডাকলো।

রুমি ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো।নিশি তার উদ্দেশ্যে বলল,”কী ব্যাপার?তুই এখানে…এভাবে ঘুমিয়ে আছিস?”

বুকে থুথু দেওয়ার ভান করে রুমি বলল,”বাপরে,ভয় পাইছি আফা।আপনে আইছেন?”

নিশি আবারো অবাক হলো।রুমি তার জন্য অপেক্ষা করছিল?সে প্রশ্ন করলো,”হ্যাঁ।কিন্তু তুই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলি?”
-“হ আফা।ছুর্য ভাইজান আপনারে নিয়ে যাওয়ার চময় আম্রে বলে গেছিল।”

নিশি কপালে হাত রাখলো।সূর্য রুমির সহযোগিতা নিয়ে তাকে কিডন্যাপ করেছিল?আজিব মানুষ তো!
.

তৃতীয় প্রহরে অনাহিতার ঘুম ভেঙে যায়।ঘুমটা তার ভালোই হয়েছিল।কিন্তু জিসানের ব্যাপার থেকে পরিষ্কার না হওয়া অবধি শান্তি হচ্ছে না।

বিছানা ছেড়ে অনাহিতা বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে নিলো।এখনো এ বাড়ির কারোরই ঘুম ভাঙেনি।তবে নিচতলায় দারওয়ান এতক্ষণে উঠে যায়।অনাহিতা ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে যায়।দারওয়ানের সাথে কথাটা পরিষ্কার করা উচিত।

সাত-সকালে দরজার সামনে ভাবিজানকে দেখে দারওয়ান হতবাক।তার দরজায় ইশিকা ছাড়া কেউ আসে না।এক রাশ বিস্ময় নিয়ে সে প্রশ্ন করল,”ভাবিজান,আপনে?”

হাজারো জড়তা যেন অনাহিতা চারপাশে ঘুরঘুর করছে।একবার ভাবলো ভেতরে গিয়ে বসবে, তারপর কথাবার্তা বলবে।পরক্ষণে মত পাল্টিয়ে সে বাইরেই দাঁড়িয়ে বলল,”আপনার সাথে কথা ছিল কিছু।”
-“হ্যাঁ,ভাবিজান বলেন।”
-“কাল আপনার সাথে একজনের দেখা হয়েছিল।আমাকে খুঁজছিল, মানে সিদ্রাতুলকে।ছেলেটার চেহারা মনে আছে?দেখতে কেমন ছিল?”

দারওয়ান মনে করার চেষ্টা করে বলল,”চোখ ছোটো ছোটো,ফর্সা।”

অনাহিতা মনে মনে বলল,”এটা তো জিসানেরই বর্ণনা।”অস্থির কণ্ঠে মুখ ফোটে বলল,”আচ্ছা,এমন কিছু যেটা দ্বারা চিহ্নিত করা যাবে?”

দারওয়ান ক্ষণ সময় নিয়ে ভাবলো।তারপর ছটফট ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,”হ,চোখের পাশে বড়ো তিল এক্কান।”

বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অনাহিতা!বর্ণনা অনুযায়ী তো…!সে আবারো প্রশ্ন করলো,”নাম কী জিসানই ছিল নাকি নি…নিসান?”
-“হ,ভাবিজান।নিসানই ছিল।লম্বা পোলা।”

আশ্চর্য!নিসান কেন তার সাথে দেখা করতে আসবে?নিসান তো জিসানের ছোট ভাই।তার সাথে নিসানের কী কাজ?জিসানের বিয়ের খবর দিতে দেখা করতে চেয়েছিল?নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য?

অনাহিতার নিজের ফোনে নিসানের ফোন নাম্বারও নেই যে কল করবে।ছেলেটা খুব ভদ্র।যখনই দেখা হতো ভাবি,ভাবি বলে সর্বক্ষণ ডাকতে তাকতো।জিসানের পরিবারে নিসানই তার কথা জানতো।তার অধ্যায়ের শেষাংশে এসে সবাই জেনেছে।

অনাহিতা ভোর বেলায় আর বাড়ি ঢুকলো না।সে চললো সামনে এগিয়ে।হালকা অন্ধকারে ঢেকে থাকা নিঝুম পরিবেশ,প্রকৃতির অন্যতম সৌন্দর্য।এই সৌন্দর্য উপভোগ করার ক্ষমতা সর্ব মানবের ভাগ্যে থাকে না।

অনাহিতা দুই বাহু,দু’হাতে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে গেল।তার ইচ্ছে করছে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিতে।তখন নিজেকে উৎসর্গ করে দূর থেকে আপনজনের জীবন খেলা দেখতে পারবে।যেমনটা প্রকৃতি দেখে।মানুষ যখন অনুভব করে তাকে একাকীত্ব গ্রাস করেছে,তখন নিঃসঙ্গতার সঙ্গি হয় প্রকৃতি।প্রকৃতি নিজের সবটুকু দিয়ে মানবের ওষ্ঠজোড়ায় হাসি ফোটাতে চায়!

জীবনের নুতন এক অধ্যায় শুরু করতে চলেছে অনাহিতা।যেখানে সে আগের অধ্যায়ের উপস্থিতি চায় না,চায় না স্মৃতিরা হানা দিক।কত ভালোই না হতো যদি জামা পাল্টানোর মতো নিজের জীবনের অধ্যায়গুলো পরিবর্তন করা যেত!যে অধ্যায় কৃষ্ণ মেঘের ছায়ায় ঢেকে যাবে,সেটা বাদ দিয়ে নতুন আরেক অধ্যায় শুরু করবে…!

কিন্তু জীবন তো জীবন!অতীতের স্মৃতিরা যেখানে বিনা আমন্ত্রণে উপস্থিত হয়।হয়তোবা জীবনকে নতুন আরেকটা রুপ দেওয়া যায়।কিন্তু পুরনো স্মৃতিরা তো উঁকি দিবেই!

(চলবে)