#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_২
ফুল সারা বেলা রান্নাঘরে শুয়েই কাতরাতে থাকল। কেউই তাকে সাহায্য করার জন্য আসলো না। এ জগতে যার বাবা ঠিক নাই তার কিছুই নাই। ওপরওয়ালার কাছে ফুলের অভিযোগের অন্ত নাই। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ তার জন্মদাত্রী মায়ের উপর। কেনো তাকে একা এই নশ্বর পৃথিবীতে রেখে চলে গেছে? ফুলকেও সাথে করে নিয়ে যেতো।
ফুলদের রান্নাঘর ঘর থেকে আলাদা। উঠোনের অপরপ্রান্তে। রান্নাঘরে মাটির দুইটি চুলা, ভাঙা হাঁড়ি পাতিল ও কাঠ লাকড়ি রাখা আছে। ফুলকে মে’রে সেখানেই রেখে এসেছে তার অমানুষ বাবা। রান্নাঘরের পিছনে অর্ধভেজা একটি পুকুর রয়েছে। কলপাড়ের পানি সেখানে পড়ে। কচুরিপাতা, কলমী শাক সহ বিভিন্ন জঙ্গলী গাছও রয়েছে সেখানে। সাজেদা বুবুর একটি দেশী গরু আছে। প্রতিদিন ফুলদের রান্নাঘরের পিছনের পুকুর পাড় থেকে গরুর জন্য ঘাস কা’টে। আজও এসেছে, অনেকটা সময় পর ফুলের কুঁকড়ে যাওয়া কণ্ঠ শুনতে পেল সে। কাঁচি, খাঁচা ফেলে আওয়াজ অনুসরণ করে এসে দেখল ফুলের বেহাল অবস্থা। “ও আল্লাহ গো! ফুল তোর কি হইছে”
বলে জড়িয়ে ধরল নিজের সাথে। গালে থাপড় দিয়ে জাগাতে চেষ্টা করল ফুলকে। ফুল নিভু নিভু চোখে উত্তর দিল,” আব্বা মা’র’ছে।”
সাজেদা ফুলকে ধরে বাইরে আনলো। আজ একটা বিহিত করেই তবে ক্ষান্ত হবে সে। উচু স্বরে ফিরোজকে ডাকল নাম ধরে। ফিরোজের অনেক বড়ো সাজেদা। চাচী বলে ডাকে ফিরোজ। ঘরের খিল খুলে বাইরে বের হয়ে ফুলকে পাশে দেখে কপাল কুঁচকে নিল সে,” কি হইছে, চিল্লাইতাছো কেন? কেউ ম’র’ছে নাকি?”
” মা হারা মাইয়াডা মরলেই তো তুই আর তোর বউ খুশি হোস। এমনকরে মারলি কেন, মাইয়াডারে? কি দোষ করছিল?”
” পাতিল পুড়ে ফেলছে, তাই মা’র’ছি।”
সাজেদা মাথায় হাত রেখে বলল,” ও আল্লাহ, তার লাইগা এমনে মারতে হয়? ঐ তুই মানুষ না জানোয়ার? ”
সাজেদার কথায় মাঝে লিপি বলে উঠল,” তোমার এতো মায়া লাগলে এই মাইয়ারে নিজের কাছে রাইখা দাও। এমন অলক্ষ্যী মাইয়া আমগোর চাই না।”
সাজেদা ফুলের হাত টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,” নিজপর সাথেই রাখমু ফুলরে। একটা ফুলের টোকাও পড়তে দিমু না। তোদের মতো পাষাণ নাকি রে! ফুলের মতো মাইয়ারে মাইরা কি অবস্থা করছোস!”
সাজেদা ফুলকে নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে গেল। বাড়িতে নিয়ে পান্তাভাতের সাথে কাঁচা পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ দিল খেতে। সাজেদাও খেয়ে নিল। ফুলকে শুইয়ে দিয়ে ব্যথানাশক ওষুধ আনতে বাজারে ছুটলো।
রাতের বেলা ফুলকে নিতে সাজেদার বাসায় ফিরোজ আসলো। সাজেদার হাতে পায়ে ধরে অনুনয় করে ক্ষমা চেয়ে নিল। পরবর্তীতে মেয়ের উপর হাত তুলবেন না বলেও জানালো। সহজ সরল সাজেদা একবেলা রাঁধে তিনবেলা খায়। ফুলকে নিজের কাছে রাখলে নিজের সাথে সাথে ফুলেরও খাওয়ার কষ্ট হবে ভেবে ফিরোজের সাথে পাঠিয়ে দিল।
ফুল জানে, তার বাবা কেনো তাকে বাড়িতে এনেছে। ফুলকে যখন ঘরে প্রবেশ করানো হল তখনই লিপি ফুলের হাত ঝাপটে ধরল। চোখে মিছে পানি এনে বলল,” মা রে! আমি মুর্খ মানুষ। না বুঝে কতো কথা বলি। আমাকে ক্খমা করে দে! আজকের পর থেকে তুই আমার মা। তুই যেভাবে বলবি সেভাবেই এই সংসার চলবে।”
ফুল আশ্চর্যের সপ্তম আকাশে তখন উড়ে বেড়াচ্ছে। যেই মানুষটা এবাড়িতে আসার পর থেকে মা বলা তো দূর! মায়ার দৃষ্টিতে ফিরেও তাকায়নি সেই মানুষটা ক্ষমা চাইছে? ফুলের কিছুতেই লিপির কথাগুলো সহজলভ্য মনে হল না। নিশ্চয়ই এর পেছনে কারণ আছে। ফুল বলল,” আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি কিন্তু বাবাকে কখনো ক্ষমা করব না।”
ফুল থরে চলে আসলো। পিছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারত, লিপির মুখের ক্রুর হাসি।
——————–
পরেরদিন সকালবেলা ফুল ভেবেছিল, আজকের সকালটা অন্যরকম হবে হয়তো। হয়তো ফুলের সৎমা রান্না করে রাখবে। ফুলবেন আসলে বলবে, মা রে! খালি মুখে কলেজে যাবি? একটু কিছু মুখে দিয়ে যা। নয়তো সারাদিন শরীর দুর্বল লাগবে।”
অথবা বাবা বলবে, ” আমার মইয়াটার মুখে কিছু খাবার তুলে দাও, লিপি। নিজের হাতে খাইতে গেলে মাইয়াটার ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।”
কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, এমন কিছুই ঘটেনি। প্রতিদিনের মতো ফুল কল পাড়ে গেল, থালা বাসন মেজে দুই কলস পানি রান্নাঘরে এনে রাখল। সকাল ও দুপুরে জন্য রান্না করে খালি মুখেই কলেজের জন্য রওনা হল।
বকুল ফুলের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নাফিস ফুলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ফুলের শরীর ভাল না। হেলে দুলে পথ হাঁটছে। যতক্ষণ সে বাইরে থাকে তার কপালে কষ্ট কম জুটে। নাফিস দূর থেকে ফুলকে দেখতে পেয়ে যা বুঝার বুঝলো। ফুল আসতেই পকেট থেকে খাতার কাগজে মুঠো করা কিছু একটা এগিয়ে দিল। কিন্তু আজ ফুল নিল না। হাত দিয়ে নাফিসের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, ” প্রতিদিন তোর ভাগের জিনিস আমি খেতে পারব না রে নাফিস। কাল থেকে আমার জন্য কিছু আনিস না।”
নাফিসের পছন্দনীয় কথাগুলো বলার পরও ফুল মাথা তুলল না। সে জানে না, কাউকে কষ্ট দিয়ে কথা বললে অনুশোচনা হয়! মেয়েটার মনে অনুশোচনাও জন্মাল না। নির্লিপ্তে নাফিসের পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। নাফিস বলল,” গতকাল রাতে ওয়াজ মাহফিলে গেছিলাম। ফ্রিতে তবারক দিয়েছে। তবারক মানে বুঝিস তো! ঐ যে হুজুররা ফ্রিতে যেই খাবার দান করে তাই তবারক। আমি পেট পুরে খেয়ে এসেছি। তুই আমার বাল্যকালের বন্ধু তাই নিয়ে এসেছি। খেয়ে নে তো! সওয়াব হবে।”
ফুল একবার নাফিসকে দেখল। কাগজে মোড়ানো নামযুক্ত তবারক নিয়ে দেখল, তাতে দুইটা সন্দেশ রাখা আছে। ছোটবেলা থেকেই সন্দেশ ফুলের খুব পছন্দ। তবারক দিলে যে কেউ মিষ্টিও দেয় জনা ছিল না ফুলের। সে সন্দেশে দুই কামড় বসিয়ে বলল,” আরিফা তোকে পছন্দ করে।”
নাফিস বলল,” জানি।”
” তুইও পছন্দ করতে পারিস, মেয়েটা মনের দিক থেকে ভাল শুধু একটু বেশি কথা বলে।”
নাফিস উত্তর দিল,” ভেবে দেখব।”
কথা বলতে বলতে দুজন কলেজে চলে আসলো। দুজনের পথও আলাদা হয়ে গেল। ফুল আরিফাকে খুঁজে পেল কলেজের ঝাও গাছের নিচে। পানি নেওয়ার জন্য লাইন ধরেছে মেয়েটা। ফুলকে এগিয়ে আসতে দেখে হাত নাড়িয়ে বলল,” এই যে ফুল আমি এইদিকে!”
ফুল মুচকি হেসে যেতে নিচ্ছিল তখনই কারো কন্ঠস্বর শুনতে পেল। ফুলকে উদ্দেশ্য করে কেউ বলল,” এই মেয়ে, তুমি সবসময় মনমরা হয়ে থাকো কেনো?”
ফুল তাকিয়ে দেখল। সুন্দর একজন ছেলে তার দিকে কেমন গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফুল বুঝল, এই ছেলেই ডেকেছে। ফুল পাত্তা দিল না চলে আসলো।
ক্লাস শুরু হতেই একজন নতুন শিক্ষক প্রবেশ করল। সকলের উদ্দেশ্য নিজের পরিচয় দিল, নতুন স্যারের নাম আদিল মাহমুদ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির শিক্ষক তিনি।
ফুল বসলো ডানপাশের তিন নাম্বার বেঞ্চে। সে লক্ষ্য করল, কিছুক্ষণ আগে ফুলকে জিজ্ঞেস করা ছেলেটা বসে আছে। তারমানে ছেলেটা ফুলের সহপাঠী। ছেলেটাকে নিয়ে ভাবনায় মশগুল থাকা অবস্থায় আকস্মিক পিছনে ফিরে তাকালো। শুধু তাকালে একটা কথা ছিল সে তো ফুলকে দেখে মুচকি একটা হাসি দিল। ফুল থতমত খেয়ে শিক্ষকের বক্তব্যে মনোযোগ দিল। পঞ্চম বেঞ্চিতে বসে থাকা নাফিস সবটাই খেয়াল করল।
কলেজ থেকে জানানো হল, পরের সপ্তাহে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নবীন বরন অনুষ্ঠান হবে। শ্রেণিকক্ষে আনন্দ ছড়িয়ে পড়লেও মনে দুঃখ বাসা বাঁধলো নবীন বরণ অনুষ্ঠান অথবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মানে সাজগোজ করে এবং নতুন কাপড় পরে আসতে হবে যা ফুলের কাছে নাই।
টিফিনের সময় আরিফা দুই বক্স বিরিয়ানি খুলে বসলো। ফুলকে বলল তার সাথে খেতে। ফুল খেতে নাকচ করলে আরিফা বলল,” বান্ধবী, নাফিসের সাথে একটু সেট করে দে না!”
ফুল ভাবল দুজন দুজনকে পছন্দ করবে এরথেকে ভাল আর কী হতে পারে! ফুল জানালা দিয়ে নাফিসকে যেতে দেখে হাঁক ছাড়ল,” নাফিস, শুনে যা।”
কলেজের ভেতর একে অপরকে যখন তখন ডাকা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে নাফিস এবং ফুলের মধ্যে। মূলত ফুলই এই আইন তৈরী করেছে। নাফিস অবশ্য এমন করতে নিষেধ করেছিল কিন্তু ফুল শুনেনি। নাফিসকে ডাকায় অবাক হল সে। জানালার কাছাকাছি এসে ফুলের দিকে না তাকিয়ে বলল,”ডাকছিস কেন?”
ফুল বলল,” বিরিয়ানি খাবি, আয়।”
নাফিস শ্রেণীকক্ষের ভেতর তাকালো। আরিফা হা করে তাদের কথোপকথন শুনছে। নাফিস তাকাতেই লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। নাফিস বলল,” তুই যেদিন নিজের হাতে রান্না করে নিয়ে আসবি সেদিন পেট পুরা খাব।”
ফুল তাচ্ছিল্যভাবে বলল, ” কুঁড়েঘরে থেকে আমার এতবার আশা করাও পাপ, নাফিস। তুই জানিস আমি কখনোই পারব না।”
নাফিস ফুলের চোখে চোখ রেখে বলল,” তুই কী জানিস ফুল, ভয় মানুষের অন্তরকে ধ্বংস করে দেয়!”
ফুল কিছু বলল না অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সবাই মিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য চিন্তা করলেও ফুলের চিন্ত বই নিয়ে। সে কীভাবে কলেজের বই জোগাড় করবে তা নিয়ে ভাবছে। ছুটির সময় আরিফার সাথেও কথা বলল ফুল। আরিফা বলল, সে ব্যবস্থা করে দিবে।
ফুল দেরী করেই বাড়ি ফিরল। বাড়ির ভেতর অনেক মানুষের কথার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ফুল উঠোনে পা রাখতেই লিপি আহ্লাদী সুরে বলল, ” ঐ তো আমার মেয়ে এসেছে।”
ফুল ভদ্রতার খাতিরে সবাইকে সালাম জানাল। সালামের উত্তর নিয়ে কয়েক জন মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ উচ্চধ্বনিতে চেচিয়ে উঠলো। একজন মহিলা এসে ফুলের হাতে মোটা বালা পরিয়ে বলল,” মেয়েকে আমাদের পছন্দ হয়েছে।”
ফুলের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সৎমায়ের দিকে তাকাল। লিপির মুখে তখন বাঁকা হাসি দেখতে পেল।
চলবে……..