#ধরিয়া_রাখিও_সোহাগে_আদরে
#লেখনীতে_জেনিফা_চৌধুরী
#পর্ব_সাত[শেষাংশ]
“আপনাকে ভালোবাসা স্বাধ থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না, মেহরিশ।”
মেহরিশ এক মনে চেয়ে আছে সায়রের দিকে। মানুষটা এত সুন্দর যত্ন করে কথা বলে কিভাবে? কথাতেই প্রেমে পড়ে যাবে সবাই। চেহারা ভর্তি মায়া এই মানুষটার। কী আশ্চর্য! মেহরিশ তো এত তাড়াতাড়ি কাউকে জীবনে জড়াতে পারবে না। ভালোবাসতে পারবে না। এখন তো ‘ভালোবাসা’ শব্দটা আতঙ্ক লাগে। মেহরিশ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। শান্ত বাক্যে শুধাল,
“আমি এই বিষয় কথা বলতে চাচ্ছি না, সায়র। প্লিজ, স্কিপ দিস টপিক।”
সায়রের মুখের হাসিটা উধাও হয়ে গেল। তবুও শান্ত বাক্যে বলল,
“আপনার রাতের শহর পছন্দ, মেহরিশ?”
মেহরিশের রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে জবাব দিল,
“আগে রাতের আঁধারে আমি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকতাম। দম আটকে আসতো। আর এখন অন্ধকারেই বেশি ভালো লাগে। সময়ের সাথে সাথে কত কিছু বদলে যায়। ভালোবাসা বদলে যায়, মানুষ বদলে যাওয়া।”
বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ সায়র প্রতিউত্তরে বলে উঠল,
“মানুষ হলো ঋতুর মতো। সময়ে তালে তালে যেমন ঋতু যেমন বদলে যায়, তেমন মানুষও বদলে যায়। গরম ছেড়ে যখন হঠাৎ করেই শীতের আগমন ঘটে, তখন আমাদের প্রত্যেকের কিন্তু কমবেশি সর্দি-জ্বর লাগে। প্রথম কয়েকদিন মানিয়ে নিতেও সমস্যা হয়। কিন্তু দেখবেন সময়ের তালে শীতেই সবার প্রিয় ঋতু হয়ে উঠে। কেন জানেন? কারণ ঠান্ডার সাথে আমরা মানিয়ে নিতে শিখে যাই। ঠিক তেমনি যখন কোনো মানুষ হঠাৎ বদলে যায়, তখন আমাদেরও সব স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগে। কিন্তু সময়ের তালে তালে আমরা এক সময় মানিয়ে নেই। মেনে নেই বাস্তবতা৷ ভুলে যাই অতীত। শুরু করি নতুন সূচনায় বর্তমান।”
মেহরিশ শুনল কথাগুলো। এই মানুষটা এত গুছিয়ে কথা বলে কিভাবে? কোনো অলৌকিক পাওয়ার আছে নাকি? মেহরিশ মলিন হেসে বলে উঠল,
“শখের পুরুষটাকে গিরগিটির মতো বদলে যেতে দেখার দৃশ্য হরর সিনেমার থেকেও বেশি ভয়ংকর, সায়র।”
সায়র আলগোছে চুপিসারে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেহরিশ পুনরায় বলে উঠল,
“আমি সব ভুলে যেতে চাই, সায়র।”
“আমি আছি আপনার পাশে, মেহরিশ।”
“পাশে থাকলেই কি ভরসা করা যায়? মানুষ তো বছরের পর বছর একসাথে থেকেও একে অপরকে ভরসা করতে পারে না। আর আমি পাশে একজনকে দেখেই ভরসা পেয়ে যাবো?”
সায়র হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল,
“আপনি আমাকে দায়িত্ব নিয়ে পাশে রাখবেন শুধু। বিশ্বাস, ভরসা, ভালোবাসা অর্জন করার দায়িত্বটা না হয় আমি নেই।”
মেহরিশ প্রতিউত্তরে মলিন হাসল। এর মধ্যেই দুজনের খাবার চলে আসলো। দুজনে মিলে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে গেল রেস্তোরাঁ থেকে। হাঁটতে থাকল পাশাপাশি। হাঁটতে হাঁটতে সায়র প্রশ্ন করল,
“আপনাকে আমি ভালোবাসি, মেহরিশ। আমার চোখে জমে থাকা ভালোবাসা, যত্ন কি আপনি টের পান না?”
“ভালোবাসি শব্দটা বলবেন না, সায়র। এখন আর এই শব্দটা শুনতে ভালো লাগে না। যদি কখনো আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারি, সেদিন না হয় সাড়া দিব আপনার ডাকে। ততদিন ভালোবাসি বলবেন না, প্লিজ।”
“যদি কখনো? আচ্ছা এই ‘যদি কখনো’ ভালোবাসার সুযোগটা যদি না পান?”
মেহরিশ থেমে গেল। ভড়কে তাকাল সায়রের দিকে। সায়র মেহরিশের ভড়কে যাওয়া মুখপানে তাকিয়ে হেসে ফেলল। মেহরিশের গাল হালকা করে টেনে বলে উঠল,
“যদি আমি ততদিনে অন্য কাউকে ভালোবেসে, আপনার উপর আর্কষণ হারিয়ে ফেলি?”
মেহরিশ বাঁকা হাসল। বলল,
“আপনার ভালোবাসা বুঝি শপিং মলের ঝুলানো ড্রেস?”
“মানে?”
“মানে হলো এই যে, আমাদের শপিং মলে গিয়ে ঝুলানো কোনো ড্রেস পছন্দ হলে তার প্রাইজ জিজ্ঞেস করি। যখন দামটা আমাদের সাধ্যের বাইরে হয়, তখন অন্য কোনো ড্রেস দেখতে গিয়ে, আগের ড্রেসটার প্রতি আর্কষণ হারিয়ে ফেলি। আপনার ভালোবাসাটাও এ কাইন্ড অফ শপিং মলের ঝুলানো সেই সাধ্যের বাইরে থাকা ড্রেসটার মতো হয়ে গেলো না?”
সায়রের মুখটা চুপসে গেল। মেয়েটা এত রুড কেন? সায়র তো কথাটা মজা করে বলেছিল। সায়র আর কথা বাড়ালো না। কিছুক্ষণ দুজনে মিলে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সারা রাস্তা সায়র আর কোনো কথা বলেনি। মেহরিশের উপর চাপা অভিমান জমেছে। বাড়ির সামনে আসতেই মেহরিশ নেমে যাওয়ার জন্য ডোর খুলতেই সায়র শান্ত বাক্যে বলে উঠল,
“আমার ভালোবাসাটা শপিং মলের ঝুলানো সাধ্যের বাইরে থাকা কোনো ড্রেস নয়, মেহরিশ। যাকে ভালোবাসি সে আমার সাধ্যের বাইরে হলেও তাকেই ভালোবাসব। সায়রের অনুভূতি এত ঠুনকো নয় যে, এত সহজেই আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে। ভালো আপনি আমাকেই বাসবেন, ততদিন না হয় অপেক্ষা করে নিব।”
বলেই গাড়ি স্টার্ট করল। সায়রের অভিমানী স্বর শুনে মেহরিশ আড়ালে ঠোঁট চেপে হাসল। গাড়ি থেকে নেমে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বলল,
“ভালোবাসা অর্জন করতে হলে স্পেস দিতে হয়। সময় দিতে হয়, সায়র। অনুভূতি কোনো মাটির জিনিস নয়, যে যখন তখন ভেঙে নতুন রুপ দেওয়া যাবে। অনুভূতি হলো ফুলের কলির মতো। সময়ের সাথে সাথে কলি যেমন ফুলে রুপ নেয়, তেমনি অনুভূতি জমতে জমতেও ভালোবাসায় রুপ নিবে।”
–
–
“শুনছেনননন?”
হুট করেই কানের সামনে চিৎকার শুনে সায়র ধড়ফড়িয়ে উঠল। সাথে আনায়াও কান্না করে দিল। সায়র পাশ ফিরে মেহরিশকে দাঁত কটমট করতে দেখে ঘাবড়ে গেল। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি? কখন আসলেন? আনায়া কাঁদছে কেন? কি হয়েছে? ঠিক আছে তো?”
মেহরিশ আনায়াকে শান্ত করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“আপনি কোন দুনিয়ায় ভেসে গেছিলেন? এত ডাকার পরেও সাড়া দিচ্ছিলেন না? আজব!”
সায়র লজ্জা পেল। বলল,
“স্যরি! একটু আনমনে ছিলাম।”
মেহরিশ কথা বাড়ালো না। আনায়াকে শান্ত করার জন্য গল্প করতে শুরু করল। সায়রও গাড়ি স্টার্ট করল। কিছু দূর যেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ জরুরী ভাবে ডেকেছেন? এনি থিং রং, মেহরিশ? অল ওকে?”
মেহরিশ দুশ্চিন্তা গ্রস্ত স্বরে বলল,
“আহিলের বাসার এড্রেস খুঁজতে হবে, সায়র।”
সায়র অবাক হলো। আহিলের কথা শুনে রাগ হলো। শক্ত বাক্যে জিজ্ঞেস করল,
“কি দরকার, আহিলকে?”
মেহরিশ আগেই সানায়ার কথাটা বললো না। আহিলকে আগে খুঁজে বের করতে হবে। আহিল যদি জেনে বুঝে সানায়ার ক্ষতি করার চেষ্টায় থাকে তাহলে এবার আহিলকে কিছুতেই ছেড়ে দিবে না মেহরিশ। মেহরিশ সায়রকে বলল,
“আমার আহিলের সাথে একটু বোঝাপড়া বাকি আছে, সায়র। বিষয়টা ব্যক্তিগত। তাই এখন হাইড রাখছি। টাইমলি আপনাকে জানিয়ে দিব।”
সায়রের মুখ দেখে মেহরিশ নিশ্চিত হলো উত্তরটা সায়রের পছন্দ হয়নি। কিন্তু এখন মেহরিশ সায়রকে বলতে চাচ্ছে না। সানায়ার সাথে আগে কথা বলতে হবে। ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝে তারপর সায়রকে জানাবে। সায়র আর মেহরিশ দুজনে মিলে সেদিনের রেস্তোরাঁয় গেলো। যেখানে আহিলের সাথে দেখা হয়েছে। আহিলের ছবি দেখিয়ে রেস্তোরাঁর ওয়েটার, ম্যানেজারের থেকে শিওর হলো আহিল এখানে নিয়মিত আসে। সাথে থাকে নিত্যনতুন গার্লফ্রেন্ড। কেউ বিদেশি, কেউ বা দেশি। সায়র রাগে ফোসফাস করছে। তবুও কিছু বলছে না। ম্যানেজার মেহরিশকে জানালো,
“আজকেও আহিল এসেছিল, তবে বেশিক্ষণ থাকেনি। চলে গেছে।”
–
–
ইউনিভার্সিটির গেটে দাঁড়িয়ে আছে মেহনূর। সানায়ার জন্য অপেক্ষা করছে। বেশখানিকটা সময় অপেক্ষা করার পর সানায়াকে একটা গাড়ি থেকে নামতে দেখল। গাড়ির ভেতরে আহিলকে দেখা মাত্রই মেহেনূর আড়ালে সরে গেল। সানায়া গাড়ি থেকে নামতেই আহিলও নেমে দাঁড়াল। সানায়া বিদায় নিয়ে চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই আহিল আচমকা সানায়ার হাত ধরে টান দিতেই সানায়া এসে আহিলের বুকে পড়ল। আহিলের দুইহাতে সানায়ার কোমর প্যাঁচিয়ে ধরল। সানায়া অস্বস্তিতে পড়ে গেলে। চারদিকে নজর দিল। এখানকার অবশ্য কেউ এসব দিকে চেয়ে থাকেনা। তবুও হঠাৎ এমন অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পড়ে সানায়ার ভীষণ অস্বস্তি হছে। আহিলকে দুইহাতে ঠেলে দূরে সরাতে সরাতে বলল,
“আহিল, ছাড়ুন। আমি এসবে অভ্যস্ত নই। প্লিজ, লিমিট ক্রস করবেন না।”
আহিল ছেড়ে দিল। অনুতপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“স্যরি। স্যরি, সানায়া। ডোন্ট মাইন্ড, প্লিজ। তোমাকে এত সুন্দর লাগছে যে, আমি বার বার চেয়েও নিজেকে ফিলিংস আটকে রাখতে পারছি না।”
সানায়া লাজুক হেসে বলল,
“ইটস ওকে। আমার লেট হয়ে যাচ্ছে। সি ইউ লেইটার।”
সানায় চলে যেতেই আহিল গাড়িতে ঘুষি মেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“শালার, এই নিয়ে দ্বিতীয় বার কোনো মেয়েকে পটাতে আমার এতটা সময় লাগছে। প্রথমে ওই মেহরিশ আর এখন এই সানায়া। দুজন যেন এক ধাতুতেই গড়া।”
কি যেন মনে করে বাঁকা হাসল। বলে উঠল,
“ কিন্তু তোমাকে যতদিন না আমি বিছানায় পাচ্ছি, ততদিন অব্দি আমি হাল ছাড়ছিনা, বেবস।”
#চলবে