#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_সাত[প্রথমাংশ]
নিজের বোনের ফোনে প্রাক্তন স্বামীর ছবি দেখে রাগে ফেটে পড়ল মেহরিশ। চিৎকার করে মেহনূরকে ডাকতে থাকল মেহরিশ। মেহনূর সবে মাত্র ভার্সিটি যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। হঠাৎ মেহরিশকে এমন ভাবে চিৎকার করতে দেখে ভয় পেয়ে গেল খানিকটা। দৌঁড়ে আসল মেহরিশের রুমে। মেহনূর মেহরিশের সামনে যেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে, আপু?”
মেহরিশ রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকাল মেহনূরের দিকে। আচমকাই সপাটে থা°প্পড় বসিয়ে দিল মেহনূরের গালে। মেহনূর আচমকা থা°প্পড় খেয়ে গালে হাত দিয়ে অসহায় চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপু! তু…।”
মেহনূর পুরো কথাটা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই কান্না চলে আসল। মেহরিশের এবার হুঁশ ফিরল। তবুও রাগ কমল না। উচ্চবাক্যে ধমকে ফোনে থাকা আহিলের ছবিটা বের করে জিজ্ঞেস করল,
“এটা কে?”
মেহনূর এক নজর ছবিটার দিকে তাকিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। অজান্তেই ঠোঁট ফুটে বেরিয়ে আসল,
“আহিল ভাই!”
মেহরিশ পুনরায় ধমকে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করল,
“শুধু আহিল বল। আহিলের ছবি তোর ফোনে কেন?”
মেহনূর এবার বিস্ময় ভরা চোখে তাকাল মেহরিশের দিকে। অসহায় বাক্যে বলে উঠল,
“আপু, আমি জা…।”
বলেই থেমে গেল। ফোনটা মেহরিশের হাত থেকে এক প্রকার কেড়ে নিয়ে কিছু দেখল। অতঃপর দেখে অবাক বাক্যে বলল,
“এটা তো সানায়া আমাকে পাঠিয়েছে। দেখো…।”
‘সানায়া’ নামটা শুনেই মেহরিশ আকাশ থেকে পড়ল যেন। অবাক বাক্যে বলে উঠল,
“সানায়া! সানায়া আহিলকে কোথায় পেল?”
মেহনূর এবার বিস্ময়সূচক বাক্যে প্রকাশ করল,
“তার মানে সানায়া আহিলের সাথে রিলেশনে যেতে চাচ্ছে! ওহ মাই গড!”
কথাটা মেহরিশের কানে যেতেই মেহরিশ মাথায় হাত দিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। কথা বলতে পারলো না আর। এ কোন বিপদ ধেয়ে আসছে! আহিল কি তবে এবার সানায়াকে টার্গেট করল? মেহরিশের চারদিক ঘুরছে। যে করেই হোক এই বিপদের হাত থেকে সায়ানায়াকে বাঁচাতেই হবে। মেহনূর মেহরিশের কাঁধের হাত রেখে অভয় দিয়ে বলে উঠল,
“আপু! আপু, ঠিক আছো তুমি?”
মেহরিশ মেহনূরের দিকে অসহায় চোখে তাকাল। শুধু শুধু মেয়েটাকে ভুল বুঝল। গায়েও হাত তুলল। অনুতাপের স্বরে বলল,
“স্যরি, বোন। আমি আসলে আহিলের ছবি দেখে বাকি কিছু খেয়াল করিনি।”
মেহনূর মেহরিশের পাশে বসে মেহরিশকে জড়িয়ে ধরল। আদুরে স্বরে বলে উঠল,
“চিন্তা কইরো না। ওই ব্যাডা আহিলের হাত থেকে সানায়াকে আমি একাই বাঁচিয়ে নিব।”
মেহরিশ মেহনূরের গালে চুমু খেয়ে বলল,
“তুই আজকেই সানায়াকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবি। ঠিক আছে?”
মেহনূর ঠিক আছে বলে উঠে চলে গেল। মেহনূর চলে যেতেই মেহরিশ সায়রকে ফোন করল। দেখা করার জন্য নিদিষ্ট এড্রেস বলে নিজেও তৈরি হওয়ার জন্য চলে গেল।
–
–
সায়র নিচে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে। এখনো মেহরিশের নামার নাম নেই। মেয়েটা কী আজকে বিয়ের সাজ সাজছে নাকি? প্রায় ২০ মিনিট হতে চলল সায়র এখানে অপেক্ষা করছে। নাকি আজকেও আমাকে ভুল বুঝে মুখ গুমরা করে বসে আছে। সপ্তাহ খানেক আগের সেই রাতের কথা মনে করে সায়র হেসে ফেলল। মেয়েটা আসলেই পাগল। সেদিনের পর কেটে গেছে প্রায় ৭-৮দিন। সায়র সেদিনের সুন্দর রাতের স্মৃতিচারণ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল…
“রাত তখন ১১টা বেজে ২০মিনিট। সায়র বাসায় পড়ে থাকা টাউজার আর সামান্য একটা পাতলা জ্যাকেট পড়েই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। মাথায় শুধু ঘুরছে, ‘মেহরিশ অসুস্থ’। এই মুহূর্তে মেহরিশকে দেখতে পাওয়াই সায়রের এক মাত্র স্বপ্ন। যেখানে সায়রের বাড়ি থেকে মেহরিশদের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৩০ মিনিটের সেখানে সায়র ২০মিনিটের আগে এসে উপস্থিত হলো মেহরিশদের বাড়ির সামনে। এত রাতে বাড়িতে যাওয়া ঠিক হবে কিনা ভাবতে ভাবতে প্রায় মিনিট খানেক পার করে দিল। মস্তিষ্ক বলছে এত রাতে কোনো ভদ্র বাসায় যাওয়া অভদ্রতা দেখায়। আবার মন ব্যাকুল হয়ে আছে মেহরিশকে দেখার জন্য। কিছুক্ষণ মন মস্তিষ্কের লড়াইয়ে মন জিতে গেল। সব চিন্তা সাইডে রেখে সায়র মেহরিশদের দরজার সামনে এসে কলিং বেল বাজাল। ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছে প্রচন্ড। মিনিটের মাথায় ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ পেয়ে সায়র বার কয়েক হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করে নিল।
“সায়র! তুমি! ”
হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে সায়র মাথা উঁচু করে দেখল মেহরিশ দাঁড়ানো। মেয়েটার চোখে মুখে বিষন্নতার সাথে বিস্ময়ের চিহ্ন। ইশ! তাহলে শরীর বুঝি একটু বেশিই খারাপ। ওইদিকে মেহরিশ বিস্ময়ে চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল। সত্যিই কী মানুষটা সামনে? নাকি স্বপ্ন দেখছে? রাত তো অনেক হলো তার মানে মেহরিশ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে। ধুর ছাঁই! মেহরিশ নিজেই নিজের মাথায় গাট্টা মে°রে দরজা আটকে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেই সায়র মেহরিশের হাত ধরে ফেলল। আচমকা স্পর্শে মেহরিশ কেঁপে উঠল। তার মানে সত্যি সায়র এসেছে! কথাটা মাথায় আসতেই মেহরিশের বিষন্ন ঠোঁটে হাসির ঝলক দেখা দিল। সায়র প্রচন্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“জ্বর কি খুব বেশি নাকি, মেহরিশ? শরীর বেশি খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকব?”
মেহরিশ হা হয়ে তাকিয়ে আছে শুধু। কথা বলার জন্য উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। কি বলবে মানুষটাকে? লজ্জা হচ্ছে ভীষণ। মেহরিশ তো দিব্যি সুস্থ। অথচ মানুষটাকে মিথ্যা পেরেশানি দিয়েছিল। আর মানুষটাও এতটা রাস্তা জার্নি করে চলে আসল। দেখে মনে হচ্ছে পড়নে যা ছিল তাই পড়েই চলে এসেছে। ইশ! এই শীতের মধ্যে পাতলা একটা জ্যাকেট পড়ে এসেছে৷ নিশ্চয়ই ঠান্ডা লেগেছে খুব।
“একি! সায়র বাবা! তুমি!”
পেছন থেকে নিলুফা বেগমের কন্ঠস্বর শুনে সায়র মেহরিশের হাত ছেড়ে দিল। নিলুফা বেগমকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছেন, আন্টি?”
নিলুফা বেগম বেশ হেসে জবাব দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ, বাবা। আমি ভালো আছি। তুমি বাইরে কেন? ভেতরে এসো।”
এরপর মেহরিশকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
“এই তুই এমন খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? সরে দাঁড়া। সায়র, বাবা। তুমি ভেতরে এসো।”
মেহরিশ আলগোছে সরে দাঁড়াতেই সায়র ভেতরে ঢুকল। সোফায় বসতে বসতে অস্বস্তি নিয়ে বলে উঠল,
“আমি পাশেই একটা দরকারে এসেছিলাম। তাই ভাবলাম আপনাদের সাথে একটু দেখা করে যাই। অনেকদিন দেখা হয় না।”
নিলুফা বেগম হেসে ফেললেন। বেশ খুশি হয়েছেন সায়রকে দেখে। তিনি খুব করে চান সায়র আর মেহরিশ একসাথে হোক। তিনি জানেন মেহরিশকে সায়র পারবে ভালো রাখতে। মায়ের চোখ কখনো ভুল হয় না। হেসে বললেন,
“চা খাবে নাকি কফি?”
সায়র সৌজন্যমূলক হেসে বলল,
“থ্যাংকস, আন্টি। বাট এখন কিছুই চাই না। শুধু একটা পারমিশিন চাই।”
মেহরিশ আর নিলুফা বেগম দুজনেই বেশ অবাক হলো। কিসের পারমিশন? নিলুফা বেগম প্রশ্নটা করেই ফেললেন,
“সেটা কি?”
সায়র বেশ অস্বস্তি নিয়ে বলল,
“মেহরিশকে নিয়ে একটু লং ড্রাইভে যেতে চাই। মেহরিশ আর আপনাদের সম্মতি থাকলে তবেই যাব।”
মেহরিশ অবাক হলো। মেহরিশ আপত্তি জানানোর জন্য মুখ খোলার আগেই নিলুফা বেগম পারমিশন দিয়ে দিলেন। তা দেখে মেহরিশও বেশ অবাক। যে কিনা কোনো ছেলেকে সহজে বিশ্বাস করেনা, তার মেয়েদের কাছে ঘেঁষতে দেয়না। সে আজ সায়রের সাথে লং ড্রাইভে যাওয়ার পারমিশন দিচ্ছে! এটা কি সায়রের প্রতি বিশ্বাস নাকি এখানকার আদব_কায়দার হাওয়া লেগেছে? মেহরিশ তবুও বলে উঠল,
“এত রাতে লং ড্রাইভে যাওয়ার কোনো কারণ নেই, সায়র। তা ছাড়া আনায়া ঘুমাচ্ছে।”
সায়র কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিলুফা বেগম বলতে লাগলেন,
“আনায়ার জন্য আমি আছি। আনায়াকে নিয়ে তোর চিন্তার কোনো কারণ নেই। মেহনূর তো সেই সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়েছে। তারপর আর কি প্রতিদিনের মতো মাঝ রাতে উঠবে আর সারারাত রাত্রি বিলাস করবে। তুই যা। ঘুরে আয়। ভালো লাগবে।”
মেহরিশের যেন আজ অবাক হওয়ার দিন। ক্ষনে ক্ষনে অবাক হচ্ছে৷ সায়র আর নিলুফা বেগমের কথা ফেলতে না পেরে মেহরিশ রাজি হয়ে গেল। দুজনের পড়নেই যা ছিল তা পড়েই বের হয়ে পড়ল। কিন্তু সায়র মেহরিশকে জোর করে ভারী জ্যাকেট পড়িয়ে নিল।
গাড়িতে উঠে বসতেই সায়র বলে উঠল,
“আমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল বুঝি?”
মেহরিশ লজ্জা পেল। আড় চোখে তাকাল সায়রের দিকে। সায়র ঠোঁট চেপে হাসছে৷ মেহরিশ হাত কচলাতে কচলাতে বলে উঠল,
“আপনাকে দেখার ইচ্ছে হবে কেন? আজব!”
বলেই ভেংচি কাটল। সায়র হেসে ফেলল। বলল,
“বুঝি, বুঝি, সব বুঝি। আমাকে দেখার স্বাধ জেগেছে বলেই তো মিথ্যা কথা বলেছেন।”
মেহরিশ চোখ গরম করে তাকাল সায়রের দিকে। সায়র মেহরিশের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। মেহরিশ রাগে বোম হয়ে উঠল। বলল,
“সো, হোয়াট? আমি মিথ্যা বলেছি তাতে কি হইছে? আপনাকে তো আসতে বলিনি। আপনি কেন আসলেন?”
সায়র গাড়ি স্টার্ট করতে করতে বলল,
“আমার চাঁদের গায়ে আঁচ এসেছে। আমি না এসে কিভাবে থাকি?”
মেহরিশ এবার শান্ত চোখে তাকাল। জমতে থাকা রাগ নিমিশেই হাওয়া হয়ে গেল। কী সুন্দর করে কথা বলে মানুষটা! মেহরিশ সামান্য হেসে পাশ ফিরে তাকাল। রাতের লন্ডন শহর সে তো সৌন্দর্যে ভরপুর। ঘন্টা খানেকের মাথায় ওরা পৌঁছায় ‘অক্সফোর্ড স্ট্রিট’। এখানে মধ্যরাত অব্দি মানুষের গমগম চলে। মেহরিশ গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সায়র গাড়ি পার্কিং করে এসে বলল,
“চলুন একটা খাবারের দোকানে বসি? এখানের বাঙালি খাবার আমার খুব প্রিয়। কি খাবেন?”
মেহরিশ কিছু বলল না। দুজনেই একসাথে গিয়ে বসল একটা খাবারের দোকানে। খাবার অর্ডার করে দুজনে টুকটাক গল্প করছি। হুট করেই সায়র বলে উঠল,
“মেহরিশ।”
সায়রের এমন যত্নমাখা ডাকে মেহরিশ শান্ত চোখে তাকাল সায়রের দিকে। সায়র পুনরায় ডেকে উঠল,
“মেহরিশ।”
“বলুন, সায়র।”
“বলব, শুনবেন?”
“শুনব বলেই তো ছুটে এসেছি। আপনি ডাকলে ঘরে বসে থাকার সাধ্য আমার নেই, সায়র।”
কথাটা বলেই মেহরিশ থেমে গেল। কী আশ্চর্য! এভাবে বললো কেন? নিজের কথায় নিজেই অস্বস্তি পড়ে গেল। কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মেহরিশ অন্য দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলল,
“কি বলবেন?”
সায়র মেহরিশের অস্বস্তি টের পেয়ে কিছু জিজ্ঞেস করল না। বরং আগের ন্যায় বলল,
“তাহলে বলি?”
“অবশ্যই।”
“মেহরিশ, আমি আপনার জীবনে এক খন্ড চাঁদ হয়ে থাকতে চাই। যে চাঁদের আলো হবেন আপনি। যাকে ছাড়া আমি নামক চাঁদ আঁধারে তলিয়ে যাবে। যাকে ছাড়া চাঁদের কোনো অস্বস্তি থাকবে না। আমার আঁধার রাতের জোৎস্ন্যার আলো হবেন, মেহরিশ?”
#চলবে