দুখীফুল পর্ব-০৮

0
459

#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_৮

পরেরদিন সকালটা হলো দুখী ফুলের জন্য সুখের সকাল। ফুলের সৎ মা বাড়ি নেই তো কথা শোনানোরও কেউ নেই।
এই সুখে ফুল মনের আনন্দে বিরিয়ানি রান্না করল। রান্নাবান্নার কাজ শেষ করে ফুল ছোট দুইটি বক্সে বিরিয়ানি ভরল। শুভর জন্য ছোট হটপটে নিল। নাফিসের জন্য বরাদ্দকৃত বক্স সবার উপরে রেখে কলেজের উদ্দেশে রওনা হল।

প্রতিদিনের মতো আজও বকুল গাছের নিচে নাফিসকে দেখতে পেল ফুল। নাফিস বকুল ফুল কুড়াচ্ছে নিশ্চয়ই ফুলের জন্য। ফুলকে দেখে চমকাল নাফিস। আজ ফুল সুন্দর করে চোখে কাজল পরেছে, ঠোঁটে কৃত্রিম রং শোভা পাচ্ছে। নাকের সোনার নাকফুল জ্বলজ্বল করছে। কানে শোভা পাচ্ছে ছোট সোনার টপ। নাফিস চোখ ফেরাতে পারছে না। সবচেয়ে বেশি নজরকাড়া সৌন্দর্য হল, ফুলের হাসি। হাসির জন্যই সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
নাফিসের কাছে এসে ফুল বিরিয়ানির বক্স বের করে বলল,” আমি বানিয়েছি। খেয়ে দেখ তো, কেমন হয়েছে?”

বিনা সংকোচে নাফিস বক্স নিল। দাঁড়িয়েই দু চার লোকমা খেয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। ফুল উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করল,” কেমন? ”

তার চোখে মুখে উত্তর পাওয়ার আকাঙ্খা বিরাজ করছে। নাফিস বলল,” ভাল হয়েছে। আজ কী উপলক্ষে রান্না করলি, শুনি? বর আসবে নাকি?”

নাফিস লক্ষ্য করল, বরের কথা বলতেই ফুল লজ্জায় নুইয়ে পড়েছে। নাফিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,” তোর জন্য বকুল ফুল কুড়াচ্ছিলাম। এই নে।”

ফুল নাকের কাছে নিয়ে ফুলের ঘ্রাণ নিল। নাফিস আবারো বলল,” গতকাল রাতে বাবা চাল আনতে বাজারে গেছিল। দোকান একটাও খোলা পেল না। আমি বলেছিলাম, নিমকি আনতে। কিন্তু পেল না। চল, হাঁটতে হাঁটতেই খাওয়া শেষ করি।”

ফুল খুশিমনে বলল,” হাঁটতে হবে না। তুই এই কাঁঠাল গাছের গোঁড়ায় বসে খাওয়া শেষ কর। আমি আরো ফুল কুড়িয়ে নেই।”

নাফিস বসতে বসতে ফুলকে লক্ষ্য করল। মেয়েটার মধ্যে যেনো প্রাণ ফিরে এসেছে। কেমন সতেজ, উজ্জল। পূর্ণ নক্ষত্র লাগছে। মধুচন্দ্রিমার আলো উপচে পড়ছে বদন জুড়ে। ফুল বকুল ফুল কুড়িয়ে নিয়ে ভাবল, সে কী তার বাবু বরের জন্য ফুল নিচ্ছে? পরক্ষণেই নিজেই উত্তর সাজাল, নিলে ক্ষতি কী? তার বাবু বর তো তারই।

নাফিস খাওয়া শেষ করে পানি পান করল। ফুলকে তাগাদা দিল, রওনা দেয়ার জন্য। ফুলের কোনো খবরই নাই। অগত্যা নাফিস ফুলের ব্যাগে ধরে টেনে টেনে নিয়ে আসতে লাগলো। এদিকে ফুল বলছে, ” ছাড় নাফিস! আরো কয়েকটা ফুল নিয়ে নেই।”
নাফিস শুনলে তো! দেরী হলে কলেজে ঢুকতে দিবে না, মেয়েটার খেয়াল আছে?

কলেজে কাছাকাছি এসেও ফুলের পূর্ণ মনোযোগ বকুল ফুলের মধ্যে দেখল নাফিস। সে বিরক্তির সুরে বলল,” কার জন্য এতো যত্ন করে নিলি, শুনি?”

ফুল মিথ্যে বলল,” আরিফার জন্য।” কিন্তু মনে মনে মিথ্যা বলার জন্য ওপরওয়ালার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল।

কলেজে আসার আগে যতোটা প্রফুল্লচিত্তে ছিল শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করে ফুলের মন ততোটায় বিষন্নতায় ঘিরে ধরল। আজ শুভ তার দুই বন্ধুদের সাথে বসেছে। শুভর চোখজোড়া দরজার দিকে তাক করা ছিল। ফুলকে দেখামাত্রই ঠোঁট উলটে ইশারায় জানাল,” এরা আজ আমাকে জোর করে বসিয়ে দিয়েছে। আমি নিরপরাধ।”

শুভর নিষ্পাপ চেহারা দেখে মন খারাপ উবে গেল। ফুল ফিক করে হেসে পিছনের বেঞ্চে আরিফার পাশে বসলো। ফুলকে পেয়ে আরিফা আজ আসমানের বড়ো চাঁদটা হাতে পেয়ে গেল। সে ফুলকে জড়িয়ে ধরে বলল,” বান্ধবী! তোর গালে দুইটা চুম্মা। কী সুন্দর লাগছে তোকে।”

ফুল হেসে শুভর দিকে তাকাল। শুভ এদিকেই তাকিয়ে ছিল। ফুলকে দেখে মাথা ঘোরানোর অভিনয় করে পাশের জনের কাঁধে ঢলে পড়ল। ফুল লজ্জায় লাল নীল হতে লাগল।

————————–

টিফিনের সময় ফুল উৎ পেতে বসে রইলো। কখন সবাই বাইরে বের হবে। শুভর একটা বিষয় ফুল সবথেকে বেশি পছন্দ করে। আর সেটা হল, শুভ কখনো সময় নষ্ট করে না। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দেখা যায় না। টিফিনের সময় বইয়ের ভেতর মুখ গুঁজে রাখে। গতকাল কীভাবে যেনো, ফুলকে নিয়ে বাইরে বের হয়েছিল। আজ যায়নি। নাফিস বাইরে যাওয়ার সময় ফুলকে ডেকে বলল,” চল বাহিরে যাই।”

ফুল বলল, আমি তো খাবার নিয়ে এসেছি। তুই যা।”

নাফিস চলে যাওয়ার পর আরিফাও নাফিসের পিছু ছুটল। আরিফার জন্য বিরিয়ানি এনেছিল সেটা দেয়ার সুযোগ পেল না। মেয়েটা এতো চটপটে না! এক জায়গায় বসেই না। ফুল বক্সটা আরিফার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। বাসায় গিয়ে খাবে নে।

শ্রেণীকক্ষে আরো দুইজন ছেলে পিছনে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। ফুল তাদেরকে দেখে শুভর কাছে ধীরপায়ে এগিয়ে আসলো। বিনা শব্দে বেঞ্চে শুভর পাশে বসে হটপট এগিয়ে দিল। শুভ ফুলকে পাশে দেখে বই বন্ধ করে ফেলল। ফুলের দিকে তাকিয়ে বলল,” জানো, মা কী বলেছে?”
ফুল উত্তর দিল, কী?”
” তেমাকে কিছুদিনের জন্য আমাদের বাসায় নিবে। দারুণ হবে না! আমার কথা বলার একজন মানুষ কিছুদিন হলেও তো থাকবে! তবে আমাদের পড়াশোনার ব্যাঘাত একটু ঘটবে। ব্যপার না, তোমাকে সহ পড়তে বসে যাব। দুইজন পড়ব, আর গল্প করব।”

ফুল বিরিয়ানির হটপট এগিয়ে দিয়ে বলল,” বিরিয়ানি এনেছিলাম।”

শুভ প্রসস্থ হাসি দিল। খুশিতে তার চোখজোড়া চিকচিক করছে। হটপট নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নিল। আহা বলে খাওয়া শুরু করল। শুভ খাচ্ছে ফুল অপলকভাবে তাকিয়ে আছে। খাওয়ার একপর্যায়ে শুভ বলল,” দিলে তো আমার ডাইটের রুটিন নষ্ট করে! জানো ফুল, একবছর আগে আমি ছিলাম গোল টমেটো। এসএসসি প্রি টেস্ট পরীক্ষায় তো সম্মানে কাদামাটি মেখে ফেলেছিলাম। বাংলা পরীক্ষার সময় প্যান্ট ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। ভাবতে পারছ, কী অবস্থা? পরে আদিল ভাইয়া আমার জন্য নতুন প্যান্ট এনে উদ্ধার করেছিল। এরপর থেকে খাওয়া দাওয়া নিয়ে খুব সতর্ক থাকি।”

শুভর কথা শেষ হতেই ফুল হাসতে লাগল। তার হাসিতে মুক্ত ঝড়ছে। শুভ হেসে বলল, ” আমি বড়ো একটা পাপ করেছি।”

ফুলের হাসি মিলিয়ে গেল। সে বলল, ” কী পাপ?”

শুভ বলল,” দুইদিন তোমাকে কষ্ট দিয়ে। আসলে তুমিও ছোট, আমিও ছোট। তোমাকে দেখলেই ছোট হওয়ার কষ্ট মনে পড়ে যেতো। তাই রাগ দেখাতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু দেখো, পারলাম না। বউয়ের আঁচলেই গিট্টু খেলাম।”

ফুল আশেপাশে তাকিয়ে বলল,” আস্তে বলো।”

শুভ হটপটের অর্ধেক বিরিয়ানি খেল। বাকী অর্ধেক ফুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,” স্বামী স্ত্রীর ভাগাভাগি করে খেলে সংসারে বরকত বাড়ে। হোক আমরা আলাদা, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য বরকত তো সঞ্চয় করে রাখতে পারি! কি বলো?”

ফুলের হাসি পেল। বরকত সঞ্চয় করে রাখা যায় প্রথম তার বাবু বরের কাছ থেকেই শুনলো। ফুল হটপট গুছিয়ে রাখতে নিলে শুভ বাঁধা দিয়ে বলল,” একদম না, এখনই এখানে বসে বাকীটা শেষ করবে। নয়তো আজ চিঠি পাবে না।”

ফুল আহত হল। শুভ চিঠি দিবে না শুনে মনমরা হয়ে মাথা নীচু করে রাখল। শুভ চ বর্গীয় শব্দ করে বলল,” আহা, মজা করেছি তো! আচ্ছা শুনো, তোমার মন ভাল করে দেই। বিরিয়ানিটা কিন্তু ভীষণ মজার হয়েছে। আমাদের বাসায় গেলে সপ্তাহে ছয়দিন বিরিয়ানি রান্না করবে। খবরদার, শুধু আমার জন্য রান্না করবে। আদিল ভাইয়ার বউ তার জন্য রাঁধবে।”

এরপর শুভ আশেপাশে তাকিয়ে ফুলের কাছাকাছি এসে ফিসফিস করে বলল,” একটা সিক্রেট কথা শুনবে? ভাবী না ইউটিউব রাঁধুনি। নিজের বুদ্ধিতে ডিমও ভাজতে জানে না।”

বলে শুভ হাসতে লাগল। ফুলের হাসি পেল না। সে চিন্তিত সুরে প্রশ্ন করল,” ছয়দিন বিরিয়ানি খেলে একদিন বাদ যাবে কেনো?”

উত্তরে শুভ মিনমিন করে বলল,” একদিন তোমার ছুটি। সেদিন আমরা বাহিরে ঘুরব, ফিরব, খাব।”

ফুলের কান গরম হয়ে আসল। শুভর ভসবনা চূড়ান্ত পর্যায়ে না পৌঁছলেও কাছাকাছি তো আছে। কবে যেনো মুখ ফসকে অন্য কথা বলে ফেলে। শুভ দেখল, টিফিন শেষ হতে পাঁচ মিনিট বাকী আছে। শুভ ফুলকে তাগাদা দিল,” তাড়াতাড়ি খাও,ফুল! নয়তো, বরকত চলে যাবে।”

ফুলে লাজুক হেসে শুভর পাশদিক থেকেই খাওয়া শুরু করল।
টিফিনের সময় শেষ, ফুল উঠে যেতে নিলে শুভ কলম দিয়ে ফুলের হাতে টোকা দিয়ে বলল,” আমার চিঠির উত্তর কই?”

ফুল মিনমিন করতে লাগলো। শুভ মানল না গম্ভীর সুরে বলল,” ছুটির পর গেইটের কাছে চিঠি নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করবে। এহ! নিজে একাই স্বাদ নিবে। আমি নিতে চাইলেই দোষ!”

ফুল হা করে তাকিয়ে রইলো। এরমধ্যে বাংলা শিক্ষক প্রবেশ করল। পিছনে নাফিস, আরিফা এলো। নাফিসের নজর গেল, শুভর পাশে দাড়িয়ে থাকা ফুলের উপর। ফুল শুভর কথার প্রত্ত্যুত্তরে বলল,” আচ্ছা দাঁড়াবো।”

শুভ বিশ্বজয়ী হাসি উপহার দিল।
—————-

ছুটির সময় নাফিস ফুলকে নিয়ে গেইটের বাহিরে অপেক্ষা করছিল। ফুল আসতে দেরী হচ্ছে দেখে নাফিস ফুলকে খুঁজতে যাচ্ছিল। তখনই নাফিসের নজর পড়ে কলেজের বারান্দার উপর। ফুল শুভকে কাগজ দিচ্ছে। সাথে সকালে কুড়ানো বকুল ফুলও দিল। নাফিস মনে মনে বলল,” ফুল আমাকে মিথ্ঢ়া বলল কেনো? ও তো ফুলগুলো আরিফাকে দিবে বলেছিল। শুভ বকুলফুল নকের কাছে নিয়ে কি যেনো বলল। ফুল তা দেখে লজ্জা পেল। নাফিস চোখ সরাতে নিয়েও সরালো না। তার আগেই দেখতে পেল, শুভও ফুলকে কী যেন দিল। নাফিসের কেনো যেনো হিংসা হল। ছোটবেলার বন্ধু বলে? নাকি নাফিসের মনে অন্যকিছু চলছে? যার জন্য ফুল অতি শীঘ্রই নাফিসকে ভুল বুঝবে!”

চলবে……………..