নেশাক্ত ভালোবাসা পর্ব-১৪+১৫

0
1884

#নেশাক্ত_ভালোবাসা
#লেখিকাঃ Tamanna Islam
#পর্বঃ ১৪

পর্দার পাশে থাকা ছোট সুতা টা টান দিতেই ঢেউয়ের ন্যায় তা নিচে নেমে পরে। ইলা অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে তো আছেই। আর আব্রাহাম যেন দুই চোখ ভরে দেখছে। হ্যাঁ সেটা আর কিছু না বরং আইরাতের ছবি। বিশাল বড়ো এক ছবি। জলরঙের মাধ্যমে আকা এটা। আইরাতের অতিমাত্রায় হাস্যজ্জল একটা পেইন্টিং। দেখে যেন মনে হয় যে কেউ নিজের সব মাধুর্যতা, সব ভালোবাসা আর অনেক বেশি যত্ন দিয়ে বানিয়েছে। ইলা আব্রাহামের দিকে তাকায়। দেখে যে আব্রাহাম এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন কত্তো বছরের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। এখন তার মুখে যে এক ঝলক দেখা যাচ্ছে ইলার মতে এমন কিছুটা সে এর আগের কখনো দেখেছিলো বলে মনে পরে না।

ইলা;; কে এই?

আব্রাহাম;; দাদি ও আইরাত।

ইলা;; ভালোবাসিস?

আব্রাহাম এবার তার দাদির দিকে ঘুড়ে তাকায়।

আব্রাহাম;; দাদি আমি আসলে জানি না যে একে ঠিক কি বলে, নাম কি এই অনুভূতির। আমি জানি না ভালোবাসা নাকি এটা তার থেকেও অনেক বেশি কিছু। আর কখনোই কারো জন্য আমার ভেতরে এমন কিছুই হয় নি। আমি জানি না কিচ্ছু। আমি শুধু এই টুকু জানি যে আইরাত আমার কাছে থাকুক, আমার পাশে থাকুক। আমাকে ছেড়ে না যাক।

ইলা;; হুম বুঝলাম।

আব্রাহাম;; দাদি এটাকে না আমি ঠিক আমার বেডের সামনে রাখবো বুঝলে। যেন প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই আমি সোজা ওর ছবির দিকে তাকাই।

আব্রাহামের কথা শুনে তার দাদি হেসে দেয়। বেশ বুঝতে পারছেন যে তার নাতিন প্রেমে পাগল হয়ে গেছে। তবে এই ভেবে তার দাদি একটু শান্তি পায় যে যদি এই আইরাতের জন্য আব্রাহাম একটু তার রাগ টাকে কোন্ট্রল করতে পারে। সামনে তাকিয়ে দেখে আব্রাহাম অলরেডি ছবি সেট করার কাজে লেগে পরেছে। এভাবেই সেইদিন গেলো।


আইরাত, তার চাচা চাচি, রনিত সবাই ডাইনিং টেবিলের ওপর বসা ছিলো। কিন্তু আইরাত খাচ্ছে না। শুধু খাবার নাড়াচাড়া করছে। তা দেখে আইরাতের চাচা ইকবাল বলে ওঠে….

ইকবাল;; কিরে আইরাত কি হয়েছে খাচ্ছিস না কেন?

আইরাত;; আসলে চা….

কলি;; খাবে কীভাবে, খাওয়ার মুখ রেখেছে নাকি ও?

ইকবাল;; মানে কি হয়েছে?

কলি;; তা তোমার গুনোধর ভাগ্নী কেই জিজ্ঞেস করো না!

ইকবাল;; হ্যাঁ রে আইরাত কি হয়েছে বল দেখি!!

আইরাত;; মানে চাচ্চু আসলে আমার হোটেলের চাকরি টা চলে গেছে।

ইকবাল;; কি, কীভাবে? মানে কেন?

আইরাত;; ওইতো দুইদিন যাই নি কাজে। আর জানোই তো একটা ফাইভ স্টার হোটেলর রুলস গুলো কেমন হয়।

ইকবাল;; তাই বলে চাকরি গায়েব।

আইরাত;; চাচ্চু আমি আরেকটা চাকরির খোঁজ করছি।

ইকবাল;; ব্যাপার টা সেটা না, তোকে কাজ করতে যেতে হবে না।

কলি;; না যেতে হবে না তো ওর এই সব বারতি খরচ কে সামলাবে।

কলির এই কথা গুলো গতকাল থেকে শুনতে শুনতে কান গুলো যেন আইরাতের ঝালাপালা হয়ে গেলো। রাগও লাগছে ভীষণ। এবার আর আইরাত থাকতে না পেরে রাগে খাবার ছেড়ে টেবিল থেকে উঠেই পরলো৷

আইরাত;; ভাবতে হবে তোমাদের কাউকে। আমি আগামীকাল থেকেই আরেক টা কাজে জয়েন করছি৷ চিন্তা করো না টাকার বোঝা হবো না আমি তোমাদের কাছে।

এই বলেই আইরাত চলে যায়। চোখ দুটো দিয়ে কখন যে পানি পরে গেছে নিজেই বুঝে উঠতে পারে নি। আইরাতের চলে যাবার পর ইকবাল সাহেবও উঠে পরেন। খাওয়ার রুচি টাই মেরে ফেলেছে। আইরাত নিজের ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছে। হোটেল তো আর নেই তবে ভার্সিটি আছে। সেখানে যেতে হবে। রাগে কোন রিকশা অব্দি নেয় নি। হেটেই চলে এসেছে এতো রাস্তা। ভার্সিটির সামনে এসে দেখে দিয়া দাঁড়িয়ে আছে।

দিয়া;; কিরে এই এত্তো গরমের মাঝে হেটে এলি যে।

আইরাত;; রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। শোন আমি না বাড়ি তেই আর থাকবো না। পালিয়ে যাবো।

দিয়া;; কিইই কার সাথে পালাবি। আমায় বলিস ওকে। হেল্প লাগলে বলিস।

আইরাত;; দিয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া 😤

দিয়া;; আচ্ছা সরি সরি সরি। কুল বেবি কুল।

আইরাত;; আরে দেখ না কাল চাকরি গিয়েছে আর আজ থেকেই আমার চাচির খোটা শুরু। আমি কি করবো এখন!

দিয়া;; শোন আমি চাচ্চু কে বলেছি বুঝেছিস। ওই লতিফ কে আচ্ছা মতো বকেছে আমার সামনেই।

আইরাত;; তোর সাথে কিছু কথা ছিলো!

দিয়া;; হুম বল না।

আইরাত;; একটা অপশন আছে আমার কাছে।

দিয়া;; কি?

আইরাত;; আব্রাহাম চৌধুরী আমাকে উনার পারসোনাল পিএ হবার অফার দিয়েছেন।

দিয়া তার ওয়াটার পট থেকে পানি খাচ্ছিলো। আইরাতের কথা শুনে তার পানি একদম নাকে মুখে উঠে যায়। কাশতে কাশতে শেষ। আইরাত আস্তে আস্তে দিয়ার পিঠে চাপড় দিচ্ছে।

আইরাত;; ধুর কি যে করিস না, আস্তে দেখে শুনে খাবি তো।

দিয়া;; আহাম,, আহামা। আব্রাহাম চৌধুরী নিজে মানে দি আব্রাহাম আহমেদ চৌধুরী তোকে নিজে থেকে অফার করেছে নিজের পিএ হবার জন্য??

আইরাত;; হ্যাঁ।

দিয়া;; জীবনে আর কি লাগে রে। আব্রাহাম চৌধুরী পারসোনাল পিএ 😍। এই এই তুই কি বলেছিস?

আইরাত;; না বলে দিয়েছি।

আইরাতের কথা শুনে দিয়া তার মাথায় দেয় এক বারি হাতে থাকা সেই ওয়াটার পট দিয়েই।

দিয়া;; তোর মতো গাধা আমি আগে দেখে নি। এমন একটা অফার কেউ ফেরত দেয় বলদ৷ আর উনি নিজে তোকে বলেছেন তুই ভাবতে পারছিস আইরু। তুই কি মাথা মোটা রে। এই শুন না তুই রাজি না থাকলে আমাকে বল আমি এক পায়ে খাড়া।

আইরাত;; এই চুপ কর তো। ক্লাসে চল।

আইরাত আর দিয়া ক্লাসে চলে গেলো। ক্লাস তো চলছে কিন্তু কিন্তু আইরাত এক হাত মাথার সাইডে ঠেকিয়ে চিন্তায় মগ্ন। কি করবে কি না করবে ভেবে পায় না। বাড়ির যে অবস্থা। আচ্ছা আইরাতের কি উচিত আব্রাহামের পিএ হওয়া। কোনকিছু তেই মন বসাতে পারছে না। দিয়া তার পাশে তাকিয়ে দেখে আইরাত চিন্তার সাগরে ভাসছে। তা দেখে দিয়া এক ধাক্কা দেয়। আইরাত কল্পনা থেকে বাস্তবে আসে।

দিয়া;; কিরে কোথায় হারিয়ে গেছিস?

আইরাত;; না রে ভাবছি যে আসলে কি করবো!

দিয়া;; শোন কোন কাজই ছোট বড়ো হয় না৷ সব কাজ সমান। আমি তোর অবস্থা টা বুঝি। এখন উপায় নেই, রাজি হয়ে যা আব্রাহাম স্যারের অফারে।

আইরাত;; সত্যি!

দিয়া;; হ্যাঁ। আর এই সব চিন্তা এখন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল তো।

আইরাত আর দিয়া ক্লাসে মনোযোগ দেয়। ২-৩ টা ক্লাস হয়েই ভার্সিটি শেষ হয়ে যায়। তবে আজ আব্রাহাম আইরাতের ভার্সিটিতে আসে নি। অফিসে কাজের চাপ ছিলো অনেক, বেশ কিছু ফাইল পেন্ডিং সেগুলো চেক আউট করতে হয়েছে। সব ঝামেলা তেই আব্রাহাম আইরাতের ভার্সিটি যেতে পারে নি। যার ফলে তার মেজাজ চরমে এখন। আর ওদিকে ভার্সিটির বাইরে দিয়া আইরাতকে আকড়ে ধরে ফুচকা খাওয়ার জন্য। ইচ্ছে মতো ঝাল দিয়ে গপাগপ খাচ্ছে ফুচকা। দিয়ার ঝালের চোটে নাকের পানি আর চোখের পানি এক হয়ে গেছে। তবে আইরাতের কিছুই হয় নি কারণ সে বেশ ঝাল খাবার খায়। দিয়ার অবস্থা দেখে আইরাত হাসতে হাসতে শেষ।

আইরাত;; এই জানু আরেকটু খাও ফুচকা। (মুখের কাছে ফুচকা ধরে)

দিয়া;; এই ছেরি যা তো এইখান থেইকা। আমি মরি আমার জ্বালায়। আল্লাহহহহহহহহহ 😖।

দিয়ার প্রচন্ড ঝাল লেগেছে। আইরাত অবস্থা বেগতিক দেখে দৌড়ে গিয়ে পাশের এক দোকান থেকে আইসক্রিম কিনে নিয়ে আসে। দিয়ার সামনে এগিয়ে দিতেই দিয়া খাবলা মেরে নিয়ে নেয়। আইসক্রিম টা খেয়ে যেন এবার কিছুটা শান্ত হয়। দিয়া আইরাতের দিকে তাকায়। দেখে যে আইরাত আগের মতোই গিলছে এই ঝাল ওয়ালা ফুচকা।

দিয়া;; তুই কি মানুষ বইন?

আইরাত;; দেখে কি ডাইনোসর লাগে।

দিয়া;; এত্তো ঝাল কেমনে খাস 🥵?

আইরাত;; খাইতে দে চুপ কর।

তারা দুজনেই খাচ্ছিলো কিন্তু ঠিক তখনই একটা গাড়ি এসে আইরাতের ভার্সিটির সামনে থামে। বেশ জোরে ব্রেক কষে। আইরাত আর দিয়া সেদিকে তাকায়। দেখে তো বেশ একটা ভাবওয়ালা লাগছে। কিছুক্ষণ পরে একটা ছেলে নেমে আসে গাড়ি থেকে। আইরাত মুখে ফুচকা পুড়েই সেদিকে একটু তাকায়। আর দিয়া তো তাকিয়েই আছে। গাড়ি থেকে নেমে ছেলে টা অন্যদিকে ঘুড়ে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই এই দিকে তাকায়। সাদা ক্লারের পেন্ট আর ব্রাউন কালারের শার্ট পরে আছে। ওপরে সফট্ ব্লু কালারের কোর্ট। আইরাত কপাল কুচকে তাকিয়ে থাকে। সেই ছেলে টা তার চোখ থেকে চশমা খুলে একবার আইরাতের দিকে তাকিয়ে ভার্সিটির ভতরে চলে যায়। ছেলেটার চাহনির ধরন কেমন যেন একটু আলাদা ছিলো। ছেলে টার ভার্সিটির ভেতরে যেতেই দিয়া বলে ওঠে….

দিয়া;; কিরে খাওয়া হলো তোর?

আইরাত;; খাওয়া তো হয়েছে। কিন্তু এই কে ছিলো রে। এর আগে তো কখনো দেখি নি।

দিয়া;; আমিও দেখি নি। কি জানি কে ছিলো।

আইরাত;; আচ্ছা যাই হোক। বাদ দে চল।

অবশেষে দুইজন দুইজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসে পরে। দিয়া চলে গেছে কিন্তু আইরাত রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই আব্রাহাম আসে বাইক নিয়ে সাই করে। আইরাত একটু পিছিয়ে যায়।

আব্রাহাম;; হেই বেবিগার্ল কি করো?

আইরাত;; ভার্সিটির সামনে মানুষ কি করে!

আব্রাহাম;; আচ্ছা যাই হোক। উঠে পরো।

আইরাত;; কোথায় উঠবো?

আব্রাহাম;; বাইকে।

আইরাত;; আমি আপনার সাথে কেন যাবো?

আব্রাহাম;; এখন কি ভালো ভাবে যাবে নাকি আমি উলটা পালটা কিছু একটা করে বসবো! (এক ভ্রু উচু করে)

আইরাত;; দেখুন রাস্তার মাঝখানে প্লিজ কোন সিন ক্রিয়েট করবেন না। প্লিজ যান এখান থেকে।

আব্রাহাম;; আইরাত উঠতে বলেছি৷ (চোখ গরম করে)

আইরাত;; না যাবো না আমি।

আইরাত যাচ্ছে না দেখে আব্রাহাম নিজেই আইরাতের হাত ধরে এক রকম জোর করেই বাইকে বসিয়ে দেয়। আইরাত আব্রাহামের বাইকের পেছনে বসে আছে।

আব্রাহাম;; ধরে বসো নয়তো পরে যাবে।

আইরাত;; ধরতে পারবো না।

আব্রাহাম;; ওকে না ধরলে।

এই বলেই আব্রাহাম বাইক ইচ্ছে করেই জোরে স্টার্ট দেয় আইরাত পরে যেতে ধরলে তার হাত গুলো আপনা আপনিই আব্রাহামের জেকেট খামছে ধরে। আব্রাহাম বাইকের ফ্রন্ট গ্লাসে আইরাতের এমন ভয়ার্ত ফেইস দেখছে আর বাকা হাসছে।

আব্রাহাম;; বুঝলে তো ঘি সোজা আঙুলে না উঠলে আঙুল বাকা করতে হয়।

এই বলেই আব্রাহাম বাইক নিয়ে চলে যায়। কিন্তু কেউ একজন তাদের দিকে এক শকুন নজরে তাকিয়ে আছে। যেন আব্রাহাম আর আইরাত কে সহ্য করতে পারছে না।
আব্রাহাম আর আইরাত যাচ্ছে তখনই আব্রাহাম বলে ওঠে…

আব্রাহাম;; তো কি ভাবলে?

আইরাত;; কিসের কি ভাবলাম?

আব্রাহাম;; আমার পিএ?

আইরাত কিছুক্ষন ভেবে বলে…

আইরাত;; হ্য হ্যাঁ আমি, আমি রাজি।

আব্রাহাম;; সিরিয়াসলি?

আইরাত;; হ্যাঁ।

আব্রাহাম;; দশটা থেকে অফিস এসে পরো কাল। মেনেজার সব বুঝিয়ে দিবে তোমায়।

এই কথা বলেই শেষ, তারপর আব্রাহাম আর আইরাতের মাঝে কোন কথা হয় না। আব্রাহাম আইরাতকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দেয়। আইরাত নেমে সোজা বাড়ি চলে যায়। আব্রাহামও বাড়ি চলে যায়। তবে বাড়ি গেতেই আব্রাহামের মাথা গরম হয়ে যায়। ইলা ড্রোইং রুমে বসে ছিলো আব্রাহাম এসে তার পাশেই বসে…..

ইলা;; আব্রাহাম..!

আব্রাহাম;; বলো দাদি।

ইলা;; ও এসে গেছে।

আব্রাহাম সোফাতে বসে ফোন ঘাটছিলো কিন্তু তার দাদির কথা শুনে কপাল কুচকায়।

আব্রাহাম;; কে এসেছে?

ইলা;; রায়হান।

আব্রাহাম;; হ্যাঁ ভালো তোমার নাতিন এসেছে। এখন কি তুমি তার কাছে যেতে চাইছো? (গম্ভীরমুখে)

ইলা;; এভাবে কেন বলছিস সোনা! রাগিস না।

আব্রাহাম;; দাদি আমি রাগি না। তুমি জানো যে আমি তোমার সাথে রাগ করতে পারবো না। তবে ভালো হবে যদি তুমি ওই রায়হানের কথা আমার সামনে না বলো তো।

ইলা;; তোরই তো আপনজন হয় নাকি..!

আব্রাহাম;; হাহাহা,, হাসালে দাদি৷ আমার আপন ওই রায়হান। হাহ্ ছেড়ে দাও দাদি৷ আমার আপন বলতে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই।

এই রায়হানের কথা শুনলে আব্রাহামের রক্ত গরম হয়ে যায়। আব্রাহাম সেখানে আর বসে থাকতে না পেরে নিজের রুমে চলে যায়। রুমে গিয়েই নিজের জেকেট টা খুলে ছুড়ে ফেলে। শার্টের হাতা গুলো ফোল্ড করে নেয়, রাগে হাতের রগ গুলো ফুলে উঠেছে। আব্রাহামের জীবনে যদি কাটা বলতে কোন শব্দ থাকে তাহলে এই রায়হান। এখন প্রশ্ন হলো এই রায়হান টা আবার কে….!?

এদিকে আব্রাহামের দাদি পরে যায় আরেক চিন্তায়। এখন এই আব্রাহাম আর এই রায়হানের মাঝে আবার দন্দ বেধে না গেলেই হয়েছে।





চলবে~

#নেশাক্ত_ভালোবাসা
#লেখিকাঃ Tamanna Islam
#পর্বঃ ১৫ (বোনাস)

রায়হান আহমেদ…! আব্রাহাম আহমেদ চৌধুরীর ভাই তবে সৎ। হ্যাঁ রায়হান আব্রাহামের সৎ ভাই। আব্রাহাম বড়ো আর রায়হান ছোট। আব্রাহামের বাবা রৌনক আহমেদ চৌধুরী আব্রাহামের মা কুসুম বেগমের সাথে কখনোই সুখি ছিলেন না। কুসুম বেগমের মনে রৌনক আহমেদের জন্য যে ভালোবাসা টা ছিলো তা শুধুই কুসুম বেগমের জন্য ছলো। যাকে বলে এক তরফা। রৌনক আহমেদ আব্রাহামের মায়ের সাথে কখনোই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে নি। তবে শাশুড়ী হিসেবে ইলা বেশ ভালো ছিলো। কুসুম বেগম কে বুঝতেন তিনি। দেখতে দেখতে তাদের বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় আব্রাহামের জন্ম হয়। কুসুম বেগম ভেবেছিলেন যে আগে হয়তো তাদের হাসবেন্ড-ওয়াইফের সম্পর্ক টা ভালো ছিলো না কিন্তু এখন হবে। কোল আলো করে একটা ছেলে হয়েছে। এই ছেলের মাধ্যমেই হয়তো তাদের মাঝে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কুসুম বেগমের এই ধারণা টা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে তাদের মাঝে সম্পর্ক যেন দিনকে দিন আরো বেশি খারাপ হতে থাকে। ঝগড়া, কথা কাটাকাটি, মাঝেমধ্যে গায়ে পর্যন্ত হাত তোলা৷ এগুলো দেখতে দেখতেই আব্রাহামের ছোট বেলা কেটেছে। ফ্যামিলি প্রব্লেম কি তা আব্রাহাম বুঝে। আব্রাহাম তার মায়ের অনেক ক্লোজ ছিলো। আব্রাহামের দাদি আব্রাহামের বাবা কে অনেক বুঝায় কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। কোন লাভই হয় নি। আব্রাহামের বয়স যখন সাড়ে পাচঁ বছর তখন হুট করেই কিছুদিনের জন্য আব্রাহামের বাবা রৌনক গায়েব হয়ে যায়। কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি তাকে। না অফিস, না বন্ধুদের বাড়ি, না কোন হোটেল। সবাই বাড়িতে অনেক চিন্তিত ছিলো। আব্রাহাম মা পাগল ছিলো। মা আর দাদি ছাড়া কিছুই বুঝে নি। গায়েব হয়ে যায় কিছুদিনের জন্য আব্রাহামের বাবা। ঠিক ৬ দিন পর বাড়ি আসেন তিনি। তবে সেইদিন তিনি একা আসেন নি। তার সাথে সেইদিন এসেছিলো তার দুই বছরের সম্পর্কযুক্ত প্রেমিকা তাও আবার নববধূ রুপে। আব্রাহাম কে কোলে নিয়ে আব্রাহামের মা দরজা খোলে দেয়। রৌনক আহমেদ কে দেখে কুসুম বেগম খুব খুশি হন, কিছু বলতে যাবেন তার আগেই পাশে এসে দাঁড়ায় রুকশানা অর্থাৎ আব্রাহামের বাবার দ্বিতীয় বউ। কুসুম বেগম ভেঙে গিয়েছিলেন ভেতর থেকে। নিজের চোখের সামনে নিজের হাসবেন্ড যদি আরেক টা বিয়ে করে আনে তাহলে কেমন লাগবে এটা হয়তো বলার বাইরে। আব্রাহামের দাদি অনেক বুঝায় তার ছেলে কে কিন্তু সে মানে না। রুকশানা যে খারাপ তা একদম না। সে বুঝেছিলো যে তার জন্য এই পরিবারে অশান্তি হবে। কিন্তু রুকশানা একটা গরিব পরিবার থেকে এসেছিলো। এখানে থাকা ছাড়া তার আর কোন উপায়ও ছিলো না। আব্রাহামের মা একদম চুপ ছিলো সেইদিন। আসলে সেইদিন থেকে তিনি কথায় বলেন নি। অতি প্রয়োজন ছাড়া তিনি কারো সাথে কথাই বলতেন না। আব্রাহামের মা আর আব্রাহাম আলাদা রুমে থাকতো৷ রুকশানা আর রৌনক আলাদা রুমে। আব্রাহাম কিছুটা হলেও বুঝতো যে কিন্তু গন্ডগোল আছে। এভাবে কেটে যায় বেশ কয়েক বছর। রুকশানা আর রৌনকের ঘর আরো করে একটা ছেলে জন্মায়। সেই রায়হান ছিলো, রায়হান আহমেদ। আব্রাহাম আস্তে আস্তে বড়ো হয় সে তখন সবই বুঝে। তার বাবার বিয়ের দিন থেকে শুরু করে আব্রাহাম তার বাবার সাথে একটা টু শব্দ পর্যন্ত করতো না। রুকশানা, রায়হান, রৌনক কারো সাথেই কথা বলতো না আব্রাহাম। আস্তে আস্তে তাদের জন্য আব্রাহামের মনে বিষের জন্ম নেয়। আব্রাহামের মা তাকে রৌনক আহমেদের বউ হিসেবে পরিচয় দেওয়া টাও বন্ধ করে দিয়েছিলো। এভাবেই ধীরে ধীরে আব্রাহাম বেড়ে উঠে। আব্রাহাম যখন ক্লাস টেনে পরে তখন আব্রাহামের মা কুসুম বেগম মারা যান হার্ট অ্যাটাকে। আব্রাহামের সেইদিন মনে হচ্ছিলো যে কবরের ভেতরে তার মা কে শুয়ানোর আগে যেন তাকে শুয়ানো হয়। কিন্তু আব্রাহামের দাদি তাকে সামলে নেয়। একরোখা, বদমেজাজি, রাগি, এটিটিউড, ইগো এই সবকিছু আব্রাহামের মাঝে আপনা আপনিই এসে পরে। আর সত্যি রৌনক বাবা হিসেবে অনেক ব্যার্থ। তিনি সবসময় আব্রাহাম আর রায়হানের মাঝে ভেদাভেদ করেছেন। আব্রাহাম এমনও দিন দেখেছে যে রুকশানা, রৌনক আর রায়হান এক সাথে এক পরিবারের মতো আনন্দ করেছে আর আব্রাহাম হাতে একটা পুতুল নিয়ে দরজার আড়াল থেকে দেখেছে। এতো সবকিছু ফেইস করার পরই এত্তো পরিবর্তন হয়ে গেছে আব্রাহাম। রায়হান এতোদিন এবোর্ড ছিলো কিন্তু এখন দেশে ফিরেছে। পড়াশোনা শেষ তার। নিজের বাবার বিজনেস দেখা শোনা করে। আর আব্রাহাম নিজের বিজনেস, নিজের পরিচয় নিজে বানিয়েছে। নিজের যোগ্যতায়-দক্ষতায় তৈরি করেছে। আজ আব্রাহাম এত্তো বড়ো একজন বিজনেস টাইকুন সব নিজের জোরে। তবে আব্রাহাম আর রায়হান একে ওপর কে দেখতে পারে না। দুইজন সাপ আর নেউল বলা যায়। শেষ কবে যে আব্রাহাম ওই রায়হান আর তার মা কে দেখেছিলো মনে নেয়। ওহহ হ্যাঁ আব্রাহামের মা মারা যাবার ঠিক ৭ মাস পরেই আব্রাহামের বাবাও মারা যান। আব্রাহাম তার দাদি কে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে এসে পরে। অন্য জায়গায় থাকে। আব্রাহাম তার বাবার সম্পত্তির এক আনাও নেয় নি। আব্রাহামের মা নিজের সবকিছু নিজের ছেলের নামে দিয়ে গিয়েছিলেন। আব্রাহামের কাছে তার বাবা মায়ের ছবি নেই, আসলে তার কাছে তার বাবার কোন ছবিই নেই। যে ছবি গুলোতে আব্রাহামের বাবা আর মা একসাথে ছিলো সেগুলো সে আলাদা করে দিয়েছে। এখন নিজের দুনিয়া বলতে তার এই দাদি। আর রায়হান ছেলে হিসেবে বেশি ভালো না। মেয়েবাজি, এলকোহল, ক্যাসিনো, বেআইনি কাজ এইসব তার নিত্যদিনের কাজ। আর আব্রাহামের কানে এগুলো ডেইলিই আসে। আব্রাহাম সবদিক দিয়েই রায়হানের থেকে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে। চায় হোক তা নাম-ডাক-খ্যাতিতে, সম্পত্তিতে, পাওয়ারে, বিচক্ষণতায়, স্মার্টে বা গুড লুকস্ এ।

আব্রাহাম সব কিছুই জানে। আর তার দাদি ইলাও। কেউ কাউকে দেখতেই পারে না। আজ এতো দিন পরে রায়হান কেন এসেছে এখানে তাও আব্রাহাম বুঝে উঠতে পারছে না।

আব্রাহাম রাগে মাথা নিচু করে বেডে বসে আছে। রাগে মাথা ফেটে পরার উপক্রম তার। পুরনো সব কিছু যেন চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। আর থাকতে না পেরে আব্রাহাম তার পাশে থাকা কাচের গ্লোব টা তুলে ঢিল মারে। গ্লোব ছোট ছিলো তাই বেশি একটা শব্দ হয় নি।

আব্রাহাম;; দুনিয়া একদিক থেকে আরেক দিক করে ফেলবো আমি যদি এই রায়হান এখন আমার জীবনে এসেছে তো। একদম জানে মেরে ফেলবো ওকে।

আব্রাহাম নিজেকে কোন রকমে শান্ত করে। আর কাল সকালে অফিসে যেতে হবে কারণ আইরাত আসবে এস এ পিএ। তো সবকিছু পারফেক্ট থাকা চাই। এই ভেবেই আব্রাহাম শান্ত হয়ে বসে।


পরেরদিন সকালে~~

ইকবাল;; আরে আইরাত মা কোথায় যাচ্ছিস ভার্সিটি?

আইরাত;; না চাচ্চু আসলে বাইরে যাচ্ছি। মানে কাজে।

ইকবাল;; কাজে মানে কোন কাজে। এতো জলদি কিসের কাজ পেলি তুই?

আইরাত;; এই রে এখন চাচ্চু কে কি করে বলি যে আব্রাহাম চৌধুরীর পিএ এর কাজ। আর আব্রাহাম সেইদিন বাড়িতে এসে যা করে গেছেন তারপর তো বলাই যাবে না (মনে মনে)

ইকবাল;; কিরে বল?!

আইরাত;; আব.. চাচ্চু আসলে অফিসে একটা স্টাফের পোস্ট খালি ছিলো তো তাই আমি জয়েন করে নিয়েছি। স্যালারিও ভালোই।

ইকবাল;; ওহহ আচ্ছা তো অফিসের নাম কি?

আইরাত;; হ্যাঁ 😧?

ইকবাল;; হ্যাঁ বল অফিসের নাম কি?

আইরাত;; না মানে আসলে….

কলি;; এই কই গো তুমি খাবার ঠান্ডা হচ্ছে যে… (চিল্লিয়ে)

ইকবাল;; এইযে শুরু হয়েছে তোর চাচির। আচ্ছা মা শোন তুই দেখে শুনে সাবধানে যাস৷ আর মা আমাকে পারলে মাফ করে দিস।

আইরাত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷ বলার কিছুই নেই তার। তার চাচ্চু এই কথা টা তাকে প্রায়ই বলে। আর এই কথা টা শুনে আইরাত আগে তার চাচ্চু কে বাধা দিতো কিন্তু এখন দেয় না। এটা শুনলে এখন শুধু আইরাতের ভেতর থেকে এক দম বের হয়। আইরাত মুচকি হেসে বিদায় জানিয়ে বাইরে এসে পরে। ঘুম থেকে আজ তাড়াতাড়ি উঠতে পারে নি। ১০ টায় যাবার কথা ছিলো কিন্তু এখন বাজছে ৯ঃ৫৫। রিকশা করে যাচ্ছে আর বারবার নিজের হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। প্রথম দিনই এতো লেট। আব্রাহাম আজ তাকে গিলেই না ফেলে কাচা৷ দেখতে দেখতে এক সময় আইরাত আব্রাহামের অফিসের সামনে এসে থামে। আইরাত মাথা তুলে ওপরে তাকিয়ে দেখে ইয়া বড়ো বড়ো অক্ষরে লিখা ‘” The Industry Of Abraham Ahmed Chowdhury “” আইরাত সেদিকে তাকিয়ে এক লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ে। এখানে তো যাচ্ছে না জানি সামনে কি কি ফেইস করতে হবে তাকে। আইরাত বেশ সাহস জুগিয়ে চলে যায় ভেতরে। তবে অফিসের ভেতরে গেতেই আইরাত অবাক হয়। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে আইরাত দেখে দুই পাশে বেশ কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একমাত্র তাকে স্বাগতম জানানোর জন্য। আইরাত চোখ বড়ো বড়ো করে দেখছে। আর বাকি সবাইকেও দেখছে। অফিসে অনেক মেয়ে স্টাফ তারা সবাই পেন্ট আর শার্ট সাথে টাই। এতো এতো মর্ডান ড্রেসাপের মাঝে আইরাত নিজেই মনে হয় একা গোল জামা পরে আছে। আর চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া। সবাই আইরাতকে ম্যাম বলে সম্বোধন করছে কিন্তু আইরাত বুঝতে পারছে না যে ম্যাম বলার কি দরকার৷ সবাই আইরাতকে ফুলের তোড়া দিচ্ছিলো তখনই অফিসের মেনেজার এগিয়ে আসে।

মেনেজার;; মিস. আইরাত। আপনাকে অনেক অনেক স্বাগতম।

আইরাত;; জ্বি ধন্যবাদ।

মেনেজার;; আপনার জন্যই আমরা এতোক্ষন অপেক্ষা করে ছিলাম, অবশেষে আপনি এলেন।

আইরাত;; জ্বি

মেনেজার;; ভেতরে আসুন।

সবাই সাইড হয়ে দাড়ালে আইরাত ভেতরে আসে। মেনেজার আইরাতকে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে আর কথা বলছে। আইরাতকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছে। কি করতে হবে কি না করতে হবে। অফিসের কিছু বেসিক রুলস গুলো আইরাতকে জানিয়ে দেয়। আইরাত বেশ ভালো করে তা শুনে। হাটতে হাটতে মেনেজার আইরাতকে আব্রাহামের কেবিনের সামনে এনে দাড় করিয়ে দেয়।

মেনেজার;; সো মিস. আইরাত এটাই হচ্ছে আব্রাহাম স্যারের কেবিন। আজ থেকে আপনি উনার পিএ। প্লিজ খেয়াল রাখবেন যেন কিছু গড়বড় না হয়। স্যার অনেক বেশির থেকেও বেশি রাগি৷ আমি এবার আসি৷

আইরাত;; জ্বি

আইরাত আব্রাহামের কেবিনের দিকে তাকায়। কেমন জানি নারভাস লাগছে। কিছু শুকনো ঢোক গিলে আইরাত ভেতরে যায়। ভেতরে যেতে ধরেই আবার থেমে যায়। আরে পারমিশন তো নিতে হবে নাকি। আর এখন থেকে তো আব্রাহামকে তার স্যার বলেই ডাকতে হবে। এই ভেবেই আইরাত একটু বিরক্তি হয়।

আইরাত;; May i come in sir…?

_________________________

আইরাত;; May i come in sir…?

আইরাত কয়েকবার ডাক দিয়েও কোন সাড়াশব্দ পায় না। এক সময় আইরাত বিনা পারমিশনেই ভেতরে ঢুকে যায়। ভেতরে যেতেই দেখে কেবিন ফাকা কেউ নেই। আইরাত কপাল কুচকায়। এখানে কেউ নেই কেন। তখন আব্রাহাম ফোনে কথা বলতে বলতে এক সাইড থেকে কেবিনের একদম মাঝ বরাবর আসে৷ আইরাত কে দেখে আব্রাহাম মুচকি হাসে। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে দেয়। আইরাতকে পা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত এক নজর দেখে নেয়। আইরাতও আব্রাহাম কে দেখে। ব্লেক কালারের পেন্ট পরা, ব্লেক কালারের শার্ট আর ওপরে একদম হাল্কা গ্রিন কালারের জেকেট। তার হাতা কুনি অব্দি উঠানো। তবে আজ কেন যেন আব্রাহাম কে একটু বেশিই রিফ্রেশ রিফ্রেশ লাগছে। হাতে ঘড়ি, মুখের চাপদাড়ি গুলো ফর্সা মুখে যেন দারুণ মানিয়েছে।

আব্রাহাম;; গুড মর্নিং…!

আইরাত;; গুড মর্নিং

আব্রাহাম;; ওও হ্যালো আমি তোমাকে গুড মর্নিং উইস করছি না। বলছি যে অফিসের বস কে সকাল সকাল গুড মর্নিং উইস করতে হয়। তা কি জানো না। এরপর থেকে অফিসে এসে আমার জন্য রোজ এক কাপ কফি আনবে আর সাথে মর্নিং উইস করবে ওকে।

আইরাত;; মানে আসতে না আসতেই অর্ডার শুরু?

আব্রাহাম;; হ্যাঁ, এবার এটা নাও।

আব্রাহাম তার গাড়ির চাবি টা আইরাতের দিকে হালকা ঢিল দেয় আর আইরাত কাপাকাপা হাতেই তা ধরে ফেলে। আব্রাহাম সুন্দর সিটি বাজাতে বাজাতে চলে যায়। আইরাত হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। আব্রাহাম তার চেয়ারে গিয়ে রিলেক্স করে বসে পরে। আইরাত চোখ নামিয়ে কেবিন থেকে চলে আসতে নিলে আব্রাহাম আবার বলে ওঠে….

আব্রাহাম;; ওও হ্যালো মিস. বেবিগার্ল…!

আইরাত পেছন ফিরে তাকায়…

আব্রাহাম;; কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?!

আইরাত;; মানে আমি আমার কেবিনে যাবো না!

আব্রাহাম;; মিস আইরাত আপনার কেবিন যে এই কেবিনের বাইরে তা আপনাকে কে বলেছে?

আইরাত;; হুয়াট ডু ইউ মিন?

আব্রাহাম;; আপনার কেবিন এদিকে আর এইটা।

আব্রাহাম ইশারা দিয়ে আইরাতকে নিজের পাশে দেখায়। আইরাত তাকিয়ে দেখা যে আব্রাহামের ঠিক বাম সাইডে একটা ছোট কেবিনের মতো রয়েছে। তবে সিম্পলের মাঝেও বেশ সুন্দর। কাচের তৈরি। সেখানে কিছু ফাইল আছে। একটা ল্যাপটপ আছে। একটা কফির মগ আছে যেখানেও ছোট্ট করে ‘পিএ’ লিখা। মানে সে এখন আব্রাহামের চোখের সামনে থাকবে, মানে তার থাকতে হবে। আইরাতের কেবিন টা আব্রাহামের কেবিনের ভেতরেই৷ হায় আল্লাহ আইরাতের মাথা নষ্ট হবার অবস্থা। আইরাত টাস্কি খেয়ে তাকিয়ে আছে। আর আব্রাহাম আইরাতের দিকে। আইরাতের এমন রিয়েকশন টা দেখে আব্রাহাম তো ভারি মজা পাচ্ছে। আইরাত ধীর পায়ে তার সেই ছোট কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়। আইরাত সবকিছু A-Z দেখে নেয়। মানে তাকে এখন আব্রাহামের চোখের সামনে থেকে কাজ করতে হবে।

আইরাত;; শুনুন আমি পারবো না, আপনি আমার কেবিন মেনেজার কে বলে বাইরে কোথাও শিফট করিয়ে দিন। এছাড়া বেলার অর্ধেক তো আপনার পিএ হয়েই কাটিয়ে দিতে হবে। এখন আমি আপনার নজরের ভেতরে থাকতে পারবো না। আমি বাইরে থাকবো। আমার কেবিন বাইরে শিফট করে দিন।

আইরাত তার কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কথা গুলো বলছিলো। এইদিকে আব্রাহাম যে আইরাতের ঠিক একদম পেছনে এসে পকেটে দুই হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে। তার দিকে আইরাতের কোন খেয়ালই নেয়। আইরাত পেছন ঘুড়ে তাকায় আর সাথে সাথে চমকে যায়। আব্রাহামকে নিজের এতো কাছে দেখে ভেবাচেকা খেয়ে যায়।

আব্রাহাম;; এখানে থাকবে না?

আইরাত;; না।

আব্রাহাম;; থাকবে না এখানে?

আইরাত;; না।

আব্রাহাম;; থাকবে না?

আইরাত;; বললাম তো না।

আব্রাহাম এক পা এক পা করে আইরাতের দিকে এগোতে এগোতে এই কথা গুলো বলছিলো আর আইরাত ধীরে ধীরে পেছাচ্ছে আর কথা গুলো বলছে। শেষের কথা টা বলেই আইরাতের পেছনে কাচের দেওয়াল ঠেকে যায়। আইরাত পেছনে তাকিয়ে দেখে যাবার আর জায়গা নেয়। পিঠ তার ঠেকে গেছে দেওয়ালের সাথে। আব্রাহাম এখনো আইরাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আইরাত মাথা নিচু করে এক সাইড দিয়ে যেতে ধরে আব্রাহাম তার হাত টা দেওয়ালের ওপর রেখে আইরাতকে আটকিয়ে দেয়। আইরাত কপাল কুচকে ফেলে। আরেক দিক দিয়ে যেতে ধরে আব্রাহাম সেদিক দিয়েও আইরাতকে আটকিয়ে দেয়। আইরাত এখন আব্রাহামের দুই হাতের আবদ্ধে বন্দী।

আব্রাহাম;; ওই মূহুর্তে আমি কখন যে নিজের ওপর থেকে কোন্ট্রল হারিয়ে ফেলবো জানি না। উল্টা পালটা যদি কিছু একটা করাতে না চাও আমার দ্বারা তাহলে এখন চুপচাপ গিয়ে সেখানে বসো বেবিগার্ল৷

আইরাত;; এহ!

আব্রাহাম;; হ্যাঁ।

আইরাত কেন জানি আব্রাহামের সেই চোখ গুলোতে তাকিয়ে থাকতে পারে না। তাই মাথা নামিয়ে ফেলে। সামনের কিছু অবাধ্য চুল আইরাতের সামনে এসে পরলে আব্রাহাম সেই চুল গুলো ফু দিয়ে আরো একটু এলো মেলো করে দেয়। আইরাত তা হাত দিয়ে কানের পেছনে নিয়ে নেয়। আব্রাহাম এখনো নিজের হাত গুলো দিয়ে আইরাতকে চেপে ধরে রেখেছে দেওয়ালের সাথে। কিছুক্ষন এভাবে থেকে আব্রাহাম নিজেই সোজা হয়ে দাড়ায়।

আব্রাহাম;; কাজে লেগে পরো মিস. পিএ।

আব্রাহাম গিয়ে ল্যাপটপে মনোযোগ দেয়। আর আইরাতের কেন জানি আব্রাহামের এতো কুল ভাব দেখে রাগ লাগছে তবুও করার কিছুই নেই। আইরাত আস্তে আস্তে সব বুঝে শুনে কাজ করছে। তবে কাজ করছে কম আর তাকে আব্রাহাম জ্বালাচ্ছে বেশি। একটা না একটার পর কাজ দিতেই থাকে। আইরাত এটা করো, ওটা করো, সেটা করো। আইরাত যখন কাজ করে তখন তার মনে হয় যে আব্রাহাম তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কিন্তু আব্রাহামের দিকে তাকালে দেখে যে সে কাজ করছে। তবে আব্রাহাম আসলে নিজের সামনে থাকা আইরাতকেই দেখেছে আর ল্যাপটপে প্রিন্টের মাধ্যমে তার স্কেচ আকছে। ক্ষীন দৃষ্টিতে আইরাতকে দেখেছে,, হাতে একটা পেন্সিল ঘোড়াচ্ছে আর স্কেচ আকাচ্ছে তার। তবে আইরাত তো ভাবছে যে আব্রাহাম কাজই করছে।


ওদিকে রায়হান বরাবরই তার কোম্পানির সাথে আব্রাহামের কোম্পানির টক্কর দেবার ট্রায় করে কিন্তু তার সাথে পেরে উঠে না। যার ফলে বেস্ট বিজনেস টাইকুনের এয়ার্ড টা প্রতিবার আব্রাহামই অর্জন করে নেয়। আজ রায়হান আইরাতের ভার্সিটি গিয়েছিলো কাজে। সেখানেই সে আইরাতকে দেখে। এখন রায়হান বসে আছে তার অফিসে “রায়হান আহমেদ”স্ কোম্পানি”। কীভাবে আব্রাহামকে হেনস্তা করা যায় তাই ভাবছে।

রায়হান;; ছেড়ে তো আমি তোকে এতো সহজে দেবোই না আব্রাহাম। তোর সাথে শত্রুতা আমার ছিলো,আছে আর থাকবেই। দেখ না সামনে আরো কি কি করি আমি। যে জিনিসেই হাত দেই তাতেই তোকে পাই। তুই আমার জীবনের আপদ। কিন্তু তুই ই যে কেন বেস্ট হোস। যাই হোক আজ নজর আরেক জনের ওপর পরেছে আমার। তাতেও তুই। সমস্যা নেই ছিনিয়ে নিবো আমি। আব্রাহাম আহমেদ চৌধুরী দেখে নেবো তোকে।

এদিকে আব্রাহাম কাজ করছে। একটা বড়ো ডিল এসেছে। এটা মিস করাই যাবে না। আর এই কাজের জন্য হয়তো তাকে বাইরে যেতে হবে। যেতে হলে যাবে।
তবে সমস্যা হচ্ছে সেখানে রায়হানও যাবে। এটা ভেবেই আব্রাহামের রাগ লাগছে। মানে সেখানেও এই রায়হান থাকবে তাকে ফেইস করতে হবে। বিরক্তিকর। পরক্ষণেই আব্রাহামের মনে পরে আইরাতকেও নিয়ে যাবে। কিন্তু তখন যে কি হবে তা সিচুয়েশনের ওপর ডিপেন্ড করে।





চলবে~~