থার্টি ফাস্ট নাইট পর্ব-০১

0
1332

@থার্টি ফাস্ট নাইট
#পর্ব_০১
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

বিয়ের পরের দিন অনাহিতা জানতে পারে তার স্বামী আগে থেকে বিবাহিত।আর পাঁচ বছরের একটা মেয়েও আছে যে কি’না ‘বাব্বা’ বলে গলা জড়িয়ে ধরেছে।এমন চিত্র দেখে সে হতভম্ব হয়ে গেল সে।তার স্বামী অভিনব মেয়েকে নিয়ে তার সামনে এসে বললো,”আমার মেয়ে,গতকাল মায়ের কাছে ছিল।”

অনাহিতা কথা বলতেই ভুলে গেছে।অভিনবের কথাবার্তা এমন যে সবকিছু স্বাভাবিক।যেন তার আগের বিয়ের বিষয়ে অনাহিতা সবকিছু জানতো।

তার স্বামী মেয়েকে কোলে নিয়ে খেলতে খেলতে রুমে চলে গেল।অনাহিতা সোফায় ধপ করে বসে পড়লো।তার মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরছে,”মা-বাবাও কী অভিনবের ব্যাপারে সব জানতো?শুধু কী তার থেকে লুকানো হয়েছে?”

অভিনবের মা কাছে এসে বললো,”অনাহিতা,তুমি এ বিষয়ে কিছু জানতে না?তোমার ভাই কিছু বলেনি?”

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সে তার শ্বাশুড়ির দিকে তাকিয়ে রইলো।অনাহিতার হাতদুটো নিজের দখলে নিয়ে তিনি আবারো বললেন,”দেখ,অভিনবের বিয়ে হয়েছিল সাত বছর আগে।আর ডিভোর্স হয়েছে আজ প্রায়ই ছ’বছর।ছ’বছরে অভিনবকে অনেক বুঝিয়ে ছিলাম কিন্তু বিয়ের জন্য রাজীই হয়নি।কিন্তু তোমাকে দেখার পর ও বিয়ে করতে রাজী হয়।ওর অতীত নিয়ে তো তোমার ভাইকে সব বলেছিলাম।সে জানে সব…”

অনাহিতার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।সে কোনোদিনও ভাবেনি তার ভাই…নিজের ভাই তাকে ঠকাবে!এতটাই কী বোঝা হয়ে গিয়েছিল সে?অনেক বেশিই কী মানসম্মানের ক্ষতি করেছিল যে, বিবাহিত,এক সন্তানের পিতা,৩২বছরের এক লোকের সাথে বিয়ে দিলো?এর উত্তর হয়তোবা ‘হ্যাঁ’। আচ্ছা,বাবা-মা জানে সব?

অনাহিতার চোখ জোড়া অশ্রুজলে টইটম্বুর।এই বুঝি বাঁধ ভাঙ্গা নদীর মতো বিনা বাধায় জল গড়িয়ে পড়লো!কিন্তু অপরিচিত মুখজোড়ার সামনে জল গড়াতে চায় না।বহু কষ্টে নিজেকে সামলে অনাহিতা প্রশ্ন করে,”মা-বাবা কী জানে?”

তিনি বললেন,”তারমানে?তুমি কিছু জানতে না?আমি তোমার ভাইকে জানিয়ে ছিলাম সব,তোমার বাবা-মা জানে কি’না তা তো সিওর না।”

এক ধমে সে উঠে নিজের রুমে চলে আসলো।ক্ষণকালের জন্য তার কাছে আশ-পাশ স্থির।তার বিয়ের প্রস্তাবটা এনেছিল ভাই।বলা হয়েছিল ২৮ বছরের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী,পরিবারও ভালো।যেহেতু প্রস্তাবটা তার ভাই নিজে নিয়ে আসে,সেহেতু বাকিরা কেউ আর খোঁজ খবর নেয়নি।তাদের জলদি মেয়ে বিয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো ছিল।তাই তো কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া দুই পরিবার মিলে তিন-চার দিনের মাথায় বিয়ে দিয়ে দেয়।

দু’হাত দিয়ে অনাহিতা নিজের মুখমন্ডল ঢেকে রাখলো।এত বড় প্রতারণা, কী করে করতে পারলো ভাই?

সে চক্ষুর অশ্রু মুছে মোবাইল ফোন হাতে নিলো।তার মা লুকাতে পারে না কোনো কিছু,নিশ্চয়ই ফোন করলে কিছু জানা যাবে।
.
ইসমি আক্তার ঘড় ঝাড়ু দিচ্ছিলেন।তখন রুম থেকে মোবাইল ফোনের আওয়াজ এলো।বিরক্তি নিয়ে তিনি বিড়বিড় করে করে রুমের দিকে হাঁটা শুরু করলো।

ফোন স্কিনে মেয়ের নাম দেখে তার বিরক্তি নিমিষে ভেনিস হয়ে গেল।হাসি হাসি কন্ঠে কল রিসিভ করে বললেন,”কী রে,কেমন আছিস?”
-“মা,তোমরা সবাই জানতে অভিনব ডিভোর্সি?তার মেয়ে আছে?”

মেয়ের এমন কথা শুনে ইসমি আক্তার থমকে গেলেন।বিয়ের পরের দিনই,অনাহিতা কী আবুল তাবুল বকছে?কোথাও তার সংসার করতে মন নেই তো?

ইসমি আক্তার অস্থির কন্ঠে বললেন,”কী বাজে বকছিস তুই?মাথা ঠিক আছে?”
-“মা,আমার মাথা ঠিকই আছে।তোমরা এত বড় একটা সত্যি কী করে লুকাতে পারলে?”
-“তোর সংসার করতে ইচ্ছে নেই বলে,যা-তা বানিয়ে বলবি?”
-“আমার কথা বিন্দুমাত্রও ভুল না।তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করো।সে সব কিছু জানতো।”
-“কিহ?আমিন সব কিছু জানতো?”
-“জিজ্ঞেস করো তোমার ছেলেকে।তোমাদের কাছে আমি এতটা বোঝা হয়ে গেলাম মা?একটা না-হয় ভুল করেছি,ভুল মানুষের সাথে…তাই বলে তোমরা আমাকে না জানিয়ে…ছিঃ মা,ঘৃণা হচ্ছে তোমাদের উপর আমার।”

অনাহিতা কল কেটে দিলো।তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।অভিনব বিবাহিত এ কথা শুনে নই,তার পরিবার কী করে সত্যি কথা লুকালো সেটা ভেবে তার মন ভেঙ্গে গেছে।

.
প্রেমশাকে নিয়ে অভিনব বেলকনিতে ছিল।রুম থেকে অনাহিতার কান্নার কন্ঠস্বর শুনে সে ঘাবড়ে যায়।এক প্রকার আঁতকে উঠে।প্রেমশার জন্য সে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে,যদি অনাহিতা প্রেমশাকে মেনে নিতে না পারে তাহলে তো…কিন্তু তার ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে গেল অনাহিতার ফোনালাপ শুনে।

অভিনব জানতো অনাহিতা সবকিছুই আগে থেকে জানে।তার মা এমনটাই বলেছিল।আর এখন অনাহিতার কথা শুনে তো পুরোপুরি পরিষ্কার যে, সে কিছুই জানতো না।সে বুঝতে পারলো পুরোটাই তার মায়ের বিছানো জাল।রাগে তার কপালের রগ ফুলে উঠলো।প্রেমশাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে,হনহনিয়ে ড্রয়িংরুমে চলে গেল।

.
প্রেমশা ধীরেধীরে অনাহিতার কাছাকাছি এলো।তখনো অনাহিতা নিজের মুখমন্ডল দু হাতের আড়ালে রেখেছিল।হঠাৎ বাচ্চা বাচ্চা গন্ধ নাকের দখলে আসতে সে হাত সরিয়ে নিলো।

প্রেমশাকে কাছ থেকে দেখে,অনাহিতার শব্দ ঝুড়ি খালি হয়ে গেল।এর আগেও বাচ্চাটার সাথে তার দেখা হয়েছে।তিন,তিনবার দেখা হয়েছে।প্রথমবার দেখা হয়েছিল শপিংমলে।

সে তো একমাস আগের কথা।প্রেমশা শপিংমলের ট্রায়াল রুমে আটকে গিয়েছিল।বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনে অনাহিতা তাকে ট্রায়াল রুম থেকে উদ্ধার করে।তখন প্রেমশার সাথে ছিল ১৮-১৯ বছরের কিশোরী কিশোরী চেহারার একটি মেয়ে।

বাচ্চা মেয়েটিকে একা ছাড়ার জন্য অনাহিতা তাকে বেশ বকেও দেয়।পরিচয় হিসাবে জানিয়ে ছিল মেয়েটি প্রেমশার ফুফি।কিন্তু এখন অবধি সেই মেয়েটাকে এক নজরও দেখেনি অনাহিতা।

প্রেমশা আহ্লাদী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,”সুপার গার্ল,তুমি কাঁদছো কেন?কে বকেছে?”

অনাহিতা অবাক হয়ে গেল প্রেমশার স্মৃতি শক্তি দেখে।প্রথম দেখায় তো,অনাহিতা নিজেও চিনতে পারেনি।কেন না,তাদের শেষ দেখা হয়েছিল ১৫ কী ১৬ দিন আগে।’সুপার গার্ল’ উপাধিটা প্রেমশা সেদিন দিয়েছিল,যেদিন তার সাথে স্কুলে দেখা হয়।

অনাহিতা গালে লেগে থাকা অশ্রুবিন্দু মুছে,প্রেমশার নাক ধরে বললো,”উঁহু,সুপারগার্ল কাঁদে না।”

খিলখিল করে হেঁসে উঠলো প্রেমশা।তারপর বললো,”তুমি আমার সাথে থাকবে তো সবসময় সুপার গার্ল?”

অনাহিতা উত্তর দিলো।এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো প্রেমশার দিকে।মেয়েটার মুখে অজস্র মায়া!সে যদি ক’বছর আগে বিয়ে করতো,তাহলে তো এটুকু বাচ্চার জননী সেও হতো!

.
-“মা,তুমি সবসময় নিজের সুখটা কেন ভাবো?তোমার মনে হচ্ছে না,অনাহিতার জীবনটা তুমি নষ্ট করেছো?”

রোমিলা বেগম চুপ করে রইলেন।অভিনবের কথার উপর,তিনি কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারেন না।কিন্তু এত কথায় আর কোনো কাজ হবে না।বিয়েটা হয়েই গেছে।দুই-তিন ঝামেলা চলবে,তারপর ঠিকই অনাহিতার সাথে উনার ছেলে সুখে সংসার করবেন।এমনটায় ধারণা রোমিলা বেগমের।

কর্কশভাবে অভিনব আবারো বললো,”তুমি মিথ্যা কথা কেন বলেছিলে আমায়?কেন বলেছিলে,অনাহিতা আমার সম্পর্কে সব জানে?”

নিচু্ স্বরে তিনি বললেন,”আমি ওর ভাইকে সব বলেছিলাম।তার ভাই না বললে আমার দোষ কোথায়?”
-“তুমি নিজে কেন সরাসরি অনাহিতাকে কিছু বলোনি?বিয়ের আগেও আমাকে অনাহিতার সাথে কথা বলতে দিলে না।বিয়ের দিন প্রেমশাকে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিলে।বাহ,কী সুন্দর পরিকল্পনা ছিল তোমার!”
-“আমি বুঝতে পারছি আমার…”
-“কী হবে মা এখন বুঝে?বিয়েটা তো হয়েই গেছে।অনাহিতার জীবনটা নষ্ট করে দিলে।কোনো মেয়েই চাইবে না ডিভোর্সি কাউকে বিয়ে করতে।ভাবো একবার,একবার ভাবো অনাহিতাকে আমার জায়গায় দাঁড় করিয়ে।তুমি নিজে…কী বলবো আমি আর!”

রোমিলা বেগম নিশ্চুপ হয়েই রইলেন।তিনি জানেন এবং মানেন,নিজে তিনি স্বার্থপর।নিজের পরিবারের ভালো, সুখ ছাড়া কিছু বুঝেন না।প্রেমশা,অভিনবের সুখটায় তার কাছে আসল।

-“মা,আমি আগে একবার ডিভোর্সি ছিলাম।এখন দ্বিতীয় বারের মতো আবার হবো।”
.

অনাহিতার মন খারাপটা প্রেমশার সাথে গল্প করতে করতে কেটে গেল।মেয়েটা বয়সে ছোট হলেও কথা প্রচুর বলে।অনাহিতা ভাবছে,কী করে প্রেমশার মা তাকে ছেড়ে চলে গেল?ডিভোর্সই বা কেন হলে?

প্রেমশার সাথে দ্বিতীয় দেখা হয় রেস্টুরেন্টে।তখনও তার সাথে সেই মেয়েটি ছিল।তিন বছরের বাচ্চা একটি অপরিচিত বাচ্চা যখন আইসক্রিম ফেলে দিয়ে অনাহিতার পোশাক নষ্ট করে দিয়েছিল তখন অনাহিতা বলেছিল,”আরে সমস্যা নেই,বাচ্চা এমন একটু-আধটু ভুল করে।বাচ্চারা এমন লাফালাফি, দৌড়াদৌড়ি তো করবেই।আমার কিছু হয়নি।”

প্রেমশার সাথে তখন শুধু নজরের মিলন হয়েছিল।কথা বার্তা বলার সুযোগ হয়নি।তারপর তৃতীয় দেখাটা হয়েছিল যখন সে শিক্ষিকা উপাধির জন্য স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে যায়।সেই স্কুলেই ভর্তি ছিল প্রেমশা।

অনাহিতার ফোন বেজে উঠলো।তার বাবা ফোন করছে।অনুভূতিগুলো কাগজে মুড়িয়ে সে কল রিসিভ করলো।ওপাশ থেকে ভেসে আসলো,”অনাহিতা, কী বললো তোর মা এসব?ও বাড়ির লোকেরা মিথ্যা কথা বলছে।আমাদের এমন কোনো কথা জানানো হয়নি।”

অনাহিতা উঁচু স্বরে বললো,”তাহলে তোমরা কেন খোঁজ খবর নিলে না আগে?”

শেখ আহমেদ কিঞ্চিৎ রেগে বললো,”গলা নামিয়ে কথা বলো অনাহিতা।বেয়াদবির সীমানা ছাড়িয়ে পেলছো তুমি।”

অনাহিতা চুপ করে রইলো।কখনোই সে তার বাবার মুখের উপর কথা বলেনি।কিন্তু শেষ দিন গুলো বাজেভাবে কেটেছে।

মুহুর্তে তিনি স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,”তোমার শাশুড়ি মিথ্যে কথা বলছে।উনাকে টেলিফোনে পাচ্ছি না আমি,ফোনটা দাও।আজকেই তোমাকে নিয়ে আসবো আমি।”
-“বাবা উনি মিথ্যা কথা কেন বলবেন?ভাইকে জিজ্ঞেস করো তুমি।ভাই সব জানে।”
-“তোমার ভাই বলছে সে কিছুই জানতো না।”
-“তাহলে তোমরা খোঁজ খবর না নিয়ে,বড়লোক দেখেছো আর ওমনি বিয়ে দিয়ে দিলে।আমি তো তোমাকে মান সম্মান পুড়িয়েছি।তাই না বাবা?”

ওপাশ থেকে অনাহিতার ভাই আমিন বললো,
-“বিয়ে করে তোর জিহ্বা বেশি বড় হয়ে গেছে অনি?লজ্জা করে না,বাবার সাথে এভাবে কথা বলিস?কেন তুই মান সম্মান শেষ করিসনি?তোর জন্য আমার বিয়ে ভেঙ্গে যাইনি?”

বহু কষ্টে কান্না গিলে অনাহিতা উত্তর দিলো,”হ্যাঁ,তাই তো যার-তার সাথে বিয়ে দিলে।এবার খুশি তো?”

মোবাইল বন্ধ করে রাখলো অনাহিতা।বার বার একই বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে এখন তার বিরক্ত লাগছে।তার সিদ্ধান্তে সে অটুট,বাবার বাড়িতে সে আর কোনোদিন পা দিবে না।

(চলবে)

[ভুলক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]