ধরিয়া রাখিও সোহাগে আদরে পর্ব-২২+২৩

0
100

#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_বাইশ

প্রাক্তন স্বামী আহিলের কোলে ছোট্ট মেয়ে আনায়াকে দেখে মেহরিশ কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দৌড়ে গেলো সামনের দিকে। এক প্রকার কেড়ে নিল আনায়াকে। আনায়াকে এনে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখল। মেহরিশের কান্ডে সায়র, আহিলসহ উপস্থিত সবাই অবাকের শেষ সীমানায়। আহিল হালকা হেসে বলে উঠল,
“তোমার মেয়ে, তোমারই থাকবে। আমি কখনো তোমার মেয়েকে ছিনিয়ে নিব না।”
মেহরিশ এবার চিৎকার করে বলল,
“আমার বাড়িতে ঢোকার পারমিশন আপনাকে কে দিয়েছে?”
সায়র শান্ত বাক্যে বলল,
“আমি।”
মেহরিশ থমকাল। মনে হলো কেউ বুকের ভেতরে আঘাত করল। অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“আপনি?”
কয়েক সেকেন্ড থেমে পুনরায় বাজখাঁই স্বরে বলে উঠল,
“আনায়া আমার মেয়ে__কথাটা ভুলে গেছেন? এই বাড়িটাও আমাদের৷ তাহলে আপনি কোন সাহসে আমাদের পারমিশন ছাড়া আহিলকে এই বাড়িতে এনেছেন?”
সায়র তখন শান্ত, শীতল বাক্যেই বলল,
“আনায়া আপনার মেয়ে__কথাটা অনিবার্য সত্য। তবে আনায়া যে আহিলেরও মেয়ে__কথাটা তো মিথ্যা নয়? আহিল স্বামী হিসেবে না হয় খারাপ, বাবা হিসেবে খারাপ নয়। পৃথিবীর কোনো বাবা খারাপ হতে পারে না, আর যারা হয় তারা হলো জঙ্গলের জা°নোয়ার। হ্যাঁ, আমি মানছি আহিল নিজের সন্তানের দায়িত্ব না নিয়ে ফেলে এসে জঘন্যতম কাজ করেছে। কিন্তু একটা মানুষ যখন নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় তাহলে কি তাকে একটা সুযোগ দেওয়া যায় না? আহিল অপরাধী, তাই বলে কি আহিল নিজের মেয়েকে এক নজর দেখতে পারবে না? ছুঁতে পারবে না?”
মেহরিশ তখনও শান্ত। উত্তর দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল না। মেহনূর তখন মুখ খুলল। বলল,
“আপু, আহিল ভাইয়া যদি খারাপও হয় তবুও তার সম্পূর্ণ অধিকার আছে মেয়েকে দেখতে পারার।”
নীলিমা বেগম এগিয়ে গেলেন মেহরিশের দিকে। মেহরিশের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“মা, এত ভয় নিয়ে বেঁচে থাকিস না। ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা মানে মৃ°ত্যুকে সেচ্ছায় গ্রহণ করা। আর সেচ্ছায় মৃত্যু মানে পাপ।”
মেহনূর এর মধ্যেই ফিচলে হেসে মিনমিনিয়ে বলল,
“যে নিজে পাপকে ঘিরে বেঁচে আছে, সে আবার অন্যকে পূন্যের বানী শুনায়। হাস্যকর!”
কথাটার মানে সায়র আর নীলিমা বেগম বুঝলেও মেহরিশ বা আহিল কেউ বুঝল না। মেহরিশ কিছু প্রশ্ন করার মতো খেয়ালেই ছিল না। আহিল এবার নিরবতা কাটিয়ে বলল,
“মেহরিশ, আমার মেয়েকে শুধু দেখতে দিও। কথা বলতে দিও। ছুঁতে দিও। ভালোবাসতে দিও। অল্পস্বল্প দায়িত্ব পালন করতে দিও। ব্যস! আর কিছু চাই না। ভাগ চাইনা আমি। আমি চাই শুধু আমার রক্ত জানুক আমি ওর বাবা৷ ঘৃণা করুক তবুও তাকে দেখার ভাগ্য আমার হোক।”
মেহরিশ কাঠকাঠ গলায় বলল,
“আপনি নিজেকে সংযত করে রাখতে পারলে আপনার মেয়ের ভালোবাসা থেকে আমি আপনাকে বঞ্চিত করব না। কিন্তু ভুলেও মেয়েকে নিয়ে যেতে আসবেন না”
আহিল আর কথা বাড়াল না। আনায়ার কপালে ছোট্ট করে চুমু খেয়ে আদুরে স্বরে বলল,
“আমার মা, অনেক বড় হও। মায়ের মতো ভালো মানুষ হবে। বাপের মতো জঘন্য হবে না কিন্তু।”
মেহরিশ এক নজর তাকাল আহিলের দিকে। আহিলের চোখের কোনে অশ্রু৷ ঠোঁটে হালকা হাসি। আহিলের চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।
আহিল সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। সেদিন আনায়ার কিডন্যাপ হওয়ার খবর শোনার পর থেকে আহিল শান্তি পাচ্ছিল না। এক নজর দেখার জন্য মন ছটফট করছিল। তাই টিকেট ম্যানেজ করে ছুটে এসেছে আনায়াকে দেখতে। আহিল চলে যেতেই সায়র থমথমে গলায় বলে উঠল,
“আমাকে বিশ্বাস না করুন, ভালো না বাসুন প্রবলেম নেই। কিন্তু সবার সামনে অপমান করার রাইটও আপনার নেই, মেহরিশ। হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন আনায়া আপনার মেয়ে। আনায়ার প্রতি যত, দায়িত্ব, কতব্য, অধিকার সব আপনার একার আছে, মানছি। তবে কাগজে কলমে আপনি আমার স্ত্রী তাই আনায়ার প্রতি সামান্য হলেও আমার অধিকার জন্মেছে__এটা তো অস্বীকার করতে পারবেন না? এই বাড়িটাও আপনাদের। তাহলে আমি কেন পড়ে আছি এখানে? আপনার জীবনে কি জোর করে জায়গা করে নিয়েছি, মেহরিশ? অবশ্য জোর করেই তো বিয়ে করেছি৷ আমার প্রতি আপনার এত তীক্ততা যে, নিজের প্রাক্তন স্বামীর সামনেও আমাকে অপমান করতে পিছপা হলেন না? বাহ! ওকে, ফাইন। আপনি যেদিন আমাকে ভালোবাসতে পারবেন, সম্মান করতে পারবেন, সেদিন আমি আবার আপনার সামনে আসব৷ তার আগে আমার মুখও আপনাকে দেখব না৷”
বলেই আনায়ার গালে চুমু খেয়ে বড় বড় পা ফেলে চলে গেল। মেহরিশ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীলিমা বেগমও কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেলেন। মেহনূর শুধু শান্ত বাক্যে বলল,
“আপু, সায়র ভাইয়ার মতো রত্নকে পায়ে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিস না। নিজেকে শক্ত খোলস থেকে বের করে নিয়ে এসে, সুন্দর ভাবে বাঁচতে শিখ।”
বলে সামনে দুই পা এগিয়ে আবার থেমে গেল। পেছন ফিরে পুনরায় বলে উঠল,
“আপু, জীবনের কিছু সত্য খুব তিক্ত হয়। তাই সময় থাকতে জীবনটাকে গুছিয়ে নে। নয়তো খারাপ সময়ে কারোর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে অব্ধি পারবি না।”
সবাই চলে যেতেই মেহরিশ সায়রের বলা কথা গুলো ভাবতে লাগল। আনায়াকে বুকে জড়িয়ে ডুঁকরে কেঁদে উঠল। নিজে নিজে বলতে লাগল,
“আমি আপনাকে এভাবে আঘাত করতে চাইনি, সায়র। আহিলকে হঠাৎ দেখে নিজেকে সামলাতেও পারিনি।”


সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। চারদিকে অন্ধকার নামছে। হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ ভেসে আসল। এই সময় কে এলো? বাসায় আর কেউ না থাকায় অনিচ্ছা স্বত্তেও গিয়েও সায়র দরজা খুলল। সানায়াকে দেখে আকাশ থেকে পড়ল। চমকিত বাক্যে বলে উঠল,
“সানায়া! সানায়া!
সায়র অবাক স্বরে বলে উঠল,
“তুই? এখানে? মাকে একা রেখে তুই চলে আসলি? আমাকে একটাবার জানানোর প্রয়োজন বোধ করিসনি?”
সানায়া চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। অতঃপর সায়রকে সাইড করে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে উত্তরে বলল,
“আমি কোথায় যাব না যাব তা কি তোমার থেকে পারমিশন নিয়ে যেতে হবে?”
সায়র অবাক হয়ে তাকাল। কড়া বাক্যে জিজ্ঞেস করল,
“আমি তোর ভাই ভুলে গেছিস?”
সানায়া হাসল। হাসতে হাসতে বলল,
“ যে ভাই বোনের মন বুঝেনা, বোনকে সপোর্ট করতে পারে না তাকে অন্তত আমি নিজের বিষয় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিতে পারিনা।”
সায়রের কেন যেন বুকের ভেতরট দুমড়েমুচড়ে উঠল। এক মাত্র বোনের থেকে এমন বাক্য কোনো ভাইয়ের কাম্য নয়। সায়র আর কথা বাড়াল না। দরজা আটকে শান্ত বাক্যে বলল,
“বাসায় রান্না করা নেই, রান্নার কোনো উপকরণও নেই৷ আমি খাবার অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি। তুই ফ্রেশ হয়ে নে। আমি রাহেলা খালাকে ফোন করে আসতে বলছি। খালা আসলে তোর রুমটা ভালোভাবে পরিষ্কার করে দিতে বলিস।”
বলেই নিজের রুমে চলে গেল। সানায়াও আর কথা বাড়াল না। সায়র চলে যেতেই সানায়া নিজে নিজে বলে উঠল,
“যে মেয়েটা আমার চোখে তোমাকে ভিলেন বানিয়েছে, তার জীবনটা ছারখার না করা অব্দি আমার শান্তি নেই।”
অতঃপর ওয়াইফাই কানেক্ট করে কাউকে কল দিল। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করতেই সানায়া বলে উঠল,
“আলিশা আপু, তুমি কখন এন্ট্রি নিচ্ছো?”
ওপাশ থেকে উত্তর আসল,
“আমি এন্ট্রি নিলে ধামাকা হবে, বেবস। একটু মশলাদার ধামাকার জন্য অপেক্ষা তো করতেই হবে।”
বলেই ফোন রেখে দিল। ফোন কাটতেই সানায়া বলে উঠল,
“সরি ভাইয়া, আমার থেকে আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নেওয়ার শাস্তিস্বরূপ তোমাকেও ভালোবাসা হারাতে হবে।”

#চলবে

#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_তেইশ

“আপু, ১৮বছর ধরে যাকে আমরা বাবা বলে জেনে আসছি, সে আসলে আমাদের বাবা না।” মেহরিশ আনায়াকে ঘুম পাড়িয়ে নিজে একটা উপন্যাসের বই নিয়ে বসেছে। রাত এখন ১১টার কাছাকাছি। মেহনূর এতক্ষণ শুয়ে শুয়ে ফোন চাপছিল হুট করে বসে মেহরিশের উদ্দেশ্যে সাবধানে প্রশ্ন করে উঠল,
“আপু, তুই যদি হঠাৎ তোর জীবনের কিছু অজানা, কঠিন সত্য জানতে পারিস সহ্য করতে পারবি?”
মেহরিশ স্বাভাবিক ভাবে বলে উঠল,
“সত সর্বদা বেশ কঠিন হয়। শুধু আমি কেন পৃথিবীর কারোর পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে কঠিন সত্য মেনে নেওয়া সম্ভব না।”
মেহনূর এবার একটু রয়েসয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা আপু তোর স্কুলের প্রথম দিনের কথা মনে আছে?”
মেহরিশ বইটা বন্ধ করল। শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল মেহনূরের দিকে। আফসোসের বাক্যে বলল,
“না রে। কেন যেন আমার মনে হয় আমার মস্তিষ্ক থেকে আমার ছোটবেলা হারিয়ে বা মুছে গেছে।”
মেহনূরের চোখে কেন যেন অশ্রু জমাট বাধা শুরু করল৷ মেহনূর এবার একটু নড়েচড়ে বসল। জিজ্ঞেস করল,
“আপু, তুই বাবাকে খুব ভালোবাসিস তাইনা?”
মেহরিশ হাসল। উত্তরে বলল,
“বাবা নামক মানুষটা আমাকে খুব বুঝে। বাবা ছাড়া কেউ আমার মাথায় স্নেহের হাত বুলায় না।”
মেহনূর তখন সোজাসাপটা, কঠিন বাক্যে উপরোক্ত বাক্যটি বলে উঠল। মেহরিশের কানে কথাটা যেতেই মেহরিশ বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকাল মেহনূরের দিকে। আকাশ থেকে পড়ার মতো চমকে উঠল। পরক্ষণেই আবার হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে মেহনূরের কাঁধে চাপড় মেরে বলে উঠল,
“হিংসুটে। বাবাকে আমি বেশি ভালোবাসি বলায় এভাবে বলছিস। আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম, বাপু।”
মেহনূর এবার উঠে দাঁড়াল। কঠিন স্বরে বলে উঠল,
“আপু, আমি মজা করছি না। যা বলছি সত্যি বলছি।”
মেহরিশ এখনো বিশ্বাস করল না। ওর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মেহনূরকে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“মজা একবার ভালো লাগে দ্বিতীয় বার না, মেহনূর।”
মেহনূর তাতেও থামল না৷ আগের ন্যায় জোর গলায় বলল,
“আমি কোনো মজা করছি না। আমরা যাকে বাবা বলে এর বছর ধরে চিনেছি সে আসলে আমাদের চাচা হয়। হ্যাঁ, আবার বাবাও হয়। কারণ আমার মায়ের দ্বিতীয় স্বামী তিনি।”
মেহরিশ এবার খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। হাত পা কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়েছে৷ তবুও কঠিন বাক্যে মেহনূরকে সাবধান করে বলল,
“মেহনূর এখানেই থেমে যা। আমার ধৈয্যের পরিক্ষা নিস না।”
মেহনূর থামল না। মেহরিশের সামনে এসে এবার বেশ অসহায় বাক্যে বলল,
“আপু, বিশ্বাস কর উনি আমাদের বাবা নন। আমাদের বাবা মা’রা গেছেন।”
কথাটা বলতে না বলতে মেহনূরের গালে সপাটে থা°প্পড় মে°রে বসল মেহরিশ৷ চিৎকার করে বলল,
“মুখ সামলে কথা বল মেহনূর৷ যা তা বলার আগে চিন্তা কর কার নামে বলছিস। নিজের বাবা মায়ের নামে এমন কথা বলছিস? আমার তোকে নিজের বোন বলতেও লজ্জা হচ্ছে। এক্ষুনি আমার চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যা। বেরিয়ে যা বলছি।”
মেহনূর গেলো না। দু চোখ বেয়ে টপাটপ পানি ঝরছে। তবুও চিৎকার করে বলে উঠল,
“আমি যা তা বলছি না। যা বলছি ভেবেই বলছি। তোর অজানা কিছু কঠিন সত্য আছে৷ যা তুই মানতে চাইছিনা বা কোনোদিন জানার চেষ্টা অব্দি করিসনি। তবে খুব শিঘ্রই তুই এমন কিছু সত্যের সম্মুখীন হবি। তখন আমাকে ভুল বোঝার জন্য আফসোস করবি। আর হ্যাঁ যাদের নামে বলছি এবং যা বলছি তা একশোভাগ সত্য। প্রমাণ করে দেখিয়ে দিব। একটু অপেক্ষা কর।”
বলেই মেহনূর চলে এলো বাইরে। দরজা খুলতেই নীলিমা বেগমকে দেখে ঘৃণায় চোখ নামিয়ে ফেলল। কঠিন বাক্যে দাঁত কিড়মিড়ে বলে উঠল,
“আমাদের এর বছর অন্ধকারে রাখার জন্য আপনি দায়ী। আমার বোনের বাবার প্রতি ঘৃণা জন্মানোর জন্যও আপনি দায়ী। কালকের জন্য অপেক্ষা করুন। দারুন কিছু ঘটবে।”
বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। নীলিমা বেগম আর রুমে ঢোকার সাহস পেলেন না। মেহরিশের সামনে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তার নেই। মেহনূর বেরিয়ে যেতেই মেহরিশ দুই হাতে মাথা চেপে বিছানায় বসে পড়ল। মেহনূরের বলা কথাগুলো তখনো কানে বাজছে। আচ্ছা আজ এত বছর পর মেহনূর কেন এসব বলল? কোন সত্য জানেনা মেহরিশ? সত্যিই এই মানুষটা মেহরিশের বাবা না? এর বছরের আদর, স্নেহ, ভালোবাসা সব কি তবে মিথ্যে ছিল? মেহরিশ আর ভাবতে পারছে না। চোখ থেকে পানি ঝরছে। মাথা ব্যাথা করছে। পুরনো স্মৃতি মনে করতে চেয়েও পারছে না। এ কোন অন্ধকার নেমে আসল জীবনে?


আবির সাহেবের সম্পূর্ণ জ্ঞান ফিরেছে ঘন্টা খানেক হবে। আগের থেকে বেশ উন্নতি হয়েছে। কথাও বলতে পারছেন। সায়র খবর পেতেই ছুটে আসল৷ দরজায় নিজের হাতের ছাপ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে ঢুকতেই মুন্না আর মেহনূরকে উপস্থিত দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করল,
“আংকেল ঠিক আছেন? কথা বলতে পারছেন? ডাক্তার কি দেখে গেছেন?”
মেহনূর তখন আবির সাহেবের মাথার কাছে বসে আছেন। কাঁদছে মেয়েটা। মুন্নার কেন যেন মেহনূরের কান্না সহ্য হচ্ছে না। কেমন মায়া হচ্ছে! কেন হচ্ছে? ইদানীং মুন্না খেয়াল করছে মেহনূরের প্রতি ও দূর্বল হয়ে পড়ছে? ভালোবেসে ফেলছে নাকি? পরক্ষণেই নিজের ভাবনা চিন্তা গুলো পাশে রেখে সায়রকে বলল,
“সব ঠিক আছে। আংকেল এখন ঘুমাচ্ছেন। ঘুম ভাঙলে কথা বলা যাবে।”
সায়র হাঁফ ছাড়ল। এর মধ্যেই আবির সাহেব নড়েচড়ে উঠলেন। মেহনূর না চাইতেও উত্তেজনায় ‘বাবা’ বলে ডেকে উঠল। আবির সাহেবের কানে শব্দটা যেতেই তিনি ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। ঝাপসা ঝাপসা মুখের একটি মেয়ে তার মাথার কাছে বসে আছেন। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছেন তার। তবুও শুকনো বাক্যে জিজ্ঞেস করলেন,
“কে তুমি, মা?”
মেহনূরের বুক ফেটে কান্না আসছে৷ তবুও কান্না চেপে বলে উঠল,
“বাবা! বাবা, আমি মেহনূর।”
আবির সাহেব এবার দেখলেন তিনি অন্য একটা রুমে। আলো বাতাসে ভরপুর সে রুম। সামনে আরো দুজন ছেলে দাঁড়ানো। একজন পুলিশের পোষাক পড়া। মেয়েটার মুখটাও এবার স্পষ্ট হলো। খুব চেনা মনে হলো। কার মুখের সাথে যেন মিল পাচ্ছে। কিন্তু মনে করতে পারছেন না। ইদানীং সে অনেক কিছুই মনে করতে পারেন না। তিনি দুইহাতে ভর করে বসার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। তা দেখে মেহনূর সযত্নে আবির সাহেবকে ধরে উঠালেন। খাটের সাথে ঠেস দিয়ে বসালেন। আবির সাহেব এবার একটু সেদিনের ঘটনা মনে করতে লাগলেন। কিন্তু স্পষ্ট মনে করতে পারলেন না। শুধু মনে পড়ল, তার প্রাণের থেকেও প্রিয় ভাই তার বুক বরাবর আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত করেছিল। মেহনূর কাঁপা হাতে আবির সাহেবের হাতের উপর হাত রাখতেই আবির সাহেব মেহনূরের দিকে মায়াভরা চোখে তাকালেন। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি কে, মা? আমি কোথায়? আমাকে এখানে কে নিয়ে এসেছে? সাবির? তোমরা সাবিরের লোক?”
বলতে বলতে তিনি ভয়ে কেঁপে উঠলেন। মেহনূর আবির সাহেবের চোখে স্পষ্ট ভয় দেখতে পেল। সায়র এবার সামনে এগিয়ে এসে শান্ত বাক্যে বলে উঠল,
“আপনি শান্ত হোন, আংকেল। আমরা আপনার খুব কাছের কেউ। আপনার ক্ষতি চাইনা৷ আপনি যেখানে আছেন একদম সেফ আছেন। হাইপার হওয়ার কোনো কারণ নেই।”
আবির সাহেবের বিশ্বাস হলো না। তিনি পুনরায় কাকুতিমিনতি করে বললেন,
“আমাকে প্লিজ মে° রো না। আমি আমার মেয়েদের দেখব। আমার নীলুকে দেখব। ওদের একবার শেষ দেখা দেখতে দাও। তারপর আমাকে যা খুশি করো। কিন্তু আমি বেঁচে আছি, ছিলাম এইটুকু সত্য ওদের জানতে দাও। আমি তোমাদের কাছে হাত জোর করে বলছি।”
মেহনূর আর কান্না চেপে রাখতে পারল না। নিজের আবেগ সামলাতে পারল না। আছড়ে পড়ল আবির সাহেবের বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলতে লাগল,
“বাবা! ও বাবা! আমি তোমার মেহনূর। তোমার মেয়ে। তোমার রক্ত। তোমার রাজকন্যা। যে কিনা তোমার আদর, স্নেহ পাওয়ার আগেই তোমাকে হারিয়ে ফেলেছিল। যে কিনা এক অন্ধকারে বেড়ে উঠেছে। আমাকে চিনতে পারছো না, বাবা?”
আবির সাহেব থমকালেন। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। নিজের কান, চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। অবাক হয়ে তাকালেন সায়রের দিকে। সায়রও বেশ দৃঢ় বাক্যে বলে উঠল,
“আংকেল, ও আপনার মেহনূর। আপনার ছোট মেয়ে।”
আবির সাহেব মনে করলেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন৷ তবুও তার ঠোঁটে হাসি ফুটল। শব্দ করে হেসে ফেললেন। পরক্ষণেই হাসতে হাসতে কেঁদে ফেললেন। মেহনূরকে এক হাতে জড়িয়ে ধরলেন। অন্য হাত রাখলেন মেহনূরের মাথায়। পরম স্নেহে মেহনূরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“খোদা আমাকে স্বপ্নেও এত সুখ দিবে ভাবতে পারছি না। যে মেয়ের মুখ মনে করার জন্য আমি দিনরাত গুমরে ম°রেছি, সে মেয়েকে ছুঁতে পাওয়া তো আমার সৌভাগ্য। এর ভাগ্যবান কি হতে পেরেছি?”
মেহনূর উঠে বসল। আবির সাহেবের হাত নিয়ে নিজের গালে রাখল। বলে উঠল,
“বাবা, দেখো আমি তোমার স্বপ্ন নই, সত্যি। আমি সত্যি এসেছি, বাবা।”
আবির সাহেব এবার পরম যত্নে মেয়ের মুখে গায়ে হাত বুলালেন। যখন বুঝলেন স্বপ্ন নয় সত্যি তখন শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। বাবা-মা হাউমাউ করে কাঁদছে। এ কান্না খুশির কান্না। সায়র আর মুন্নার চোখেও পানি। মুন্না এই অকল্পিত মুহূর্তটা ক্যামেরায় বন্দি করতে ভুলল না। সায়র ওদের দুজনকে স্পেস দেওয়ার জন্য একটু রুম থেকে বেরিয়ে আসল। মুন্নার হাত ধরে বলে উঠল,
“থ্যাংকস মামা। তুই না থাকলে এমন সুন্দর মুহূর্ত আমি দেখতে পেতাম না। এখনো তো আমার ম্যাডাম সব সত্যি জানেনা। যখন জানবে তখন হয়তো আমি আরেকবার এই সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী হবো।”
মুন্না হেসে বলে উঠল,
“আল্লাহ আমাদের সহায় ছিলেন বলেন আমরা সেদিন আবির সাহেবকে সময় মতো উদ্ধার করতে পেরেছিলাম। হয়তো আর কিছুক্ষণ লেট হলে এই সুন্দর মুহূর্তটা দেখতে পেতাম না।”
সায়র হাফ ছাড়ল। বলে উঠল,
“তা সত্য।”
মুন্না নিজের বিশ্বস্ত দুজনকে সাবির সাহেবের উপর ২৪ঘন্টা নজর দেওয়ার জন্য রেখেছিল। সেদিন সাবির সাহেবকে ফলো করেই ওরা দুজন আবির সাহেবের খোঁজ দিয়েছিল মুন্নাকে। মুন্না সেখানে পৌঁছে আবির সাহেবকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে সাবির সেখানে বেরিয়ে গেছিল বলে হাতেনাতে ধরা সম্ভব হয়ে উঠেনি। মুন্না এবার বলে উঠল,
“তাহলে এখন কোন প্লান কাজে লাগাবি? প্লান (A) নাকি প্লান (B)? যদি প্লান (A) হয় তাহলে আমি চাইলে এক্ষুনি সাবির সাহেবকে বাসা থেকে তুলে আনতে পারি। আদালতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য আমাদের হাতে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আর যদি প্লান (B) হয় তাহলেও তাকে এখন তুলে নিয়ে যেতে পারি টর্চার সেলে।”
সায়র একটু ভেবে ভাবুক স্বরে বলল,
“আপাতত আবির আংকেলের মুখ থেকে সবটা শুনতে হবে। হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এতে করে শত্রুপক্ষ সাবধান হয়ে যেতে পারে।”


“আপনি নিশ্চিত আবির আংকেল বেঁচে নেই?”
সাবির মাথা নেড়ে জবাবে বলল,
“অবশ্যই। যার মৃ°ত্যু আমি নিজের হাতে নিশ্চিত করেছি তাকে নিয়ে আর ভয় কিসের?”
ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েলী স্বরে কেউ একজন বলে উঠল,
“মা°রবেন যখন তাহলে এত বছর বাচিয়ে রাখলেন কেন?”
সাবির হাসল। বলল,
“সে আমার সাথে আবিরের সম্পদের বোঝাপড়া বাকি ছিল তাই। কিন্তু আমার শত্রুতা তো সব থেকে বেশি মেহরিশ আর নীলিমার সাথে। আমার মেয়েকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে মেহরিশ। আর আমার স্ত্রীকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে নীলিমা।”
“কিভাবে?”
সাবির সাহেবের কন্ঠস্বর নিচু হয়ে আসল। অসহায়ের মতো করে বলে উঠল,
“আমার ছোট্ট সুহা। ওইদিন সে প্রথম স্কুলে গিয়েছিল। খুব খুশি ছিল আমার মেয়েটা। খুশিতে পুরো ছাদ দৌড়ে খেলছিল। মেহরিশ আর সুহা মাস খানেকের ছোটবড়। একটা খেলনা পুতুল নিয়ে দুজনের মাঝে ঝামেলা বাঁধল। আমার মেয়েটাও পুতুল ছাড়বে না, আর মেহরিশও দিবে না। মেহরিশ খুব জেদি একটা মেয়ে ছিল। ঝগড়ার এক পর্যায় মেহরিশ জেদ করে আমার সুহাকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেয়। আমার ছোট্ট মেয়েটা আমার চোখের সামনে ছটফট করতে করতে মা°রা গেল। আমি বাবা হয়েও কিছু করতে পারলাম না। বাঁচাতে পারলাম না আমার মেয়েটাকে। আমি আজো রাতে ঘুমাতে পারিনা আমার ছোট্ট সুহার রক্তাক্ত দেহ আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। মনে হয় আমার কানে কানে বলছে, ‘বাবা, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। বড় হতে চেয়েছিলাম। ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। কেন আমার জীবন শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে গেল, বাবা?’। আমার সুহা। আমার ছোট্ট পরি। আমি হারিয়ে ফেলছি।”
বলতে বলতে কেঁদে উঠলেন তিনি। নিজের ভেতর জমানো কষ্টটা চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ছে।

#চলবে
শব্দসংখ্যাঃ- ১৭০০+