#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_দশ
প্রায় দেড় বছর পর মেহরিশ বাংলাদেশে পা রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশে পা রাখার সাথে সাথে নিজের একমাত্র মেয়েকে হারাতে হবে এটা ভাবতে পারছে না। মেহরিশ ছুটছে প্রাণপণ। মেহরিশের পিছু পিছু মেহনূর, সাথে ওর বাবা-মাও ছুটছে। মেহরিশ ছুটতে ছুটতে হঠাৎ একটা গাড়ি এসে ধাক্কা দিয়ে চলে যায় মেহরিশকে। মেহরিশ মুখ থুবড়ে পড়ে যায় রাস্তায়। মেহনূর চিৎকার করে উঠে। দৌড়ে এসে মেহরিশকে টেনে উঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে মেহরিশ জ্ঞান হারিয়েছে। মাথা ফেটে রক্ত বন্যা বইছে। মেহরিশের বাবা-মাও এবার পাগলের মতো কাঁদতে শুরু করলেন। একটা গাড়ি ডেকে মেহরিশকে হাসপাতালের নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। মেহনূর আর নিলুফা বেগম মেহরিশকে নিয়ে হাসপাতালে গেলেন। আর আবির সাহেব পুলিশ স্টেশনে গেলেন। মেহরিশকে হাসপাতলে এনে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলো। মেহনূর আর নিলুফা বেগম বাইরে বসে কাঁদছে। মেহনূরের দম বন্ধ হয়ে আসছে। সবকিছু কেমন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। এইতো কিছুক্ষণ আগেও ওরা সবাই হাসিখুশি ছিল। ঘন্টা খানেকের ব্যবধানে সবকিছু এভাবে এলোমেলো হয়ে গেলো কিভাবে? ওরা বাংলাদেশ ল্যান্ড করেছে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা বেজে ১০ মিনিটে। এয়ারপোর্টের সব ঝামেলা মিটমাট করে বাইরে বের হতে হতে প্রায় সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। মেহরিশ, আনায়া, মেহনূর দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল। আবির সাহেব আর নিলুফা বেগম গাড়ি আনতে গিয়েছেন। মেহনূর কিছু খাবার কেনার জন্য আনায়াকে কোলে নিয়ে একটা দোকানের দিকে গেল। দোকান থেকে কিছু কেনাকাটা করে রাস্তা পার হওয়ার টাইমে একটা গাড়ি এসে মেহরিশের কোল থেকে আনায়াকে ছুঁ মে°রে নিয়ে যায়। চোখের পলকে সবটা ঘটে যাওয়ায় মেহরিশ কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। যখন কানের আনায়ার তীব্র কান্নার শব্দ গেল তখন মেহরিশ শুধু নিস্তব্ধ চোখে দেখল আনায়াকে নিয়ে গাড়িতে চলে যাচ্ছে। মেহরিশের ধ্যান ভাঙতেই মেহরিশ গাড়িটার পিছু পিছু ছুটতে লাগল। আর চিৎকার করতে লাগল। মেহনূর দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে মেহরিশের পেছন পেছন ছুটতে লাগলো। চোখের পলকে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলো। মেহনূর গাড়ির নাম্বারটা দেখেছিল। সাথে সাথে নোটও করেছিল। আবির সাহেব আপাতত পুলিশের সাহায্যে গাড়িটা ট্রাক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মেহনূরের ফোনে সিম কার্ডও নেই যে কারোর সাথে যোগাযোগ করবে। হসপিটালের ওয়াইফাই চালুর জন্য চেষ্টা করতে লাগল। মেহনূর কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুবাধে যেকোনো কিছুর পাসওয়ার্ড হ্যাক করার বিষয়টা খুব ভালো করেই জানে। তাই ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড নিজের ফোনে কানেক্ট করে সবার আগে সায়রকে ভয়েস রেকর্ড করে সবটা জানাল। সায়র এই মুহূর্তে অনলাইনে নেই। তাই নিজের বাংলাদেশের কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের সাথে যোগাযোগ করল। এর মধ্যে ডাক্তার এসে জানাল,
“মেহরিশের, ব্লাড লাগবে।” মেহনূর আর মেহরিশের ব্লাড গ্রুপ এক হওয়ায় মেহনূর ব্লাড দেওয়ার জন্য গেল।
–
–
–
আমেরিকা টাইম সকাল ৮টা। সায়র ঘুম থেকে উঠে নাস্তার টেবিলে বসে মায়ের সাথে টুকটাক কথা বলছিল। তখনি কথার মাঝে সায়র হঠাৎ প্রশ্ন করে,
“মেহরিশ, শুধু ডিভোর্সি বলে তোমাদের সমস্যা? নাকি অন্য কোনো সমস্যা আছে?”
সায়রের অসহায় বাক্যে প্রশ্ন শুনে শাহিনা বেগম ছেলের দিকে অপরাধীর ন্যায় তাকালেন। বলে উঠলেন,
“বাবা, তুই অবিবাহিত একটা ছেলে হয়ে কেন বিবাহিত একটা মেয়েকে বিয়ে করবি? তাও যেই মেয়েটার সন্তান আছে।”
সায়র প্রতিউত্তরে প্রশ্ন করল,
“একটা ডিভোর্স হলে ডিভোর্সের কারণ হিসেবে শুধু মেয়েদের কেন দায়ী করা হয়, মা? না মানে ছেলেদের কেন দোষ দেখা হয় না? ছেলেরা কি সাধু? নাকি ছেলেরা ফেরেশতা যে তাদের কোনো দোষ নেই, থাকতে পারে না?”
শাহিনা বেগম চুপ করে গেলেন। সায়র পুনরায় প্রশ্ন করে বসল,
“যেই ছেলেকে তুমি নিজের মেয়ের পাশে প্রেমিক হিসেবে মানতে পারছো না, সেই ছেলেকে নিয়ে একটা মেয়ে ঘর করবে এমন ভাবছো কিভাবে? ছেলেটা যদি ভালো হতো তাহলে তো তুমি নিজের মেয়ের জামাই হিসেবে তাকে গ্রহণ করতে। ছেলেটা ভালো না বলেই মেয়েকে দূরে সরাতে চাচ্ছো। তা মা, নিজের মেয়ের বেলায় ১৬ আনা, অন্যের মেয়ের বেলায় ২আনা কেন?”
শাহিনা বেগম আর উত্তর দিতে পারলেন না। চুপ করে গেলেন। আলগোছে উঠে চলে গেলেন। সায়র চুলগুলো দুই হাতে খামচে ধরল। মাথাটা বড্ড ধরেছে। আজ মেহরিশ পরিবার সহ বাংলাদেশ চলে গেছে। কিন্তু একবারও সায়রকে জানায়নি অব্দি। সায়রকে মেহনূর বলেছে বলেই জানতে পারলো। মেহরিশের হঠাৎ দূরত্ব বুঝতে পারছেনা সায়র। এই দূরত্বের কারণ কি? মেহনূর সব বলেছে সায়রকে। সানায়ার আচরণে সায়রের ইচ্ছা করছে সানায়াকে থাপ্পড়ে গাল লাল করে দিতে। সব কিছু শুরু হওয়ার আগে এভাবে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন? সায়রের নিজেকে অসহায় লাগছে। সবটা বুঝে উঠতে পারছেনা। মেহরিশের মন জয় করবে কিভাবে? সানায়াকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করবে কিভাবে? আদৌও কি সায়র মেহরিশকে পাবে? সায়রের গলা দিয়ে খাবার নামছে না আর। তাই খাবার রেখেই উঠে চলে আসল। গাড়িতে এসে মনে পড়ল এতক্ষণে মেহরিশদের পৌঁছে যাওয়ার কথা। পৌঁছে তো মেহনূরের জানানোর কথা তাহলে জানানো হলো না কেন? ফোনের কথা মনে উঠতেই খেয়াল হলো ফোনটা রুমে রেখে এসেছে। তাই তড়িঘড়ি করে আবার রুমে গেল। ডাটা অন করতেই মেহনূরের ভয়েস ম্যাসেজটা আসল। সায়র বুঝতে পারল ওরা পৌঁছে গেছে। তাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ভয়েস রেকর্ডটা চালু করে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পা জোড়া থেমে গেল। মেহনূরের কান্নারত বাক্যে আনায়ার কিডন্যাপ হওয়ার কথা কানে আসতেই সায়রের মনে হলো ওর চারদিক ঘুরছে৷ চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। বুকের ভেতরটায় ধক করে উঠল। চিনচিন ব্যাথা শুরু হয়েছে। ভুল শুনল? আনায়ার মতো নিষ্পাপ একটা বাচ্চাকে কেউ কিডন্যাপ করেছে? নাহ! ভাবতে পারছেনা সায়র। হাটু ভেঙে পড়ে যেতে নিলেই হঠাৎ কেউ এসে ধড়ে ফেলল। সায়র পাশ ফিরে সানায়াকে দেখে আরো রেগে গেল। সানায়া চিন্তিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে, ভাইয়া? আর ইউ ওকে?”
সায়র শুধু অস্পষ্ট বাক্যে উচ্চারণ করল,
“আনায়া, কিডন্যাপ হয়েছে।”
সানায় কথাটা শুনতেই মনে হলো আকাশ থেকে পড়ল। আনায়া তো এসব চায়নি৷ কে করল এসব? আহিল? কিন্তু আহিল তো এখানে। তাহলে কে করল?
–
–
–
“স্যার, বাচ্চাটা কাঁদছে বার বার। প্লিজ আমরা বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে দেই?”
২৭/২৮বয়সী একটা ছেলে কথাটা বলতে দেরি কিন্তু তার গালে থাপ্পড় পড়তে দেরি হলো না। সামনে বসে থাকা বয়স্ক লোকটা গর্জন করে বলে উঠল,
“ওর জন্য এত মায়া লাগলে তোর নিজের মেয়েকে এনে দে।”
ছেলেটার কলিজা ধক করে উঠল। চুপ করে গেল সেকেন্ডের মাথায়। লোকটা এবার শান্ত বাক্যে বলল,
“মায়াকে খবর দাও, বাচ্চাটাকে সামলাতে বলো। যাও।”
ছেলেটা প্রতিউত্তরে মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। ছেলেটা চলে যেতেই লোকটা বিশ্রি ভাবে হেসে উঠল,
“মেহরিশ মা আমার, খুব শিঘ্রই তুমি তোমার জীবনের সবথেকে ভয়ংকর সত্য জানতে পারবে। জানতে পারবে তুমি কে, কি তোমার পরিচয়? তোমার জন্য আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি, তাই তোমাকেও তোমার মেয়েকে হারাতে হবে।”
–
–
–
সায়র পাগলের মতো ছুটছে এদিক সেদিক। কাগজ পত্র সব ঠিক করে টিকেট কয়াটা, একদিনের ভেতর সব কিছু ম্যানেজ করা সম্ভব না। সায়রের ইচ্ছে করছে এক্ষুনি মেহরিশের কাছে উড়ে চলে যেতে। মন, মস্তিষ্ক প্রশ্ন করছে বার বার, কে এই শত্রু? আহিল? কিন্তু আহিল নিজের মেয়েকে কিডন্যাপ করে নেওয়ার হলে এতদিনেই পারতো। তাহলে কে এই অদৃশ্য? কি শত্রুতা মেহরিশের সাথে? আনায়া ঠিক আছে তো?
#চলবে
#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_এগারো
বাংলাদেশে পা রেখেই সায়র ছুটে যায় হসপিটালে। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলো তার ভালোবাসার ফুল এই দুইদিনে ঝড়ে পড়ে গেছে। মেহরিশ পাগলের মতো করছে। হাতের ক্যানোলা টেনে ছিড়ে ফেলাতে হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে। এত হাইপার হওয়াতে ব্যান্ডেজ ভেদ করে রক্তের ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে। মেহনূর, নিলুফা বেগমসহ, ডাক্তার, নার্স সবাই মিলে মেহরিশকে বুঝিয়ে রাখতে পারছে না। নিলুফা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলছেন,
“মা, আমার মা। মারে, তুই একটু শান্ত হ। সব ঠিক হয়ে যাবে। আনায়ার খোঁজ পাওয়া গেছে। তুই একটু শান্ত হ। এমন করিস না, মা।”
মেহরিশ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল,
“আমার আনায়াকে এনে দাও। আমি আনায়াকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না, মা।, প্লিজ এনে দাও৷ মা, মাগো। ও মা, আনায়াকে এনে দাও।”
সায়র আর সহ্য করতে পারল না। হাটু থেকে পা অবশ হয়ে ভেঙে আসতে লাগল। চোখের সামনে ভালোবাসার মানুষটাকে পাগলপ্রায় অবস্থায় দেখা মারাত্নক যন্ত্রণা। সায়র কেবিনের ভেতর ঢুকেই অসহায় বাক্যে বলে উঠল,
“আমি আনায়াকে এনে দিব, মেহরিশ।”
পরিচিত কণ্ঠস্বর পেয়ে মেহরিশ থেমে গেল। সামনের দিকে তাকিয়ে সায়রকে দেখে চমকে উঠল। মেহনূর আর নিলুফা বেগম বোধহয় এতক্ষণে শান্তি পেল। সায়র এগিয়ে গিয়ে মেহরিশের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল,
“শান্ত হন, মেহরিশ। আপনি ভেঙে পড়লে, আমাদের ছোট্ট আনায়া ফাইট করবে কিভাবে? মায়েরা সন্তানের শক্তি জানেন না? আপনি তো এর নরম না, মেহরিশ। তাহলে ভেঙে পড়ছেন কেন? আপনাকে তো সুস্থ থাকতে হবে। আপনি সুস্থ না হলে আনায়কে খুঁজবেন কিভাবে? অপরাধীদের শাস্তি দিবেন কিভাবে?”
মেহরিশ প্রতিউত্তরে কিছু না বলেই হামলে পড়ল সায়ররের বুকে। শক্ত করে সায়রকে আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। কান্নারত বাক্যে উচ্চারণ করতে লাগল,
“সায়র! সায়র, দেখুন আমার বুকের ভেতরটায় কেমন করছে। মনে হচ্ছে বুক ফেটে যাবে। আমার আনায়া! আমার মা! আমার নাড়ী কা°টা ফুল, আনায়া! আমার আনায়া আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না, সায়র। আর আমার সে আনায়া আজ দুইদিন যাবৎ নেই৷ কোথাও নেই। মনে হচ্ছে আমি আমার অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলছি, সায়র। আমার আনায়াকে এনে দিন না, সায়র। আমি আমার আনায়াকে ছাড়া ম°রে যাব। প্লিজ, এনে দিন।”
সায়রও কাঁদছে। উপস্থিত সকলের চোখে পানি। মেহরিশের এমন পাগলের মতো হাহাকার পুরো দুনিয়াকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। পুরো বাংলাদেশের মানুষের মনে এখন একটাই চাওয়া আনায়াকে ফিরে পাওয়া। সুস্থ ভাবে ফিরে পাওয়া। দুইদিন ধরে নিউজ চ্যানেল, সোস্যাল মিডিয়ার হেড লাইন খবর ‘শিশু আনায়া মিসিং’। পুরো ঢাকা শহর উত্তাল হয়ে আছে। ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে খোঁজা হচ্ছে আনায়াকে। কিন্তু দুইদিন পার হয়ে যাওয়ার পরেও কোনোরকম খোঁজ পাওয়া যায়নি। এমনকি কেউ মুক্তিপণের জন্যও ফোন করেনি। সায়র বহু কষ্টে দুইদিনে টিকেট ম্যানেজ করে, আজ এসেছে। সায়র মেহরিশকে শান্ত করতে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠল,
“মেহরিশ, শুনুন। আমার কথা শুনুন।”
বলেই মেহরিশের সামনে হাটু গেড়ে বসল। কাঁপা-কাঁপি হাতে হাত রাখল মেহরিশের গালে। মেহরিশের চোখে চোখ রেখে অসহায় বাক্যে বলে উঠল,
“আমাকে বিশ্বাসের করেন, মেহরিশ?”
মেহরিশ হ্যা সূচক মাথা নাড়ল। সায়র এবার তৃপ্ত স্বরে বলে উঠল,
“তাহলে আমার উপর এই বিশ্বাস, ভরসাটা রাখুন।আমি কথা দিচ্ছি আনায়াকে আমি সুস্থ ভাবে আপনার কাছে ফিরিয়ে আনব, প্রমিস। এই যে দেখুন, আমি আপনাকে ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি। আপনি আমাকে একটা সুযোগ দিন, মেহরিশ প্লিজ। এই কঠিন পরিস্থিতিতে আপনাকে আমার পাশে চাই, মেহরিশ। আমরা দুজনে মিলে আনায়াকে ঠিক খুঁজে বের করব। আপনি একটু সুস্থ হয়ে নিন। আমি আপনাকে নিয়ে যাব এখান থেকে। প্লিজ, মেহরিশ।”
মেহরিশ পুনরায় কান্নায় ভেঙে পড়ল। আজ আবার মেহরিশ সেই অতীতের মতো ভেঙে পড়েছে। অসহায় হয়ে পড়েছে। নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে বাজে মা বলে মনে হচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে মেহরিশ আওড়াল,
“আমি পৃথিবীর সবথেকে বাজে, কেয়ারলেস মা। যে মা কিনা নিজের সন্তানকে আগলে রাখতে পারে না, তার মা হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই। আমার বেঁচে থাকার থেকে ম°রে যাওয়াই ভালো। আমার মতো মেয়ের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি সামান্য একটা বাচ্চাকে আগলে রাখতে পারলাম না। আমার বুক থেকে আমার মানিককে কেড়ে নেওয়া হলো, অথচ আমি কিনা কিছু করতে পারলাম না। ছিহ! শেইম অন মি।”
বলেই নিজের গালে থা°পড়াতে লাগল। পাগলের মতো থা°পড়ানো শুরু করল। সায়র বার বার আটকানোর চেষ্টা করেও যখন পারল না। তখন জোর করে মেহরিশকে জড়িয়ে ধরল। বুকের ভেতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেহরিশকে একদম নড়াচড়া করতে দিল না। চোখের ইশারায় ডাক্তারদের বুঝাল, ‘এই মুহূর্তে মেহরিশকে শান্ত করার জন্য যা করার দরকার করুন’। ডাক্তার হয়তো সায়রের ইশারা বুঝল। তাই নার্সকে আদেশ করল মেহরিশকে ইঞ্জেকশন দেওয়ার জন্য। নার্সও ডাক্তারের আদেশ অনুযায়ী একটা ইঞ্জেকশন আলতো করে মেহরিশের শরীরে পুশ করে দিল। মেহরিশ এখনো ছটফট করছে। বার বার আওড়াচ্ছে,
“আমার আনায়াকে দিন, সায়র। প্লিজ এনে দিন।”
কয়েক মিনিট এভাবেই আওড়াতে আওড়াতে ঘুমের ঘরে তলিয়ে গেল। সায়রের বুকেই শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সায়রের বুক ফেটে যাচ্ছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আচ্ছা, পৃথিবীতে ছেলেদের মন খুলে কাঁদার কোনো আইন নেই কেন? একটা ছেলে চাইলেও যেখানে খুশি সেখানে মন খুলে কাঁদতে পারে না। বুকের ভেতর জমানো কষ্টটা মুহূর্তেই চোখের জলে ভাসিয়ে দিতে পারে না। সায়রের ইচ্ছে করছে না মেহরিশকে বুকের থেকে সরিয়ে ফেলতে। কিন্তু ইচ্ছা করলেই কি সব হয়? সব ইচ্ছে কি পূরণ হয়? নাহ! সব ইচ্ছা পূরণ হয় না। সায়র মেহরিশকে আলতো করে বেডে শুইয়ে দিল। নিলুফা বেগমকে মেহনূর শান্ত করতে বাইরে নিয়ে গেছে। সায়র মেহরিশের হাত দুটো প্যাঁচিয়ে ধরে মনে মনে বলল,
“আপনাকে আমি এভাবে দেখতে পাচ্ছি না, মেহরিশ। কথা দিচ্ছি, খুব শিঘ্রই আমি আপনার মুখের হাসি আপনাকে ফিরিয়ে দিব।”
–
–
–
“স্যার, বাচ্চাটার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।”
কথাটা বলতে দেরি কিন্তু ছেলেটার গায়ে থাপ্পড় পড়তে দেরি হলো না৷ সায়র ছেলেটার কলার চেপে ধরে চিৎকার করে বলে উঠল,
“পাওয়া যায়নি মানে কী? তোমাদের তাহলে আমি এতগুলো টাকা কেন দিলাম? ৫২ঘন্টা পাড় হয়ে গেলো অথচ একটা বাচ্চার কোনো খোঁজ তোমরা দিতে পারলে না। কি করেছো তোমরা?”
ছেলেটা ভয়ে জুবুথুবু হয়ে আছে। তোতলানো স্বরে বলল,
“স্যার, আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী খুঁজেছি। এখনো চেষ্টা চলছে।”
সায়র রাগে কাঁপছে। বুকের ভেতরে থাকা যন্ত্রটা কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না। বার বার উপরওয়ালার কাছে আনায়ার সুস্থ থাকার প্রার্থনা করছে। ওইটুকু একটা মেয়ে কি করে আছে? আদৌ কি বেঁচে আছে? কথাটা ভেবে সায়র কেঁপে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“শহরের আনাচে কানাচের সব দেয়ালে পোস্টার ছাপিয়ে দাও। কেউ আনায়ার খোঁজ দিতে পারলে তাকে ৫০লক্ষ টাকা পুরষ্কার দেওয়া হবে। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে আমার আনায়াকে চাই। যাও।”
ছেলেগুলো চলে যেতেই সায়র থানার উদ্দেশ্যে বের হলো। মিরপুর থানার ওসি মুন্না সায়রের বন্ধু। সায়র থানার বাইরে গিয়ে মুন্নাকে কল দিয়ে কিছু একটা বলল। মিনিট খানেকের মাথায় মুন্না থানা থেকে বের হয়ে সায়রের গাড়িতে এসে উঠে বসল। সায়র মুন্নার দিকে অগ্নী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“কার বা* ফেলতে পুলিশ হয়েছিস? এখন অব্দি একটা বাচ্চাকে খুঁজে দিতে পারলি না?”
মুন্না শান্ত বাক্যে বলল,
“আমরা ঢাকা শহরের প্রত্যেকটা থানায় ইনফর্ম করে রেখেছি। সবাই সবার জায়গা হতে সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। নিউজ চ্যানেল গুলোতেও বার বার খবর প্রচার করা হচ্ছে। বলতে গেলে পুরো ঢাকা শহর এখন উত্তাল আনায়ার সন্ধানে। ভাগ্য আমাদের সহায় না হলে আমরা আর কি করতে পারি বল, ভাই?”
সায়রের চোখে জল। অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল,
“ভাই, আমি হয়তো বাবা হইনি। তাই এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একটা বাবার ঠিক কতটুকু চিন্তা, দূর্দশা হওয়া উচিত আমার জানা নেই। আনায়া আমার রক্তের কেউ না। কিন্তু আনায়কে হারিয়ে আমার মনে হচ্ছে আমার বুকের ভেতরটায় কেউ ধারালো কিছু দিয়ে বিশাল ক্ষত বানিয়ে দিয়েছে। কিছুতেই সেই ক্ষতের যন্ত্রণা কমছে না। মনে হচ্ছে আমার কলিজাটা কেউ টেনে ছিড়ে ফেলেছে। দেহ থেকে রুহটাকে আলাদা করে দিয়েছে। আমি আমার যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করে বুঝাতে পারবো না রে। আমার আনায়কে চাই। আমার বুকে আনায়া শান্ত হয়ে থাকে। আমার বুকটা খালি খালি লাগছে ভাই। আনায়ার কিছু হলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। আমার বোনের কথায় কষ্ট পেয়ে মেহরিশ বাংলাদেশে ফিরেছিল। শুধু মাত্র আমার থেকে দূরে থেকে একটু শান্তির খোঁজে এসেছিল মেয়েটা। আর দেখ এসেই নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলল। সব কিছুর জন্য আমি দায়ী।”
সায়র কাঁদছে। নিঃশব্দে কাঁদছে। মুন্না পাশে বাক শূন্য হয়ে বসে আছে। এত বছরের বন্ধুত্বে জীবনে এই প্রথম সায়রকে কাঁদতে দেখছে৷
–
–
–
পরের দিন। সকাল তখন ৬টা বেজে ২০মিনিট। শীতের সকালে চারদিকে কুয়াশায় সাদা হয়ে আছে। মেহরিশের ঘুম ভাঙতেই পাশে সায়রকে দেখল। কিছুতেই হসপিটালে থাকতে চাইল না। বাধ্য হয়ে সায়র মেহরিশকে নিয়ে বের হলো। মেহরিশ নিজে খুঁজবে ওর মেয়েকে। সায়রের পাশে উঠে বসল। গাড়িতে উঠে প্রশ্ন করল,
“গাড়িটার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।”
সায়র শান্ত বাক্যে বলল,
“হ্যাঁ, পাওয়া গেছে। গাড়িটার লাস্ট লোকেশন ছিল মিরপুর ১২তে। লোকেশন অনুযায়ী পুলিশ ওই জায়গায় যায়। একটা সদ্য গড়ে তোলা ব্লিডিং এর নিচে গাড়িটা ছিল। কিন্তু কেউ গাড়িটাকে পুড়িয়ে ফেলে রেখে গেছে। আশেপাশের সব জায়গায় খোঁজা হয়েছে আনায়াকে পাওয়া যায়নি।”
মেহরিশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কান্না চেপে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“কেন যেন মনে হচ্ছে আমার মেয়েকে আমার খুব কাছের কেউ আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে।”
সায়র অবাক হলো। জিজ্ঞেস করল,
“কারোর সাথে কোনো রকম শত্রুতা ছিল আপনার?”
মেহরিশ প্রাণশূন্য হেসে জবাব দিল,
“এক জীবনে আহিল ছাড়া আমি কারোর সাথে কখনো উচ্চবাক্যে কথা অব্দি বলিনি। সেখানে শত্রুতা খোঁজা তো হাস্যকর। জানা মনে আমার দৃশ্যমান কোনো শত্রু নেই। তাহলে কে এই অদৃশ্য শত্রু?”
কালসী ব্রীজ৷ ময়লা ভর্তি খালের পাশে লোকজন জড়োসড়ো হয়ে আছে৷ বেশ হাঙ্গামা শুরু হয়েছে। ব্রীজের উপরেও জ্যাম পড়েছে। সায়রের গাড়িও জ্যামে পড়ল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও বুঝতে পারলো না এখানে কি হচ্ছে। তাই দুজনেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ব্রীজের ধারে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল খালের লাশে বহু মানুষ। সাথে পুলিশও আছে। কিছু একটা ঘিরে এই জনসমাগম। বিষয়টা বুঝতে না পেরে পাশে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করল,
“এখানে কি হয়েছে, ভাই?”
মধ্যবয়সী লোকটা আফসোসরত স্বরে, হা-হুতাশ করে জবাব দিল,
“একটা বাচ্চাকে কেউ মে°রে বস্তায় ভরে ফেলে দিয়ে গেছে। আহারে! কী মায়াবী মেয়েটার মুখখানা! দেখে বুকের ভেতরটায় ব্যাথা করছে, ভাই।”
কথাগুলো সায়র আর মেহরিশের কানে যেতেই দুজনের শরীর কেঁপে উঠল। বুক ধক করে উঠল। মেহরিশ খামচে ধরল সায়রের হাত। মেহরিশ কাঁপছে। বেগতিক কাঁপছে। সায়র মেহরিশকে শক্ত করে ধরবে সে শক্তি পাচ্ছে না। আল্লাহ! নিয়তি কি তবে এত নিষ্ঠুর হলো…?
#চলবে