#ধরো_যদি_হঠাৎ_সন্ধ্যে
#সূচনা_পর্ব
#Jhorna_Islam
আমার পরনের লুঙ্গিটার দাম জানিস কতো? চোখে দেখেছিস জীবনে? তোর বাপ ও তো এতো টাকার জিনিস ছোয়া তো দূরে থাক চোখে ও মনে হয় দেখেনি।
তুই কিনা আমার লুঙ্গিটা নষ্ট করে দিলি তরকারির ঝোল ফেলে? কথাগুলো প্রান্তিকার ভাইয়ের শ্বশুর তাকে বলে ক’ট’ম’ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
কিছু সময় আগেই প্রান্তিকাকে নিচে ফেলে দিয়েছে তার ভাইয়ের শ্বশুর ধাক্কা দিয়ে । পরে যেয়ে প্রান্তিকা হাতে আর কপালে প্রচুর ব্যাথা পায়।ব্যাথায় অস্ফুট শব্দ করে উঠে। তারপর আবার মুখ চেপে ধরে রাখে যেনো কোনো শব্দ না হয়।চোখের কোণ বেয়ে অবিরাম ধারায় অশ্রু বেরিয়েই যাচ্ছে।
তার দুঃখ বাড়ির সকলে খুব মনোযোগ দিয়ে আনন্দের সাথে উপভোগ করছে।কিছু বলার মতো বা তার পাশে দাড়ানোর মতো এখানে কেউ নেই। সকলেই ফ্রি তে বিনোদন নিচ্ছে।
লোকটার দিকে একবার তাকিয়ে তাচ্ছিল্যর হাসি দেয় প্রান্তিকা।তার বাবার বাড়িতে থেকে বাবার টাকায় খেয়ে লোকটা কি না তাকেই টাকার অহংকার দেখাচ্ছে?যার টাকায় জীবন চালায় সে এই লুঙ্গি চোখে দেখেছে কিনা তা জিজ্ঞেস করে হাহ্।
প্রান্তিকার ভাবি আর ভাবির মা প্রান্তিকার দিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসছে। তারা খুব খুশি।
সকাল থেকে এক মনে কাজ করেছে প্রান্তিকা। কাজ করতে গিয়ে ভুল বশত ছু/ড়ি লেগে হাত ও কেটেছে। সেই কাটা হাত দিয়েই সকল রান্না করেছে সে।তার হাতের রান্না ছাড়া নাকি কারো মুখে খাবার উঠে না। সেই সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত এক না’গাড়ে কাজ করতে হয় তাকে।নিজের বাড়িতে চা’করের মতো খাটতে হয়।
অথচ এই বিশাল বড় বাড়ির একমাত্র রাজকন্যা সে। বাবা মা চলে যাওয়ার সাথে তার সুখ শান্তি ও চলে গেছে।
এক ভাই এক বোন প্রান্তিকারা।প্রান্তিকা তার ভাইয়ের ছোট। ভাই এখন আর ভাই নেই।বউ আর শ্বশুর শ্বাশুড়ির কথায় উঠে বসে সে।প্রান্তিকার খোঁজ নিবে দূরে থাক একবার ভালো করে তার দিকে তাকিয়ে ও দেখেনা।অথচ বাবা মা থাকতে কতো আদর করতো তার ভাই।
বাবা মা মারা যাবার পর প্রান্তিকার ভাই প্রান্ত তার শ্বশুর শ্বাশুড়ি কে এই বাড়িতে নিয়ে আসে। উনারা প্রান্তিকাকে কাজের লোক বানিয়ে রেখেছে। প্রান্তিকা কিছু বলতেও পারে না কি বলবে? ভাইকে প্রথম প্রথম বলায় ভাই ধমক দিয়ে বলেছিলো তুই ইচ্ছে করে ওদের নামে বদ’নাম করছিস।তোর সহ্য হচ্ছে না উনাদের তাই না? তোর টাকায় কি উনারা খাচ্ছে?
তারপর থেকে প্রান্তিকা চুপ হয়ে যায়। আর প্রতিবাদ করেনি। সব মুখ বু’জে ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে। প্রান্তিকাও দেখতে চায় আর কতো কি তাকে সহ্য করতে হয়।
শুধু বাবা মায়ের স্মৃতি এই বাড়ির সাথে জড়িয়ে আছে বলে এখনো পরে আছে প্রান্তিকা নয়তো কবেই যেদিকে দু চোখ যায় চলে যেতো। এরা হয়তো সকলেই মনে মনে চায় সে যেনো চলে যায় তাইতো এমন অ’ত্যা’চার চালায় তার উপর।
এইযে কতো কষ্টে সে কাটা হাত নিয়ে রান্না করলো দুপুরে।প্লেটে খাবার দেওয়ার সময় হাতের কাটা জায়গায় চামচ লাগায় ব্যাথা পায়।যার দরুন চামচ টার ব্যালেন্স রাখতে পারে নি। ফলে একটু ঝোল গিয়ে লুঙ্গি তে পরে। প্রান্তিকার ভাই এতোসময় সাথেই ছিলো খাবার টেবিলে। এই দৃশ্য টা দেখে প্রান্ত খাওয়া হয়ে গেছে বলে সুরসুর করে বেরিয়ে গেলো।
প্রান্তিকার মনে হয় তার ভাই এদের সুযোগ করে দিয়ে গেলো ওকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। এক দিকে মা মেয়ের বি’ষা’ক্ত কথার তীর। আরেক দিকে এই লোকের গায়ে হাত তোলা।
প্রান্তিকার এদের কথায় মন নেই।সে ভাবে আর ভাবতে থাকে এটা কি তার আপন ভাই? নিজের ভাইরা কি কখনো এমন করে? আবার মনে হয় সে কি ভাবছে এগুলো তারই তো ভাই। শুধু সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে।পা’ষাণ হয়ে গেছে।
প্রান্তিকা কে আরো কিছু কথা শুনিয়ে সকলেই মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো।প্রান্তিকা ঠায় এক জায়গায় বসে রয়।পা আর চলছে না। শরীরে জোর নেই এক বিন্দু ও।সেই মোটাতাজা প্রান্তিকা আজ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। যে একবেলা একটু দেরি করে খাবার পেলেই চিল্লাচিল্লি শুরু করতো আজ সে দিনে প্রায় সময়ই না খেয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই আবার মাঝে মাঝে কাজের চাপেই খাওয়ার কথা ভুলে যায়।
কেউ একটা খোঁজ নেওয়ার নেই প্রান্তিকার।দাদা দাদি নেই।তার দাদা দাদির একটাই সন্তান ছিলো তার বাবা। আর নানা বাড়ির বিষয়ে কিছু না ভাবাই ভালো। নানা বাড়ির লোকজন প্রান্তের ব্যাপারে যতোটা ভালোবাসা দেখায় প্রান্তিকার ব্যাপারে ততোটাই উদাসীন। মুখ দেখেই বোঝা যায় তারা প্রান্তিকা কে পছন্দ করে না। নয়তো নানির বাড়ি ই চলে যেতো।প্রান্তিকা ভেবে পায় না সকলে তার প্রতি কেনো এতো অ’নীহা।
প্রান্তিকা সকল ভাবনা চিন্তা ফেলে উঠে দাঁড়ায়।। এখন বসে থাকলে চলবে না তার।একদমই চলবে না।
উঠে পুরো বাড়িটার দিকে চোখ বুলায় প্রান্তিকা।এক সময় যা সুখের রাজ্য ছিলো আজ তা বি’ষা’দ’পু’রী।সুখের আনন্দের ছিটেফোঁটা ও নেই কোথাও। তার বাবার রেখে যাওয়া কষ্টের টাকায় এই লোক গুলো পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করছে।
অথচ প্রান্তিকার বাবা মা থাকতে এই লোক গুলোই প্রান্তিকার সাথে কি সুন্দর ব্যবহার করতো।আর আজ,,,,,।
প্রান্তিকা উঠে সব কিছু গোছগাছ করে রাখে।থালা বাসন গুলো নিয়ে চলে যায় ধোঁয়ার জন্য। এই কাটা হাত দিয়ে কাজ ও করতে পারছে না। বাম হাতের সাহায্য সব কাজ অনেক কষ্টে শেষ করে।
প্রচুর খিদে পায় প্রান্তিকার।এক সাথে কতো কাজ করলো।খাওয়ার জন্য অল্প খাবার নেয়। ভাত মাখাতে গিয়ে বুঝতে পারে খেতে বসে বড় ভুল করে ফেলেছে।
হাত জ্বলে গেলো।মনে হচ্ছে কলিজায় গিয়ে লাগছে।অস্ফুট স্বরে ওমাগো বলে উঠে প্রান্তিকা।এই হাত দিয়ে আর খেতে পারে নি। অনেক কষ্টে কয়েক লোকমা গিলেছে।তাকে বাঁচতে তো হবে সেই আশায়।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে নিজের রুমে এসে মাত্র শুয়ে চোখ টা বুঁজে প্রান্তিকা।এর মধ্যেই তার ভাবির গলা শুনতে পায়।তাকে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ডাকছে।আর এই দিকেই এগিয়ে আসছে।
প্রান্তিকা শোয়া থেকে উঠে বসতেই তার ভাবি মোনা রুমে ঢুকে।
“কিছু বলবা ভাবি?”
বলার জন্যই তো এসেছি। সারাদিন তো শুয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কাজ নেই।খেয়ে খেয়ে শুধু শরীর ফোলাচ্ছিস। এই নে ধর লিস্ট এই জিনিস গুলো নিয়ে আয় আমার লাগবে।
এতো কাজ করে ও তার ভাবির থেকে শুনতে হয় সে নাকি সারাদিন শুয়ে বসে থাকে হাহ্।
ভাবি আমার শরীর খারাপ লাগছে অন্য কাউকে পাঠাও না প্লিজ। নয়তো কাল এনে দেই?
অন্য কাউকে কাকে পাঠানোর কথা বলছিস তুই? তোর মতো কে আজাইরা পরে আছে? দুই আঙ্গুলের মেয়ে সে আমার কথা অমান্য করে। থাপড়ে তোর গাল ফাটায় দিবো।
চুপচাপ গিয়ে জিনিস গুলো নিয়ে আয়।
প্রান্তিকা চুপ হয়ে যায়। বুঝতে পারে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। যতো কিছু হয়ে যাক তাকে গিয়ে এসব আনতেই হবে।
তারপর আর কি রে’ডি হয়ে বের হয়ে পরে ভাবির লিস্ট ধরিয়ে দেওয়া জিনিস গুলো আনতে।
————————–
পুরো বাজার তুলে আনার লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছে মনে হচ্ছে প্রান্তিকার। দুই হাত ভর্তি জিনিস পত্রের ব্যাগ।নিতে প্রায় হিমশিম খাচ্ছে।
রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোন রকম ব্যাগ গুলো নিয়ে যাচ্ছে প্রান্তিকা। সন্ধা হয়ে গেছে সব কেনাকাটা করতে করতে।
হঠাৎ করেই একটা বড় রেস্টুরেন্টের সামনে এসে কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে নিচে পরে যায় প্রান্তিকা।কোনো সুঠাম দেহি শক্ত পো’ক্ত মানবের সাথে যে ধাক্কা খেয়েছে বুঝতে পারে। নয়তো এতটুকু ধাক্কাতে প্রান্তিকার পরে যাওয়ার কথা নয়। অবশ্য দোষ টা তার না অপর পাশের মানুষটার। তবুও প্রান্তিকা কিছু বলেনি।এমনকি চোখ তুলে সামনে কার সাথে ধাক্কা খেলো তা দেখার ও প্রয়োজন মনে করেনি।
চুপচাপ তারাতাড়ি ব্যাগ গুলো উঠিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে নিজে দোষ না করেও স’রি বলে চলে আসে।
লোকটা কথা বলতে বলতে হয়তো খেয়াল করেনি প্রান্তিকা কে। যার কারণে এমন বিপত্তি বাঁধলো।
লোকটা অবাক হয়ে প্রান্তিকার যাওয়ার দিকে তাকায় পাশে দাড়ানো লোক গুলো প্রান্তিকাকে কিছু বলতে নিবে লোকটা হাত উচিয়ে থামিয়ে দেয়। মনে মনে বলে উঠে অদ্ভুত!
তার পরক্ষনেই লোকটা নিজের হাতের দিকে তাকায়। এখানেই মেয়েটা ধাক্কা খেয়েছে।
কপাল কুঁচকে বাম হাত দিয়ে ময়লা ঝাড়ার মতো হাতে ঝাড়া মারে।
তারপর বিরক্তিকর ভাবে আশে পাশে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে উচ্চারণ করে ডিজগাস্টিং!!..
আর অন্য দিকে না তাকিয়ে সোজা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকে।
#চলবে,,,,,,