#দ্বাবিংশতি
#লিখনে_মৃত্তিকা_চৌধুরী
#পর্ব_৩
৪.
“আমায় নিয়ে বাসায় গেলে আপনার ওয়াইফ কিছু বলবেনা?”(আশ্চর্যকন্ঠে)
“বাসায় চলো,তখনই দেখতে পাবে।”
রাই আর শুদ্ধ তখন রওনা হয় শুদ্ধের বাড়ির উদ্দেশ্যে।সারারাস্তা রাই গাড়ির কাচের বাহিরে মাথা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস অনুভব করছিলো।আসলেই বাংলাদেশের মানুষগুলো বেশ ভালোই।হঠাৎই রাইয়ের আরাভের কথা মনে পড়লো।
“কেমন আছে,আরাভ?সে কীভাবে পারলো রাইকে ছেড়ে এত দূরে চলে যেতে।রাই তো তাকে আজও ভালোবাসে।নিজের চেয়েও বেশি।আর কিছুদিন এরপর রাই সবকিছুকে আবার সেগুলোর আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিবে।এই উদ্দেশ্যেই তো তার বাংলাদেশে আসা।”
“নামবে না,রাই?”
শুদ্ধের কথা শুনে রাই খেয়াল করলো গাড়ি থেমে গেছে বহুক্ষণ আগেই।কিন্তু সে আরাভের স্মৃতিতে ডুবে থাকায় টের পায়নি।অগত্যা সে তার সমান টেডিটাকে কোলে নিয়ে কোনোমতে গাড়ির বাহিরে এসে দাড়ালো।
“হুম,চলুন।”
রাইয়েরা এখন একটা ছয়তলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বাড়িটা বিভিন্ন রঙের লাইট দিয়ে সাজানো।ডাক্তার সাহেব নিশ্চয়ই তার মেয়েকে অনেক ভালোবাসেন।তাই তো এত আয়োজন।রাই আর শুদ্ধ সিড়ি বেয়ে দোতালায় গিয়ে জুতা খুলে একটা ফ্ল্যাটে ঢুকলো।রাই দেখলো সাদা জামা পরিহিত একটা বাচ্চা পরী সবার মাঝে বসে আছে।শুদ্ধকে দেখতে সে দৌড়ে আসলো।
“মামা!আমি জানতাম তুমি আসবে।”
“শ্রদ্ধা কোথায়?শ্রেয়া!”
“আম্মু,তোমাকে মামা ডাকছে।”
“তোর মামাকে বল তার বোন ডেকোরেশনের কাজ করছে সেই দুপুর থেকে।সেও যাতে এসে আমাকে সাহায্য করে।”
“সর!আমি মাত্র বাহির থেকে এসেছি।তুই দুলাভাইকে বল!”
“শালাবাবু,তোমার কি মনে হয় আমাকে তোমার বোন বসিয়ে রেখেছে?আমাকে নিয়েই সে কাজে নেমেছে।বাঁচাও আমায়,শালাবাবু।”(নিবিড়)
“দুলাভাইইই,আপনার কথা শোনা যাচ্ছেনা।আমি গেলাম!” (দুষ্টমি করে)
এতক্ষণে শুদ্ধর পেছন থেকে এবার রাই বেরিয়ে আসতেও শুদ্ধের মা বললো,
“তুমি কে বাবা?তোমাকে তো আগে দেখিনি।”
“আমার বন্ধু,আম্মু।”
“এহেম এহেম,আমার এই ছেলের বন্ধুও আছে জানতাম তো!”
রাই হাসলো।এরপর গিয়ে শুদ্ধের মায়ের পাশে বসলো।
শুদ্ধের মা রাইকে দেখে বললো,
“তোমার নাম কি,বাবা?”
“রাই,আন্টি।”
“আচ্ছা,রাই।তুমি কোথায় থাকো?”
“আমি এই তো বুসানে ছিলাম এতদিনে।এক্সামের শেষ তাই বাসায় এসেছি।”
“এটা আবার কোথায়?”
“সাউথ কোরিয়াতে।”
রাইকে দেখে এতক্ষণে শুদ্ধের মেয়ে কাজিনরা ক্রাশ খাওয়া শুরুও করে দিয়েছে।
শাম্মি তো বলেই ফেললো,”তোমার নাম কি,ভাইয়া?”
“রাই।”
“আয়হায়,নাবিহা দেখদেখ ছেলেটা আমার কথার জবাব দিয়েছে!”
রাই ওদের কান্ড দেখে হাসলো।এরপর আন্টিকে অন্যদের সাথে কথা বলতে দেখে সে ধীরে ধীরে শ্রেয়ার কাছে গেল।
“তোমার নাম কি,আম্মু?”
“আমার নাম শ্লেয়া।”
“কি?”
“শ্লেয়া।”
“ওহ,এই নাও তোমার গিফট শ্লেয়া।”
“টেডি!!!”
রাই নিজের সমান বড় টেডিটাকে শ্রেয়ার সামনে রাখতেই সে টেডিকে ফেলে রাইকে দৌড়ে গিয়ে জরিয়ে ধরলো।
“এটা তুমি আমার জন্য এনেছ?”
“হুম,ছোট একটা সাদা পরীর জন্য এনেছি।”
শুদ্ধ ফারাবির সাথে এতক্ষণ কলে কথা বলছিলো।এবার শ্রেয়ার দিকে তাকাতেই সে শ্রেয়াকে এত খুশি হতে দেখে রাইয়ের দিকে তাকালো।ছেলেটা আসলেই আলাদা ধরনের।
শ্রেয়া রাইকে জরিয়ে ধরেই বললো,
“তুমি আমার মামি হবে?”
“মামি?”
“হুম,শুদ্ধ মামার বউ!”
“ডাক্তার শুদ্ধ তোমার মামা হয়?”
“হুম।কেন তুমি জানো না?”
“এই যে এখন জানলাম।কিন্তু,তুমি কীভাবে জানলে আমি মেয়ে?”
“ইশশ,বাবা তুমি কত্ত কিউট!তোমাকে দেখেই তো আমার মামি মামি ফিল হচ্ছে।”
রাই শ্রেয়ার বাচ্চামি দেখে হাসলো।এবার শুদ্ধ কল কেটে এগিয়ে আসলো।
“কি কথা হচ্ছে?তোমাদের!আমাকেও বলো?”
শুদ্ধের কথা শেষ হতেই ঘড়িতে বারোটা বেজে গেল।আর সবাই একসাথে শ্রেয়াকে উইশ করলো।টেবিলে কেক সাজানো হলো কয়েকধরনের।ভ্যানিলা,স্ট্রবেরি,চকলেটি সহ নানা ফ্লেভারের।কেক দেখেই রাইয়ের সেই আকারে ক্ষুধা পেয়ে গেল।আসলেই তো সে কখন থেকে না খেয়ে আছে!শ্রেয়ার বার্থডে পার্টি শেষ হতে হতে দুইটা বেজে গেল।শ্রেয়া ঘুমিয়ে গেছে অনেক আগেই।তাই, বাড়ির বড় সদস্যরা গল্প করছিলো।দুইটা বাজলে সবারই ঘুম পেতে শুরু করে।শুদ্ধর মা তাকে ডেকে বলে,
“শুদ্ধ?”
“জি,আম্মু।”
“রাই তোর রুমে থাকুক?গেস্টরুমে মানুষ ভর্তি।আর বন্ধু মানুষ গল্প কর যেহেতু ও এতদিন পর দেশে এসেছে।”
“কিন্তু!আচ্ছা ঠিক আছে,আম্মু।আজকের জন্যই তো প্রবলেম নেই।”
শুদ্ধ রাইকে ডেকে সবার মধ্যে থেকে তার রুমে নিয়ে গেল।এরপর সে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো।আর রাই তার তার রুম ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো।অনেক প্রাইজ আর সার্টিফিকেটে ভরে আছে রুমটা।তার মাঝে শুদ্ধ আর একটা মেয়ের গ্র্যাজুয়েশনের ছবি খুব যত্ন করে রাখা।এই সেই মেয়ে তাহলে!শুদ্ধ রুম থেকে বের হয়ে রাইকে এসব দেখতে দেখে বললো,
“তুমি কি নিয়ে পড়ছিলে বাহিরে?”
“ল’!”
“ওহ,তাহলে তো ভালোই।কোন ইয়ারে?”
“শেষ ফাইনাল দিয়ে আসলাম।কয়েকদিন পর রেজাল্ট দিবে।”
“ওহ!এত দ্রুত?”
“তিন বছরের কোর্স ছিলো।তাই এত দ্রুত শেষ হয়ে গিয়েছে।”
“আচ্ছা,অনেক রাত হয়েছে শুয়ে পড়।”
“ডাক্তার সাহেব,এটা আপনার গার্লফ্রেন্ড?”
“না,হবু বউ।কেন তোমার ভালোটালো লেগেছে নাকি?ও কিন্তু আগে থেকে বুকড।হিহিহি।”
রাই শুদ্ধের দিকে তাকালো লোকটার হাসি বেশ মিষ্টি।রাই এবার বিছানায় না শুয়ে বারান্দার ইজিচেয়ারে গিয়ে শুয়ে পড়লো।
“এখানে কেন তুমি?”
“এমনি।আমার ইনসোমোনিয়ার প্রবলেম আছে অনেক আগের থেকেই।তাই আমি সবসময়ই রাতটা খোলা আকাশের নিচে কাটাতে পছন্দ করি।কিন্তু এখানে তো বদ্ধ শিকলের ভেতর শুয়ে আছি আমি।”
“আচ্ছা,তাহলে থাকো এখানেই।মশার কামড় খাও!”
“মশা নেই বাহিরে।”
শুদ্ধ রাইয়কে আরকিছু বললোনা।কারণ সে ইতিমধ্যেই জেনে গেছে রাই অনেক জেদি ধরনের।এছাড়াও কাল তার অনেক কাজ বাকি আছে।আর তাই সে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই তার চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে গেল।
৫.💜
শুদ্ধ ঘুমিয়ে গেছে কনফার্ম করার পর রাই পিঠে হাত দিয়ে তার ইন্নারটা হালকা করে দিলো।ইন্নার হালকা হওয়ায় অনেকক্ষণ পর রাই ভালো মত নিশ্বাস নিতে পারলো।রাই তো এটাই চেয়েছিলো সবাই তাকে ছেলে ভাবুক!এটাই তো ভালো।রাইয়ের এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার হাই স্কুলের একটা ঘটনা।
“রাই?”
“ইয়াপ,এলেক্স!”
“ইউ স’ দিস গার্ল?শি ইজ আওয়ার নেক্সট টার্গেট।”
“ওকে,আই উইল গেট হার ফর ইউ,এলেক্স।”
“মাইগড,তি আমো<'3 মাই লাভ।" "ওকে,ওকে।নাও লেটস গো টু আওয়ার নেক্সট ডেইট?" "শিওর,লেটস গো।" সেদিন রাতে মেয়েটাকে বাচানোর জন্য ছদ্মবেশীনি রাইকে এলেক্সকে মে/রে ফেলতে হয়েছিলো। "ইউ সেইভ মাই লাইফ!থ্যাংকস গেরান্ডে ফ্রাতেলো(বড় ভাই)। সেদিন রাতে তিয়ানকে টেনে হিচড়ে এলেক্স তাদের আড্ডাখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় রাইও তার সাথে ছিলো।তিয়ানকে বাঁচাতে রাই তার হাতে থাকা টাইটেনিয়াম রড দিয়ে এলেক্স এর মাথায় আঘাত করতেই তার মাথা ফেটে এক ফিনকি রক্ত বেরিয়ে আসে।এরপর এলেক্সের বেশ অনেকটাই রক্তক্ষরণ হয়।যার কারণে সে মারা যায়।তার হাত নিস্তেজ হতেই তিয়ান ছুটে এসে রাইকে জরিয়ে ধরে।বেচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিয়ান রাইকে সেদিন থ্যাংকস জানিয়ে দৌড়ে নিজের হোস্টেলে ফিরে গিয়েছিলো। সেদিন থেকেই রোসালাইন থেকে বদলে রাইকে রাই হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে হয়েছিলো।আর যেই মেয়েটাকে রাই বাচিয়েছিলো সে রাইয়ের বেস্টফ্রেন্ড তিয়ানতিয়ান।তিয়ানতিয়ান কিছুদিন ধরেই বারবার রোসালাইনকে বলছিলো যে তাকে কেউ ফলো করে।আর এরপর রোসালাইন তিয়ানকে ফলো করে দেখলো তাদের কিছু সিনিয়ররা তিয়ানকে ফলো করে।সেদিন রোসা নিজের চুল কেটে,টাইট ইন্নার পড়ে সম্পূর্ণ ছেলেদের বেশে গিয়ে সিনিয়রদের সাথে ইচ্ছা করে ধাক্কা খেয়েছিলো।ওখানের একটা ছেলে গে থাকায় রাই তার নজরকাড়া রুপ দিয়ে তাকে খুব সহজেই পটিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়।আর সেই ছেলেই সিনিয়রদের লিডার থাকায় সিনিয়রের বফ হিসাবে রাই খুব সহজেই গ্রুপ মেম্বারদের ভীড়ে মিশে থাকতে পারে।আর এটাই তাকে তিয়ানকে বাচাতে সাহায্য করে। মানুষ হয়তো কখনো জানতে পারলে রাইকে ভুল বুঝবে।কিন্তু রাইয়ের হাতে সেদিন এছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিলোনা।ইটালির মত দেশে হয়ত এগুলো হওয়া সহজ।কিন্তু যার সাথে যা হয় সে তার বাকিটা জীবন একটা ট্রমা নিয়েই বেচে থাকে।তার যন্ত্রণা একজন সাধারণ নাগরিক বুঝবেনা। এরপর থেকে রাই তার এই রুপেই নিজেকে বেশি সেইফ ফিল করত।ধীরে ধীরে রাই তার কানেকশন আর ব্রেইন ইউজ করে খুব সহজেই ইটালির আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন ওয়ান্টেড মাফিয়ায় পরিণত হয়েছিলো।কিন্তু সে সবসময় তার গ্রুপের ছেলে-মেয়েদের সাহায্য করে ভালো পথে আনার পেছনে অনেক কাজ করেছে।রাইয়ের আন্ডারে ইটালিতে ওই এইজেই সাতটা স্কুল ছিলো।এখন তো এর সংখ্যা বেড়ে শতাধিকে পৌছেছে।কিন্তু এত কিছুর পরও রাই আজ এখানে।কারণ সে যে হেরে যেতে শিখেনি।আর তার বিশস্ত কেউই তাকে হারিয়ে দিয়েছে।এসব ভাবতে ভাবতে যে কখন রাই ঘুমিয়ে পড়েছে তার তা মনে নেই।কিন্তু সকাল পাঁচটায় আজানের শব্দে রাইয়ের ঘুম ভেঙে যায়।সে আবার ফিরে যায় রাইয়ের বেশে।ডাক্তার সাহেব এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।লোকটাকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে।কিন্তু লোকটা তো রাইয়ের নিজের নয়।তাই রাই নিজেকে সামলে নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো।এরপর এসে ইজিচেয়ারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো।সকালে ছয়টায় এলার্মের শব্দে শুদ্ধের ঘুম ভাঙতেই সে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলো।এরপর বারান্দায় রাইয়ের কাছে গিয়ে দাড়ালো। ছেলেটাকে অনেক সুন্দর লাগছে।ঘুমন্ত শিশুদের মতোই ঘুমিয়ে আছে রাই।হঠাৎই কি ভেবে শুদ্ধ রাইয়ের কপালে নিজের হাত ঠেকিয়ে রাইয়ের তাপমাত্রা মাপতে গেলে রাই চোখ খুলে শুদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইলো। "না,তাপমাত্রা তো ঠিকই আছে।" মনেমনে কথাটা বলে রাইয়ের দিকে তাকাতেই রাইকে জেগে থাকতে দেখে শুদ্ধ ভয়ে লাফিয়ে পিছিয়ে গেল। চলবে,