ধরিয়া রাখিও সোহাগে আদরে পর্ব-১২+১৩

0
153

#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_বারো

বছর খানেক একটা বাচ্চা মেয়ের লা°শ ভেসে উঠেছে নর্দমার পানিতে। দেখতে ভীড় জমেছে হাজার মানুষের। ফুলের মতো বাচ্চাটাকে কারা এভাবে মা°রলো? হাত কাঁপলো না? একটুও মায়া হলো না? হায়, আল্লাহ! ভীড়ের মাঝ থেকে এসব কথা ভেসে আসছে মেহরিশ আর সায়রের কানে। মেহরিশ তো ঠাঁয় দাঁড়ানো। কান্না করার শক্তি অব্দি পাচ্ছে না। ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছে। বুক কাঁপছে। শরীর কাঁপছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। এটা যদি আনায়া হয়! নাহ! আল্লাহ! মেহরিশ ভাবতে পারছে না। মুখ দিয়েও কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। সায়রেরও একই অবস্থা। তবুও সায়র কোনোমতে নিজেকে শান্ত রেখেছে। মেহরিশকে অভয় দিয়ে বলল,
“আমরা একবার দেখি? চলেন। ভয় পাবেন না। আল্লাহ ভরসা।”
মেহরিশ তবুও সাহস পাচ্ছে না। অর্ধেক এসে দাঁড়িয়ে আছে৷ সায়র মেহরিশ একহাতে নিজের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। পুনরায় আগের ন্যায় বলে উঠল,
“মেহরিশ, আল্লাহ তার বান্দাদের নিরাশ করেন না। আমরা যদি বাচ্চাটার মুখ না দেখি তাহলে শিওর হবো কি করে? আপনি মা। নিজের মনকে শক্ত করুন। মায়েরা যা দোয়া করে আল্লাহ তাই কবুল করেন। তাই মনে মনে আনায়ার সুস্থ থাকা প্রার্থনা করুন। চলুন আমার সাথে।”
মেহরিশ এবার একটু সাহস পেলো। মনে মনে বলে উঠল,
“এটা আমার আনায়া না। আনায়া হতে পারে না। আমার ফুল। আমার বুকে যত্নে থাকবে। এই নর্দমায় তাকে মানায় না।”
বলতে বলতে সায়রকে আগলে এগিয়ে যাচ্ছে। ভীড় ঠেলে সামনে যেতেই দেখলো বাচ্চাটাকে পলিথিনে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। চারদিকে পুলিশ ঘের দিয়ে রেখেছে। মেহরিশ আর সায়র এগিয়ে যেতেই পুলিশ বাঁধা দিলেন। বললেন
“সামনে যাওয়া যাবে না।”
সায়র শান্ত বাক্যে বলে উঠল,
“অফিসার, আমাদের বাচ্চা মিসিং আজ ৩দিন। আমরা একটু বাচ্চাটার মুখ দেখতে চাই, প্লিজ।”
পুলিশ কর্মকর্তা বাঁধা ছেড়ে দিয়ে অপর একজনকে আদেশ করলেন,
“বাচ্চাটার মুখ দেখাও।”
কথাটা মেহরিশের কানে যেতেই মেহরিশ সায়রের হাত খামচে ধরল। চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। এই দৃশ্যটা দেখা সম্ভব না। এটা যদি আনায়া নাও হয় তবুও দেখা সম্ভব না। এটা আনায়া না হোক, কিন্তু আনায়ার মতো একটা ফুল তো। কারোর বেঁচে থাকার সম্বল তো। কোনো এক মায়ের নাড়ি কাটা ফুল তো। এইটুকু একটা বাচ্চার মৃ°ত দেখা পৃথিবীর কারোর পক্ষে সম্ভব না। পুলিশ কর্মকর্তা বাচ্চাটার মুখ খুলতেই মেহরিশ আর সায়র দুজনেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। পুলিশ কর্মকর্তা বললেন,
“দেখুন, মিস্টার। চিহ্নিত করে আমাদের কাজে সাহায্য করুন।”
সায়র মনে মনে একবার প্রার্থনা করল,
“আল্লাহ, আমাদের উপর রহম করো। আমরা যা ভাবছি তা যেন না হয়।”
সায়র চোখ খুলল। একবার আকাশের দিকে অসহায় চোখে তাকাল। অতঃপর বাচ্চাটার দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর জমে থাকা নিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসল। ঠোঁটের কোনে চিলতে হাসির রেখা দেখা দিল। শরীরের এবার খুশিতে কাঁপতে শুরু করল। মেহরিশ তো এখনো চোখ বন্ধ করে আছে। চোখ খোলার সাহস নেই ওর। সায়র এবার খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে উঠল,
“মেহরিশ, চোখ খুলুন। চোখ খুলুন মেহরিশ। আমাদের কথা আল্লাহ শুনেছে, মেহরিশ।”
মেহরিশের কানে কথাটা যেতেই মেহরিশ ফট করে চোখ খুলল। পাশ ফিরে দেখল সত্যিই বাচ্চাটা আনায়া না। আল্লাহ! মেহরিশ এবার খুশিতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সায়রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ববলে উঠল,
“সায়র! আমার আনায়া কোথায়?”
সায়র মেহরিশকে ভীড় থেকে বুকে চেপে ধরেই বের করে নিয়ে আসল। মেহরিশকে এনে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আমার মন বলছে, মেহরিশ। আনায়া যেখানে আছে একদম ঠিক আছে। ওর কোনো ক্ষতি হবে না দেখে নিয়েন।”
বলেই পানির বোতল বের করে মেহরিশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“পানিটা খেয়ে নিন। আপনাকে এখন শান্ত থাকতে হবে। সুস্থ থাকতে হবে। আমি আপনার পাশে আছি, মেহরিশ।”
মেহরিশ পানিটা খেয়ে নিল। সায়র যথারীতি আবার ড্রাইভিং সীটে গিয়ে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল। হুট করে সায়রের ফোনে ২/৩টা ম্যাসেজের শব্দ বেজে উঠল। সায়র এক হাত দিয়ে ফোন বের করে ম্যাসেজগুলো সীন করতেই সারা মুখে অন্ধকার নেমে আসল। ম্যাসেজের রিপ্লাই না করে চুপচাপ ফোনটা পকেটে রেখে দিল। অতঃপর কিছু সময় পর হুট করে মেহরিশকে প্রশ্ন করল,
“মেহরিশ, আংকেল কোথায়?”
মেহরিশের ধ্যান ফিরলে জবাব দিল,
“আমি তো জানিনা, সায়র। বাবা, আনায়াকে খুঁজতে ব্যস্ত আছে। দিন রাত এক করে খুঁজে যাচ্ছে। কেন বলুন তো?”
সায়র ছোট করে উত্তর দিল,
”এমনি।”
খানিক থেমে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“আংকেলতো হসপিটালের কোথাও দেখলাম না এই দুইদিন।”
মেহরিশের পুনরায় ধ্যান ভাঙল। ভেবে দেখল সত্যিই তো! যে মেহরিশের কিছু হলে পাগল হয়ে উঠে সে কিনা এই ৩/৪দিনে মেহরিশকে দেখতে একবারো হসপিটালের যায় নি! ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক! মেহরিশ কথা ঘুরিয়ে বলল,
“একা মানুষ কতদিকে যাবে বলুন?”
সায়রও চুপ করে গেল। আর কথা বাড়াল না। নিরবতায় ছেয়ে গেল পরের মুহূর্তগুলো।


“স্যার, বাচ্চাটা আজ খুব কাঁদছে। জ্বরও এসেছে প্রচন্ড। কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না। একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া খুব দরকার।”
মেয়েলী কন্ঠে কথাগুলো ভেসে আসতেই সামনে থাকা ব্যক্তিটি মেয়েটার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। পরক্ষণেই আবার চোখ নামিয়ে ফেললেন। ধীর বাক্যে বললেন,
“ডাক্তার সময় মতো এসে যাবে। যাও, এখন। বাচ্চাটাকে সামলানোর দায়িত্ব তোমার। এখন তুমি কিভাবে সামলাবে এটা তোমার ব্যাপার। আমার দেখার বিষয় না।”
মেয়েটা চলে যেতেই ব্যক্তিটি নিজের পরিচিত ডাক্তারকে ফোন করে আসতে বললেন। ফোন রেখে দেয়ালে টাঙানো মেহরিশের ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মেয়ে তুমি অলুক্ষণে, অপয়া নাকি ভাগ্যবতী জানিনা। জন্মের পর নিজের বাবা-মাকে হারিয়ে, চাকরানী থেকে রাজরানী হয়ে থাকলে এটা অবশ্যই ভাগ্য। কিন্তু তুমি রাজরানী হয়েছো বলেই আমার মেয়ে হয়েছিল চাকরানী। আমার মেয়েটা তোমার জন্য আত্মহ°ত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। তোমার জন্য আমি আমার মেয়েটাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। শুধু তোমার জন্য না তোমার আর তোমার বোনের জন্য। তোমরা দুইবোন আমার থেকে আমার সব কেড়ে নিয়েছো। তোমাদের পরিনতি হবে ভয়ংকর।”
বলতে না বলতে তার চোখ বেয়ে দুফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল,
“প্রত্যেকটা মানুষের ভিলেন হওয়ার পেছনে একেকটা মর্মান্তিক কাহিনী থাকে৷ যে এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গেছে একমাত্র সে বাদে সমাজ ও সমাজের মানুষ কখনো তার ভিলেন হওয়ার পেছনের কাহিনীটা জানতে চায় না। বুঝতে চায় না। সবাই শুধু খারাপ মানুষটাকেই দেখে। খারাপ হওয়ার কারন দেখে না।”


সায়র মেহরিশকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজে মুন্নার সাথে দেখা করতে থানায় গেলো। মেহরিশের শরীর খারাপ হয়েছে তাই সায়র মেহরিশকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিল। মুন্নার কাছে গিয়ে সায়র দেখল সেখানে আগের থেকেই মেহনূর উপস্থিত। মেহনূর সায়রকে দেখেই অশান্ত স্বরে প্রশ্ন করে বসল,
“সায়র ভাইয়া, আপনারা যা ভাবছেন সম্পূর্ণ ভুল। আমাদের পরিবারে এখন শোকের ছায়া পড়েছে। আমাদের শোক আরো বাড়িয়ে দিবেন না, প্লিজ।”
সায়র কিছু বলার আগেই মুন্না আগ বাড়িয়ে বলে উঠল,
“আপনাদের শোক কেউ বাড়িয়ে দিচ্ছে না, মেহনূর। দেখুন তদন্তের খাতিরে আমরা সবাইকেই সন্দেহ করতে পারি। আপনিও সেই লিস্টের বাইরে নন।”
মেহনূর বিরক্ত হলো। চেঁচিয়ে বলল,
“তাই বলে আপনারা আমার বাবাকে কিডন্যাপার বানিয়ে দিতে পারেন না, অফিসার। আমার বাবা কেন তার নাতনিকে কিডন্যাপ করবে?”

#চলবে

#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_তেরো

“বাবা হয়ে নিজের মেয়েকে কিডন্যাপ করেছেন, মিস্টার আহিল? এত জঘন্য আপনি? আপনার জন্য আজ পুরো জাতি ‘বাবা’ নামক মানুষটাকে নিয়ে ভয়ে থাকবে।”
মেহরিশের ঘৃণিক বাক্যের কথাগুলো শুনে আহিল থমকে গেল। মাথা ভনভন করে ঘুরতে শুরু করল। কানে বাজতে লাগল,
‘বাবা হয়ে নিজের মেয়েকে কিডন্যাপ করেছেন?’
তার মানে আনায়াকে কেউ কিডন্যাপ করেছেন? এইটুকু বাচ্চাকে কেউ কিডন্যাপ করেছেন? ভেবেই আহিল কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। শরীর কেমন কাঁপতে শুরু করল। যতোই হোক আহিলের অস্তিত্ব আনায়া। আনায়ার কোনো ক্ষতি করার কথা আহিল স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। সেখানে আহিল নাকি আনায়াকে কিডন্যাপ করেছে? ভাবতেই পারছে না। মেহরিশ এত জঘন্য একটা অপবাদ কিভাবে দিচ্ছে? আহিলের গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না। তবুও থেমে থেমে বলে উঠল,
“আমার মেয়েকে আমি কিডন্যাপ করেছি____এমন কথা তুমি ভাবতে পারলে, মেহরিশ?”
মেহরিশ আগের ন্যায় বলল,
“শুধু ভাবতে পারিনি, আমি জানি এই কাজটা তুমিই করেছো। তুমি ছাড়া আমার কোনো শত্রু নেই।”
আহিল কেশে উঠল। গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল,
“মেহরিশ! আনায়া আমার মেয়ে।”
“তুমি মানো?”
মেহরিশের পাল্টা প্রশ্নে আহিল খুব দৃঢ় বাক্যে বলে উঠল,
“অবশ্যই মানি। আনায়া আমার রক্ত। আমার অস্তিত্ব। হ্যাঁ, আমার তোমার সাথে শত্রুতা। ক্ষতি করার হলে এতদিনে আমি তোমার ক্ষতি করতাম। কিন্তু আনায়া আমার মেয়ে। পুরো পৃথিবী মিথ্যা হলেও আনায়া আমার একমাত্র সত্য।”
মেহরিশের কণ্ঠ স্বর এবার নরম হলো। সত্যিই তো! আনায়ার ক্ষতি করার হলেও আহিল এতদিনেই করতে পারতো। মেহরিশ এবার আরো একবার কেঁপে উঠল। তাহলে কে এই অদৃশ্য শত্রু? চেনা কেউ নাকি অচেনা কেউ? মেহরিশ ফোন রেখে দেওয়ার জন্য তৈরি হতেই ওপাশ থেকে আহিল ব্যস্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
“আনায়ার কি হয়েছে, মেহরিশ?”
মেহরিশ থমকাল। কি উত্তর দিবে ভেবে পাচ্ছে না। আহিল এবার ধমকে উঠে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“আমার মেয়ে কোথায়?”
কথাটা একটু উচ্চস্বরেই বলল আহিল। মেহরিশের নিঃশ্বাস আটকে আসছে৷ পৃথিবীটা ঘুরছে। মস্তিষ্ক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য কোনোরকম কাজ করছে না। তবুও কোনোরকমে থমকে থমকে উত্তর দিল,
“আনায়া আজ প্রায় ৪দিন হলো মিসিং।”
আহিল থমকে উঠে বলে উঠল,
“কি? মিসিং? আল্লাহ! কবে থেকে? কিভাবে হলো? আর তুমি আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না? আনায়া আমারও সন্তান। তোমার আর আমার সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। কিন্তু আনায়ার উপর আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে__এটা ভুলে যেও না। ”
মেহরিশ উত্তর দিতে পারলো না। সত্যিই তো জানানোর দরকার ছিল। কিন্তু মেহরিশ তো জানানোর পরিস্থিতিতে ছিল না। মেহরিশ এবার আস্তে ধীরে সবটা খুলে বলল। সবটা শুনতে শুনতে আহিলের চোখের কোন বেয়ে কখন যে জল গড়িয়ে পড়েছে আহিল তা খেয়াল করেনি। মন, মস্তিষ্ক জুড়ে চিন্তা ভর করল। আনায়া ঠিক আছে তো?


সায়র এক গ্লাস পানি মেহনূরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“মেহনূর শান্ত হও। পানিটা খেয়ে নাও। আমরা একটু ঠান্ডা মাথায় ডিসকাশন করি।”
মেহনূর পানিটা নিল। চেয়ারে বসে পানিটা সম্পূর্ণ ঢকঢক করে গিলে ফেলল। বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। মুন্না শান্ত বাক্যে জিজ্ঞেস করল,
“ব্যাটার ফিল করছেন, মেহনূর?”
মেহনূর উত্তর দিলো না৷ কটমট দৃষ্টিতে তাকাল মুন্নার দিকে। সায়র এবার মেহনূরকে প্রশ্ন করল,
“মেহনূর, আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব। ভেবেচিন্তে ঠিকঠাক উত্তর দিবে। ওকে?”
মেহনূর মাথা নাড়ল। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ ’। সায়র গলা পরিষ্কার করে নিয়ে প্রথম প্রশ্ন করল,
“আংকেল বা আন্টি তোমাদের আসল বাবা মা, শিওর?”
মেহনূর প্রচন্ড বিরক্ত হলো। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে এলো। বিরক্তস্বরে বলল,
“অদ্ভুত! বাবা-মা আবার আসল নকল হয় বুঝি, সায়র ভাইয়া?”
সায়র হালকা হাসার চেষ্টা করে। পুনরায় বলে উঠল,
“আমাকে বিশ্বাস করো?”
মেহনূর এবার নরম বাক্যে জবাব দিল,
“আপনাকে আমি নিজের ভাইয়ের মতো ভাবি, সায়র ভাই। তাই আপনাকে বিশ্বাস না করার প্রশ্নই উঠে না।”
“তাহলে প্লিজ আমি যা জিজ্ঞেস করব একটু ভেবেচিন্তে উত্তর দাও।”
মেহনূর মাথা নাড়ল শুধু। সায়র পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“দেখো আমাদের চারপাশে অজানা এমন অনেক কিছু আছে। আমাদের দেখার বাইরেও কিছু সত্য থাকে। অনেক সময় সেসব সত্য সামনে আসলে আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়।”
মেহনূর এবার অসহায় বাক্যে বলল,
“তাই বলে আমার বাবাকে সন্দেহ করবেন, সায়র ভাই?”
সায়র শান্ত বাক্যে জবাব দিল,
“আমি সন্দেহ করছি না, বোন। সব প্রমাণ আংকেলের সপক্ষে।”
মেহনূর আর উত্তর দিল না। মুন্না এবার বলে উঠল,
“আপনি কি আপনার বোনের মেয়েকে সুস্থ ভাবে ফেরত চান?”
মেহনূর কাঠকাঠ গলায় বলল,
“আপনি আমার জায়গায় থাকলে কি সুস্থ ভাবে ফেরত চাইতেন না?”
মুন্না থেমে গেল৷ মিনমিন করে বলল,
“ধানি লংকা একটা।”
সায়র এবার বলল,
“মেহনূর তোমার কাজ হলো আংকেল ও আন্টির চুল এনে আমাদের দেওয়া। আমাদের কনফিউশান দূর করার জন্য ডি.এন.এ টেস্ট একমাত্র উপায়। এখনেই মেহরিশকে কিছু বলার দরকার নেই। আরো অনেক প্রমাণ দরকার। নিজেকে যেকোনো ধাক্কা সামলানোর জন্য প্রস্তুত রাখো, মেহনূর।”
বলেই উঠে দাঁড়াল। পরক্ষণেই একটু থেমে বলল,
“একটা খুশির সংবাদ দেই, আনায়া যেখানে আছে সুস্থ আছে। খুব শিঘ্রই আমরা আনায়াকে ফিরে পাবো।”
মেহনূর খুশিতে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠোঁটের কোনে হাসির ঝলক দেখা দিল। প্রফুল্লচিত্তে প্রশ্ন করল,
“সত্যি?”
মুন্না বলে উঠল,
“আমরা ফেক নিউজ দেই না।”
মেহনূর বিরক্তিতে মুখ বাঁকাল। সায়র মেহনূরকে নিয়ে বেরিয়ে আসল।


ডাক্তার আনায়াকে দেখে চিন্তিত স্বরে বলে উঠল,
“ওর মা কে?”
পাশে থাকা লোকটা বলল,
“ডাক্তার, আমাকে বলেন কি হয়েছে? এনিথিং রং?”
ডাক্তার চিন্তিত বাক্যে বলে উঠল,
“বাচ্চাটাকে আজকের মধ্যে হসপিটালে এডমিট করা দরকার। বাচ্চাটার গায়ে জ্বর ১০২°। এভাবে রেখে দিলে যেকোনো খারাপ কিছু ঘটতে পারে।”
লোকটা ভয় পেলো খানিকটা। ডাক্তার কিছু ঔষধ সাথে কিছু বিধিনিষেধ লিখে দিয়ে বার বার বলে গেলেন হসপিটালে নিয়ে যাওয়া জন্য। ডাক্তারকে বিদায় দেওয়ার সাথে সাথে রুমে প্রবেশ করল মুক্তা। আনায়া কাঁদছে। আনায়ার কান্নাতে চারপাশটা ভারী হয়ে আছে। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। মুক্তা আনায়াকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা করতে করতে অসহায় স্বরে বলে উঠল,
“স্যার, ওকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে আসুন না প্লিজ। তার বদলে আপনি আমার জীবন নিয়ে নিন। তবুও বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি করবেন না, প্লিজ।”
কথাটা বলতে না বলতেই মুক্তার কপালে সজোরে কোনো ভারী বস্তু আঘাত হানল। হঠাৎ আঘাতে মুক্তার টাল সামলাতে একটু সময় লাগল। খেয়াল করল মাটিতে একটা মোবাইল পড়ে আছে। তার মানে লোকটা মুক্তাকে মোবাইল ছু°ড়ে মে°রেছে। কপাল কী কেটে গেছে? মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। হয়তো কাটেনি। কিন্তু টের পেল কপালের মাঝ বরাবর গোলাকার মাংশ পিন্ড শক্ত হয়ে ফুলে উঠছে। ব্যাথায় চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। আনায়া একাধারে কেদেই চলেছে। লোকটা এবার বিরক্তিতে চেঁচিয়ে বলল,
“ওকে এক্ষুনি আমার চোখের সামনের থেকে নিয়া যা। ওর কান্না সহ্য হচ্ছে না আমার। নিয়া যা। নয়তো ব°ন্ধুকের সবগুলো গু°লি ওর গায়ে বসবে।”
মুক্তা ভয়ে কেঁপে উঠল। আনায়াকে বুকে আগলে কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। লোকটা রাগ সামলাতে না পেরে দেয়ালে ঘু°ষি মে°রে চিৎকার করে বলে উঠল,
“আমার কেন মায়া হচ্ছে? কেন? আমি কেন এখনো বাচ্চাটাকে মা°রতে পারছিনা? কেন বাঁচিয়ে রেখেছি? কি হয়েছে আমার? আমি তো চাই বাচ্চাটা যেন ম°রে যায়। তাহলে কেন মে°রে ফেলতে পারছি না।”


মাঝরাতে বাচ্চার কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল মেহরিশের। ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে মেহরিশকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল। তবুও ভেঙে গেল। মেহরিশ লাফিয়ে উঠে বেডে বসতেই দেখল কেউ একজন নিচে বসে বেডে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মেহরিশকে উঠে বসতে দেখে মানুষটা ধড়ফড়িয়ে উঠল। এবার মেহরিশ মানুষটাকে খেয়াল রাখল। সায়র মেহরিশকে উঠে বসতে দেখে চিন্তিত বাক্যে জিজ্ঞেস করল,
“মেহরিশ, কি হলো? ঠিক আছেন আপনি?”
মেহরিশ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল,
“সায়র, আনায়া! আনায়া!”
বলতে বলতে মেহরিশ বিছানায়া থেকে নেমে পড়ল। ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সায়র ধরতে চেয়েও পারল না। মেহরিশের পেছন পেছন নিজেও ছুটে আসল। মেহরিশ দৌড়ে এসে সোজা মেইন ডোর খুলল। মেইন ডোর খুলতেই অবাক হয়ে গেল। দরজার সামনে আনায়া। আনায়া কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে বাচ্চাটার। সায়রও মেহরিশের পেছন পেছন ছুটে এসে আনায়াকে দেখে থমকে গেল। এটা কী সত্যিই আনায়া? নাকি চোখের ভ্রম?

#চলবে