
গল্প- নির্জীব
১ম পর্ব
সোয়েব বাশার
এশাকে আমি একদমই সহ্য করতে পারি না।
ওর সাথে আমার বিয়ের ছ’মাস হয়েছে। এই ছ’মাসে, ও খুব চেষ্টা করেছে আমার মন পাবার। আমি দেইনি। ওর সাথে বিয়েতে আমার মত ছিলো না। মা-বাবা জোর করে ওর সাথে আমার বিয়ে দেন।
আমার পছন্দ ছিলো রুবিকে। রুবি, আমাদের পাড়ার ডাকসাইটে সুন্দরী। বহু তরুণের সে মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিলো, আমারও। আমি চেষ্টা করতে থাকি তার মন পাবার। আর পাইও। আমাদের প্রেম চলেছিলো তিন মাস। বাসায় আমি ওর আর আমার সম্পর্কের কথা জানাই। মা-বাবা একেবারেই না করে দেন।
তবে আমি একেবারেই অবাক হলাম না।
ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা এমন। আমার কোনো পছন্দেরই তারা মূল্য দেন না। আমি যদি আইসক্রিম খেতে চাইতাম, তারা বার্গার কিনে দিতেন। আমি আর্টসে পড়তে চাইলে তারা দ্রুত আমাকে সাইন্সে ঢুকিয়ে দেন। এহেন বাবা-মা যে আমার বিয়ের পছন্দেও বাগড়া দিবেন, তাতে অবাক হবার কি আছে?
আমি তবুও এবার খুব চেষ্টা করেছিলাম। রুবিকে বলেছিলাম, বাড়ি থেকে না মানলেও ওকে বিয়ে করবো। রুবি না করে দিলো। ও বললো, ‘দেখো, আমি একটা সুস্থ স্বাভাবিক বিয়ে চাই। দুই পরিবার এক হবে, কতো আনন্দ হবে বিয়েতে। এসব পালিয়ে বিয়ে, অমতে বিয়ে আমার পছন্দ নয়।’
রুবির অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে গেলো। বাবা-মাও আমার সাথে এশার বিয়ে দিলেন।
বিয়ের পরপরই আমার একটা চাকরি হয়ে যায়, অন্য শহরে। এশাকে নিয়ে আমি সেই শহরে চলে যাই। আমাদের দুজনের সংসার। সেই সংসারে আমাদের দূরত্ব বাড়ে, আমি নিজেই বাড়াই। রাতে ওকে অন্য রুমে পাঠিয়ে দেই শোবার জন্য। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বকাঝকা করি। মেয়েটা চুপচাপ সব মেনে নেয়। কিচ্ছুটি বলে না। উল্টো প্রানপণ চেষ্টা করতে থাকে আমার মন পাবার।
যেমন, কোনোদিন সে বিরিয়ানি রান্না করে। বিরিয়ানি আমার পছন্দের খাবার। আমি অফিস সেরে এসে খাবার নিয়ে বসি। দু লোকমা মুখে দিয়েই খাবারের প্লেট ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলি, ‘কি ছাইপাশ রান্না করো? এর চাইতে তো মাটি খাওয়াও ভালো।’
মেয়েটা ছলছল চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। আমি উঠে যাই। ওর বিরিয়ানিটা যে সত্যিই অসাধারণ হয়েছে, এই সত্যটা ওকে বলিনা।
কোনোদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি, ও খুব সুন্দর করে সেজেছে। আমার জন্য। আমি মুগ্ধ হই ওকে দেখে। ও আসলেই সুন্দর, রুবির থেকেও সুন্দর। কিন্তু সেই মুগ্ধতা প্রকাশ করি না। ধমক দিয়ে বলি, ‘বাড়ির বাইরেটা ময়লা হয়ে আছে কেন? সারাদিন সাজগোজ নিয়ে থাকলে তো চোখে পড়বে না এসব।’
কোনোদিন রাতে ঘুম ভাঙলে শুনি, পাশের রুমে এশার চাপা কান্নার শব্দ। আমি বিরক্ত মুখে ওকে গিয়ে ধমকাই, ‘কাল অফিস আছে। এভাবে কান্নাকাটি করলে ঘুমাবো কখন? এসব ঢং বাদ দিয়ে ঘুমাও জলদি।’
এশা মুখ চেপে কান্না আটকায়। আমি রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ি।
এভাবেই, বাবা-মার ওপর রাগের প্রতিশোধ আমি এশার ওপর নিতে থাকি। মাঝেমাঝে যদিও একটু খারাপ লাগে, তবুও আমি মনটাকে শক্ত করে রাখি। আমি চাই, এসব অত্যাচারের কথা বাবা-মার কানে যাক। তাদের একটু অনুশোচনা হোক। কিন্তু, এশা মেয়েটা মনে হয় না বাসায় কিছু জানায়। এমন চুপচাপ, সর্বংসহা মেয়েকে নিয়ে যেন আমি আরেক বিপদে পড়ি।
এরপর, একদিন সত্যিই খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যায়।
সেদিন আমি এশাকে ইচ্ছামতো বকাঝকা করি। বকার কারণ, ঘর নোংরা করে রাখা। অবশ্য এশারও কোন দোষ ছিলো না। ও সারাটা দিন অসুস্থ ছিলো। ব্যাপারটা আমি জানতাম। তবুও ওকে বকি।
মেয়েটা এতোদিন সব চুপচাপ সহ্য করতো। সেদিন করলো না। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘তুমি এমন করো কেন আমার সাথে? পছন্দ না করলে বিয়ে কেন করেছিলা?’
ওর কান্না দেখে আমার মেজাজটা বিগড়ে গেল। আমার সামনের টেবিলে একটা কাঁচের ফুলদানি রাখা ছিলো। সেটা তুলে ওর দিকে ছুঁড়ে মেরে বললাম, ‘বিয়ে কি ইচ্ছা করে করেছি? বাবা-মা জোর না করলে কি বিয়ে করতাম তোমাকে?’
এশা একটু পিছে সরে ফুলদানিটা থেকে বাঁচার জন্য। ওর পিছেই ছিলো দেয়াল। দেয়ালে আমরা একটা স্টিলের হ্যাংগার টানিয়েছিলাম কাপড় রাখার জন্য। হ্যাংগারের দাঁতগুলো কোনো এক অদ্ভুত কারণে বেশ ধারালো ছিলো।
সেই ধারালো দাঁতের একটা সজোরে এশার মাথার পিছে ঢুকে গেল। মেয়েটা মেঝেতে পড়ে ছটফট করলো কিছুক্ষণ। এরপর নিথর হয়ে গেল ওর শরীর।
ব্যাপারটা এতো দ্রুত ঘটলো, আমি প্রথমে বুঝতেই পারলাম না কি হচ্ছে। যখন সম্বিত ফিরে পেলাম, এশার কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে ডাকলাম, ‘এশা।’
এশা নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো সিলিংয়ের দিকে।
আমি এবার নিচে ঝুঁকে ওর শরীরে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে লাগলাম। ‘এশা, এই এশা। উঠো।’
এশা একটুও নড়লো না। ওর মাথার পিছন থেকে বের হওয়া রক্তে আমার পায়ের পাতা ভিজে গেল।
আমি চুপচাপ নিজের রুমে এসে নিজেকে ছুঁড়ে দিলাম বিছানায়। এরপর হাত দিয়ে মুখ ঢেকে পড়ে রইলাম সেভাবেই। এটা কি করলাম আমি! একটা মেয়েকে খুন করে ফেললাম! এখন কি হবে!
কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। নিজের ওপর খুব ঘৃণা হচ্ছিলো, রাগ হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো, কোনোভাবে সময়টা পেছাতে পারতাম। যেটা ঘটে গেছে সেটাকে থামাতে পারতাম। এশার দিকে ফুলদানিটা ছুঁড়ে না মারতাম।
সেটা তো সম্ভব না।
আমি সেভাবেই পড়ে রইলাম- দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যায়। জানালা দিয়ে সূর্যের রোদ আমার মুখের ওপর দিয়ে চলে গেল পূর্ব থেকে পশ্চিমে। আমার বউয়ের লাশটা পড়ে রইলো পাশের রুমেই, যেভাবে পড়ে ছিলো।
এরপর, রাত নামলো। আমি যেমন ছিলাম, তেমনই পড়ে রইলাম বিছানায়। পুরো বাড়ি অন্ধকারে ডুবে রইলো।
সেসময়েই, হঠাৎ আমার মনে হলো, রান্নাঘরে টুংটাং শব্দ হচ্ছে। কে যেন আছে রান্নাঘরে।
আমি ঘাড় ঘোরালাম। সত্যিই, রান্নাঘরের আলো জ্বলছে। আমি বিছানা থেকে নেমে আস্তে আস্তে রান্নাঘরের দিকে এগোলাম। কে রান্নাঘরে আছে দেখার জন্য। কারো তো থাকার কথা নয়, বাড়ির চাবি আমার আর এশা ছাড়া কারো কাছে নেই।
সামনের দেয়ালটা ঘুরলেই রান্নাঘরের দরজা। আমি আস্তে আস্তে দেয়ালটার পাশ দিয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিলাম।
এশা দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘরে।
আমি ভালো মতো তাকালাম। সত্যি, ওটা এশাই। আমি কিছু না বলে চুপচাপ নিজের রুমে ফিরে এলাম। এরপর দুহাতে মাথা চেপে ধরে কাঁপতে লাগলাম ভয়ে।
পায়ের শব্দ পাচ্ছি। কেউ আসছে আমার রুমে।
এশা আমার রুমে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো। এরপর একটু ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এভাবে কাঁপছো কেন?’
আমি ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম, কিছু বললাম না।
এশা মুচকি হেসে আমাকে ধমক লাগালো, ‘ওঠো তো, ওঠো। কি অবস্থা করে রেখেছো বিছানটার। আমি একদিন একটু নেই, তাতেই সব একদম আউলা-ঝাউলা করে ফেলে রেখেছো।’
বলেই এশা ঝাঁড়ু নিয়ে বিছানা ঝাঁট দেয়া শুরু করলো। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কি হচ্ছে এখানে? এশা এমন করছে কেন? ওর কি সত্যিই কিছু হয়নি? নাকি সব আমার মনের কল্পনা ছিলো?
আমি দৌড়ে গেলাম সে ঘরে, যেখানে এশার লাশ পড়েছিলো। সে ঘরের মেঝেতে রক্তের বন্যা, কিন্তু এশার শরীরটা নেই।
এশা ততক্ষণে আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
মেঝেতে রক্ত দেখেই ও বললো, ‘ইশ, কি অবস্থা। যাও তো, চুলায় তরকারিটা একটু নেড়ে দিয়ে আসো। আমি মেঝেটা পরিষ্কার করে ফেলি।’
আমি চুপচাপ রান্নাঘরে এসে তরকারি নাড়তে লাগলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পর, মনে হলো, এশার কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে উঁকি দিলাম ঘরে।
দেখলাম, মেঝে তকতকে পরিষ্কার। এশা পড়ে আছে বিছানায় নিথর হয়ে, নিষ্পলকে তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে।
তাহলে? এতোক্ষণ কে ছিলো আমার সাথে?
(চলবে)