দূর দ্বীপবাসিনী পর্ব-৩৯

0
542

#দূর_দ্বীপবাসিনী (কপি করা নিষিদ্ধ)
#৩৯তম_পর্ব

নীলাম্বরীর দিকে উদাস চাহনীতে চাইলো চারু। মনে মনে বললো,
“এই জাল থেকে মুক্তি পেতে হলে, শ্রাবণের অতীত জানতে হবে। যে কোনো মূল্যেই হোক সেটা”

বলেই চোখ বুজে নিলো। তখনই কোলাহল কানে এলো চারুলতা। মোস্তফা সাহেবের রাশভারী কন্ঠ শোনা গেল, চারু দেরি না করেই ছুটলো নিচে। নিচে যেতেই দেখলো গোলটা মোস্তফা সাহেবের ঘরে বেধেছে। শ্রাবণ ব্যাতীত সকলেই সেখানে উপস্থিত। সদ্য আসা কাজের মেয়ে লতিকা অপরাধীর ন্যায় মেঝে থেকে কাঁচ পরিষ্কার করছে৷ এবং মোস্তফা সাহেব আহত বাঘের ন্যায় গরগর করছেন। শান্তা বেগম উপায়ন্তর না পেয়ে থাকে থামতে বলছেন,
“ভাইজান, নতুন তো ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা করে দিন”
“আমি হাজারবার বারণ করেছি। আমার ঘরে যেনো কেউ প্রবেশ না করে। দেখলি তো কি ঘটলো। ইশরার ছবিটা ভেঙ্গে ফেললো”
“একটা ছবিই তো ভাইজান”

শান্তা বেগমের কথাটা কর্ণগোচর হতেই কড়া তীর্যক চাহনীতে তাকালেন মোস্তফা সাহেব। তার কড়া অগ্নিদৃষ্টিতে শান্তা বেগম চুপসে গেলেন। দ্বিতীয় বার কোনো কথা বললেন না তিনি। মোস্তফা সাহেব থামলেন না। হুংকার ছেড়ে বললেন,
“ভুতের মতো বসে আছো কেনো, যাও এখান থেকে। আমার তোদের একজনের চেহারা দেখতে ইচ্ছে করছে না”

চারু বেশ অবাক হলো আজকের ঘটনায়। ইশরা বেগমের ছবি কেন্দ্রিক এতো বড় ঘটনা ঘটলো অথচ এই বাড়িতে ইশরা বেগমের কোনো কথাই হয় না। খেয়াল করে দেখলে সারা বাড়িতে কেবল তিনটে ছবি তার। দুটো শ্রাবণের ঘরে এবং একটি মোস্তফা সাহেবের ঘরে। এ ব্যতীত কোনো ছবি নেই। ঘরের কর্তী হিসেবে তার কথায় ঘর মুখোরিত হবার কথা। ঘর থেকে এক এক করে সকলে বের হতে লাগলো। চারু পেছনে ফিরে একবার মোস্তফা কামালের মুখপানে চাইলো। অদ্ভুত বিষাদের রেখা লক্ষ্য করলো সে। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার কোনো লক্ষণ তার ভেতরে এ বাড়িতে আসার পর থেকে পরিলক্ষিত হয় নি চারুর কাছে। অথচ আজ তার একটা ছবি ভাঙ্গায় এতোটা বড় কান্ড, ব্যাপারটা তাকে ভাবতে বাধ্য করছে।

********

পশ্চিমে রক্তিম আভা জড়ো হয়েছে, অস্তগামী তেজস্বী সূর্য। ব্যস্ত দিনের অন্ত হচ্ছে, রজনীর যাত্রা শুরু। মাগরীবের আজান কানে আসছে। পাড়ার মসজিদের মোয়াজ্জেন অক্লান্ত ভাবে একই সময়ে আজান দিয়ে নিজের কাজ অব্যাহত রাখছেন। এখনো দিনের শেষ আলোটি কাটে নি। আলো আঁধার মিলানো মায়াবী প্রকৃতি। চিত্রা মাথায় ওড়নাখানা টেনে রক্তিম নীলাম্বরীর দিকে তাকিয়ে আছে। আজকাল জীবনটা বেরঙ লাগছে। বড্ড এলোমেলো সবকিছু। এই এলোমেলো জীবনের অন্যতম কারণটি হলো ধ্রুব। ধ্রুবের আচারণ বড্ড অদ্ভুত। প্রথমত নিজেই চিত্রাকে নানা ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যেনো তার জীবনে হস্তক্ষেপ না করা হয়। যখন চিত্রা তার জীবন থেকে সম্পূর্ণ নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে তখন স্বয়ং তার জীবনে হস্তক্ষেপ করছে। তাও বিশ্রীভাবে। গতকালের ঘটনাটির পর ধ্রুব নিজ থেকে বলেছে যেনো তার ঘরেই চিত্রা থাকে। চিত্রা অবাক কন্ঠে যখন জিজ্ঞেস করলো,
“কেনো? এক ঘরে থাকতে হবে কেনো?”

তখন কাঠ কাঠ গলায় ধ্রুব উত্তর দিলো,
“আমি চাই না মামীদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে”

চিত্রা অবাক হলো। আরোও অবাক হলো যখন মানুষটা নিজ ইচ্ছাতে তাকে কলেজ নিয়ে যাচ্ছে আবার নিজের সময় মতো নিয়ে আসছে। এই পরিবর্তনের কারণ জানে না চিত্রা। তবুও মরীচিকার পেছনে ছুটতে চাইছে না সে। হৃদয়ে আশা বেধে সেই আশাভঙ্গের কষ্টটা সহ্য করার ক্ষমতা নেই তার, সেই সাহসটুকুও নেই। এর মাঝেই মারুফার তীক্ষ্ণ কন্ঠ কানে আসে চিত্রা।
“চিত্রা, তাড়াতাড়ি নিচে আয়”

চিত্রার ভাবনার জগতে ফাটল ধরলো। ছুটে গেলো নিচে। নিচে যেতেই প্রচন্ড অবাক হলো সে। কাওরান বাজার থাকার সাব ইন্সপেক্টর এসেছে তাদের বাসায়। পুলিশের বাসায় আসার ব্যাপারটা খটকা লাগলো তার। মিহি কন্ঠে সালাম দিলো সে। ভদ্রলোক বললো,
“মনীরুল ইসলামের বাসা তো এটাই তাই না? আপনি”
“আমি তার মেয়ে, চিত্রা”

লোকটির হাসি বিস্তৃতি পেলো। ধ্রুব ও বাড়ি নেই। এই সময়ে লোকটির আগমণে খানিকটা বিচলিত হলো সে। মারুফা এবং জাহানারা এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রলোক বিনয়ী স্বরে বললো,
“আসলে মনীরুল সাহেবের খু/নে/র মামলার জন্য এসেছি”
“কিহ!”
“জ্বী, আপনার বাবাকে খু/ন করা হয়েছে। যদিও প্রথমে দূর্ঘটনা মনে হচ্ছিলো। কিন্তু এখন তা স্পষ্ট সেটা খুন। আচ্ছা ধ্রুব সাহেব আছেন কি! মানে উনার ভাগ্নে, আসলে ধ্রুব সাহেব ই আমাদের এই মামলার তদন্তের কথা বলেন। তার ধারণাছিলো এই দূর্ঘটনা, দূর্ঘটনা নয়”
“আপনি কি একটু খুলে বলবেন, আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না৷ সবকিছু এলোমেলো লাগছে”

সাব ইন্সপেক্টর দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর সে বলা শুরু করলো,
“দেড় মাস পূর্বে, রাত চারটার দিকে আপনার বাবার লাশ পাওয়া যায় মেইন রোডের কাছে। টহল পুলিশ সেই লাশ পায়, তারা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই তাকে মৃ/ত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তে মনীর সাহেবের পেটে এলকোহল পাওয়া যায়। তাই আমরা নিশ্চিত হই এটা মাতলামির কারণে ঘটিত একটা দূর্ঘটনা। তবে ধ্রুব সাহেবের কঠিন বিশ্বাস ছিলো এটা দূর্ঘটনা নয়। এবং সেটাই সত্যি বের হলো। এটা দূর্ঘটনা নয়। ওখানে একটা দোকান ছিলো, দোকানের বাহিরে লাগানো সিসিটিভি টি প্রায় রাস্তাই কভার করে। আমরা সেই ফুটেজ পেয়েছি। আপনার বাবা রাস্তার ফুটপাত দিয়েই চলছিলো। হুট করেই একটা গাড়ি তাকে পিসে চলে যায়। একবার না দুবার। বোঝায় যাচ্ছে খু/নের মতলব ছিলো তাদের। গাড়িটির প্লেট থেকে গাড়ির হদিস পাওয়া গেছে। কিন্তু গাড়িটি চোরাই পথে বেঁচে দেওয়া হয়েছে। এই খবর টি দিতেই আসা। আমরা হোপফুল, খুব তাড়াতাড়ি চালক ধরা পড়বে”

চিত্রা স্তব্ধ, তার বাবা হয়তো পৃথিবীর জঘন্য মানুষের কাতারে পড়ে। কিন্তু লোকটিকে কেউ খু/ন করতে পারে কখনোই ভাবে নি সে। সে পাথরের মিতো বসে রইলো। মারুফা এবং জাহানারাও সব শুনলো। মারুফার চোখ ভিজে আসছে বারবার। আকস্মিক খবরটি তিনজনকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। ভেতরের মনোবল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। কে এই অজানা শত্রু_______

চা হাতে মোস্তফা কামালের ঘরে কড়া নাড়লো চারু। মোস্তফা কামাল তখন আইনের মোটা বই এ কিছু খুঁজতে ব্যাস্ত। কড়া নাড়ার শব্দে তিনি চশমার ফাঁকে চোখ তুলে তাকালেন। চারু জড়োসড়ো হয়ে বললো,
“বাবা আসবো?”
“একি তুমি? লতিকা কোথায়?”

চশমা খুলতে খুলতে মোস্তফা সাহেব প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। চারু স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“ও ভয় পেয়েছে, আসলে নতুন তো। তাই আমি ই চা নিয়ে এলাম”
“আচ্ছা, রেখে দাও”

চারু চায়ের কাপটা রেখে চলে যেতে নিলেও থেমে গেলো। কিছুটা জড়তা নিয়ে বললো,
“বাবা, একটা প্রশ্ন করবো?”
“কি?”
“এই বাড়িতে মায়ের কথা বলা নিষেধ কেনো? কাল যা ঘটেছে তাতে আমি নিশ্চিত আপনি মাকে খুব ভালোবাসেন। তাহলে কেউ কেনো মায়ের কথা বলতে চায় না?”

চারুর প্রশ্নে চমকে উঠেন মোস্তফা কামাল। অবাক চোখে থাকায় তার দিকে। চারুর চোখে মুখে হাজার প্রশ্নের আভাস পেলো সে। বইটা বন্ধ করতে করতে বললেন,
“অতীত নিয়ে থাকাটা বুদ্ধিমানের নয় চারু, তাই এই বাড়িতে কেউ অতীট ঘাটায় না”

চারু আর কথা বাড়ালো না। ম্লান হেসে বেড়িয়ে গেল। মোস্তফা কামাল এবং শ্রাবণ উভয়ই ভয়ংকর রহস্যময় মানুষ। এদের রহস্য ধরতে পারা খুব জটিল। তবুও হার মানবে না চারু। বন্দী জীবন কারোরই সহনীয় নয়। চারুর কাছেও এই জীবনটা অসহনীয়। যেখানে প্রতিটি সময় একটা ভয়ের সম্মুখীন হতে হয় এমন জীবনে সে মোটেই থাকতে চায় না। চারু ঘরে যেতেই শ্রাবণের মুখোমুখি হলো সে। যে হৃদয়জোড়া একটা সময় উষ্ণ ছিলো আজ তা শীতল। চারু একপলক শ্রাবণের দিকে তাকালো। পরমূহুর্তেই তার পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই শ্রাবণ তার হাত টেনে ধরলো। চারু চমকালো শ্রাবণের কাজে। কিছু বলার আগেই শ্রাবণ অস্থির ব্যগ্র কন্ঠে বললো,
“তুমি কি ভুলে যাচ্ছো, আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি!”
“হাত ছাড়ুন”
“আমার স্পর্শেও ঘৃণা হচ্ছে তোমার?”
“হচ্ছে, একটা প্রতারকের স্পর্শে যেমন অনুভূতি হবার কথা সেটাই হচ্ছে”

শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। অসহায়ত্ব তার চোখে ভেসে উঠলো৷ চারুর এরুপ আচারণ যেনো সহ্য হচ্ছে না তার। শ্রাবণ ছেড়ে দিলো চারুকে। তারপর সজোরে লাথি দিলো চেয়ারটিতে। নির্জীব চেয়ারটি মুখ থুবড়ে পড়ে রইলো মেঝেতে। চারু হাত দিয়ে নিজের চিৎকার আটকালো। শ্রাবণের শরীর কাঁপছে। সমস্ত রাগ যেনো চেয়ারটির উপর ই দেখালো সে। চারু মূর্তির মতো দেখলো সবকিছু। এই ঘটনার মাঝে তার খেয়াল ও নেই তার ফোন বাজছে। যখন ফোনের রিংটোন তীব্র হলো চারু খানিকটা নড়ে চড়ে উঠলো। ও বাড়ির ফোন। কন্ঠ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে ফোনটি ধরলো চারু। তখন ই চিত্রার ক্রন্দনরত কন্ঠ কানে এলো,
“বুবু, বাবাকে খু/ন করা হয়েছে”

কথাটা বুঝতে সময় লাগলো চারুর। কিছুক্ষণ চুপ রইলো, তারপর তার চোখ চলে গেলো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ তখন বিছানায় বসে নিজের রাগ নিবারণে ব্যাস্ত। চিত্রা বলতে লাগলো,
“বুবু কি শুনছিস?”

চারু উত্তর দিলো না…………..

চলবে।