#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_১০
দিনটা বৃহস্পতিবার। তিনদিন যাবত নাফিস ফুলের খোঁজ পাচ্ছে না। কলেজেও আসে না। বকুল ফুল গাছের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ফুলের দেখা পায় না। ফুলের মা জীবিত থাকা অবস্থায় নাফিস একবার ফুলের বাড়ি গিয়েছিল। সেদিনের ঘটনা নাফিস কখনোই ভুলবে না। ফুলের বাবা সেদিন মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফিরে। বিনা কারণেই ফুলকে এবং ফুলের মাকে মা’র’তে শুরু করে। নাফিস লজ্জায় সেদিন চলে এসেছিল আর যায়নি। ফুল সেই ঘটনার পর লজ্জায় কখনো নাফিসকে তার বাড়ি যেতে বলেনি।
আজ নাফিস ফুলের বাড়ি যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। কলেজে যাওয়ার আগে ফুলের বাড়ির রাস্তায় উঠল। যদিও ফুলের সৎ মাকে নিয়ে তার ভয় হচ্ছে। ফুলের কাছে যতটুকু জেনেছে, মহিলা একটুও ভাল না। নাফিস আল্লাহ আল্লাহ বলে ফুলদের বাড়ি গেল। লিপি তখন উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছিল আর নিজের কপালের পুড়ে যাওয়া নিয়ে আহাজারি করছিল। নাফিস বুঝল, মহিলাটি ফুলের সৎ মা। নাফিস সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,” আন্টি, ফুল কোথায়?”
লিপি, নাফিসকে আগে একবার দেখেছে। সকাল সকাল বাড়ি থেকে ফুলের বের হওয়া নিয়ে একবার লিপির মনে সন্দেহ হয়েছিল। তাই এক সকালে ফুলের পিছু নেয়। সেখানেই ফুলের সাথে ছেলেটাকে দেখে। লিপি বুঝতে পারে, দুজনের মধ্যে কিছু একটা চলছে। তাই বড়োলোক বাড়ির প্রস্তাব পেয়ে ছেলে সম্পর্কে না জেনেই রাজি হয়ে গিয়েছিল। মনে করেছিল, ছেলের বয়স বেশি হবে কিন্তু বের হলো কচি বাবু। লিপির এখন মনে হচ্ছে, জীবনের সবথেকে বড়ো ভুল ছিল ছেলে ও ছেলের বাড়ি সম্পর্কে খোঁজ না নিয়ে।
লিপি ঝাড়ু মাটিতে ফেলে কোমরে আঁচল গুঁজে উত্তর দিল,” ভাইগা গেছে। পিরিত কইরা নাগরের লগে ভাইগা গেছে। বিয়া দিছিলাম, খারাপ কাজ যাতে না করে তারজন্য। কিন্তু মাইয়া আমগোর মান সম্মানের উপর ধূলো দিয়া ভাইগা গেছে।”
লিপি ইচ্ছে করেই নাফিসকে মিথ্যা কথা বলল। যেনো নাফিস ফুলকে অপছন্দ করে বা ঘৃণা করে। নাফিস অবাক হল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। লিপির কথা তার বিশ্বাস হল না। ফুলকে নাফিস চেনে। সে এমন নয়। যদি কারো সাথে ফুলের সম্পর্ক থাকে তাহলে সবার আগে নাফিসই জানবে। কেননা, নাফিস ছাড়া ফুলের আর কোনো বন্ধু নেই।
নাফিস ফুলদের বাড়ি থেকে নাখোশ হয়ে ফিরে আসলো। এদিকে লিপি বিশ্রীভাবে হাসল। ফুলকে সে কখনোই শান্তিতে থাকতে দিবে না।
নাফিস কলেজে এসে খেয়াল করল, শুভ নামক ছেলেটাও কলেজে আসেনা। সে শুভর কাছের বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলে জানাল, দুইদিন যাবত শুভও কলেজে আসে না।
কিছুক্ষণের জন্য নাফিসের মস্তিষ্কে লিপির কথা বাজতে লাগল। নাফিস মস্তিষ্কে আর চাপ দিল না। স্বচক্ষে ও স্ব কানে না শোনা পর্যন্ত নাফিস কোনো কথাই বিশ্বাস করবে না।
—————————–
দুইদিন যাবত ফুল হাসপাতালে ভর্তি। ফুলের শ্বশুর বাড়ির লোকজন এক মুহূর্তের জন্যও ফুলের পাশ থেকে সরেনি। ফুলের জ্ঞান ফিরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পরই। জ্ঞান ফিরে শুভকে পাশে দেখতে পেয়ে মুচকি হাসে সে। আবছা কন্ঠে শুনতে পায়। শুভ তার হাসি দেখে বলছে,” হাসবে না,ফুল! তোমাকে আজকের ঘটনার জন্য নতুন নাম দিলাম, বিষাক্ত ফুল।”
ফুল আর কিছু শুনতে পায়নি। পরেরবার যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন পাশে ফুলের শাশুড়িকে দেখতে পেল। ফুলকে দেখামাত্রই হাসিমুখে বলল,” এখন কেমন লাগছে রে,মা!”
ফুল দুর্বল কণ্ঠে জানাল,” ভাল।”
ফুলের শাশুড়ি ফুলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,” জ্বর কীভাবে বাঁধালি? ”
ফুল কিছু বলল না। এমন সময় আদিল ঘরে প্রবেশ করে বলল,” ডাক্তার বলল, তোমার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছে। তোমাকে কী কেউ মে’রে’ছে,ফুল?”
ফুলের মনে ভয় ঢুকলো। তার লিপির বলা কথা মনে আছে। ফুল যদি এখন সত্যি বলে দেয় তো ফুলের সৎ মা তার শ্বশুর বাড়ির লোকদের মিথ্যা বলবে। ফুল তাদের চোখে খারাপ হতে চায় না। ফুল মিথ্যা বলল,” কলপাড়ে পড়ে গিয়েছিলাম।”
আদিল বিশ্বাস করল কী না কে জানে? ফুলের কথাটা ভাটা পড়ে গেল কারোর আগমনে। দরজা খুলে সাগরিকা প্রবেশ করল। পরিধানে সুতির শাড়ি। হাতে দুই দুইটা বড়ো টিফিনবাক্স। আলগোছে ঢিলে খোঁপা করে চলে এসেছে। সামনে দিয়ে কয়েকটা বাড়তি চুল ঝুলে রয়েছে। ফুল অবাক হয়ে দেখছে। এতো সুন্দর মেয়েকে ফুল কখনো দেখেনি। অগোছালো মেয়েটাকেও ফুলের কাছে চমৎকার লাগছে। কেবিনে ঢুকে ফুলের শাশুড়িকে সালাম জানাল। হাতের টিফিনবাক্স নির্দিষ্ট স্থানে রেখে কোমরে হাত রেখে বলল,” মা, তোমার ছোট ছেলেটা আস্তো বজ্জাত। জানো, কি করেছে?”
ফুলের শাশুড়ি হেসে উত্তর দিল,” কি করেছে?”
” কি করেনি, বলো? আমাকে একবারও ফোন দেয় না। আরে আমারও তো একটা সম্মান টম্মান আছে? ভাবি হই তার! এই যে, হাসপাতালের নিচে পেলাম। বললাম, ছোট ভাই টিফিনবাক্স দুইটা ধরো তো! ধরল ঠিকই কিন্তু কেবিনের সামনে এসে খপ করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ভাবি আমি যাব না। তুমিই বলো মা, কাজটা করা কী ঠিক হয়েছে?”
ফুলের শাশুড়ি মাথা নেড়ে বললেন,” একদম ঠিক হয়নি। আমি আরিবকে শাস্তি দিব। তোমার এমন পাগল অবস্থা কেনো? রান্না করতে করতে চুল গোছানোরও সময় পাওনি বুঝি?”
সাগরিকা একবার আদিলের দিকে কটমট চোখে তাকাল। আদিল মাথা চুলকে অন্যপাশে ফিরে গেল। ফুল সবটাই দেখছিল। কী সুন্দর সুখী পরিবার শুভর। অথচ তার কপালটা!
সাগরিকা এবার ফুলের সাথে কথা বলা শুরু করল,” কেমন আছো,ফুল?”
ফুল উত্তরে বলল,” ভাল।”
সাগরিকা খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,” ভাল থাকারই কথা, স্বামীর কোলে চড়ে সারাটা পথ এসেছো! আমি থাকলে ক্যামেরায় ক্যাপচার করে রাখতাম। ইশ, আমাদের বাবু বউকে কতোটা কেয়ার করে!”
ফুল লজ্জায় মাথা নুয়ে ফেলল। আদিলের খুক খুক করে কেশে ফোনে কল আসার বাহানায় কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। সাগরিকা ফুলের পাশে বসে ফুলকে ধরে বসালো। ফুলের থুতনিতে হাত রেখে বলল,” সত্যিই তুমি খুব সুন্দর, ফুল। একদম মিষ্টি ফুলের মতো। আরিব ঠিকই বলেছিল, তার ফুল নিষ্পাপ ফুল।”
সাগরিকা ফুলকে ধরে নিচে নামালো। আগে থেকে রাখা শপিং ব্যাগ থেকে একসেট জামা বের করে বলল, ” পরতে পারবে? নাকি সাহায্য করব?”
” পারব।”
ফুল বাথরুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে জামা পালটে আসলো। অবশ্য গোসল করলে ভাল লাগতো। ফুলের শাশুড়ি ইতিমধ্যে খাবার সাজিয়ে নিল। ফুল বের হতেই সাগরিকা ধরে বিছানায় বসিয়ে নিজে পিছনে বসল। ব্যাগ থেকে চিরুনী বের করে সুন্দর করে মাথার চুল বেঁধে দিল। এতো যত্ন পেয়ে ফুল এবারও কেঁদে উঠল। ফুলের শাশুড়ি তার চোখের পানি মুছে বলল,” কথায় কথায় কাঁদিস কেনো, শুনি? আমাকে কী পর মনে হয়? একদম কাঁদবি না। আমি এমন শাশুড়ি না যে, ছেলেদের একচোখে দেখব আর ছেলের বউদের অন্য চোখে। আমার কাছে তোরা দুজন মেয়ের মতো।”
ফুলের শাশুড়ি ফুলের মুখে লোকমা তুলে দিলেন। তা দেখে সাগরিকা মিছে রাগ দেখিয়ে বলল,” ছোট মেয়েকে পেয়ে, বড়ো মেয়েকে ভুলে গেলে,মা?”
ফুলের শাশুড়ি বললেন,” আয় তোকেও খাইয়ে দেই।”
—————–
দ্বিতীয়বার ফুলের জ্ঞান ফিরে আসার পর শুভর দেখা একবারও পায়নি। এমনটা নয় যে, শুভ হাসপাতালে নেই। বারান্দা থেকে শুভর কথা শুনেছে সে। কিন্তু ভেতরে কেনো আসছে না কে জানে! ফুলের একবার সাগরিকাকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু জড়তার কারণে করল না। সাগরিকা চুল বাঁধছিল। ফুলের দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর সুরে বলল,” যাকে খুঁজছো সে মনে হয় না, আজ আসবে! তবে তোমার বালিশের নিচে কিছু রাখা আছে। দেখে নাও।”
ফুল অবাক হয়ে বালিশের নিতে হাত রাখল। খচখচ শব্দ শুনে বুঝেতে পারল, তার বাবু বর চিঠি দিয়েছে। কিন্তু কখন দিল? সাগরিকা ফুলের মনে থাকা প্রশ্নের জবাব দিল,” আমাকে দিয়ে পাঠাইছে। বলেছে তোমার বালিশের নিচে রেখে দিতে।”
সাগরিকা মুচকি হাসল। ফুল বালিশের নিত থেকে চিঠি বের করে পড়তে শুরু করল,
বিষাক্ত ফুল,
আজকের সম্মোধনটা একেবারে তোমার সাথে যাচ্ছে। কি, রাগ করেছো? করলে করো। আজ পরোয়া করব না। আজ তোমার বিষ আমার সারা গায়ে ছড়িয়ে দিয়েছ। আমি রাগ করেছি, ভয়ংকর রাগ করেছি। এই রাগের কোনো শেষ নাই। একটিবারের জন্য মনে হয়েছিল, আমাদের পথ শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।
তোমাকে দেখে কতোটা ভয় পেয়েছিলাম জানো? জানবে কীভাবে? তুমি তো আমাকে চিন্তায় ফেলে নিশ্চিন্তে পড়ে রইলে। একবার সুস্থ হও, ভীষণ ঝগড়া করব। তোমার পায়ে পা তুলে ঝগড়া করব। এজন্য লোকে আমাকে মহিলা মানুষ ভাববে? ভাবলে, ভাবুক। আজ আমি বেপরোয়া স্বামী হয়ে গেছি।
তোমার সাথে আরেকটা কারণে রাগ করেছি। জানতে চাও কী? তাহলে শুনো, তোমার পরিবারের কিছুই আমাকে জানাওনি। আমি গতকাল ভাইয়ার কাছ থেকে শুনেছি তোমার মা তোমার আসল মা না। অবাক করার বিষয়টা জানো কী? তার ব্যবহার শুরুদিন থেকেই আমার ভাল লাগেনি। হয়তো, তোমার আপন নয় বলে! নকি তুমি ভেবেছো যে, তার কথা জানলে আমি তোমার সথে সম্পর্ক রাখব না? এমন ধারণা মনে আসছে কোনো, ফুল? আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি চাই, আমাদের মধ্যে গোপনীয়তা না থাকুক। স্বামী স্ত্রীর পাশাপাশি আমরা কী বন্ধু হতে পারি না?
তোমার সামনে না আসার কারণটা খুবই ভয়াবহ। লিখতে গিয়েও হাত থেকে কলম ফস্কে যাচ্ছে। শুনবে কী? বলছি,
আমার জীবনের প্রথম মেয়ে তুমি যাকে আমি ছুঁয়েছি। তোমাকে আমার কোলে জায়গা দিয়েছি। ধরে নিতে পারো, একদম মনে! তোমার হাত ছুঁয়েছি। আচ্ছা, তোমার হাতে কালসিটে দাগগুলোর কেনো হয়েছে? ভাইয়া বলল, তুমি নাকি পড়ে গিয়েছিলে? আমি কিন্তু বিশ্বাস করিনি। ভাইয়াও করেনি। তোমার হাতের দাগ দেখে বুঝেছি, তোমার উপর কেউ হাত তুলেছে। এত রাগ হচ্ছে?
আমাকে একবার বড়ো হতে দাও, ফুল! যার জন্য তুমি কষ্ট পাবে তাকে দুনিয়া থেকে তাড়িয়ে দিব। আরেহ, কতো কথা বলে ফেললাম কিন্তু আসল কথা বলাই হল না। তোমার সামনে আসছি না কিছুটা সংকোচে। তোমার অনুমতি ছাড়া, অজ্ঞান অবস্থায় তোমাকে ছুঁয়ে দিয়েছি। ব্যপারটা কেমন লাগছে। তুমি কী রাগ করেছো?
উফ রাগ তো আমি করেছি। তোমার উচিত আমার রাগ ভাঙানো। আমার রাগ কীভাবে ভাঙাবে ভাবছো তো! আমি বলে দেই, ভাবির হাতে তোমার জন্য আনা দুইটা শাড়ি পাঠিয়েছি। নবীন বরনের দিন যে কোনো একটা শাড়ি পরে যেতে হবে। রাজি তো?
তোমার চিঠি দুটো কতোবার পড়েছি। হিসাব নেই। বলে রাখি ফুল, আমার গলা জিরাফের মতো লম্বা হতে চাই না। গোল আলুর মতো মোটা হতে চাই। যেনো কেউ পাশে বসে নাদুসনুদুস গলায় চি’ম’টি বসাতে পারে। আরেকটা কথা, তুৃমি আমাকে কখনো কাছে এসে দেখেছো? তাহলে কীভাবে জানলে, আমার বাম গালের কানের কাছে তিল আছে? আমি কিন্তু খুশি হয়েছি। সামনাসামনি হোক অথবা আড়ালে আমাকে খেয়াল করছো তো!
তোমার কাঙ্খিত নামটা আজও নিলাম না। তবে আমার মনে হচ্ছে, সময় এগিয়ে আসছে। যেদিন তোমাকে সেই নামে ডাকব!
ইতি
তোমার বাবু বর
চিঠি পড়ে ফুলের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। চিঠি ভাঁজ করে সাগরিকার দিকে তাকিয়ে দেখল, সাগরিকা হা করে ফুলের দিকে তাকিয়ে আছে। ফুল লজ্জা পেয়ে মাথা নুয়ে ফেলল। সাগরিকা বলল,” আমার দেবরটা অনেক ভাল। আমাদের সম্পর্ক ভাবি দেবরের হলেও বড়ো বোনের মতো সম্মান করে। আমাদের কথা হলেই তোমার সম্পর্কে বলে।”
ফুল কি বলবে, ভেবে পেল ন।
ইতিমধ্যে ফুলের শাশুড়ি ও আকিল কেবিনে প্রবেশ করল। তাদের হাতে ছাড়পত্র। ফুলকে আজই হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে। ফুলের অন্তর কেঁপে উঠল। বিয়ের ঠিক কতদিন পর সে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে? ভাবতে লাগল।
চলবে……..