#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_৯
নাফিস ফুলকে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। তবে তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল, ফুলের বিয়ে হওয়ার পর পরপুরুষের সাথে মেলামেশার কারণ কী? নাফিস তার ছোটবেলার বন্ধু। তারসাথে মেলামেশা আলাদা কথা। ফুল কোনো ভুল করছে না তো! একজন ভাল বন্ধু হিসাবে নাফিসের কী উচিত, ফুলকে সাবধান করা!
নাফিস আনমনে ফুলের কথাই ভাবছিল। ফুল তার পাশেই হাঁটছে আর কী ভেবে যেনো হাসছে। নাফিস ফুলের উল্লাস দেখে প্রশ্ন করল,” তোর বর দেখতে কেমন রে, ফুল?”
ফুল মজার ছলে উত্তর দিল,” বুড়াদের মতো।”
নাফিস বলল,” তোকে শ্বশুর বাড়ি নিবে না?”
ফুলের মন খারাপ হয়ে গেল। শেষে কী না নাফিসও একই প্রশ্ন করছে? ফুল উত্তরে বলল,” নিবে, তবে দেরীতে।”
নাফিস শুভর ব্যপারে জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিল তখনই ফুল দেখতে পেল বাদাম ওয়ালা। ফুল নাফিসকে দেখিয়ে বলল, ” বাদাম খাবি? আজ টাকা আছে।”
নাফিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল বলল, ” চল।”
————–
বাড়ি ফিরে ফুলের সৎ মায়ের চলে আসা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল ফুলের। উঠোনে আসতেই লিপি তেড়ে ফুলের কাছে ছুটে আসল। ফুলের চুলের মুঠোয় ধরে রান্নাঘরে নিয়ে পাতিল দেখিয়ে বলল, ” চাল, মাংস কী তোর শ্বশুর বাড়ি থেইকা নিয়ে আসছোস, অলক্ষ্মী? কার কাছে জিজ্ঞেস কইরা এতো বিরিয়ানি রান্না করছোস? আর দেখি দেখি….
কথা শেষ না করেই ফুলের কলেজের ব্যাগ টেনে নিল। চেইন খুলে দুটো বক্স দেখে অদূরে নিক্ষেপ করে বলল,” কার লাইগা খানা নিয়ে গেছিলি? তোর কোন নাগর আছে কলেজে, শুনি? কাইল থেইকা কলেজে যাওয়ার নাম মুখে নিয়ে দেখিস তোর অবস্থা কি করি। এহ, বাপের নাই দুই পয়সার কামাই। হেয়, কলেজে পড়তে যায়। যা বাড়ির সব কাজ কর।”
ফুল অঝোরে কাঁদছে। চুলের গোড়া ব্যথা করছে। হাতের কব্জিতে লাল দাগ পড়ে গেছে। ফুল লিপিকে বলল,” আমাকে নিজেদের কাছে কী এজন্যই রাখছো, যেনো কাজের মেয়ের মতো আচরণ করতে পার?”
” হো, কি করবি? শ্বশুর বাড়ির মাইনষেরে কইয়া দিবি? একবার বলে দেখ, আমিও বলে দিমু কলেজে যাওয়ার সময় কোন ছেলের সাথে যাস। অবশ্য, আমি তো সত্যি কমু না। যা করোস নাই তাও বানাইয়া কমু। আমার কথা বিশ্বাস করতো না তো কার কথা বিশ্বাস করব। কারণ, আমিই তো তোরে বিয়ে করাইছি।”
ফুল চমকাল। নাফিস তার ছোট বেলার বন্ধু। তাকে নিয়ে সৎ মায়ের ঘৃণিত মনোভাব দেখে রাগ হল। সে জোরেই বলল,” ও আমার ছোট বেলার বন্ধু। তোমার মতো খারাপ মহিলা যেই ঘরে থাকবে সেই ঘর কোনোদিনও শান্তিতে থাকবে না। তুমি একটা জঘন্য মহিলা।”
লিপি ফুলের গালে সজোরে থাপ্পড় বসাল। শাড়ির আঁচল কোমরে চেপে আরো কয়েকটা ঘা বসালো ফুলের পিঠে। ফুলকে টেনে হিঁচড়ে ঘরে নিয়ে বলল,” কাজ কর নয়তো আজ তোরে মা’ই’রা ফেলমু।”
ফুল ভীষণ ভয় পেল। লিপি কাছে আগালে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পিছনে চলে গেল। ভাঙা কন্ঠস্বরে তাড়াহুড়ো করে বলল,” তোমার পায়ে ধরি, আর মে’র না। আমি সব কাজ করে দিব।”
লিপির মুখে বিশ্বজয়ী হাসি ফুটে উঠল। সে তো এটাই চেয়েছিল, ফুল তার সব কথা শুনুক। বিয়ের পর মেয়েটার জবান লম্বা হয়ে গিয়েছিল। আজকাল নিজের মনমতো চলতেও শুরু করে দিয়েছে। লিপি জীবিত থাকা অবস্থায় ফুলকে সুখী দেখতে পারবে না। সহ্য হবে না। এই বাড়ির সব লিপির।
এখন তার নজর পড়েছে ফুলের গহনাদির উপর। সেগুলো মেয়েটা না দিলে জোর করে নিতে পারে লিপি।
ভেবেই বিশ্রীভাবে হাসলো লিপি। গলার চেইন হাতে নিল।যেটা সে ফুলের বিয়ের দিন চুরি করে রেখে দিয়েছিল।ঘুরিয়ে বলল,” এই চেইনের দাম আর কতোই হবে। আসল সোনা তো ফুলের কাছে আছে।”
——————
সব কাজ শেষ করে ফুল ঘরে ফিরল। ফুল মায়ের কানের দুল বিক্রি করে কলেজে ভর্তির টাকা ও ড্রেসের টাকা জোগাড় করেছিল। লিপি আজ ড্রেসটাও টেনে ছিঁড়ে ফেলল। ফুল পোশাক পরিবর্তন করে কলেজ ড্রেস হাতে নিয়ে দেখতে পেল, অনেকটাই ছিঁড়ে গেছে। সেলাই করলেও বুঝা যাবে। ফুলের কাছে নতুন পোশাক বানানোর টাকা নেই। চোখের পানি মুছে ফুল কলেজ ড্রেস রেখে দিল।
পাখা ছেড়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তেই শুভর চিঠির কথা মনে পড়ল। ফুল ব্যাগ খুঁজতে গিয়ে ঘরের এক কোণেই পড়ে থাকতে দেখল। ব্যাগের মধ্যেও কাঁদা লেগে আছে। ফুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিঠি বের করল। লিপি এখনো জানে না, শুভ তাদের কলেজেই পড়ে। জানলে হয়তো, মুখে কথা না বলে কলেজে না যাওয়ার কাজটা স্ব শরীরে গিয়ে ব্যবস্থা করে আসতো।
ফুল চিঠির ভাজ খুলে পড়তে নিলেই লোডশেডিং হয়ে গেল। টেবিলের ড্রয়ার থেকে মোম বের করে খাটের কোণায় গরম মোম ঢেলে আঁটকে নিল। তার অন্তর কাঁপছে। এমনটা তখনই হয় যখন সে শুভর চিঠি পড়তে যায়। মোমের আলোয় শুভর চিঠি পড়তে শুরু করল,
অর্ধ দুখীফুল,
সম্মোধনটা অদ্ভুত শোনা গেলেও আজকাল তোমার মধ্যে অসীম পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারছি। আমার আশপাশে থাকলে তোমার মুখে কেমন উজ্জ্বলতা চলে আসে। তাই তোমাকে এই নামে ডাকলাম। রাগ করেছো? নাও, মন ভালোও করে দিচ্ছি। তোমার জন্য আমার চিন্তা হয় না। পড়তে বসলে তো মনেই পড়ে না। খেতে বলতে তুমি খেয়েছো কী না, স্বরণ হয় না। ঘুমাতে গেলে নিচে তাকাই না। মাঝরাতে তোমাকে বিছানার পাশে বসারত অবস্থায় পাব, তা ভাবিই না। আমাদের বিয়ের পর আমি মিথ্যা বলতে শিখেছি; তোমাকে নিয়ে।
ভাইয়ার তোমাকে নিয়ে অনেক চিন্তা। সে বিশ্বাস করতে পারছে না তুমি আমার সাথে সুখী হবে। অবশ্য চিন্তা করার কারণও আছে, আমরা ছোট। ছোট বলে ভেবো না, তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববো না। অবশ্যই ভাববো। এই চিন্তা করার জন্য ওপরওয়ালা আমাকেই তো সিলেক্ট করেছে। তোমার, আমার, আমাদের সন্তানাদির, নাতি নাতনির ভবিষ্যৎ আমাকেই ভাবতে হবে। দেখেছো, আমার চিন্তা ভাবনা কতো দূর পর্যায়ের। তুমি আবার আমাকে দুষ্ট ভেব না। আমি তোমার একমাত্র ভদ্র বাচ্চা বর।
আজ কী হয়েছে বলতে পারো! বকশি কাকার মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমাদের বাসায় এসেছে। তার স্বামী নাকি পরকীয়ায় আসক্ত। ভাবতে পারছো! কি অবস্থা। আমি তোমাকে বলে দিলাম ফুল! আমি নিতান্তই ভদ্র বর। ফুল ছাড়া অন্য মেয়ের দিকে এখন না পরেও তাকাব না। আমরা একে অপরকে বিশ্বাস করব, হ্যাঁ!
শুনো ফুল, তোমার জন্য দুইটা শাড়ি কিনেছি। একটা লাল গোলাপি রং আরেকটা হালকা আকাশীরং। অবশ্য আদিল ভাইয়া পছন্দ করে দিয়েছে। আমি পেমেন্ট করেছি। তোমার মনে প্রশ্ন আসলো না, আমি টাকা কোথায় পেলাম? উত্তর আমিই দিয়ে দিচ্ছি। তোমার বর, ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে যেই টাকা পেয়েছিল, সেটা জমিয়ে রেখেছিল। গতকাল তোমাকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে মনে হল, বর হিসাবে আমারও তোমাকে কিছু দেয়া উচিত। এখন আবার পালটা আমাকে কিছু দেয়ার কথা মাথায়ও আনবে না। আমার কিছুই চাই না শুধু তোমার হাসিমুখ দেখতে চাই।
আজও তোমাকে আমার দেয়া নামে ডাকতে পারলাম না। যেদিন মনে হবে, তুমি নামটার জন্য প্রস্তুত সেদিন ডাকব।
ইতি,
তোমার ভদ্র বর
পুনশ্চঃ
বিরিয়ানিটা অনেক মজার ছিল। তোমার বাবার বাড়ি থাকা অবস্থায় একদিন হান্ডি পাতিল নিয়ে তোমার দুয়ারে ভীড় করব বিরিয়ানি রান্না শেখার জন্য। আমাদের দেশে এমন কোনো সংবিধান তৈরী হয়নি, যেখানে শুধু মেয়েরাই রান্না করবে। ছেলেদেরও প্রয়োজন মেয়েদের সাহায্য করা! তুমি জানো, স্ত্রীকে সাহায্য করা সুন্নত!
আরেকটা কথা, আজ তোমাকে সুন্দর লেগেছে। ক্লাসে মন বসাতে পারিনি। অনেক গল্প করতে ইচ্ছে করছিল। আর সেজে এসো না, নয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ ভয়ংকর রকমের……..
চিঠির শেষাংশ পড়ে ফুল শব্দ করে কাগজ উলটে ফেলল। তার অন্তর দুরুদুরু কাঁপছে। বাবু বর সত্যিই অদ্ভুত ভাল। নয়তো তার মতো দুখীফুলের কপালে সুখী বর মিলে!
—————-
পরেরদিন ফুল আর কলেজে গেল না। কলেজ ড্রেস ছিঁড়ে গেছে বলে নয়, বরঞ্চ গতকালকের মা’র খাওয়ার পর শরীরের তীব্র ব্যথায় জ্বর আসার কারণে। এখন বাজে দুপুর আড়াইটা। ফুল জ্বরে কাবু হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। গতকাল রাত থেকে তার পেটে কিছুই পড়েনি। সেই যে, শুভর সাথে আধটুকু বিরিয়ানি খেয়েছিল সেই পর্যন্তই।
আজ সকালে নাফিস ফুলের জন্য অপেক্ষা করেছিল কিন্তু ফুল আসেনি। সে মনে করেছে, হয়তো ফুলের মন খারাপ তাই আগেই কলেজে চলে গেছে। কিন্তু কলেজে এসেও দেখল ফুল আসেনি তখন একটু চিন্তা হল।
এদিকে শুভও ফুলের দেখা না পেয়ে মন খারাপ করে সারাটা সময় পাড় করল। ফুলের অনুপস্থিতিতে শিক্ষকদের বুঝানো পড়াও মাথায় ঢুকল না। কলেজ ছুটির সময় শুভ নাফিসকে ডাকল, ” এই শুনো? ফুলের কী হয়েছে বলতে পারবে?”
নাফিস ত্যাড়াভাবে উত্তর দিল,” আমাকে কী ফুলের দেহরক্ষী মনে হয়! যে, ফুলের কী হয়েছে জানবো?”
শুভর মুখ বাঁকা হয়ে আসলো। মনে মনে বলল,” এহ, হিংসুটে বন্ধু। আমি বুঝি না! ফুলের পাশে আমাকে দেখলে তোমার জ্বলে বন্ধু, তোমার গা জ্বলে।”
নাফিসের সামনে মিছে হাসি দিয়ে অহ বলে কাটিয়ে চলে আসলো।
ঠিক আড়াইটা বাজে শুভ ফুলদের বাড়িতে এসে পৌঁছাল। লিপি তখন আরাম করে রুই মাছের ইয়া বড়ো মাথাটা চিবুচ্ছিল। অসময়ে সোনার হরিণকে দেখে খাওয়া থামিয়ে দিল। শুভ এক পলক শাশুড়িকে দেখে বলল, ” থেমে গেলেন কেনো? কন্টিনিউ করেন। ফুল ঘরে আছে তো?”
লিপি মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ সম্মতি দিল। শুভ কথা না বাড়িয়ে ফুলের ঘরে চলে গেল। এদিকে লিপির গতকালকের ঘটনা মনে পড়ল। সকালে ফুলকে শুয়ে থাকতে দেখেছিল।লিপির হাজারো বকা শুনেও মেয়েটা বের হয়নি। লিপির ভয় হতে লাগল, ফুলের কিছু হয়নি তো? ম’রে টরে গেলে তো আবার পু’লি’শ কে’সে ফে’সে যেতে হবে তাকে। রুই মাছের মাথাটার স্বাদও চলে গেল তার ভাবনা মতো। প্লেটে শব্দ করে ফেলে হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল।
শুভ ফুলের ঘরে এসে দেখল, ফুল উপুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। তার বাম হাতে শুভর খোলা চিঠি। পাশেই শেষ হয়ে যাওয়া মোম অযত্নে পড়ে আছে। শুভ ফুলকে দুইবার ডাকল কিন্তু ফুলের কোনো সাড়া পেল না। শুভ ফুলের দিকে হাত বাড়িয়ে নিয়েও গুটিয়ে নিল। ফুলের অনুমতিতে একবার হাত ধরার পর মনে হয়েছিল মেয়েটা ভয় পেয়েছে। এখন যদি!
নাহ আর ভাবতে পারছে না। শুভ দিক ঠিকানা না পেয়ে তার মাকে ফোন করল,” মা, ফুলের কি যেনো হয়েছে। ডাকলেও উত্তর দিচ্ছে না।”
ঐপাশ থেকে শুভর মা বললেন,” কি হয়ে গেল, মেয়েটার। দেখতো অজ্ঞান হয়ে গেছে কী না?”
শুভ মিনমিন করে বলল,” আমি ফুলকে ছুবো না মা! তুমি আসো।”
কথাটা বলেই ফোন রেখে দিল শুভ। সে জানে তার অগ্নি মাতা কী উত্তর দিবে। শুভ ফুলের হাত থেকে চিঠি নিয়ে বইয়ের ভাঁজে রাখল। ঘরের চারপাশে নজর বুলিয়ে কলেজের ড্রেসের দিকে নজর গেল। কাঁদায় মাখামাখি অবস্থা পোশাকের। ইতস্ততভাবে জামাটা হাতে নিল শুভ। জামার বেহাল অবস্থা দেখে সেখানে রেখে দিল।
লিপি হুড়মুড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করে দেখল, শুভ দাড়িয়ে আছে। লিপি ভাল মা সাজার নাটক চালিয়ে গেল। ফুলের কাছে গিয়ে শরীরে দুইটা ঝাঁকি দিয়ে বলল,” আরে, অবেলায় ঘুমাইয়া আছোস কেন? জামাই বাবাজী আসছে। চা নাস্তার ব্যবস্থা করতে হইবো নাকি! ফুল, ও ফুল!”
ফুল নড়েচড়ে সোজা হলো। ওড়না বিহীন ফুলকে দেখামাত্রই শুভ পিছনে ফিরে তাকালো। তার কী যে হল! হঠাৎ পানির পিপাসা লেগে গেল। লিপি ফুলের গায়ে হাত রেখে বুঝল, জ্বর এসেছে। ঠোঁটের কোণাও ছিলে গেছে। লিপি কোণা চোখে শুভর অবস্থান দেখে দ্রুত ওড়না দিয়ে ফুলের গা ঢেকে দিয়ে শুভর উদ্দেশে বলল, ” আসলে বাবা, ফুলের যা ঘুম! সামান্য জ্বর আসছে।”
শুভ উত্তর দিল,” ঔষধ আনেননি?”
লিপি ইতস্তত হওয়ার ভাব নিয়ে বলল,” আসলে কীভাবে যে বলি? ঘরে একটা টাকাও নাই যে, মেয়েটার জন্য ঔষধ কিনে আনব।”
শুভর মেজাজ খারাপ হল। সে মানিব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকার দুটো নোট বের করে লিপির দিকে এগিয়ে ধরল,” ফুলের জন্য আর নিজেদের জন্যও ঔষধ এনে রাখবেন।”
লিপি খপ করে টাকা নিয়ে নাড়াচাড়া করে বলল,” এসবের কী দরকার ছিল, বাবা!”
এরমধ্যেই বাইরে মোটরবাইকের আওয়াজ শোনা গেল। শুভ ঘর থেকে বের হয়ে আসলো। মোটরবাইকে তার ভাই এসেছে বুঝল। ফুলের শাশুড়ি যেভাবে ছিল সেভাবেই চলে এসেছে। লিপি হা করে কিছু বলতে নিয়েও বলতে পারল না। ফুলের শাশুড়ি সময় দিল না। লিপিকে ডিঙিয়ে ফুলের কাছে চলে গেল। বিছানায় বসে ফুলের গায়ে হাত দিয়ে চমকে গেল। জ্বরে মেয়েটার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। ফুলের শাশুড়ি আওয়াজ দিয়ে ছোট ছেলেকে ডাকল, ” আরিব?”
শুভ আসতেই পিঠে দুটো ঘা বসাল। শুভ আহ করে শব্দ করে উঠে বলল,” মা’র’লে কেনো?”
” মেয়েটার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। তোকে বলেছিলাম, গায়ে হাত দিয়ে দেখতে?”
শুভ মাথা নিচু করে মিনমিন করতে থাকল। ততক্ষণে আদিলও চলে আসলো, বড়ো ছেলেকেও একই কথা জানাল ফুলের শাশুড়ি। আদিল সময় অপচয় না করে বলল,” ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সময় নষ্ট করা যাবে না, মা!”
শুভর উদ্দেশে বলল,” ওকে আর এখানে রাখব না। আমি বকশি কাকাকে খবর দিয়েছি। গাড়ি নিয়ে আসলো বলে। ওর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেল, শুভ।”
শুভ পিঠ হাতিয়ে গোমড়া মুখে ফুলের জিনিসপত্র গোছাতে লাগল। এদিকে লিপি বলছে,” সব নিয়ে কী করবেন? আমাগোর মাইয়া তো দুইদিন পর এখানেই ফিরে আসবো।থাক না!”
আদিল রক্তচক্ষু হয়ে তাকিয়ে বলল,” আপনার মেয়ে এখন আমাদের বাড়ির বউ।মেয়ের সাথে মেয়ের শ্বশুর বাড়ির জিনিসও আমাদের।সুতরাং এগুলো এই বাড়িতে রেখে শেয়াল কুকুরকে খাওয়ানোর কোনো ইচ্ছে আমাদের নাই।”
শুভ ভাইয়ের কথায় অবাক হয়ে বলল,” তুমি এতো প্যাঁচানো কথা বলছো কেনো, ভাই? ওনি তো ফুলের মা।”
আদিল পুনরায় বলল,” সৎ মা।”
শুভর মুখ হা হয়ে গেল। নিজের বউয়ের সৎ মায়ের সম্পর্কেও সে জানে না? আর কী কী সে জানে না? ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
গাড়ি আসলো দশ মিনিটের মধ্যেই। আকিল শুভকে বলল, ফুলকে কোলে নিতে। কিন্তু শুভ নাকচ করল।সে ফুলের অনুমতি ছাড়া ফুলকে ছুঁবে না। আদিল হাত উপর করতে শুভ ভয় পেয়ে ফুলকে কোলে তুলে নিল।
শুভ এখন বুঝতে পারছে মেয়েটা কোনো অচেতন হয়ে আছে। ফুলের শরীরের তাপে শুভও পুড়ে যাচ্ছে। শুভ ফুলের মায়াবী মুখের দিকে তাকালো। শুষ্ক ঠোঁট জোড়া লাল হয়ে আছে। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে। শুভর ভয় হতে লাগল।
বাহিরে প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। ফুলকে সিটে শুইয়ে দিয়ে শুভও অপরপাশে ফুলের মাথার কাছে গেল। ফুলের মাথা নিজের পায়ের উপর রেখে দুইবার ফুলের গালে হাত বুলিয়ে ডাকল। শুভর মা ছোট ছেলের আচরণ দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। পরমুহূর্তে মেয়েটার জন্য মায়া দেখতে পেয়ে নিজে সামনের সিটে গিয়ে বসল।
বকশি কাকা এক এক করে ফুলের জিনিসপত্র প্রাইভেট কারের পিছনে রাখছে। লিপির মনে হচ্ছে, ওর কলিজা কেউ নিয়ে চলে যাচ্ছে। সে মুখে কিছু বলতেও পারছে না, আবার সইতেও পারছে না। মনে মনে শুধু হায় হায় করছে।
গাড়ি চলছে আপন গতিতে। প্রাইভেট কার সামনে, আদিল মোটরযান করে পিছনে আসছে। শুভ নিজের রুমাল ভিজিয়ে ফুলের কপালে রেখে দিল। ফুলের হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখল।
বিড়বিড় করে বলল,” তোমার সকল দুখ আমার হোক,ফুল!”
চলবে……….