দূর দ্বীপবাসিনী পর্ব-৪২

0
650

#দূর_দ্বীপবাসিনী (কপি করা নিষিদ্ধ)
#৪২তম_পর্ব

নিচে যেতেই বাবাকে থমথমে মুখে দেখলো শ্রাবণ। কাওরান বাজার থানার ওসি ইন্সপেক্টর ইকবাল বসে আছে বসার ঘরে। শ্রাবণকে দেখতেই তার হাসি চওড়া হলো। এগিয়ে এসে বললো,
“ইউ আর আন্ডার এরেস্ট, মিস্টার জায়ান শাহরিয়ার। মনীরুল ইসলামের খু/নের দায়ে আপনাকে গ্রেফতার করছি। আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমা্ণ আছে যে আপনি ই এই খু/নের প্রধান সাসপেক্ট”

কথাটা মস্তিষ্কের কোষে পৌছাতে সময় নিলো শ্রাবণের। হতবাক চাহনীতে তাকিয়ে রইলো সে। সে খু/ন করে নি, কারণ সেরাতে সে চারুর সাথে ছিলো। একই ঘরে, একই বিছানায়। শ্রাবণ অস্থির ভাবে বললো,
“আমি কিছু করি নি, কোথাও ভুল হচ্ছে?”
“আমাদের ভুল ঠিক না হয় আমরাই বুঝে নিবো মিস্টার জায়ান, প্লিজ কো-ওপারেট”
“কিসের জোরে আমাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছেন, না জেনে আমি কোথাও যাবো না”
“বেশ, মনীরুল সাহেব কে যে খু/ন করা হয়েছে তা নিশ্চয়ই জানেন। যে সিসি টিভি ফুটেজ আমরা পেয়েছি সেখানে স্পষ্ট আপনার সেক্রেটারি রাকিবকে দেখা যাচ্ছে, আর যে গাড়িতে এক্সিডেন্ট হয় সেটাও তার গাড়ি। আমরা প্রথমে তাকেই সন্দেহ করি। কিন্তু একটা সেক্রেটারি কারণ ছাড়া কেনো কাজটা করবে? তার সকল ফোন রেকর্ড আমরা চেক করি। সেখানে আপনার একটা রেকর্ডিং আমরা পেয়েছি। যেখানে আপনি তাকে ওর্ডার করছিলেন, যেনো মনীরুল সাহেব শেষ হয়ে যায়। আপনার সেক্রেটারিকেও আমরা এরেস্ট করেছি। এবার তো আমাদের সাথে যাবেন”

শ্রাবণের অস্থিরতা বাড়লো। নিজেকে বারংবার নির্দোষ প্রমাণ করতে চাবার আকুল প্রচেষ্টা চালাতে লাগলো সে। কিন্তু ইন্সপেক্টর ইকবাল তার সিদ্ধান্তে অনড়। তখন ই শ্রাবণের খেয়াল হলো তার পেছনে চারু দাঁড়িয়ে আছে। সে ছুটে গেলো তার কাছে। আকুল কন্ঠে বললো,
“চারুলতা, আমি কিছু করি নি। তোমার চাচাকে আমি সত্যি খু/ন করি নি। বিশ্বাস করো”
“করতে তো চেয়েছিলাম। কিন্তু ওই যে বলে, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়। আমি হলাম সেই ঘরপোড়া গরু। কিভাবে বিশ্বাস করি বলুন, কিভাবে পারলেন এতোটা নিষ্ঠুর হতে। এতোকাল যা অন্যায় করেছেন সব মেয়ে নিতাম, যদি বড় চাচাকে আপনি ছেড়ে দিতেন। সে তো শুধু আমাকে চড় মারতে গিয়েছিলো। আপনি সেটার বদলা এভাবে নিলেন”
“আমি কিছু করি নি, বিশ্বাস করো প্লিজ”

শ্রাবণের আকুল আবেদন কানে তুললো না চারু। নিষ্ঠুরের মতো হাত ছাড়িয়ে নিলো। অপ্রতীভ কন্ঠে বলল্
“আমাদের দেখা কোর্টে হবে”

মোস্তফা কামাল শক্ত মুর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের ছেলেকে নিষ্ঠুরের মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কিছুই করতে পারছে না সে। আইনের মানুষ হয়ে তো আইন ভাঙ্গতে পারে না। তবে সে দৃঢ় কন্ঠে বললেন,
“আমি তোমাকে ঠিক ছাড়িয়ে নিবো। যদি সত্যি তুমি নির্দোষ হও তবে কেউ তোমাকে আটকে রাখতে পারবে না”

শ্রাবণকে নিয়ে যাওয়া হলো। চারু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো পুলিশের ভ্যানটির দিকে। শ্রাবণ অসহায়ের মতো চারুর দিকে সাহায্যের জন্য তাকিয়ে ছিলো। কিন্তু চারু নিস্প্রভ আচারণ তাকে ভেতর থেকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিলো। সে সত্যি ই কিছুই করে নি। পুলিশ কখনোই শ্রাবণ অবধি আসতো না। কিন্তু ধ্রুবের সন্দেহ আজ শ্রাবণকে এই পর্যায়ে এনেছে। ধ্রুব সেই দোকানের মালিককে কিছু টাকা দিয়ে সিসিটিভি ফুটেজটি নেয়। খুব খুতিয়ে খুতিয়ে দেখে ওখানে কোনো ক্লু আছে কি না। অবশেষে পেয়েও যায়। ভিডিও এর একপাশে রাকিবের অবয়ব দেখা যায়। ধ্রুব এবং চিত্রা সেটা পুলিশকে জানায়। পুলিশ ততদিনে গাড়ির মালিকের খোঁজ নেয়, গাড়িটি রাকিবের নামে রেজিস্টার করা। কিন্তু গোল বাধে রাকিব যখন বলে, গাড়িটি চুরি গেছে। রাকিবের কাছে সেটার প্রমাণ ও ছিলো। তখন পুলিশ রাকিবের ফোন রেকর্ড বের করে। তার ল্যাপটপ এখন পুলিশের হেফাজতে। সেখান থেকেই শ্রাবনের রেকর্ডিং পাওয়া যায়। তখন পুলিশ নিশ্চিত হয় কে এই কান্ডের মূলে। ধ্রুব এবং চিত্রা পুলিশের এই ব্যাপারটা চারুকে ফোনে জানায়। চারুর মনে হয়েছিলো কেউ তার কানে যেনো গরম লোহা ঢেলে দিয়েছে। বিশ্বাস আবারো ভেঙ্গে যাবার অনুভূতি হয় তার। তাই শ্রাবণকে যে পুলিশ ধরতে আসবে জানা ছিলো চারুর। হ্যা, শ্রাবণ মনীরুল সাহেবকে শেষ করে দেবার কথাটা বলে ঠিকই, কিন্তু সেটা কোন প্রেক্ষিতে সেটা পুলিশের কাছে স্পষ্ট নয়। শ্রাবণ যখন জানতে পারে মনীরুল সাহেব ই দায়ী আহসান সাহেবের মৃত্যুর পেছনে এবং সে সম্পদের লোভে সব করেছে তখন তার রাগ নিয়ন্ত্রণ হারায়। রাকিবকে ফোন কে সে ওর্ডার দেয় ঠিকই। কিন্তু রাকিব সেটা করার আগেই মনীরুল সাহেব মারা যান। রাকিব সেখানে উপস্থিত ঠিক ছিলো। তবে তা মনীরুল সাহেবের মৃত্যুর পর। রাকিব বারংবার পুলিশকে বলা সত্ত্বেও তারা বিশ্বাস করছে না। কারণ প্রমাণ প্রধান। যদিও রাকিবের ল্যাপটপ থেকে তেমন কিছুই পায় নি পুলিশ। আগামী রবিবার তাদের কোর্টে চালান করা হবে।

বিগত আধা ঘন্টা যাবৎ শ্রাবণকে জেরা করা হচ্ছে। কাওরান বাজার থানায় বর্তমানে নতুন ইন্সপেক্টর জয়েন করেছে। সে শ্রাবণের অতি পরিচিত একজন, ফররুখ আহমেদ। সে তাকে রিমান্ডে নেবার পারমিশন আনিয়েছে। ইকবাল এবং সে একই সাথে এই কেসে আছে। কিন্তু শ্রাবণ মৌন, তাকে হাজার প্রশ্ন উত্তর করা হলেও সে তার মৌনতা ভাঙ্গে নি। চারুর মুখ ফি্রিয়ে নেওয়াটা যেনো সহ্য করতে পারছে না সে। বারবার চারুর ঘৃ/ণায় জড়ানো দৃষ্টি তার চোখের সামনে ভাসছে। একটা সময় ফররুখ বিরক্ত হয়ে যায়। জেরা থামিয়ে দেয়। ইকবালকে ডেকে বলে,
“এ মুখ খুলবে না, আমাদের এভিডেন্স তো স্ট্রং?”
“মোটামুটি”

তখন ই মোস্তফা কামাল উপস্থিত হয় নামী উকিল শাহাদাত হোসেনকে নিয়ে হাজির হলো। ফররুখ মোস্তফাকে ভালো করেই চিনে। সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“স্যার, যত চেষ্টা করুন লাভ হবে না”
“দেখাই যাক”

উকিলের আসায় কয়েদির সাথে কথা বলার সময় দেয় ইকবাল এবং ফররুখ। মোস্তফা কামাল শ্রাবণকে বলে,
“তুমি আমার কাছ থেকে লুকিও না কিছু, সত্যি করে বলো তো এই খু/নটা কি করেছিলে?”
“চারুলতা আসলো না, ও কোথায়?”
“এখন কি চারুকে নিয়ে ভাববার সময় শ্রাবণ?”
“ও আমাকে একবার দেখতে আসলো না, ও কি এসব বিশ্বাস করে নিয়েছে?”

ছেলের এমন উত্তরে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠে মোস্তফার। সে তীব্র কন্ঠে বলে,
“তোমাকে প্রথমেই বলেছিলাম, এই মেয়েটাকে এতো ভালোবেসো না। এতো পাগল হয়ো না। তুমি শুনো নি। সে তো তোমাকে ধরে আনার পর ই ও বাড়ি চলে গেছে। তোমার বিরুদ্ধে সে বয়ান ও দিবে। সাক্ষী সে তোমার বিরুদ্ধে। তোমার সব কিছু তো তার জানা। বুঝতে পারছো, কি হবে?”
“চারুলতা আমার সাথে এমন করবে না, ও তো আমাকে ভালোবাসে”

শ্রাবণ উম্মাদের মতো এক কথাই আওড়ালো। মোস্তফা কামাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ছেলে সত্যি উম্মাদ হয়ে গেছে। সে রাকিবের সাথে কথা বললেন, রাকিব তাদের এমন কিছু জানালো যার অপেক্ষাই তারা করছিলো। কিন্তু সময় লাগবে এটা প্রমাণ করতে। ততদিন এমন কিছু করতে হবে যেনো শ্রাবণ সুরক্ষিত থাকে। মোস্তফা কামাল উঠে দাঁড়ালেন। তার যাবার সময় হয়ে গিয়েছে। যাবার সময় ছেলেটার মাথায় একবার হাত বুলালো মোস্তফা কামাল। এতো বছরে এই প্রথম সে তার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়েছে। কতগুলো বছর কেটে গেছে। কিন্তু শ্রাবণের মাঝে সেই অনুভূতি নেই। সে এক দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। এতোটা নিষ্ঠুর কেনো তার দূর দ্বীপবাসিনী? কেনো?
*****
সময় নদীর স্রোতের মতো। রবিবার দেখতে দেখতে চলে এলো। রাকিব এবং শ্রাবণকে কোর্টে উঠানো হলো। যখন কাঠগড়ায় দাঁড়ালো তখন তার চোখ খুঁজলো চারুকে। প্রেয়সীকে দেখতে না পাবার উচাটন তাকে অস্থির করে তুলেছে। অসহায় চোখজোঁড়া খুঁজতে লাগলো শুধু চারুলতা। অবশেষে পেয়েও গেলো। একটা ধূসর রঙ্গের শাড়ি পরিহিতা রমনী কোর্টের শেষ ভাগে বসে রয়েছে। তার শুষ্ক চুলগুলো খোঁপায় বাধা। চোখে কালি পড়েছে। উদাস নয়নে তাকিয়ে আসে সে। শ্রাবণ অনুভব করলো তার বক্ষস্থলে চিনচিনে ব্যাথা করছে। এই ব্যাথার কারণটা কি? তার প্রেয়সীর চোখে ঘৃ/ণা, অবিশ্বাস যেনো তীক্ষ্ণ বিষাক্ত ছুরির আঘাতের মতো লাগছে। হৃদয়টা ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। কোর্টের কার্যক্রম শুরু হলো, প্রতিপক্ষের উকিল শ্রাবণের বিরুদ্ধে আরোপ লাগালো অনেক। শ্রাবণের সাথে সেদিনের ঝগড়ার সাক্ষী দিলো চিত্রা এবং ধ্রুব। একটা সময় চারুকেও ডাকা হলো কাঠগড়ায়। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো,
“মিসেস ফাতেমা তুজ জোহরা, আপনার এবং জনাব জায়ান শাহরিয়ার এর বিয়ের সময়কাল কতো?”
“মাস চারেক”
“আপনার স্বামীকে আপনি এই কয় মাসে ঠিক কত টুকু চিনেন? আপনার কি ধারণা আপনার স্বামীর পক্ষে এই খুন সম্ভব?”

চারু এক পলক তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণের অসহায় নিভু চোখজোড়া প্রতীক্ষায় আছে প্রিয়তমার উত্তরের। উত্তরটি কতটা জরুরী চারু জানে! আজ তার সাক্ষীর উপর শ্রাবণের ভবিষ্যৎ। চারু নীরব থাকলো বেশ কিছু সময়। শ্রাবণের চোখের দিকে স্থির থাকলো তার দৃষ্টি। শ্রাবণের উৎকন্ঠা যেনো অনুভব করলো সে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
……………………

চলবে
মুশফিকা রহমান মৈথি