
নির্জীব
২য় ও শেষ পর্ব
সোয়েব বাশার
(১৮+ সতর্কতা)
এভাবেই এশা পড়ে রইলো, সারাদিন। আমি ওকে ওঠানোর চেষ্টা করলাম অনেক। ও উঠলো না।
কি হলো তবে? সবটাই কি আমার মনের কল্পনা ছিলো? তাহলে মেঝে, বিছানা পরিষ্কার করলো কে? রান্নাই বা করলো কে?
বুঝতে পারছিলাম না কিছুই।
সেদিনটা সেভাবেই কেটে গেল। রাতে আবার এশা এলো আমার রুমে। মিষ্টি হেসে বললো, ‘তোমার প্রিয় বেগুনের তরকারি রান্না করেছি। খেয়ে নিও।’
আমি বললাম, ‘এশা, তুমি কি সত্যি?’
‘মানে?’
‘মানে, তুমি মারা যাওনি?’
‘না তো। মারা কেন যাবো?’
‘ঐ যে, সেদিন তোমার মাথায় হ্যাংগারের বাড়ি লাগলো। তুমি পড়ে গেলে…লাশ… রক্ত…’
এশা হেসে বললো, ‘আরে ধুর। কি যে বলো! একটু হ্যাংগারের বাড়ি লেগেছিলো। ওটা তেমন কিছু ছিলো না।’
‘তবে সেদিন যে মরার মতো পড়েছিলে। আজো সারাদিন, অমন ভাবেই তো পড়েছিলে বিছানায়।’
‘আমি ঘুমাচ্ছিলাম।’
সত্যিই কি তাই? তবে ওর শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ ছিলো কেন?
এশা আমার দিকে এগিয়ে এসে বললো, ‘মনে হচ্ছে তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছো না? দেখো, তবে আমায় ছুঁয়ে দেখো। তোমার সন্দেহ দূর হোক।’
বলেই ও হাত বাড়িয়ে দিলো। আমি ওর হাত ছুঁলাম। ঠাণ্ডা একটা হাত।
আমরা চুপচাপ খাওয়া সারলাম। এশা প্লেটগুলো নিয়ে রান্নাঘরে গেল। আমি গেলাম ওর পিছুপিছু।
এশা অবাক হয়ে বললো, ‘কিছু বলবা?’
‘হ্যাঁ। এশা, আমাকে মাফ করে দাও।’
‘কেন?’
‘আমি তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। এমন ব্যবহার আমার করা উচিত হয়নি।’
এশা মাথা নিচু করে বললো, ‘এসব কথা এখন কেন বলছো?’
‘বলছি। আর হয়তো বলার সময় পাবো না।’
এশা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘পাবে, আরো সময় পাবে। উই হ্যাভ অল দ্য টাইম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’
সে রাতটা আমরা দুজন একসাথে কাটালাম। আমাদের বিয়ের পর, প্রথমবারের মতো।
সকালে উঠে দেখলাম, এশা পড়ে রয়েছে বিছানায়, নির্জীব, অসাড় হয়ে। চোখগুলো নিষ্পলকে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে।
সারাটাদিন এশা এমনই রইলো। সন্ধ্যার পর, আবার জেগে উঠলো সে।
আমরা সেদিন একসাথে রান্না করলাম। খেলাম। টিভিতে মুভি দেখলাম। এরপর দুজন দুজনকে তীব্রভাবে আদর করলাম।
সকালে আবার নির্জীব হয়ে রইলো এশা।
এভাবেই কাটছিলো আমাদের রাত্রিবেলার সংসার। সুখেই কাটছিলো। মনে হচ্ছিলো, নবদম্পতি আমরা, আমাদের আবার নতুন করে বিয়ে হয়েছে।
আমাদের ভালোবাসাও বাড়তে থাকে তীব্রভাবে।
প্রতিরাতে, আদরের পর, এশা আমার দিকে চেয়ে বলে, ‘তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না তো।’
আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলি, ‘না। কখনো যাবোনা।’
এশা মিষ্টি করে হেসে আমার চুলে বিলি কেটে দেয়।
সে রাতেও, এশা একই কথা জিজ্ঞেস করলো। আমিও একই উত্তর দিলাম। এরপরই দরজায় শব্দ হলো।
‘খুলুন, দরজা খুলুন।’
এশা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আজ আমাকে তোমায় ছেড়ে যেতে হবে।’
‘কি বলো? কেন?’
‘ওরা আমাকে নিতে এসেছে।’
দরজায় শব্দ বাড়ছে। চিৎকার করে ওপাশের লোক বলছেন, ‘দরজা খুলুন শিগগির। নইলে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়বো।’
এশা বললো, ‘আমায় যেতে হবে। কিন্তু তোমাকে ছাড়া যেতে আমার ইচ্ছা করছে না। প্লিজ, আমাকে যেতে দিও না। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। সারাজীবন থাকতে চাই।’
আমি এশাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেবো না।’
সেসময়ই, বিকট শব্দে দরজা ভেঙে গেল। একপাল মানুষ ঢুকে পড়লো ঘরের ভেতর। আমি একদম ভড়কে গেলাম। এতোগুলো মানুষ, অথচ কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই কেমন আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। এদিকে ওদিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশও জ্বলে উঠছে হঠাৎ হঠাৎ করে।
যে লোকগুলো ঢুকেছিলো, তাদের মধ্যে সামনের দিকে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা দুজন ছিলেন। তারা ঘরে ঢুকেই হরহর করে বমি করে দিলেন। এরপর নাক চেপে ধরে বললেন, ‘ঐ পঁচা-গলা লাশটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন কি করে?’
আমি পাশে তাকালাম। এশা পড়ে আছে নির্জীব।
আমি উনাদের ধমক দিয়ে বললাম, ‘কি বলছেন? ও পঁচা-গলা লাশ হবে কেন? ও আমার স্ত্রী এশা। একটু আগেই ও কথা বলছিলো আমার সাথে। আপনারা আসতে আসতেই ও ঘুমিয়ে পড়েছে।’
উপস্থিত সবগুলো লোক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে।
কে যেন বললো, ‘সত্যি আপনি দেখতে পারছেন না? এটাতো পুরা পঁচা-গলা একটা লাশ। চেহারাও বোঝা যাচ্ছে না ভালো মতো। ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। আপনি সত্যিই দেখতে পারছেন না?’
আমি চিৎকার করে বললাম, ‘কি বলেন এসব? এটা তো এশা। আমার বউ। ও বিয়ের পর যেমন ছিলো, তেমনই আছে, একটুও বদলায়নি। পঁচা-গলা-ফুলে ওঠা লাশ, এসব কি বলছেন আপনারা? সবাই কি পাগল হয়েছেন একসাথে?’
ভীড়ের সবাই একসাথে গুঞ্জন শুরু করলো। পুলিশরা ঠেলে ঠেলে সবাইকে বাইরে পাঠাতে শুরু করলেন। ঐ ভীড়ের থেকে কিছু কিছু কথা আসতে লাগলো আমার কানে-
‘পাগল।’
‘উন্মাদ।’
‘নেক্রোফিলিয়াক।’
আমি বাঁধা দেবার চেষ্টা করেছিলাম অনেক, কিন্তু পারলাম না। এশাকে ওরা কেড়ে নিয়ে গেলো আমার কাছ থেকে।
পরদিন সব পেপারে খবর বেরোলো- ‘মৃত স্ত্রীর সাথে পাঁচদিন একই বাড়িতে ছিলেন যিনি।’
দু’মাস পর, আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রে। এই কেন্দ্রের প্রধান, শফিকুর রহমান সাহেব, খুব চমৎকার একজন মানুষ। মানসিকভাবে অসুস্থ লোকদের নিয়ে কাজ করা তার জীবনের পেশা এবং নেশা, এই নেশার পিছে ছুটে কখনোই সংসার করেননি ভদ্রলোক। তিনি আমাকে অনেক সময় দেন। আমার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা এসে গল্প করেন। আমারও মনে হতে থাকে, তিনি আমার দূরের কেউ নেন, যেন খুব কাছের কোনো আত্মীয়।
আমি তাকে আমার সবটুকু কাহিনীই জানালাম।
শফিক চাচা, আমি তাকে চাচা বলেই ডাকা শুরু করেছিলাম, একদিন এসে আমার সাথে খোলাখুলি আমার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি মেডিক্যাল টার্মগুলো বাদ দিয়ে একদম সাধারণভাবে আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে দেন।
‘তুমি মনে মনে পছন্দ করতে এশাকে। উপরে উপরে তুমি এশার ওপর মানসিক অত্যাচার চালাচ্ছিলে সেটা ঠিক, তবে তোমার মনের এতে সায়ও ছিলো না। নিজেকে তুমি অপরাধী ভাবা শুরু করেছিলে অবচেতন মনে। এরমধ্যেই একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়, এশা মারা যায়।
এশার মৃত্যুর সমস্ত দায়ভার তুমি নিজের ওপর নিয়ে নিলে। এতে কি হলো, তোমার মনোজগতে এক বিশাল ঝড় উঠলো, যেই প্রলয়ংকরী ঝড় ধ্বংস করে দিবে সবকিছু। এই ঝড় থেকে তোমায় বাঁচাতে তোমার মন কি করলো? সে এশার একটা রুপ তৈরি করে তোমার সামনে নিয়ে আসলো। তোমাকে বোঝালো, এশা মরেনি, বেঁচে আছে সে। তার সাথেই তুমি সংসার করা শুরু করলে। সোজা কথায়, এতোদিন যা কিছু ঘটেছে এশার সাথে, সবই তোমার মনের মধ্যে ঘটেছে।’
‘কিন্তু, এশা এসে আমার জন্য রান্না করে দিয়েছিলো, ঘর গুছিয়ে রেখেছিলো। ও সত্যি না এলে এসব করলো কে?’
শফিক চাচা আমাকে কিছু ছবি দেখালেন।
‘এই ছবিটা দেখছো? তোমাদের মেঝের ছবি। কিরকম রক্তমাখা মেঝে! এটা তোলা হয়েছিলো, তোমাকে যেদিন ঐ বাড়ি থেকে আমার ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়, সেদিন। অথচ তুমি আমাকে বলেছিলে, এশা নাকি মেঝে পরিষ্কার করে তকতকে করে রেখেছে। ও মেঝে পরিষ্কার করলে এই রক্তগুলো এলো কোত্থেকে?
আরো দেখো, এগুলো তোমার কিচেন সিঙ্কের ছবি। সব ময়লা-আধোয়া প্লেট পড়ে আছে। এশা সব পরিষ্কার করলে এগুলো এলো কোত্থেকে?
সোজা কথা, তুমি এতোদিন ঘোরের মধ্যে ছিলে। তোমার মন বাস্তবের ওপর এক পর্দা ঝুলিয়ে দিয়েছিলে, সেই পর্দা দিয়েই তুমি বাইরের জগৎ দেখতে। এজন্যই কোনটা বাস্তব, আর কোনটা কল্পনা, তুমি বুঝতে পারোনি।’
আমি চুপ করে রইলাম। শফিক চাচা বললেন, ‘আমার কথা কি তুমি বিশ্বাস করছো?’
‘করছি।’
‘কোনো প্রশ্ন আছে তোমার?’
‘আছে। এশার সাথে যে আমি রাত কাটিয়েছিলাম, সেটাও কি আমার মনের কল্পনা ছিলো? নাকি সত্যি সত্যি আমি একটা লাশের সাথে…’
‘এ ব্যাপারে আমি তোমাকে পরে বলবো।’
শফিক চাচা আর কখনো এ ব্যাপারে আমাকে কিছু বলেননি। আমিও কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
আমি এখন শফিক চাচার সাথে সাথেই থাকি। তার পেশেন্টদের ট্রিটমেন্ট করা দেখি। মাঝে মাঝে টুকটাক সাহায্যও করি। চাচা আমার ওপর খুব খুশি হন।
আমার রিলিজ ডেটও চলে আসে খুব তাড়াতাড়ি।
রিলিজ হবার দিন, শফিক চাচা আমাকে ডেকে বললেন, ‘তোমাকে একটা কথা বলি। পৃথিবীতে কোনো কিছুই কারো জন্য থেমে থাকে না। এশা চলে গেছে, এটা নিয়ে তুমি পড়ে থেকো না। তোমার সামনে এখনো পুরো জীবন পড়ে রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে মানুষ সব দুঃখই ভুলে যায়। মানুষ তো নিজের সব থেকে আপনজন, নিজের বাবা মায়ের মৃত্যুর শোকও কাটিয়ে উঠতে পারে, পারে না? এশার মৃত্যুর জন্য তুমি নিজেকে কখনো দায়ী করবে না। ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিলো, তুমি তো আর এশাকে মারতে চাও নি।
এখন, তুমি আমাকে কথা দাও, তুমি সামনে খুব সুন্দর এক জীবন কাটাবে। খুব সুন্দর এক মেয়ের প্রেমে পড়বে, তার সাথে সংসার করবে। ফুটফুটে সন্তান হবে তোমাদের। তুমি এনজয় করবে তোমার লাইফ। পারবে না?’
‘পারবো চাচা। আমি কথা দিলাম।’
‘গুড। খুব ভালো লাগছে, জানো। আমার ক্লিনিকে যারা আসে, খুব কমজনই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি যান। তুমি সেই কম মানুষদের একজন। এ ক’দিনে, তোমার ওপর কি পরিমান মায়া পড়ে গেছে আমি তোমাকে বোঝাতে পারবো না। তুমি রিলিজ হবার পরও তোমার এই বুড়ো চাচাকে দেখতে আসবে। বলো, আসবে না?’
আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘আসবো চাচা, অবশ্যই আসবো।’
শফিক চাচা চোখের পানি মুছে বললেন, ‘যাও বাবা। আবার দেখা হবে।’
শফিক চাচার ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। আমার মুখে হাসি ফুটলো।
আমার অভিনয়গুলো কাজে লেগেছে।
সুস্থ হবার অভিনয়।
প্রথম থেকেই বুঝছিলাম, ওরা আমাকে উল্টাপাল্টা বোঝাচ্ছে। এশা নাকি আমার মনের কল্পনা। ওরে বোকার দল, যাকে এতো কাছ থেকে দেখেছি, স্পর্শ পেয়েছি, ঘ্রাণ পেয়েছি, সে কি আমার কল্পনা হতে পারে?
শফিক চাচা খুব চেষ্টা করেছেন, এশা যে আমার কল্পনা সেটা প্রমাণ করার জন্য। আমাকে আমার ঘরের রক্তমাখা মেঝের ছবি দেখিয়েছেন। ওরে বুড়া ভাম, আমার বউ মরছে ড্রয়িংরুমে, আর তুই আমাকে শোবার ঘরের মেঝের রক্তমাখা ছবি দেখাস? আমি কি এতোই বোকা?
এই বোকাচন্দ্রগুলোর হাত থেকে বাঁচতে অনেক কষ্ট করছি। ওষুধ খাওয়ার অভিনয় করেছি, একটা ওষুধও খাই নাই। বুড়াভামটার পিছে পিছে ঘুরেছি অনেক, হুদাই উনার বকবক শুনেছি বসে বসে। যাক, লাভ হইছে, আগে আগে রিলিজ পাইছি। এখন আমি এশার কাছে যাবো। সেই রাতে নির্জীব হয়ে পড়বার আগে ও আমাকে বলে গিয়েছিলো লোকগুলা ওকে কোথায় কবর দিবে। সেখান থেকে এশাকে বের করবো। এরপর অনেক দূরে চলে যাবো। এশা আবার সন্ধ্যা বেলায় জেগে উঠবে।আবার আমাদের রাত্রিবেলার সংসার শুরু হবে।
আমি আর এশা এভাবে একসাথে থাকবো। চিরটাকাল।
(সমাপ্ত)