#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_৩
নববধূ বেশে নিজের ঘরে বসে আছে ফুল। তার চোখ ভরা পানি। কিছুক্ষণ আগেই কাজি বিয়ে পড়িয়ে গেছে। ফুলের হাতে আরিব নামের মেহেদী পরানো হয়েছে। মেয়েদীর রংটা হলদেটে। দেওয়ার সাথে সাথে ফুল তুলে ফেলেছে।গাছের বাটা মেহেদী দেখে হালকা রং হয়ে আছে। নামটার উপর ফুল দুইবার হাত বুলিয়ে কেঁদে উঠল।
মেহেদিয়ার বর পাশের গ্রামের বড়োলোক বংশের। ফুলের সৎ মায়ের দূরের আত্মীয় হয় সে। ফুলের সৎ মা বিয়ে এনেছে। ফুলকে পাত্রের মা দেখেছিল। ফুলকে দেখে বিয়ের প্রস্তাব রাখে। গতকাল ফুলকে সাজেদা নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার পরই খবর আসে। বড়োলোক বাড়ি শুনে ফুলের নেশাখোর বাবার চোখজোড়া চিকচিক করে উঠে। তখনই সামনে শর্ত রাখে, ফুলকে সোনা গয়নায় মুড়িয়ে দিতে হবে। ভদ্রমহিলা রাজি হয়ে যায়। ফুলের বাবা আবারো প্রস্তাব রাখে, মেয়েকে বউ বানাতে হলে তাদের নগদ দুই লক্ষ টাকা দিতে হবে। ভদ্রমহিলা এতেও রাজি হয়ে যায়। লিপির লোভী চোখ জোড়া তখন চকচক করছিল। তাইতো ফুলের জন্য আনা গয়না থেকে কিছু গয়না নিজের জন্য লুকিয়ে রাখল।
ফুল কান্না করছিল তখনই সাজেদা বুবু দৌড়ে আসলো। ফুলের দুই বাহুতে ঝাঁকিয়ে বলতে শুরু করল,” কেমন অলক্ষুণে মেয়ে তুই হ্যাঁ রে ফুল! ভাবছিলাম বিয়ে হলেই মনে হয় তুই বাঁইচা যাবি কিন্তু তোর পোড়া কপাল সারা জীবন পোড়াই রয়ে গেল।”
‘” কি হয়েছে সাজেদা বুবু। তুমি এমন করছ কেন?”
সাজেদা পূর্বের মতোই আহাজারি করে বলতে শুরু করল, “তোর কপাল পুড়েছে রে কপালপুড়ি? তোর বর তোকে নিজের সাথে নিবে বলে না সাফ সাফ জানাইয়া দিছে। তোকে এখানেই পরে ম’র’তে হবে রে, ফুল!”
ফুলের চেহারায় অসহায়ত্ব ভেসে উঠল। চোখ জোড়া দিয়ে আপনা আপনি পানি ঝড়তে শুরু করল। তখনই দরজা ঠেলে একজন ভদ্রমহিলা ঘরে প্রবেশ করল। মহিলার বয়স পঞ্চাশের কোঠায় সম্ভবত। ইনি হচ্ছেন ফুলের শাশুড়ি। কুটুমকে দেখে সাজেদা উঠে দাঁড়াল। ভদ্রমহিলা ফুলের পাশে বসে ফুলের হাত ধরে বলল,” আমার ছেলেটা অবুঝ বুঝে কম। এখন জিদ ধরছে পরে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে কথা দিয়ে যাচ্ছি তোমার ভরণপোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ আমার। আমি প্রতি সপ্তাহে এসে তোমাকে দেখে যাব। তোমাকে কথা দিচ্ছি আমার ছেলেকে বুঝিয়ে বড় অনুষ্ঠান করে তোমাকে ঘরে তুলব। ”
ফুল কিছু বলল না এক দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকিয়ে রইল। ফুলের শাশুড়ি আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে গেল। সেই রাতেই বরপক্ষ চলে গেল বউ ছাড়া। গ্রামের মানুষেরা ছি ছি করতে থাকলো। ফুলকে অপয়া, অলক্ষ্যী বলে যা তা বলল। লোভী ফুলের বাবা ও সৎমায়ের কিছুই হল না। তারা দুজনেই খুশি হল। দুজনেই টাকা ও গয়না পেয়ে গেল। সমাজে ফুলের পরবর্তী দিনগুলো কেমন হবে তা ভাবল না।
বরপক্ষ চলে যাওয়ার পর সাজেদা বুবু ফুলের কাছে আবারও আসলো। মেয়েটার দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফুলের হাতে একটি কাগজ গুঁজে দিয়ে বলল, “তোর বর দিযছে। তোর কাছে পৌঁছে দিতে কইল। এহ! মাইয়াটার জীবন ঝুলাইয়া রাইখা চিঠি দেয়া! তুই ঘুমিয়ে যা। তোর জন্য ওপরওয়ালা যা রাখছে তাই হবে।”
ফুল কাগজের ভাঁজ খুলে দুই লাইন লেখা দেখতে পেল। লেখাগুলো পড়ে কাগজের ভেতর মুখ গুঁজে আবারো কাঁদতে শুরু করল।
——————
পরেরদিন নাফিস সেই বকুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ফুলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। দীর্ঘ বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পরও ফুলের দেখা পেল না। মন খারাপ করে প্যান্টের পকেটে হাত রাখল। আজ সে বিশেষ কিছু এনেছিল ফুলের জন্য কিন্তু দেয়া হল না। মন খারাপ করে একাই কলেজের পথে রওনা হল।
শ্রেণীকক্ষের শেষের বেঞ্চিতে ফুল বসে আছে। পুরো শ্রেণীকক্ষ ফাঁকা, কেউ আসেনি। ফুল আজ সকাল সকাল কলেজে চলে এসেছে। একরাতের মধ্যেই ফুলের জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। এমনিতেও যে সুখী ছিল সেটা বলা ঠিক হবে না। আগেও সে দুখী ছিল নতুন করে আরো দুখ যোগ হল। ফুলদের নতুন শিক্ষক এদিকেই যাচ্ছিল। আজ উনিও তাড়াতাড়ি কলেজে এসে পড়েছে। প্রথম বর্ষের শ্রেণীকক্ষে ফ্যান চলতে দেখে উঁকি দিল। ফুলকে দেখে হাতের বন্ধনীতে সময় দেখল। ক্লাস শুরু হতে এখনো ত্রিশ মিনিট বাকী আছে। এই তাড়াতাড়ি মেয়েটা চলে এসেছে? আদিল এগিয়ে আসতে নিয়েও আসলো না। কিছু একটা ভেবে চলে গেল। ক্লাস শুরু হওয়ার পনেরো মিনিট আগে ছাত্র ছাত্রী আসা শুরু করল। নাফিসও তখন পৌঁছাল। ফুলকে আগেভাগে চলে আসতে দেখে অবাক হল। সে পকেট থেকে শিউলি ফুলের মালাখানা বেঞ্চের উপর রেখে বলল,” আমার কাছ থেকে কিছু্ নিবি না মুখে বললেই তো হতো। এভাবে অপেক্ষা করালি কেনো?”
ফুল কিছু বলল না। তার দৃষ্টি শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করা ছেলেটির দিকে। ছেলেটিও ফুলের দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হতেই ফুল দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আকস্মিক কেউ ছেলেটিকে নাম ধরে ডাকল,” শুভ!”
ফুলের চাঞ্চল্য দৃষ্টি নাফিসের নজর এড়ালো না। সে আবার বলল,” কি হয়েছে তোর, ফুল?”
ফুল উত্তর দেওয়ার আগে আরিফা এসে উপস্থিত হল। দুজনকে একসাথে দেখে বলল,” আমাকে রেখে তোমরা কী গল্প করছো?”
নাফিস কিছু না বলে নিজের জায়গায় বসল। আরিফা দুনিয়ার গল্প জুড়ে বসলো।
————-
ফুলদের কলেজে দপ্তরির দায়িত্বে যিনি আছেন, ওনার নাম আলামত মিয়া। টিফিনের সময় ফুলের কাছে আসলেন তিনি। বেঞ্চের উপর প্রথম বর্ষের পুরাতন বই রেখে বললেন,” এগুলো তোমার।”
ফুল প্রশ্ন করল, ” কে দিতে বলেছে?”
দপ্তরি উত্তর দিল,” তোমার বান্ধবী কলেজের অসহায়দের লিস্টে তোমার নাম দিয়েছিল। এগুলো কলেজ থেকে দিয়েছে। শুধু তোমাকে না, অনেকেই বই পেয়েছে।”
ফুল বইগুলো নাড়াচাড়া করে বুঝতে পারল বইগুলো এতোটাও পুরোনো না। আরিফার দিকে শুকরিয়ার দৃষ্টিতে তাকাল। এদিকে আরিফা মাথা চুলকে ভাবতে লাগল, সে কখন এই কাজ করেছে।
ছুটির সময় ফুল শুভর সামনে পড়ল। শুভ এক দৃষ্টিতে ফুলকে দেখে চলে গেল। ফুলদের তথ্য ও প্রযুক্তির শিক্ষক আদিল মাহমুদ দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কলেজ থেকে ফেরার পথে ফুল ও নাফিস একসাথেই ফিরছিল। ফুল কথা বলছিল না দেখে নাফিসই বলল,” বললি না তে, তোর কি হয়েছে?”
ফুল হাঁটা বাদ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। নাফিসের দিকে দুইহাত এগিয়ে দিয়ে বলল,” আমার বিয়ে হয়ে গেছে, নাফিস!”
নাফিস দেখল ফুলের মেহেদী রাঙা হাত। যেখানে একটি নাম লেখা আছে। ফুল সেখানে তাকিয়েই কাঁদছে। নাফিসের চোখজোড়াও লাল হয়ে গেল। তার ছোট বেলার বন্ধুর বিয়ে হয়ে গেল অথচ সে জানতেই পারল না। নাফিস শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,” ছেলেটি কে?”
উত্তরে ফুল বলল,” বলতে পারব না।”
নাফিসের রাগ হলো। সে পাশের গাছের গোড়ায় লাথি দিয়ে বলল,” মশকরা করিস না,ফুল?”
ফুল কান্না করতে করতে মাটিতে বসে পড়লো। গতকাল রাতের পুরো ঘটনা নাফিসকে জানালো। তার বরের চিঠির কথাও জানাল কিন্তু বরের পরিচয় বলল না। নাফিস চোখ বন্ধ করে লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে হাঁটু গেড়ে ফুলের সামনে এসে বসলো। ফুলের মাথায় হাত রেখে বলল,” আমি সবসময় তোর পাশে আছি, ফুল! যদি কখনো মনে হয় বিয়ে নামক সম্পর্কের মায়াজাল থেকে বের হয়ে আসতে! আমাকে বলিস। আমি সব ব্যবস্থা করে দিব।”
ফুল অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,” আমার আপন বলতে কেউ রইল না, নাফিস। কেউ না।”
নাফিসের অন্তরে গিয়ে বিঁধল কথাটা। সত্যিই কী নাফিস তার কেউ না!
—————–
বাড়িতে ফিরে লিপিকে নিজের ঘরে পেল ফুল। ফুলের বিয়ের গয়না নাড়াচাড়া করছে সে। ফুলকে দেখামাত্রই বলল,” তোর আক্কেল জ্ঞান কবে হবে শুনি? এতো সোনা গয়না কেউ এভাবে ফেলে যায়?”
ফুল ভ্রু যুগল কুঁচকে নিলো। লিপির হাত থেকে গয়নার বক্সগুলো নিয়ে বলল, ” আমি তো গয়নাগুলো যেখানে সেখানে ফেলে যাইনি। কাঠের বাক্সোতে রেখেছিলাম। তোমার হাতে এগুলো কী করে?”
লিপি থতমতো খেয়ে আমতা আমতা করতে লাগল। ফুল যা বুঝার বুঝে গেল। গয়নাগুলো পুনরায় কাঠের বাক্সোতে রেখে বলল,” এগুলো আমার। আর কখনো আমার গয়নাতে হাত দিবে না।”
লিপি বেশ অপমানিত হল। সে মুখ বাঁকা করে বলতে শুরু করল,” তুই কী কইতে চাস, তোর গয়নার দিকে আমি নজর দিছি। এতো বড়ো সাহস? বিয়া হইয়া সাহস বাইড়া গেছে। হো আনি তে খারাপ আর তুই পাক পবিত্র। এরলাইগাই তোর স্বামী তোকে ফালাইয়া চইল্লা গেছে।”
ফুলের চোখে পানি আলে আসলো। ঘরের শত্রুই বিভীষণ। ফুল ধরা গলায় বলল,” আমি বিয়ে বসতে চাইনি। তোমরাই নিজেদের ফায়দার জন্য আমাকে বলির পাঠা বানাইছো।”
ফুলের বাবা তখনই ঘরে প্রবপশ করল। ফুলের শেষোক্ত কথাগুলো শুনে বলল, ” কি কইলি তুই,ফুল?”
লিপি স্বামীকে দেখে নাটক শুরু করল,” কি মাইয়া জন্ম দিছো। আমারে কয়, আমি নাকি চোর। আমারে বিয়া করার সময় বললা না যে, তোমার মাইয়া এতো বড়ো বেয়াদব? জানলে তোমার ঘরে পা রাখতাম না।”
লিপি মিছে কান্না শুরু করল। ফিরোজ নেশায় ছিল, বউয়ের মরাকন্না শুনে ফুলকে সবসময়ের মতো মারার জন্য এগিয়েই যাচ্ছিল। এমন সময় ফিরোজের নাম ধরে কেউ ডেকে উঠলো। ফিরোজ ফুলের দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে বাইরে চলে গেল।
চলবে…………….