দ্বাবিংশতি পর্ব-০২

0
242

#দ্বাবিংশতি
#লিখনে_মৃত্তিকা_চৌধুরী
#পর্ব_২

৩.

রাই দেখলো শুদ্ধের গাড়িতে সামান্যই স্ক্র্যাচ পড়েছে।তাই নিয়ে রাইয়ের আশেপাশে মেডিকেলের অর্ধেকের বেশি ছেলে-মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এখন দেখার পালা এই দৃশ্য দেখে শুদ্ধ কি করে!পার্কিংলটে এত কোলাহল কিসের তাই দেখতে গিয়ে ফাইজার চোখ আসমানে।আজকে রাই শেষ!শেষ পর্যন্ত প্রফেসরের গাড়িতে গিয়েই ম/র/তে হলো ওর?শুদ্ধও তার লেকচার শেষ করে এদিকেই আসছে।আজ তার একটু তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে।কারণ আজ তার জানটুশের জন্মদিন।আর সে অনেক বায়না করেছে একটা গোলাপি টেডি আনার জন্য।যা কিনতেই শুদ্ধের তাড়াহুড়ো করে ক্লাস শেষ করা।

নিজের গাড়ির সামনে এত ভীড় দেখে শুদ্ধ ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেল।সবাই কানাঘুষা করছে রাইকে মাঝে রেখে।আর রাইও এখান থেকে এক পাও নড়তে পারছেনা এই ভীড়ের জন্য। ফাইজা আশেপাশের মেয়েগুলোকে অনেক বুঝানো চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি।তাদের একটাই কথা এই ছেলের কত বড় সাহস প্রফেসরের গাড়িতে স্ক্র্যাচ তৈরি করার।আগে প্রফেসর শুদ্ধ আসবে।তাকে একচোট রাম ধোলাই দিবে এরপর এই ছেলের শিক্ষা হবে।ফাইজা দেখলো রাইয়ের হাতটা অস্বাভাবিকভাবে কাপছে।এতক্ষণে ভীড় ঠেলে শুদ্ধ রাইয়ের সামনে পৌছে গেছে।

রাইকে তার সামনে শুধু সাদা একটা শার্টকে দেখতে পাচ্ছে তাও অনেক ঘোলা।এরপর আর তার কিছু মনে নেই।সে যখন চোখ খুললো তখন তার আশেপাশে অনেক সাংবাদিককে দেখতে পেল।তার পুরো পরিবার বিশেষ করে তার বাবা তার হাত ধরে তার পাশেই বসে আছে।হঠাৎই সেখানে শুদ্ধের আবির্ভাব ঘটলো।

“এ কি অবস্থা?আপনারা এত মানুষ এখানে কি করছেন?পেশেন্টের ফ্যামিলি বাদে সবাই বেরিয়ে যান,প্লিজ।”

প্রথম প্রথম সাংবাদিকেরা বাহিরে যেতে না চাইলেও ফাইজা সবাইকে ঠেলে বের করে দিলো।এরপর রিজভী সাহেব শুদ্ধের দিকে তাকিয়ে বললো,

“ডাক্তার,রাই কেমন আছে?”

“চিন্তা করবেন না।হঠাৎ কোনো কারণে শরীরে পানিশূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিলো তাই এমন মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেছে।আজকে রাতটা চেকআপ এ থাকলে কালকে ঠিক হয়ে যাবে।”

“আচ্ছা,ডাক্তার।”

এরপর ডাক্তার শুদ্ধ ফাইজাকে ডেকে বললো,

“ওর এখন রেস্টের প্রয়োজন,ফাইজা।সো আই থিংক তোমরা এখন বাসায় যেতে পারো।কারণ ওকে দেখার মত এনাফ স্টাফ আর সিকিউরিটি আছে এখানে।”

ফাইজা মাথা নেড়ে তার বাবা-মার কাছে গিয়ে এসব বলতেই তার বাবা একবারে সোজাসোজি না করে দিলেন।

“তোমরা বাসায় যাও।দরকার পড়লে পিয়াসকে ফোন দিয়ে তোমাদের নিয়ে যেতে বলো।আমি রাইয়ের সাথে আজকে এখানেই থাকবো।”

রাই এবার অতিকষ্টে চোখ খুলে তার বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,

“বাবাই,তুমি ওদের সাথে বাসায় যাও।আমি ঠিক আছি।একটা রাতেই ব্যাপার!আমি নিজেকে সামলে নিবো।তুমি যাও।আর এখন ওদের সিকিউরিটির বেশি দরকার কারণ বাহিরে অনেক সাংবাদিক ওদের জন্যই অপেক্ষা করছে।”(রাইয়ের হঠাৎ ওয়েদার চেঞ্জের জন্য ঠান্ডা লেগে গলার স্বর বেশ মোটা হয়ে গেছে।তাই তার স্বর অনেকটা ছেলেদের মতই শোনাচ্ছিলো।)

রাইয়ের কথায় রাইয়ের মাও সম্মতি জানালেন।তাই অগত্যা মেয়ের কথা মানতে আর পরিবারের সুরক্ষার জন্য রিজভী সাহেবকে বাড়ি ফিরে যেতে হলো।কিন্তু সে যাওয়ার আগে শুদ্ধকে অনেক করে বলে গেল,

“ডাক্তারবাবু,আমার বাচ্চাটাকে দেখে রাখবেন।দোহাই লাগে আপনার।ও অন্য কান্ট্রি থেকে এসেছে তো তাই তেমন কিছুই জানে না এখানকার।আপনি দয়া করে আজ রাতটার জন্য ওর খেয়াল রাখবেন,প্লিজ।”

“কিন্তু আমি তো..!কথা শেষ করার আগেই ফাইজার বাবা শুদ্ধের হাত ধরে বললো,

” নিজের বাবার বয়সী একজনকে মানা করো না, বাবা।”

শুদ্ধ আর মানা করতে পারলোনা।কিন্তু আজ যে শ্রেয়ার বার্থডে।আজ শুদ্ধ বাসায় না গেলে শ্রেয়া সারারাত কান্নাকাটি করবে।তাও কি করার সে রাইয়ের কাছে গিয়ে দাড়ালো।রাইকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শুদ্ধ তাকে ঘুমিয়ে পড়তে বললো।

“ধন্যবাদ,ডাক্তার।”

“কেন?”

“আব্বুকে ম্যানেজ করে বাসায় পাঠানোর জন্য।”

“ওহ,ইটস ওকে।এমনিতেও আপনাকে দেখার জন্য এখানে অনেক মানুষ আছে।”

“আচ্ছা।”

“একটা প্রশ্ন করার ছিলো!”

“জি বলুন!”

“একজন ছেলে হিসেবে আই থিংক আপনার ওয়েট অনেক কম।খাবার ভালো মত খাওয়ার ট্রাই করবেন।নাহলে বড় ধরনের কিছু হতে পারে।”

“আচ্ছা,ট্রাই করবো।”

রাই আর শুদ্ধের কথা শেষ হতেই শুদ্ধের ফোনে কল আসে।শুদ্ধ নাম্বারটা দেখেই ঘাবড়ে যায়।সে রাইকে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে করিডোরে গিয়ে কল রিসিভ করে।আর রাই নিজের ফোনটাকে আশেপাশে খুজতে থাকে।না,কোথাও নেই!এখন সে কি করবে?কি একটা অবস্থা।সারারাত কি সে ঘাস কেটে পার করবে?নো ওয়ে!

এছাড়াও সেলাইন নেওয়ায় রাইয়ের নিজেকে এখন অনেকটাই চাঙ্গা লাগছে।তাই সে সাবধানতার সাথে নিজের হাতে লাগানো ক্যানোলাটা খুলে পাশে থাকা টিশুটা দিয়ে নিজের রক্তপড়া বন্ধ করে করিডোর দিয়ে চোরের মত হাটতে থাকে।হঠাৎই সে শুনতে পায় শুদ্ধ বলছে,

“মামুনি,সত্যি আজকে একটা ইমারজেন্সিতে আছি।কালকেই আমি তোমার টেডি নিয়ে যাবো।”

ওপাশ থেকে কি বললো শোনা গেল না।

“আহারে আমার জন্য ডাক্তারবাবু বাচ্চাটার কি একটা অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।”

রাই এবার গিলটি ফিল করতে লাগলো।তাই সে নিজের রুমে গিয়ে হাসপাতালের ড্রেস গুলো চেঞ্জ করে নিজের শার্ট আর প্যান্ট পড়ে নিলো।এরপর নিজের পকেট চেক করতেই সে হাজার টাকার সাতটা নোট খুজে পেল।এরপর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রুমে আসতেই দেখলো শুদ্ধ রুমে নেই।সে করিডোরে প্রবেশ করতেই শুদ্ধ তাকে দূর থেকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে এলো।

“এই ছেলে, তুমি কি পাগল?”

“ডাক্তার সাহেব!”

“কি?” (বিরক্তিকন্ঠে)

“বাহিরে যাবেন?”

“কিহহ!”

“আই মিন আমার ক্ষুধা লেগেছে সেই আকারের।আর আমি এখন ঠিকও আছি।ট্রাস্ট মি!”

“কখনোই না।পাগল হয়েছ নাকি তুমি!যাও কেবিনে গিয়ে রেস্ট নাও।আমি তোমার সাথে কোথাও
যাচ্ছিনা।”

তখনই একজন নার্স রাইয়ের শরীর কেমন আছে তা দেখার জন্য রুমের দিকে আসতে লাগলো।রাইয়ের শ্রবণশক্তি প্রখর।সে একধাক্কায় শুদ্ধকে নিয়ে দরজার পেছনে লুকিয়ে পড়লো।এরপর শুদ্ধের মুখ শক্ত করে চেপে ধরলো।শুদ্ধ জানে এমন অবস্থায় সে এই ছেলের সাথে ধরা পড়লে কারো সামনে।সেই খবর পুরো হাসপাতালে পারমাণবিক বোমার মত ছড়িয়ে পড়বে।

তাই সেও অনেক চেপে দাড়ালো।রুমে কাউকে দেখতে না পেয়ে নার্স ভড়কে গিয়ে অন্যদের ডাকতে গেল।আর তখনি রাই শুদ্ধর হাত ধরে করিডোর দিয়ে সন্তর্পণে পালিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসলো।শুদ্ধ বাহিরে আসার পর খেয়াল করলো রাইয়ের হাত বেশ নরম।ছেলেদের হাত এত নরমও হয়?আর সে দেখিতেও বেশ মায়াবী!তাকে আসলে কি বলা উচিত?মায়াবী পুরুষ?না,না।এটা আবার কেমন শব্দ!

“মেইন গেইট কোনদিকে?ডাক্তার সাহেব?”

“কি?ওহ,ওইদিকে।”

শুদ্ধ রাইয়ের হাত ধরে মেইন গেইট পেরিয়ে বাহিরে আসলো।ঘড়িটা উচু করতেই সে দেখলো দশটা বাজে।শহুরে এলাকায় দশটা মানে কিছুই না।সে রাইয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই রাই নিজের বাইকে উঠে বাইক স্টার্ট দিলো।

“পাগল হয়ে গেছ নাকি?”

“মানে?”

“তুমি স্টিল সিক।নামো বাইক থেকে।” শুদ্ধের কথা শুনে রাই সুড়সুড় করে বাইক থেকে নেমে গেল।এরপর শুদ্ধের গাড়িতে উঠে বসলো।শুদ্ধ বললো,

“কোথায় যাবে?”

“উম,মার্কেট এরিয়ার আশেপাশের কোনাও রেস্তোরাঁয়!”

শুদ্ধ বুঝতে পারলোনা এই ছেলে এমন আজব ব্যবহার কেন করছে?বড়লোকের ছেলেরা কি এমনই হয়!ম্যানারসল্যাস?

মার্কেট এরিয়ায় গিয়ে পৌছাতে শুদ্ধের আধা ঘন্টা লেগে গেল।সে গাড়ি থামাতেই রাই এক লাফে বাহিরে বের হয়ে গেল।

“সাবধানে।”

“আচ্ছা।”

শুদ্ধ বাহিরে বের হতে হতে রাই আশেপাশে চোখ বুলাতেই একটা পুতুলের দোকান দেখতে পেল।ততক্ষণে শুদ্ধ তার পাশে এসে দাড়িয়েছে।

“ওই যে ডাক্তার সাহেব রেস্তোরাঁ!” বলেই ভোঁ দৌড় দিলো রাই।রাইকে এমন বেপরোয়া হয়ে দৌড়াতে দেখে শুদ্ধও তার পিছনে পিছনে ছুটতে শুরু করলো।শেষমেশ রাই পুতুলের দোকানে ঢুকেই হুলুস্থুল কান্ড বাধিয়ে দিলো।সে একটার পর একটা দেখেই যাচ্ছে।

“এই ছেলে!এটা রেস্তোরাঁ না।”

“আমি জানি।আপনার বেবির ফ্যাভরিট কালার কি ডাক্তার সাহেব?”

“মানে!”

“ওই যে বাচ্চাটা আপনার কাছে টেডি চাচ্ছিলো।সরি আমি এক্সিডেন্টলি শুনে ফেলেছি।আমার জন্য কেউ সাফার করবে এটা হতেই পারেনা।তাও একটা বাচ্চা এটা তো সম্ভবই না।”

এবার শুদ্ধ বুঝতে পারল ছেলেটার এত কান্ডের কারণ।সে না জেনেই শুধু শুধু ছেলেটাকে খারাপ ভেবেছে।
এবার শুদ্ধ গোলাপি রঙের মধ্যে একটা টেডি কোলে নিয়ে বার কয়েক দেখতেই রাই কাউন্টার থেকে বিল পে করে শুদ্ধকে টানতে টানতে বাহিরে বেরিয়ে গেল।

“ডাক্তার সাহেব!”

“এমা,বিল পে করে বাহিরে আসতে হয়।ওয়েট আমি বিল পে করে আসি।”

“বিল আমি পে করেছি।”

“কি,কেন?”

“চিল,এটা আমার তরফ থেকে আপনার বাচ্চার জন্য একটা গিফট।”

শুদ্ধ কিছু বলার আগেই রাই বলতে লাগলো,

“আপনি এখন বাসায় চলে যান।আমি এখান থেকে গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে চলে যাবো।গো গো!”

শুদ্ধ রাইয়ের দিকে অবাক ভাবে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,

“তোমার নাম কি?”

“রাই।আপনার?”

“শুদ্ধ রাহমান।রাই ছেলেদের নাম হয়?”

“হুম,বেশ হয়।আচ্ছা,বা বায় আমি গেলাম।”

রাই রাস্তা পার হতে গেলেই শুদ্ধ পেছন থেকে ডাক দেয়।

“যার জন্য গিফট কিনলে তাকে নিজের হাতে গিফট না দিয়েই চলে যাবে?”

রাই থেমে পেছনে তাকালো।শুদ্ধ হাসলো রাইকে পেছনে তাকাতে দেখে।

চলবে,