#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_৪
ফুলের শ্বশুর বাড়ি থেকে ফুলের জন্য জিনিসপত্র এসেছে। ভ্যান গাড়ীতে দুটো বড়ো ট্রাংকে মেয়েদের প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় থেকে শুরু করে, স্নো, তেল, আলতা সবই আছে। এগুলো সব ফুলের শাশুড়ি পাঠিয়েছেন। বকশি মিয়া নামক একজন ভদ্রলোক গাড়ি থেকে ট্রাংক নামিয়ে ফুলের উদ্দেশে বললেন,” আপনার থাকার ঘরটা কোনদিকে বউমামনি?”
ফুল ইশারায় নিজের ঘর দেখিয়ে দিল। লিপি বলল,” ঐ ঘর তো ছোট। আপনি বরঞ্চ আমাদের ঘরে রেখে আসেন, চাচা।”
বকশি মিয়া ফুলের শ্বশুর বাড়ির বিশ্বস্ত একজন মানুষ। ষোলো বছর ধরে এবাড়িতে কার্যরত অবস্থায় আছেন। বড়ো মায়ের কাছে সবই শুনেছেন। তিনি বললেন,” মা বলে দিছেন, ট্রাংক দুইটা বউমামনির ঘরেই রেখে আসতে। আমি আলমারি আনি নাই। ট্রাংক এনেছি। এগুলো চৌকির তলেও রাখা যায়।”
ফুলের শাশুড়িকে বকশি চাচা মা বলে ডাকেন।
লিপির লোভী চোখজোড়া নিমিষেই বন্ধ হয়ে গেল। বকশি মিয়া ফুলের ঘরে নিয়ে বিছানার উপরই ট্রাংকগুলো রাখল। ফুলের পরিবারও পিছু পিছু আসলো। ফুল এক গ্লাস পানি বকশি মিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,” কাকা, পানি।”
গামছা দিয়ে মুখ মুছে বকশি মিয়া পানি নিল। এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি পান করে বলল,” মা ঠিকই কইছে, তুমি আসলেই লক্ষ্মী একটা মাইয়া।”
ফুল মুচকি হেসে বলল,” দুপুরে খেয়ে যাবেন, কাকা।”
বকশি মিয়া নাকচ করে বলল,” না বউমামনি, আমার যাইতে হবে। বাবু বাজারে অপেক্ষা করতাছে। বলছে, এগুলো তোমার হাতে তুলে দিয়া তাড়াতাড়ি যাইতে।”
আমরা সাধারণত ছোট বাচ্চাদের আহ্লাদ করে বাবু ডাকি। ফুল ভাবল, বকশি মিয়ার বাচ্চা হবে হয়তো! সে কথার প্রেক্ষিতে বলল,” বাবুকে নিয়েই আসতেন। কুটুম বাড়িতে কেউ খালি মুখে চলে যায় নাকি?”
ফুল খেয়াল করল, বকশি মিয়ার মুখখানা মলিন হয়ে গেল। মাথা নিচু করে ঘর ছেড়ে বাইরে বের হল। গলায় গামছা ঝুলিয়ে বলল,” বাবু আসবে বউমামনি। তোমারে রাইখা যাওয়ার কারণে মা এখন পর্যন্ত বাবুর সাথে কথা বলে নাই। তুমি চিন্তা কইরো না, বাবু খুব নরম মনের মানুষ। রাগ কমলে এমনেই চলে আসবো।”
ফুল এতক্ষণে বুঝতে পারল, ফুলের বরকে বকশি কাকা বাবু বলে ডাকে। এতো বড়ো মানুষটাকে বাবু বলার কারণ খুঁজে পেল না ফুল। বকশি কাকা যাওয়ার আগে ফুলের মাথায় হাত রাখলো। তাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে ফুলকে দেখে বেশ পছন্দ হয়েছে। ফুলের হাতে একশো টাকার চকচকে নোট গুঁজে বলল,” নতুন বউয়ের মুখ দেখলে কিছু দিতে হয়। তুমি খুব ভালা। দেখবো, তুমি খুব সুখী হইবা।”
বকশি মিয়া চলে গেল। ফুল হাতের টাকার দিকে তাকিয়ে আপনমনে বলল,” দুখীফুল সারাজীবন দুখীই থাকবে, কাকা। সুখীফুল হতে পারবে না।”
ফিরোজ এমনিতেও নেশা করে এসেছিল। বকশি মিয়ার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল কোনো কথা বলেনি। বকশি মিয়া চলে যেতেই নিজের ঘরে শুয়ে পড়লো। গতকাল গরম গরম টাকায় দেশী ম’দের সাথে বিলেতি ম’দও কিনেছে সে। দিনের বেলা বলে অল্প খেয়ে এসেছে।
লিপি সময় নষ্ট না করে ট্রাংক খুলে বসলো। ফুলের জন্য আসা জিনিসপত্র দেখে চোখ ছানাভরা হয়ে গেল। একটি ট্রাংকে শাড়ি, থ্রি পিস আর অপরটিতে তেল সাবান আলতা স্নো দেখে মাথা নষ্ট হশে গেল।
লিপি তাড়াহুড়ো করে দুইটা শাড়ি ও সাজগোজের কিছু জিনিস আঁচলের নিচে লুকাল। ফুল ঘরে এসে সৎমায়ের আপাদমস্তক দেখে বলল,” আমার জিনিস আমাকে ফেরত দাও।”
লিপি ভাঙা গলায় বলল, ” কোন সব জিনিস।”
ফুল লিপির আঁচলের নিচ থেকে শাড়ি টেনে বলল, ” এগুলো।”
লিপি অপমানিত হল। ফুলের বিয়ে দেওয়া নিয়ে আফসোস করতে লাগল। মেয়েটা বিয়ের পর কেমন সাহস দেখাতে শুরু করেছে। লিপিও কম না, ফুলের একটা না একটা ব্যবস্থা না করে শান্ত হবে না। লিপি কটমট চোখে তাকিয়ে চলে গেল।
ফুলের সামনে শাড়ি, গহনা সবই আছে কিন্তু মনের কোথাও সুখ নেই। ফুল কিছুই ব্যবহার করল না। সব গুছিয়ে তালা মেরে দিল।
——————
বিকালবেলা ফুল বাড়ি থেকে বের হল। উদ্দেশ্য সাজেদার বাড়ি। ঘর ছেড়ে বের হতেই গতকাল রাতের উঠোনের দৃশ্য চোখে ভেসে উঠলো। বিয়ের সাজ সাজিয়ে ফুলকে একটিবারের জন্য উঠোনে আনা হয়েছিল। ফুলের বরও উপস্থিত ছিল। তার ভোঁতা মুখের দিকে একপলক চেয়ে ফুল অবাক হয়েছিল। ফুলের থেকে বেশি অবাক হয়েছিল তার বর। বউরূপে ফুলকে দেখামাত্রই দাড়িয়ে পড়েছিল। ফুলের শাশুড়ি পাশেই বসা ছিল। ছেলেকে জোর করে বসিয়ে দিয়ে ফুলের উদ্দেশে বলেছিল,” তুমি ঘরে যাও, মা!”
ফুল চলে আসার পর কী হয়েছিল সে জানে না। তার কিছুক্ষণ পরই কাজি বিয়ে পড়াতে আসছিল।
গতকাল রাতের কথা ভেবে ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাজেদা বুবুর বাড়িতে গিয়ে জানল, সে বাড়িতে নেই। মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে বই খাতা উলটাতে লাগল।
—————
বিয়ের অনেক খাবার রয়ে গেছে। ফুল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কিছু খাবার গরম করে নিল। রোজকার মতোই রান্না করে, থালাবাসন ধুয়েমুছে কলেজের জন্য রওনা হল। আজ সে সময়ের অনেক আগেই বের হয়েছে। বকুল গাছের নিচে এসে নাফিসের জন্য অপেক্ষা করছে। নাফিস আসলো, দশ মিনিট পরে। ফুলকে আগেভাগে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকাল সে। ফুলের কাছে এসে,” শরীর ভাল তোর?”
ফুল উত্তর দিল,” ভাল।”
ব্যাগ থেকে খাবারের বক্স বের করে বলল,” তোর জন্য।”
নাফিস ভ্রু যুগল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,” এতে কি আছে?”
” পোলাও, রোস্ট।”
নাফিস বলল, ” তোর বিয়ের?”
ফুল মাথা ইশারা করে হ্যাঁ বলল। নাফিস মুখ ফিরিয়ে বলল,” খাব না। আরিফাকে নিয়ে খেয়ে নিস।”
ফুল কিছুটা মনমরা হয়ে বলল,” তুই তো প্রতিদিনই আমার জন্য কিছু না কিছু আনিস। আমি ভাবলাম!”
ফুলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে নাফিস বলল,” আজও এনেছি। মহেশখালি থেকে বড়োভাই লাড্ডু এনেছে।”
ফুল হাত বাড়িয়ে বলল,” কই আমাকে দে!”
নাফিস পকেট থেকে কাগজের ঠোঙা বের করে ফুলপর হাতে দিয়ে বলল,” তোর খাবার ব্যাগে রাখ ফুল। ঐ খাবারও আমার দেখতে ভাল লাগছে না।”
লাড্ডুতে এক কামড় বসিয়ে ফুল হেসে ফেলল। নাফিস অবাক হয়ে সেই হাসি দেখছে। ঠিক কতোদিন পর ফুল হাসছে সে কী জানে? এই হাসির কারণ কী ফুলের বিয়ে? যদি তাই হয় তবে নাফিস তার কেমন বন্ধু হল, যে ফুলের মুখে কখনো হাসি ফোটাতে পারেনি!
ফুল হাসি থামিয়ে বলল,” তুই কী রেগে আছিস?”
নাফিস কিছু বলল না। হাঁটতে থাকল।
আরিফার মতো বাচাল মেয়ের সাথে যে বন্ধুত্ব করবে সে পাগল হবে নিশ্চিত। নাফিস ও ফুলের কলেজে পৌছাতে অনেক দেরী হয়ে গেল। যার দরুন, ফুল আরিফার পাশে জায়গা পেল না। নাফিস পিছনের সিটে বসতে পারলেও ফুল জায়গা পেল না। আজ নতুন তিনজন ভর্তি হয়েছে। অতিরিক্ত বেঞ্চ আনতে গেছে কেউ।
নাফিস উঠে গিয়ে ফুলকে জায়গা করে দিত কিন্তু ছেলেদের সাথে ফুল আদৌও বসবে? এমন সময় ক্লাস শুরু হওয়ার ঘন্টা বেজে গেল। ফুলদের প্রথম ক্লাস তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। ফুল সামনেই দাড়িয়ে ছিল। শ্রেণি শিক্ষক আদিল মাহমুদ ক্লাসে ঢুকে ফুলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করল, ” কোনো সমস্যা? ”
ফুল নতমাথায় উত্তর দিল, ” জায়গা নেই।”
আদিল স্যার সারা ক্লাসের চোখ বুলিয়েবলল,” শুভ কোথায়?”
একজন উত্তর দিল,” বেঞ্চ আনতে গেছে, স্যার।”
এমন সময় শুভ চলে আসলো। সাথে আরেকজনকে নিয়ে বেঞ্চ ধরাধরি করে ক্লাসে আসার অনুমতি চাইলো। নাবিল স্যারের অনুমতি পেয়ে পিছনে না ফিরেই আগাচ্ছিল। ফলস্বরূপ ফুলকে দেখতে পেল না। ফুল তাদের আগানো দেখে পেছনে যেতে যেতে দেয়ালের সাথে লেগে দাঁড়াল। অনাকাঙ্খিতভাবে শুভ ফুলের দিকেই পেছাতে থাকল। ফুলের কাছাকাছি যাওয়ার সময় আদিল মাহমুদ উঁচু আওয়াজে বলল,” এই সাবধান!”
শ্রেণিকক্ষের সকল শিক্ষার্থী ভয় পেয়ে গেল।সকলের দৃষ্টি তখন ফুলের দিকে নিবদ্ধ। শুভও পেছনে ফিরল। ফুলের থেকে এক ইঞ্চি দূরত্বে সে ছিল। শুভ শান্ত চোখে ফুলকে দেখে বেঞ্চ সেখানে রেখে চলে আসল।
আদিল নিঃশ্বাস ফেলে ফুলের উদ্দেশে বলল, ” বসো।”
ফুল বসলে আদিল আবারো বলতে শুরু করল,” শুভ ফুলের পাশে গিয়ে বসো।”
ফুল তাকিয়ে দেখলো শুভর সথে আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে বেঞ্চটা তারা নিজেদের জন্য এনেছিল। ফুল উঠে যেতে নিলে আদিল নিষেধ করে বলল,” পনেরো মিনিট এমনিতেই চলে গেছে। শুভ তাড়াতাড়ি বসো। আজ একটি ইম্পরট্যান্ট চ্যাপ্টার শুরু করব।”
শুভ অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দূরত্ব রেখে ফুলের পাশে বসল। সারা ক্লাসে ফুল পড়া বুঝতে পেরেছে কি না জানে না। তবে অস্বস্তিতে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল।
টিফিনের সময় আরিফা ব্যস্ত হয়ে ফুলের পাশে এসে বসলো। ফুল নাফিসের জন্য পোলাও এনেছিল। আর আরিফার জন্য পায়েস। নাফিস যেহেতু খাবার নেয়নি তাই আসার সময় দারোয়ান চাচাকে দিয়ে এসেছিল ফুল। আরিফার দিকে পায়েস এগিয়ে দিয়ে বলল,” এটা তোর জন্য।”
আরিফা খুশিতে গদগদ হয়ে চামচ হাতে নিল। আজ শুভ বাইরে যায়নি। ক্লাসরুমে বসেই নোট করছিল। বলাবাহুল্য শুভ অনেক ভাল স্টুডেন্ট। সারা ক্লাসে শুভর গুনগান অনেক। আরিফা শুভকে দেখে বলল,” এই শুভ, টিফিন করবে না?”
শুভ লেখতে লেখতেই উত্তর দিল,” আশিকের নোটটা শেষ করেই যাব।”
আরিফা বলল, ততক্ষণে টিফিনের সময় শেষ হয়ে যাবে। তুমি বরং আমাদের সাথে শেয়ার কর।”
কথাটা বলে আরিফা পায়েসের বাটি শুভর দিকে এগিয়ে ধরল। শুভ কিছুক্ষণ পায়েসের দিকে তাকিয়ে বলল, ” আমি খাব না। তোমরাই খাও।”
শুভ সোখানে থাকল না। হনহনিয়ে শ্রেণীকক্ষের বাইরে চলে গেল। আরিফা শুভর চলে যাওয়া দেখে মুখ বাঁকা করে বলল,” প্রতিটা ভাল ছাত্রদের ভাব দেখলে, মাথায় ডাব ফা’ টা’ তে মন চায়।”
চলবে………