দুখীফুল পর্ব-০৫

0
441

#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_৫

ফুলের সৎ মা এতো সহজেই অপমান হজম করে নিবে তা ভাবাও বোকামি। শুক্রবারে ফুলের বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো জায়গা নেই। বাড়ির কোণেই পড়ে থাকতে হয়। ফুলের বিয়ের খবর ইতিমধ্যে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিকালে পাড়া প্রতিবেশী মহিলারা দলে দলে আসতে শুরু করেছে। ফুল জানালা দিয়ে তাদের দেখল। সে জানে তারা ফুলকে অপদস্ত করার জন্যই এসেছে। খোশগল্প করা তো বাহানা মাত্র। লিপি সবাইকে দেখে আহ্লাদী সুরে বলল,” আসেন, আসেন ভাবী! কী কপাল আমার। ভাবছিলাম দুই নাম্বার বউ হইয়া আইছি বলে কেউ দেখতে পারবে না। আপনারা আসেন আমি খুব খুশি হইছি।”

একজন বলল,” ফুল কই? আমরা তোমারে দেখবার আইছি না,বউ!”

লিপি হায়হায় প্রলাপ করতে থাকল,” আমার ফুলপর মতো মাইয়াডার কথা কী আর কমু? কপালপোড়া মাইয়ার সংসার হউয়াও হইলো না। বিয়ার পরও বাপের ঘাড়েই পড়তে হইলো।”
প্রতিবেশীদের চেহারার দিকে তাকিয়ে লিপি আওয়াজ করে ডাকল,” ফুল রে! ও ফুল। তোকে দেখতে আসছে।”

অনিচ্ছা সত্বেও ফুল ঘর থেকে বের হয়ে আসলো। তার পরিধানে বাড়িতে পরে থাকা মলিন কাপড়। ফুলকে দেখে বলল,” তোর বর তোকে রাইখা গেল আর তুই থাইকা গেলি? বরের পিছনে চইলা যাইতি। তোর শ্বশুর বাড়ির মানুষরাই কেমন। পুলারে বিয়া করাইয়া তোরে বাপের ঘাড়ে রাইখা গেছে!”

ফুল সৎমায়ের দিকে তাকিয়ে বুঝলো এদের সেই দাওয়াত করে এনেছে। লিপি পান সাজাতে বসে উত্তর দিল,” মা যদি সঠিক শিক্ষা দিয়া মরতো তাইলে আক্কল হইতো। বুঝেনই তো মা মরা অবুঝ মাইয়া। কয়েকদিন পর আক্কল হইলে নিজেই চইলা যাইবো।”

ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,” আমার কপালটা সত্যিই খুব খারাপ, চাচী। নইলে নেশাখোর বাবা টাকার জন্য খোঁজ খবর না নিয়েই বিয়ে দিয়ে দেয়?”

ফুল চলে আসলো। পিছনের প্রতিবেশীদের মুখ এইটুকু হয়ে গেল। এই জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় মৃত্যু। মৃত্যুও ফুলের কাছে আসে না। তার আপজনদের কেড়ে নিয়ে যায়। যেমন তার মাকে!
ফুল ঘরের দরজা আঁটকে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকল। মা’রে’র আঘাতের চেয়েও মানুষের কথার আঘাত বড়ো। এমনিতেও তার দুখ কম ছিল না। এখন আবার বিয়ে নামক বন্ধনের দোহায় দিয়ে নতুন দুখ শুরু হলো। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেল। ফুলকে খাওয়ার জন্যও লিপি ডাকলো না। অবশ্য কখনোই ডাকা হয় না। কতোরাত তো ক্ষুধায় ছটফট করতে করতে ফুল ঘুমিয়ে পড়ে। ফিরোজ মিয়া কখনোই মেয়ের খোঁজ নেয় না।

রাত তখন দশটা বাজে। গ্রামাঞ্চলে রাত দশটা মানে মধ্যরাত। এই রাতে ফিরোজের ঘরের দরজায় কেউ কড়াঘাত করছে। ফুলের কানে আওয়াজ এলো ঠিকই কিন্তু ঘর থেকে বের হলো না। কেননা, ফিরোজ রাত করেই নেশাকরে বাড়ি ফিরে। দরজা খুলতে দেরী হলে ফুলকেই মারধর করে। কিছুক্ষণ পর লিপি দরজা খুলে দিল। অপরপাশের মানুষটাকে দেখে বলল,” বাবা, তুমি?”

ফিরোজ বাড়িতেই ছিল। দুইদিনে জু’য়া খেলে টাকা হেরে বসে আছে। লিপি জানতে পারলে গর্দান নিয়ে নিবে। ফিরোজ দ্রুত চেয়ার এনে দিল। জামাই এই প্রথম বাড়ি এসেছে। সাধ্যির মধ্যে আপ্যায়ন করতেই হবে। লিপি লেবুর শরবত বানালো। আরিবের সামনে গ্লাস এগিয়ে দিলে দ্বিধায় পড়ে গেল। দুজনকে ব্যস্ত হতে দেখে বলল,” ব্যস্ত হবেন না।”

লিপি আহ্লাদী হয়ে বলল,” কি কইতাছো, বাবা! তুমি তো আমাদের মাইয়ার জামাই। তোমারে দেখবাল না করলে, লোকে কী কইবো?”

আরিব কিছু বলল না। ফিরোজ জিজ্ঞেস করলো,” তা বাবাজি, এতো রাতে কি মনে কইরা।”

আরিব শান্ত সুরে উত্তর দিল,” আজ এখানেই থাকব। আপনাদের কোনো সমস্যা হবে না তো!”

লিপি খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,” আরে না! সমস্যা হইবো কেন? দাঁড়াও ফুলরে ডাক দেই। ফুল, ও ফুল রে!”

বিবাহিতার স্ত্রীর নাম শুনলে কী কারো হৃদকম্পন বেড়ে যায়? পৃথিবীতে হয়তো সেই প্রথম স্বামী, যার স্ত্রীর নাম শুনলে হৃদকম্পন বেড়ে যায়। তাকে দেখলে রাগ হয় কিন্তু মায়াভরা মুখ দেখলে গলে যেতে ইচ্ছে হয়। পবিত্র বন্ধন হয়তো এমনই। ফুলকে এখানে ফেলে রেখে প্রতিনিয়ত অনুশোচনায় ভুগছে সে। ফুল সময় নিয়ে দরজা খুলল। তার চোখজোড়া ফোলা, নাকের ডলা লাল গোলাপি। আরিব একবার দেখে মুখ ফিরিয়ে নিল। এই মেয়ের মায়ায় সে জড়াতে চায় না। তার জীবনে এখনো অনেক কিছু করা বাকী।
ফুল নিজের স্বামীকে দেখে চমকাল। রাগ নাকি অভিমান সে জানে না। যেভাবে এসেছিল সেভাবেই ঘরে চলে গিয়ে দরজা আটকে দিল। লিপি ইতস্তত হয়ে মিথ্যা হেসে বলল,” মনে হয়,লজ্জা পাইছে।”

আরিব জানে, মেয়েটা লজ্জা পায়নি। বরঞ্চ একজন কাপুরুষকে দেখে অন্তরের আগুনকে নেভানোর মিথ্যা চেষ্টা করছে। একজন বিবাহিতা মেয়ের বিয়ের পরের জীবন শ্বশুর বাড়িতেই থাকতে হয়। অথচ, আরিব অসহায়! মেয়েটাকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে না।

ফিরোজ এগিয়ে এসে মেয়েকে ডাকল,” জামাই আসছে, দেখোস নাই? দরজা খোল। খাওনের ব্যবস্থা কর।”

ফুল দরজা খুলল না। আরিব চেয়ার ছাড়লো লিপি ভাবল, আরিব চলে যাবে। তাই বাঁধা দিয়ে বলল,” যাইয়ো না বাপজান। তুমি আমগোর ঘরে থাকো। ও তো এমনই, পোড়ামুখী।”

আরিবের গায়ে কথাটা লাগল। নিজের মেয়েকে কেউ পোড়ামুখী বলে? আরিব দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ডাকল,” দরজা খুলো, ফুল!”

ফুল দরজা খুলল না। মুখে ওড়না চেপে বসে রইলো। আরিব পুনরায় বলল,” তুমি কী চাও, এতরাতে আমি চলে যাই? এতে গ্রামের মানুষেরা ভাল বলবে?”

ফুল দরজা খুলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। আরিব ঘরে প্রবেশ করে চারপাশে নজর ঘুরিয়ে বলল,” মা যেই জিনিসপত্র পাঠিয়েছে তা ব্যবহার করো না?”

লিপি দৌড়ে আসলো। নিজেই চৌকির নিচ থেকে ট্রাংক বের করে লাল টুকটুকে জরজেটের শাড়ি বের করল। ফুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,” যা পোড়ামুখী, শাড়িটা পরে আয়। স্বামীর সামনে সেজেগুজে থাকতে হয়।”

ফুল মোমের পুতুলের মতো ধীরপায়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আরিব দেখল, ফুলের ঘরে পাখা নেই। অথচ সে ঘেমে জবুথুবু অবস্থায়। শার্টের দুইটা বোতাম খুলে বিছানায় বসল। লিপি ঘর থেকে নড়ছে না। এমনভাব করছে, যেনো ফুলের নয় নিজের স্বামী এসেছে। আরিব লিপির উদ্দেশে বলল,” আপনি কী কিছু বলবেন?”

লিপি হেসে বলল,” না, না। তুমি বসো বাবা। আমি ফুলের বাপ কি করে দেইখা আসি।”

আরিব হাতঘড়ি বালিশের পাশে রেখে শুয়ে পড়লো। কপালে হাত রেখে সন্ধ্যার কথা ভাবতে লাগল। আরিবের মা দুপুর থেকে অনাহারে বসে আছেন। বকশি কাকার কাছে খবরটা শোনার পর বাড়ি এসে সোজা মায়ের কাছে যায় সে। আরিবের মা মুখ ফিরিয়ে নেন ছেলের থেকে। বকশি কাকা ডাকতে থাকলেন,” মা, বাবু আসছে। এবার তো কিছু খেয়ে নেন।”
আরিব বলল,” এ কেমন ছেলেমানুষি, মা! খাওয়া বন্ধ করেছো কেনো? তুমি ভুলে যেও না, তোমার ডায়বেটিস আছে। না খেয়ে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”

” আমার কিছু হলে তোদের কী? তোরা ভাই বোনেরা তো আমার মৃত্যুই চাস। নয়তো এমন ফুলের মতো মেয়েকে বাবার বাসায় রেখে আসতি না।”

আরিব মায়ের হাত ধরে বলল,” তাকে রেখে আসার কারণটা তোমাকে বলেছি মা!”

আরিবের মা হুঙ্কার ছাড়ল,” তোর বাবার মৃত্যুর পর একা লড়াই করে চলছি। আমাকে কাউকে ভয় পেতে দেখেছিস? নাকি আমার পছন্দের উপর তোর ভরসা নেই।”

আরিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠের খাদ নিচে নামিয়ে বলল,” আমি কী করব, বলো।”

আরিবের মা উত্তর দিল,” মেয়েটার কাছে যা। বাড়িতে আনতে সমস্যা হলে তুই ওর কাছে যা। ওর মনে এই ভাবনা আসতে দিস না যে, তুই তাকে ঠকাচ্ছিস।”

আরিব মাকে কথা দিয়েছিল সে আসবে। বকশি কাকা বাজার পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছেন। আরিব নিষেধ করলেও শুনলেন না। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও ফুলের বের হওয়ার নাম নেই। আরিব ভাবল, একবার গিয়ে ডাকবে। দেখা গেল আরিবের ডাকতে হল না। ফুল দরজা খুলে বের হয়ে আসলো। তার গায়ে আগের পোশাকই। শাড়ি পরেনি। অবশ্য আরিবও চায়নি ফুলের অনিচ্ছায় যেকোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে। ফুল চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আরিব উপরের দিকে তাকিয়ে বলল,” আমি জানি, আমার উপর তোমার অভিযোগের অন্ত নেই। কিন্তু আমি অসহায়। কিছু কারণে তোমাকে মেনে নিতে পারছি না। মা বলেছে, তোমার কাছে আসতে। এইটুইই। আসলে মা হঠাৎ করে এভাবে বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলবে ভাবতে পারিনি। আমার একটা স্বপ্ন আছে। আমি অনেক বড়ো হবো। নিজের জীবন গুছিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিব। কিন্তু মা মানল না। জোর করে বিয়ে করতে বাধ্য করল।”

ফুলের চোখের অবাধ্য পানি চলে যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। সেও তো বিয়ের কথা ভাবেনি। না ভেবেছে, এই বন্দীশালায় থাকতে। সে তো বাঁচতেই চায় না। কীসের আশায় বাঁচবে সে? কার জন্য? তার আপন বলতে কেউ নেই।

ফুলকে নড়তে না দেখে আরিব ফুলের দিকে পাশ ফিরল। ভ্রু যুগল কুঁচকে বলল,” তুমি কী কাঁদছিলে?”

প্রশ্নটা করে নিজেই বোকা বনে গেল। সাধারণত এতো কথা বলার মানুষ সে নয়। বিশেষকরে অপরিচিতদের সাথে সহজে মিশতে পারে না। আরিব পুনরায় বলল,” তুমি কী যেখানে একবার দাঁড়াও সেই জায়গা কী বাপের সম্পত্তি বানাও? কলেজেও খেয়াল করেছি। আর সবসময় মনমরা হয়ে থাকো। কেনো?”

” কারণ, আমি দুখীফুল।”

আরিব বসা থেকে উঠে বসলো। ফুলের কথাটা তার অন্তরে গিয়ে বিঁধল। তার সাথে বিয়ে হওয়ার পর কী ফুলের জীবন এলোমেলো হয়ে গেল? আরিবের মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে গেল। সে আজ না আসলেও পারতো! মেয়েটার মনের দুঃখ বাড়িয়ে দিল। আরিব উঠে দাঁড়িয়ে বলল,” আমি চলে যাচ্ছি।”
ফুল মিনমিন সুরে বলল,” এতো রাতে…

আরিব মায়ের কথা স্বরণ করল। তার মা নিশ্চয়ই কষ্ট পাবে! সে দেখল, বিছানায় একটাই বালিশ। একপাশে চেপে শুয়ে বলল,” পাখা ছাড়া আমার ঘুম আসে না। তুমি কীভাবে এখানে ঘুমাও?”

ফুলের বলতে ইচ্ছে করছিল। সে তো ছোটকাল থেকেই এভাবে থাকে কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য দেয়াল কথা বাড়াতে নিষেধ করল।

অনেকটা সময় পাড় হলে ফুল সামনের মানুষটির নড়াচড়া পেল না। ফুল বুঝল, মানুষটা ঘুমিয়ে গেছে। ফুল ধীরপায়ে এগিয়ে এসে জমিনে বসে পড়লো। মানুষটার দিকে এক পলক তাকিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজল। কিছুক্ষণ পর পর কেঁপে উঠছে মেয়েটা। আরিব নিঃশব্দে ফুলের দিকে ফিরল। আজ ফুলের এই কান্নার জন্য দায়ী একমাত্র সে।

———-

পরেরদিন খুব সকালে ফুল বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। সারারাত নির্ঘুমে থেকেছে সে। ফুল কলেজের পথে আগালো না। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই হাঁটতে শুরু করল।

চলবে……….