#দুখীফুল
#আফসানা_মিমি
#পর্ব_১১
দুইপাশে সবুজ অরণ্য ঘেরা তারমাঝে রাস্তা। মনমুগ্ধকর পরিবেশের সাথে মিশে ফুলের অসুস্থতা কোথায় পালিয়ে গেল। এমনকি কিছুক্ষণ আগের মন খারাপের রেশ ছুটে গেল। ফুলের মন খারাপের কারণ, তার বর। প্রাইভেটকারে জায়গা থাকা স্বত্তেও ফুলের সাথে উঠেনি। ভাবিকে প্রাইভেট কারে চাপিয়ে দিয়ে নিজে বড়ো ভাইয়ের মোটরবাইকের পিছনে চড়ে বসলো। ফুলের দিকে একবারের জন্য তাকায়নি। ফুলের এতো কান্না পেয়েছিল!
বর্তমানে দুঃখ ভুলে সুখের সাগরে ভাসছে ফুল। এঁকেবেঁকে রাস্তার ধারের প্রকৃতিতে নিজেকে বিলীন করে দিচ্ছে সে। ফুল প্রকৃতি দেখতে এতোটাই মগ্ন ছিল যে, তাদের গাড়ির পাশাপাশি কখন আদিলের বাইক এসেছে বুঝতেই পারেনি। আদিল একপলক ফুলকে দেখে সাগরিকার অবস্থান দেখলো। সাগরিকা আদিলকে দেখে মুখ বাঁকাল। আদিল রাগে, দুঃখে পিছনে বসে থাকা ছোট ভাইয়ের দিকে ইচ্ছে করেই চেপে গেল। শুভর তখন বেহাল অবস্থা, অন্ডকোষের মধ্যে চাপ লাগায় চোখমুখ লাল হয়ে গেল সাথে সাথেই। ভাইয়া বলে চেঁচাতে গিয়েও আদিলের শার্ট খামচে ধরল। ফুল বুঝল না, তার বরের ঠিক কী হল। সে দেখল, শুভ অন্যপাশে ফিরে আদিলের গলা চেপে ধরছে। প্রাইভেট কার এগিয়ে গেল সামনে। ডানে মোড় ঘুরে ইটের রাস্তা। পঞ্চাশ গজ যেতেই থেমে গেল গাড়িটি। ফুল দেখল, দূর থেকে বকশি কাকাকে গামছা কাঁধে ফেলে দৌড়ে আসতে। বকশি কাকা পিছনের দরজা খুলে ফুলের উদ্দেশে বললেন,” বউমামনি, সাবধানে আসো। বড়ো বউমামনি কেমন আছো?”
সাগরিকা হেসে উত্তর দিল,” ভাল আছি, কাকা। তোমার শরীর কেমন?
” ভাল, বউমামনি।”
সাগরিকা ফুলকে ধরে সামনে আগালো। ফুলের চোখের সামনে রাজপ্রাসাদ দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। দুতলা বাড়িটি বাহির থেকে সাদা রং করা। ছাদের লাল, সাদা সবুজ বাগানবিলাস ছেয়ে আছে। ফুলের নাকে আসলো শিউলি ফুলের ঘ্রাণ। লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে ঘ্রাণ নিল সে। আশেপাশে শিউলি ফুলের গাছ খুঁজে চলছে সে। বাড়ির দালান ঘেঁষে শিউলি ফুলের গাছ দেখে আনন্দে মন নেচে উঠল ফুলের। সাগরিকা ফুলকে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকছে ঠিকই কিন্তু ফুল তখনো ঘাড় ঘুরিয়ে শিউলি ফুলের দিকে তাকিয়ে আছে।
ফুলের শাশুড়ি হাত মুখ ধুয়ে রান্না ঘরে ঢুকলো। ফুলকে বসানো হল, সোফার ঘরে। ফুল জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। এতো বড়ে বাড়ি দেখে ভয় পাচ্ছে সে। ছোট বেলা থেকেই ফুল, টিনের চালের নিচে বড়ো হয়েছে। উঁচু দালানকোঠা দূর থেকেই দেখে এসেছে। ফুলের মনে হচ্ছে, মাথার উপর ছাদটা তার উপর ভেঙে পড়বে। যার জন্য কিছুক্ষণ পর পরই ফুল উপরে তাকাচ্ছে। সাগরিকা আদিলের ঘর থেকে ফ্রেস হয়ে সুতির থ্রি পিস পরে নিচে এসেছে। ফুলকে তখনো বসে থাকতে দেখে বলল,” তুমি এখনো সোফায় বসে আছো? উপরে আরিবের ঘরে গিয়ে গোসল করে নাও।”
ফুল নামল না। উপরের দিকে তাকিয়ে মিনমিন সুরে বলল,” হাঁটলে উপর থেকে সব মাথার উপর পড়ে যাবে নাতো!”
সাগরিকা হেসে ফুলের গাল টেনে বলল,” না রে পাগলি! এই যে, আমি দাড়িয়ে আছি কিছু হয়েছে?”
ফুল মাথা না বোধক নাড়লো। সাগরিকা ফুলকে ধরে বলল,” চলো, আরিবের ঘরে দিয়ে আসি।”
ধীরপায়ে, অন্তরের দুরুদুরু কম্পনের সাথে ফুল সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে উঠল। হাতের বাম পাশটায় শুভর বাম পাশটা আদিলের। সাগরিকা বাম পাশে ইশারা করে বলল,” এখানে যতো ঘর আছে, সব তোমার আর আরিবের। সোজা গিয়ে ডানে মোড়ে আরিবের ঘর। যাও, আমি গিয়ে দেখি মায়ের কিছু লাগবে কি না।”
ফুল তাই করল। দরজার নব ঘুরিয়ে শুভর ঘরে প্রবেশ করল। এতো পরিপাটি ঘর দেখে ফুল অবাক হল। তারচেয়ে বেশি অবাক হল, শুভর ঘরে তার ব্যাগ দেখে। ফুল ব্যাগ থেকে একসেট জামা বের করে নিল। গোসলখানা খুঁজতে খুঁজতে পানি পড়ার শব্দ শুনতে পেল। ফুল বুঝতে পারল, এটাই শুভর গোসলখানা। ফুল এগিয়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে বিপাকে পড়ে গেল। শুভ ভেতরে গোসল করছে। চোখ বন্ধ করে ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ফুল সাথে সাথে ঘুরে দাঁড়ালো। খিঁচে চোখ বন্ধ করে আস্তেধীরে চলে আসলো।
কিছুক্ষণ পর পানি পড়ার শব্দ না পেয়ে বুঝল, শুভ এখনই বের হবে। ফুল শুভর সামনাসামনি হবে না ভেবেই চলে যেতে নিলে শুভ চেঁচাল,” দরজা খুলেছে কে?”
ফুলের ইচ্ছে করছিল বলতে, ভু’ত! ফুল বলল না। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শুভ বাথরুম থেকে বের হয়ে ফুলকে দেখে তাড়াহুড়ো করে আবার বাথরুমে ঢুকতে নিয়েছিল। কারণ, শুভ খালি গায়ে কোমরে শুধু তোয়াল প্যাঁচিয়ে বের হয়েছিল। না দেখে যেতে নিতে দেয়ালের সাথে ধাক্কা লেগে মাথায় ভীষণ ব্যথা পেল। ফুল হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসতে নিলে শুভ বলল,” আমি লজ্জা পাচ্ছি, ফুল। কাছে এসো না। তুমি বরং আমার জামা কাপড় ওয়ারড্রব থেকে বের করে দাও।”
শুভর আঙুলের ইশারা অনুসরণ করে ওয়ারড্রব থেকে কাপড় আনলো। নিচের দিকে তাকিয়ে শুভর হাতে দিল। শুভ সময় নষ্ট করল না। দরজা আটকে দিল। এদিকে ফুল শুভর কথা স্মরণ করে আপনসুরে বলল,” লজ্জা পাওয়ার কথা আমার, অথচ পেল আমার বাবু বর!
শুভ বের হয়ে মাথা চুলকে বলল,” ভাবছি, রাগটা ধরে রাখব? নাকি কমিয়ে দিব?
ফুল বলল,” তোমাকে রাগ মানায় না, হাসিমুখে মানায়।”
শুভ কপাল ঘষতে ঘষতে বলল,” আমি আইস কিউব নিয়ে আসি। তুমি ততক্ষণে গোসল সেড়ে নাও।”
ফুল মাথা নেড়ে চলে যেতে নিয়েও ফিরে এসে বলল,” বিষাক্ত ফুলের বিষ কেমন লেগেছিল?”
শুভ চোখজোড়া বড়ো করে ফেলল। তার হাসফাস লাগছে। চিঠিতে সে সাদা মানুষ কিন্তু বাস্তবে সাধারণ পুরুষ। শুভকে ধাঁধায় ফেলে ভীষণ মজা পেল,ফুল। হেসে কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।
———————
শুভর বাবা নেই। শুভর বয়স যখন চার বছর তখন মা’রা যান। শুভর মা তখন থেকেই দুই ছেলেকে একা হাতেই বড়ো করেছেন। ফুলরা এসেছিল, বেলা এগারোটা। এখন বাজে দুপুর দুইটা। এখন দুপুরের খাওয়ার সময়। ছুটির দিন ছাড়া ছেলেদের সাথে দুপুরে খাওয়া হয় না ফুলের শাশুড়ির। আজ দুই ছেলে ও ছেলের বউদের একসাথে পেয়ে এতটুকু সময়ে যা পেরেছেন রান্না করেছেন।
গোসল শেষ করে ফুল উপরে থাকেনি। সে যে এখন পুরোপুরি সুস্থ তাও বলা মুশকিল। নিচে এসে শুভর দেখা পেল না, ফুল। শাশুড়ি কি করছে দেখতে রান্নাঘরে ঢুকতে গেলেই ফুলের শাশুড়ির বকা খেল,” তোকে এখানে কে আসতে বলেছে? তুই রান্না পারিস, আমি জানি। আরিব বলেছে, তুই নাকি বিরিয়ানি খুব ভাল রান্না পারিস। তা রান্না করবি ঠিক আছে। কিন্তু আজকে না। আগামীকাল শরীর ভাল লাগলে করিস।”
ফুল উত্তর দিল,” কাজ দেখলে আমার বসে থাকতে ইচ্ছে করে না। আমাকে একটা কাজ দাও। কথা দিলাম, বসে বসেই করব।”
ফুলের শাশুড়ি কপালে হাত দিয়ে শষা টমেটো ফুলের হাতে তুলে দিয়ে বলল,” তাহলে এগুলো কে’টে দে।”
তিনজন মিলে রান্নার কাজ শেষ করে টেবিলে খাবার দিল। আদিল ও শুভকে বকশি কাকা খবর দিলে খাবারের টেবিলে আসলো।
ছেলেদের পছন্দের সব রান্না করেছে ফুলের শাশুড়ি। একসাথে বসল সবাই। শুভর অপরপাশে ফুল বসলো।সাগরিকা বসলো আদিলের গা ঘেঁষে। এতে আদিল খুক খুক করে কাশতে শুরু করল। বাঁকা চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল। শুভ কপাল কুঁচকে কতক্ষণ বসে থেকে উঠে গিয়ে ফুলের পাশে বসলো। তারপর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বুঝাল,” এই দেখো আমারও বউ আছে।”
আদিল তখন কপাল চাপড়াল।
খাবারের সারা সময় সকলে তৃপ্তি সহকারে খেতে পারলেও ফুল কিছু খেতে পারেনি। সর্বনাশা জ্বর শরীরের বল কেড়ে নেওয়ার সাথে সাথে মুখের স্বাদও কেড়ে নিয়েছে। শুভ ব্যপারটা লক্ষ্য করল। খাওয়ার মাঝখানে উঠে গেল সে। ফুলের শাশুড়ি পিছু ডাকলেও শুনল না। কিছুক্ষণ পর ঘি ও ডিম ভাজা নিয়ে ফেরত আসলো। ডিমটা সে নিজেই ভেজে নিয়ে এসেছে। ফুল ব্যতীত সবাই অবাক হলো। আদিল তো বলেই ফেলল,” তুই ডিম ভেজে এনেছিস? আমাকে তো এক গ্লাস পানি এসে খাওয়াস না। আর বউয়ের জন্য রান্না? অবিশ্বাস্যকর।”
ফুলের শাশুড়ি খুশি হলেন কিন্তু কিছু বললেন না। উনি এখন কিছু বললেই ছেলেটা লজ্জা পাবে। এদিকে ফুল বিষয়টা বুঝতে পেরে লজ্জা পেল। শুভ কারো কথা কানে না ঢুকিয়ে নতুন প্লেট নিল। গরম ধোঁয়া উড়া ভাতের উপর ঘি মিশিয়ে ডিম ভাজি রাখল। ফুলের উদ্দেশে বলল,” খেতে পারবে? নাকি খাইয়ে দিব?”
ফুল নিচু স্বরে জানাল,” খেতে পারব।”
খাবারের প্লেট নিজের কাছে এনে ভাত মাখিয়ে এক লোকমা মুখে দিয়ে বুঝল, এই খাবারটা পেটের ভেতর যেতে পারবে। শুভ ফুলের খাওয়া দেখে জিজ্ঞেস করল,” ডিম ভাজা মজা হয়েছে?”
” হ্যাঁ।”
শুভ বিশ্বজয়ী হাসি দিল। আদিলের উদ্দেশে বলল,” দেখেছো ভাইয়া, আমিও আমার বউয়ের খেয়াল রাখতে পারি।”
আদিল বিড়বিড় করে বলল,” দুনিয়া উদ্ধার করে ফেলেছিস।”
ছোট ভাইয়ের কথায় আদিল বিষম খেল। সাগরিকা পানি এগিয়ে দিয়ে বলল, ” তুমি ঠিক আছো?”
আদিল কড়াচোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কটমট চোখে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল,” জীবন যুদ্ধে এগিয়ে গেলেও মনপ হচ্ছে, ভাইয়ের চতুরতার সাথে আগাতে পারব না।”
শুভ তা শুনে দাঁত বের করে হেসে উত্তর দিল,” বুঝতে হবে, তোমার সামনে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া ছেলে বসে আছে।”
চলবে……..