#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_১
” তোর বাপে আরেকটা বিয়া করছে রে, ফুল।
সাজেদার কথায় নড়চড় হল না ফুলের। সে শিউলি ফুলের মালা গাঁথতে থাকল। সাজেদা বুবুর কথা সত্য হলে কতোই না ভাল হতো। অন্তত সে নেশাখোরের কবল থেকে বেঁচে যেত।
অষ্টাদশী কন্যা ফুল। শিউলিফুল তার খুবই পছন্দের। চার ছয় পাপড়িযুক্ত অঙ্কুরের মাঝে হলদে ডোরাকাটা দাগ দেখে বড্ড অভিমান হয় তার। ঠোঁট উলটে গাছের শিকরে বসে গাছের কাছেই অভিযোগ করছিল সে। ফুলগুলো শুভ্র সাদা হলো না কেনো? চাঁদের গায়ে দাগ আছে বলে! ফুলের প্রিয় জিনিসগুলোই এমন হয়। দাগ কাটা থাকে। ফুলের আর শিউলিফুলের মালা গাঁথা হল না। নাক ফুলিয়ে চেয়ে রইল সম্মুখে দাঁড়ানো সাজেদা বুবুর দিকে। বুবু আবার বলল,” এখনো বসে আছিস? তোর বাবা ঘরে নতুন বউ তুলল বলে!”
“আব্বা বিয়ে করলে আমি বেঁচে যেতাম,বুবু। কেনো মিথ্যা বলছো?”
পৃথিবীতে কারো ভাল করতে নেই। সাজেদা আজ বুঝল। ফুলকে নিজেই নিয়ে আসলো তাদের বাড়িতে। উঠোনেই ফুলের নতুন মা মারুফা খাতুন ঘোমটা টেনে চেয়ারে বসে আছে। তাকে ঘিরে পাড়া প্রতিবেশীরা দাঁড়িয়ে আছে। ফুল দূরেই দাঁড়িয়ে রইল। বাবার ভয়ে কাছে গেল না। সৎ মায়ের সম্পর্কে যতটুকু ধারণা থাকার প্রয়োজন ততটুকুই আছে। তার আশেপাশে সৎ মায়ের দ্বারা অত্যাচারিত হতে অনেক দেখেছে।
ফুলের বাবার নাম পিরোজ আলী। ফ এর জায়গায় প বর্ণ বসিয়ে সকলেই ডাকে। ফিরোজ আলী নতুন বিয়ে করে মনে করছে মহৎ কাজ করে ফেলেছে। লোকসমাজের কথা ভেবে ফুলকে ডেকে আনলো নতুন বউয়ের সামনে। নতুন স্ত্রী উদ্দেশে বলল,” দেখো কে এসেছে, আমাদের মেয়ে।”
ভদ্র মহিলা ফুলকে একপলক দেখে স্বামীর দিকে তাকাল। তার চোখজোড়ায় হিংসাত্মক মনোভাব। ফুলের সাথে কথা বলা তো দূর দ্বিতীয়বার ফিরেও তাকাল না। ফুলও এরচেয়ে বেশি আশা করেনি। ফুলের বাবা হে হে করে হেসে মেয়েকে বলল,” তোমার নতুন মাকে সালাম করো, ফুল?”
মুখে মধু অন্তরে বিষ প্রচলিত কথাটা আজ সত্যি প্রমাণ হলো। মধুমাখা সুরে ফুলকে বললেও ফুলের হাত শক্ত করে ধরল। যেনো ফুল ফিরোজের কথা শুনতে বাধ্য হয়। ফুল নতুন মাকে পায়ে ধরে সালাম করে দৌড়ে পালাল।
ফুলের বাবা বিয়ে করার পরের জীবনটা ফুলের জন্য আরো কষ্টকর হয়ে গেল। নতুন মায়ের নাম লিপি। নামের মতো সারাদিনের সব কথাই লিপিবদ্ধ করে রাখে পঁচা মস্তিস্কে। স্বামী বাড়ি এলে সত্য মিথ্যা বানিয়ে ফুলকে মা’র খাওয়ায়। লিপি এবাড়িতে এসেছে দুই মাস হয়েছে। এবাড়িতে আসার পর তিনবেলা ফুলকে ভালভাবে খেতে দিয়েছে কী না সন্দেহ আছে।
ফুল কলেজে ভর্তি হয়েছে। ক্লাস শুরু হয়েছে এক সপ্তাহ হয়ে গেছে কিন্তু এই পর্যন্ত কলেজে পা দেয়ার সুযোগ হয়নি ফুলের।
গতকাল রাতের কথা, লিপি তখন ভাত খাচ্ছিল। মায়ের খাওয়া শেষ হলেই সে লিপিকে কলেজের কথা জানাল। লিপি তখন কি করল, ফুলের খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিল। ফুল কারণ জিজ্ঞেস করল,” এমন করছো কেনো?”
উত্তরে লিপি বলল,” আমার সংসারে থাইকা খাবি, কাজ করবি। পড়াশোনা আবার কীসের? আগে তোর সব ছিল। এখন সব আমার। তোর পড়াশোনা বন্ধ। পড়াশোনা করলে আমার বাড়িতে জায়গা দিমু না।”
ফুলকে ঠেলে ঘরের বাইরে বের করে লিপি দরজা আটকে দিল। ফুল মধ্যরাত পর্যন্ত দুয়ারেই বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল। ফিরোজ আসতেই দুই পা জড়িয়ে ধরে একটাই মিনতি করছিল। আর তা হল, কলেজে যাওয়া। অর্ধমাতাল ফিরোজ তাল মাতাল বেমালুম হয়ে অনুমতি দিয়ে দিল।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুল কলপাড়ে পিছলে পড়ে গেল। কোমরে ভালোই ব্যথা পেয়েছে সে। নুইয়ে সকাল ও দুপুরের রান্না একসাথে করে নিল। সৎ মা ও বাবার ঘুম ভাঙার আগেই কলেজের জন্য আগেই বেড়িয়ে গেল। দেখা যাবে তাদের সামনে পড়লে মতামত পাল্টে ফেলবে। স্কুলের মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয়, এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে কোন জায়গায় যেতে যেখানে এক টুকরো সুখ পাওয়া যায়। ফুল জানে, তার এমন চিন্তা করাও বোকামি। সুখ তার কপালে নেই। দুখী ফুল সব সময় দুখীই থাকবে।
ফুলের ছোটবেলার বন্ধুর নাম নাফিস সেলিম। ফুলকে সবসময় সাপোর্ট করে থাকে। বাবার দ্বিতীয় বিয়ে করা নিয়ে যখন ফুল আতঙ্কে ছিল, নাফিস তখন পাশে থেকে বলেছিল,” চিন্তা করিস না, ফুল! আমি সবসময় তোর পাশে আছি।”
ফুল জানে তার পাশে একজন আছে। আজও সে ফুলের জন্য অপেক্ষা করছে। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে নাফিস ফুলের জন্য অপেক্ষা করছিল। ফুলকে দেখামাত্রই তার মুখে মিষ্টি হাসি ফুটলো। ফুল গোমড়া মুখে এসে বলল,” চল।”
নাফিস ফুলকে ভালোভাবে দেখে বুঝতে পারল, আজও বাসায় কিছু হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে পকেট থেকে ঠোঙা বের করল সে। ফুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,” আব্বা বলে দিয়েছে, সাথে যে থাকবে তাকে যেনো দিয়ে খাই। নয়তো পেটে অসুখ হবে।”
ফুল কটমট চোখে তাকাল। সহজে বললেই তো হয়। এত ঘোরানোর কী আছে? ফুল ঠোঙা হাতে নিয়ে দেখল, দুইটা কেক পড়ে আছে। একটা কেক নিয়ে কামড় বসালো সে। পুরোটা শেষ করে আরেকটা নাফিসের দিকে এগিয়ে বলল,” ঐটা তুই খা।”
নাফিস খেল না। ফুলের ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,” টিফিনের সময় খেয়ে নিস। আমি তো ছেলেদের সাথে থাকব, তোর সাথে কথা বলার সুযোগ পাব না।”
ফুল মুখ ফোটে কিছু বলল না। অল্পভাষী দারিদ্র্য মেয়ে সে। মুখ ফোটে ক বললে সকলে খ বুঝে।
ফুলদের কলেজ তাদের বাসা থেকে অনেকটা দূরে। ফুলের স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের যে সরকারি কলেজে ভর্তি হতে পেরেছে সে। কলেজের পরিবেশ সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।
কলেজে পৌঁছেই ফুলের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ছেলেমেয়ে সম্মিলিত হয়ে যেখানে পারছে সেখানে বসেই আড্ডা দিচ্ছে। ফুলের বিষয়টা ভালো লাগলো না জড়োসড়ো হয়ে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
নতুন ক্লাসে ফুলের পরিচয় হলো আরিফার সাথে। অবশ্য পরিচয়টা নাফিসই করে দিয়েছে। কিছু সময়ের মধ্যে ফুল গেল এবং এও জানল আরিফা নাফিসকে খুব পছন্দ করে কিন্তু নাফিস আরিফার সম্পর্কে কি ভাবে এখনো পর্যন্ত সে জানে না। ফুল অবাক হল কথাগুলো শুনে। আরিফাকে জিজ্ঞেস করল,” কবে থেকে তুমি নাফিসকে পছন্দ করো?”
আরিফা লাজুক সুরে বলল,” এক সপ্তাহ ধরে।”
এক সপ্তাহ মানে কলেজের প্রথম দিন থেকেই আরিফা নাফিসকে পছন্দ করা শুরু করেছে। ফুল নিজের মাথায় হাত রেখে বসে পড়লো। প্রথম দেখায় কি কাউকে ভালোবাসা যায়? উত্তরটা তাৎক্ষণিক পেল না।
—————
প্রথম দিনের ক্লাস করে ফুলের খুব ভালো লাগলো। কলেজ থেকে বইয়ের একটি লিস্ট নিয়ে আসলো। কিন্তু বিপত্তি ঘটল টাকা নিয়ে। ফুলের বাবা এযাবৎ এক পয়সাও ফুলের পিছনে খরচ করেনি। বছরে দুইটা জামা কিনে দেয় এই যা। আর সৎ মা তো সৎ মা ই। সেও ফুলকে সহ্য করতে পারে না। এখন কি করবে ভেবে পেল না। রাস্তা দিয়ে আনমনে হেঁটে ভাবছিল ফুল।
বাড়ি ফিরতেই ফুলের পিঠে কয়েকটা ঘা বসাল ফিরোজ। ফুলের চুলের মুঠি ধরে নিয়ে গেল রান্নাঘরে। সেখানে পুড়ে যাওয়া পাতিল দেখিয়ে বলল,” খা***র মা**গী, পাতিল পুইড়া কোন নাগরের সাথে প্রেম লীলা করতে গেছিলি? আমার ঘরের ক্ষতি না করলে তোর ভাল লাগে না?”
ফুল চিৎকার করে বলল, ” আব্বা, আমাকে ছেড়ে দাও।আমি পাতিল পুড়িনি। হয়তো মা করে আমার দোষ দিচ্ছে।আমি তো কলেজে গেছিলাম।”
” আমার বউরে দোষ দেওয়া? দাড়া আজ তোর কলেজের যাওয়া ছুটামু।”
ফিরোজ কথাটা বলে আকাশী গাছের কাঠ দিয়ে ফুলকে মা’র’তে শুরু করল। ততক্ষণ পর্যন্ত মা’র’তে থাকল। যতক্ষণ পর্যন্ত শরীরের শক্তি শেষ না হল।
বাবা চলে যেতে দুর্বল শরীরে ফুল উঠে বসলো। শরীরের প্রতিটা অঙ্গ ব্যথা করছে। এভাবে যে সে প্রথম মার খেয়েছে তা না। মায়ের মৃত্যুর পর প্রতি রাতে বাবা মাতাল অবস্থায় ফুলকে মেরেছে। কোন কারণ ছাড়াই গায়ে আঘাত করতে ভাবে না। ছাইয়ের এর উপর পড়ে থাকা ব্যাগখানা তুলে ঝেড়ে বুকের সাথে চেপে ধরল ফুল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ” দুখীফুল কী সারা জীবন দুখীই থাকবে? সুখের সন্ধান পাবে না?”
চলবে,,,,,,,