#নেশাক্ত_ভালোবাসা
#লেখিকাঃ Tamanna Islam
#পর্বঃ ০৪
অয়ন, রহিত আর আব্রাহাম অফিস থেকে বের হয়ে সোজা আব্রাহামের গেস্ট হাউজ “” গ্রিনসিটি “” তে চলে যায়। এবার ভাবতে থাকে যে কে কি করবে। কারণ রহিতের মুখ থেকে শোনা যায় যে আরুশির বাবা খুব বেশি বদমেজাজি একজন। আর আরুশির ফ্যামিলি অনেকটাই বড়ো। আরুশির সাথে লুকিয়ে চুড়িয়ে কথা হয়েছে রহিতের। বিয়ে বাড়ি অনেক তোড়জোড় ভাবে সাজানো হয়েছে।
রহিত;; আচ্ছা এখন কি করবো?
আব্রাহাম;; আরুশিকে যেভাবেই হোক এখানে আনতে হবে।
রহিত;; এটা অসম্ভব, কারণ সেখান থেকে বের হতে গেলে কারো না কারো কাছে সে ধরা খাবেই খাবে।
আব্রাহাম;; তাহলে ওকে বিয়ে বাড়ি থেকে ভাগিয়ে আনতে হবে এছাড়া আর কোন উপায় নেই।
অয়ন;; কিন্তু কীভাবে?
আব্রাহাম;; কৌশল কে ফোন লাগা।
অয়ন;; ওকে।
অয়ন দ্রুত কৌশল কে ফোন করে জরুরি ভাবে ডাকে। আর কৌশল তার বেশ কিছুক্ষন পর এসেও পরে।
আব্রাহাম;; এবার আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন। আরুশিকে এখানে আনতে হবে। কারণ ওকে একা পালিয়ে আসতে বললে ও পারবে না।
কৌশল;; তাহলে কি তুই যাবি নাকি বিয়ে বাড়িতে..!
অয়ন;; কিহহ, মাথা খারাপ হয়েছে তোর। আব্রাহাম যাবে ওমন লোকাল বিয়ে বাড়িতে। দুই মিনিটে আবার মিডিয়ার লোকজন সব চলে না আসে।
আব্রাহাম;; আমি আর রহিত এখানেই থাকবো। কারণ আরুশির ফ্যামিলি রহিত কে চিনে, যদি দেখে ফেলে তো আর বিয়ে করে কাজ নেই। সো অয়ন তুই আর কৌশল তোরা দুইজন যাবি বুঝতে পেরেছিস।
কৌশল;; আচ্ছা গেলাম। তারপর কি করবো?
আব্রাহাম;; শোন………………………….
আব্রাহাম অয়ন আর কৌশল কে সব কিছু এক এক করে বুঝিয়ে বলতে লাগলো। কোন ভাবে যেন কোন প্রব্লেম ফেইস না করতে হয়। যা যা লাগে সব নিয়ে নিলো তারা। আর এদিকে রহিত আরুশিকে ফোন করে বলে যে তার বিয়ে এটা হবে না। রহিত সব ব্যাবস্থা করেছে। এতে যেন আরুশির মনে একটু শান্তি আসে। আব্রাহাম অয়নের হাতে তার জিপের চাবি দিয়ে দিলো। সব কিছু নিয়ে প্ল্যান অনুযায়ী অয়ন আর কৌশল জিপ নিয়ে আরুশির বাড়ির দিকে চলে গেলো।
।
।
এদিকে দিয়া আর আইরাতের ভার্সিটি শেষ। এখন ভার্সিটির বাইরে বের হচ্ছে আর কথা বলছে৷
দিয়া;; কিরে আজ কি প্ল্যান আছে তোর?
আইরাত;; তেমন কোন প্ল্যান নেই। এখন এখান থেকে সোজা বাড়ি যাবো কিছুটা রেস্ট নেবো আর তারপর হোটেলে চলে যেতে হবে। অনেক কাজ আছে।
দিয়া;; তা আর করতে হবে না।
আইরাত;; মানে?
দিয়া;; মানে এই যে এখন তুই আমার সাথে থাকবি। শোন আজ আমার একটা কাজিনের বিয়ে বুঝলি।
আইরাত;; তোর কাজিন? কোনদিন তো শুনলাম না।
দিয়া;; আরে আমার দূর সম্পর্কের আত্নীয় লাগে। কিন্তু যেই কাজিনের বিয়ে সে অনেক ভালো আর আমার সাথেও ভালোই। নাম আরুশি।
আইরাত;; ওহহ আচ্ছা।
দিয়া;; আর আমি তো সেখানে তেমন কাউকেই চিনি না শুধু আরুশি আপু আর তার বাবা মা কে ছাড়া। সেখানে একা একা ঘুড়তে হবে তাই আমি তোকে আমার সাথে নিয়ে যাবো।
আইরাত;; না আমার অনেক কাজ রে তুই চলে যা।
দিয়া;; ধুরু, আরে তোর কাজ করতে হবে না। আমি চাচ্চু কে বলেছি যে বিয়েতে আমি আইরু কে সাথে নিয়ে যাচ্ছি। আর চাচ্চু দ্বিতীয় কোন কথাই বলে নি। আর বাড়িতে ফোন করে বলবি যে তুই কাজে আছিস ব্যাস।
আইরাত;; কিন্তু..
দিয়া;; চুপ কর কোন কিন্তু পারান্তু না। যাবি মানে যাবি আমার সাথে।
দিয়া যেন এক প্রকার খামছে ধরলো আইরাতকে। আইরাত আর না পেরে হ্যাঁ ই বলে দিলো। ভার্সিটি শেষে আইরাত সোজা দিয়ার সাথে তার বাড়ি চলে যায়। দিয়া রেডি হয় একদম শাড়ি টাড়ি পরে। আইরাতকেও অনেক বলে কিন্তু প্রথমত আইরাত শাড়ি সামলাতে পারে না আর দ্বিতীয় সে ওলয়েজ নরমাল গেটাপে থাকতেই পছন্দ করে।
বিকেলের দিকে দিয়া আর আইরাত রওনা দেয় বিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে। আর বিয়ে হলো রাতে। প্রায় এক ঘন্টা লাগলো এই বিয়ে বাড়িতে গেতেই। আইরাত আর দিয়া গিয়েই একটু ঝটকা খায়। অনেক বড়ো সড়ো করেই সাজানো হয়েছে। আর মানুষের কথা নয় বাদই দিলাম।
আইরাত;; বইন এই কোথায় নিয়ে এলি তুই আমায়? (দিয়ার কানে কানে ফিসফিস করে)
দিয়া;; আমি নিজেও বুঝতে পারছি না যে কোথায় এলাম।
দিয়ার কথা বলা শেষ হতে না হতেই একজন মহিলা “দিয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া” বলে চিল্লিয়ে দিয়ার কাছে আসে, তাকে জড়িয়ে ধরে। আইরাত ভয় পেয়ে কিছুটা পিছিয়ে যায়। দিয়া মুখ কে ভেটকিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে৷
কুসুম বেগম (আরুশির মা);; দিয়া মা কেমন আছিস? কত্তো দিন দেখি না তোমায়। কত্তো বড়ো হয়ে গেছো গো।
দিয়া;; জ্বি জ্বি আন.. আন্টি।
কুসুম;; ওমা এই মেয়েটা কে গো? (আইরাতের উদ্দেশ্যে)
দিয়া;; আন্টি আমার বেস্টফ্রেন্ড। আসলে আমার বোনই।
কুসুম;; বাহহ, ভারি মিষ্টি মেয়ে তো (আইরাতের থুতনিতে ধরে)
আইরাত কিছু বলে না। তার এই মূহুর্তে প্রচুর হাসি পাচ্ছে। তবুও মুচকি হাসে। আইরাত বুঝলো যে আরুশির মা অনেক রশিক প্রকৃতির একজন। ঠিক তখনই একজন লোক তার দুই হাত পেছনে ভাজ করে গম্ভীর মুখ নিয়ে আরুশির মায়ের পেছনে আসে।
আতাউর (আরুশির বাবা);; কি দিয়া নাকি। (ভারি গম্ভীর গলায়)
দিয়া;; জ্বি আংকেল।
আতাউর;; হুমমম, তা কেমন আছো?
দিয়া;; জ্বি আংকেল ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
আতাউর;; হ্যাঁ ভালো। তুমি কে?
আইরাত;; আ….
দিয়া;; আমার বোন।
আতাউর;; বোন?
দিয়া;; আমার আরেক চাচার ঘরের মেয়ে।
আইরাত এখন পারে না দিয়ার অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে। মুখ টিপে হাসছে দেখে দিয়া চিমটি কাটে আইরাতকে। আর আইরাত গলা খাকাড়ি দিয়ে চুপ হয়ে যায়৷
কুসুম;; আহহ, আসতে না আসতেই শুরু হয়ে গেছে তোমার। চুপ করো। দিয়া আর আইরাত মা তোমরা আরুশির ঘরে যাও। আরুশি তার রুমেই আছে। যাও দেখা করো।
দিয়া;; জ্বি আচ্ছা আন্টি৷
দিয়া আইরাতের হাত ধরে সিড়ি বেয়ে আরুশির রুমে চলে যায়। আর এতোক্ষণে আইরাত কিটকিট করে হেসে দেয়। আইরাতের এমন অদ্ভুত রকমের হাসি দেখে দিয়াও হেসে দেয়।
আইরাত;; এই তোর কাজিনের বাবা-মা। আল্লাহ দুই মিনিট এদের কাছে থাকলে আমি পাগল হবো। না জানি তোর বোন কেমনে থাকে 🤣।
দিয়া;; আস্তে হাস লোকে এমনিতেও পাগল বলবে। ভেতরে চল।
দিয়া আর আইরাত ভেতরে গেলো। গিয়েই দেখে আরুশি রেডি হচ্ছে। মেয়েরা তাকে রেডি করাচ্ছে কিন্তু আরুশির মুখে হাসির ছিটেফোঁটাও নেই। আর তা আইরাত খেয়াল করে। তবে আয়নাতে দিয়া কে দেখতেই আরুশি খুশি হয়ে যায়।
আরুশি;; দিয়া, এসেছিস তুই।
দিয়া;; আসলাম।
আরুশি;; কেমন আছিস?
দিয়া;; তোমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ভালো আর রইলাম কোথায়?
আরুশি;; ছেলে দেখতে বলবো তোকেও বিদায় দিয়ে দেই।
দিয়া;; এই না।
আরুশি;; তুমি দিয়ার সেই ফ্রেন্ড না..?(আইরাতের উদ্দেশ্যে)
দিয়া;; আরে সবাইকে বলেছি বোন হয় আমার।
আরুশি;; হ্যাঁ তো ঠিকই তো। আইরাত নাম তাই না।
আইরাত;; জ্বি আপু।
আরুশি;; কেমন আছো?
আইরাত;; জ্বি ভালো। আপনি কেমন আছেন?
আরুশি;; হ্যাঁ ভালোই।
এভাবেই কথা হতে থাকে। আস্তে আস্তে আরুশির সাথে আইরাত বেশ মিলেমিশে গেলো। দিয়া তো তুমি করে বলে তাই আইরাতকেও তুমিই বলতে হবে। তবে কথার ছলে আইরাত খেয়াল করলো যে আরুশি হয়তো ভালো নেই।
আইরাত;; আপু একটা কথা বলো তো?
আরুশি;; কি?
আইরাত;; তুমি এই বিয়েতে খুশি তো?
এবার যেন আর আরুশি থাকতেই পারলো না। চোখ দিয়ে আপনা আপনি পানি গড়িয়ে পরলো। দিয়া তো বেশ অবাক।
আরুশি;; ভালোবাসি একজন কে আর বিয়ে হতে যাচ্ছে আরেক জনের সাথে। খুশি থাকি কীভাবে।
দিয়া;; মানে কি আপু তুমি তো আমায় কখনো বললে না?
আরুশি;; কি আর বলবো বল। বাবা রাজি না কত্তো ঝামেলা হয়েছে তুই জানিস।
আইরাত;; তো তুমি যাকে ভালোবাসো তাকে বলো নি।
আরুশি;; ফোন করেছিলো বলেছে বিয়ে সে হতে দিবে না।
দিয়া;; এখন?
আরুশি;; জানি না কিছুই। শুধু যা হচ্ছে হতে দিচ্ছি।
আইরাত;; আচ্ছা চিন্তা করো না কিছুই হবে না।
যদিও আরুশির মুড অনেক বেশি খারাপ তবুও আইরাত আর দিয়া মিলে আরুশির মুড ভালো করার চেষ্টা করছে।
।
কৌশল আর অয়ন আরুশির বাড়ির সামনে এসে পরে। রহিত তাদের বাড়ির এড্রেস দিয়েছিলো তারা সেই এড্রেস অনুযায়ী ই এসে পরে। আর আসতেই যে বড়ো বিয়ে বাড়ি দেখে তাতে এমনিতেই বুঝা যাচ্ছে যে এটা বিয়ে বাড়ি।
অয়ন;; এসে তো পরলাম এখন কি?
কৌশল;; এখন আগে যে কোন ভাবেই হোক জিপ টাকে পার্ক করে একটা জায়গায় রাখতে হবে। যেন কারো চোখে না পরে।
অয়ন জিপ থেকে নেমে পরে আর কৌশল কিছুটা দূরে গিয়ে সেটা পার্ক করে দেয়। যেন আরুশিকে নিয়ে তারা যখন বাইরে বের হবে তখন যেন খুব ইজি ভাবেই জিপ টার কাছে চলে যাওয়া যায়। অয়ন আর কৌশল নরমাল গেটাপেই ভেতরে যায়। আর যেই তাদের জিজ্ঞেস করছে তাদের বলছে যে ফ্রেন্ডের বিয়ে।
অয়ন;; এই তোর হাতে কি রে?
কৌশল;; ক্লোরোফোম। (অজ্ঞান করার মেডিসিন)
অয়ন;; কি এটা কেন এনেছিস তুই। আরে মেয়ে কে কিডন্যাপ করছি না আমরা। শুধু এখান থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি। আরুশি ভালোবাসে রহিত কে। এমনিতেই এসে পরবে।
কৌশল;; আরে কখন কি হয় বলা যায় না। আরুশির যে বাপ শালায় যদি দেখে ফেলে তাহলে কাপড়ে করে এই মেডিসিন নিয়ে ওর নাকে-মুখেই চেপে ধরবো। কম খাটাচ্ছে না কি হতো যদি ভালোভাবে মেনে নিতো?!
অয়ন;; আচ্ছা হয়েছে এবার চল।
অয়ন আর কৌশল এমন একটা ভাব করছে যে তারা এই বাড়িরই মানুষ। অয়ন তো এমন এক্টিং করছে যে বলার বাইরে। একজন দাদি টাইপ মহিলা অয়ন কে কিছুটা সন্দেহ করেছিলো। তারা যাতে ধরা না খায় এর জন্য অয়ন “” দাদি আম্মায়ায়ায়ায়ায়া “” বলে চিল্লিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো সোজা। বয়স্ক মহিলা টি ভেবাচেকা খেয়ে গিয়েছিলো। তাই সেখান থেকে দ্রুত চলে আসে। অয়ন আর কৌশল খুব কষ্টে খুঁজে খুঁজে আরুশির রুম বের করে ফেলে। দেখে তিনজন জন মেয়ে বসে আছে। আরুশিকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে যে সেই বউ। দরজার আড়ালে অয়ন আর কৌশল দাঁড়িয়ে আছে।
অয়ন;; ওই দেখ ওইযে আরুশি বসে আছে।
কৌশল;; হুমম দেখেছি।
অয়ন;; শোন যা করতে হবে খুব সাবধান বুঝলি। আর এভাবে কাজ হবে না।
কৌশল;; তো?
অয়ন;; এক কাজ কর।
কৌশল;; কি?
অয়ন;; আমরা তো বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে এসেছি তাই না। তাহলে বাড়ির পেছনে দরজা টা অবশ্যই দেখেছিস। এক কাজ কর বাড়ির মেইন সুইচ অফ করে দে।
কৌশল;; কি?
অয়ন;; হ্যাঁ, কারণ বাড়িকে এরা রাতের বেলাতেই দিন বানিয়ে রেখে দিয়েছে যে আলো বাপ রে বাপ। এখন যদি বউ কে নিয়ে যেতে হয় তাহলে সবার অগোচরেই নিয়ে যেতে হবে। আর রহিত তো আরুশিকে ফোন করে জানিয়েই দিয়েছে। কোন প্রব্লেম হবে না। বাড়ির পেছনেই তো মেইন সুইচ থাকে তাই। তুই গিয়ে সুইচের মিটার ডাউন করে দে। আর বাড়ির সুইচ বন্ধ করলে সবার নাকের নিচ থেকে আমরা নিয়ে যেতে পারবো৷ কাজ টা সুবিধের হবে।
কৌশল;; ধন্য ধন্য আমি ধন্য ভাই। এতো বুদ্ধি নিয়ে ঘুমাস কেমনে।
অয়ন;; আব্বে ওও পাম কম মার যা বলছি তাই কর। দ্রুত যা।
কৌশল;; আচ্ছা।
কৌশলের হাতে একটা ছোট ব্যাগ ছিলো। তাতেই সব কিছু রয়েছে। কৌশল ব্যাগ টা অয়নের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে চলে যায় বাড়ির পেছনে মেইন সুইচ অফ করতে। আর অয়ন আরুশির দরজা থেকে কিছুটা দূর দাঁড়িয়ে আছে।
।
আরুশি, আইরাত আর দিয়া হেসে হেসে অনেক কথা বলছে। হঠাৎ আরুশি বলে ওঠে…
আরুশি;; আব.. দিয়া শোন না। ওই রুমে টেবিলের ওপর আমার ফোনটা চার্জে লাগানো আছে। প্লিজ একটু নিয়ে আয় না।
দিয়া;; যাচ্ছি।
দিয়া অন্য রুমে চলে যায় ফোন আনতে। আর আইরাত আরুশির কানের দুল টা ঠিক করে দিচ্ছে। অয়ন একটু উকি দিয়ে দেখে আরুশি বউ সেজে সেকখানেই বসে আছে। কিছুক্ষন পর দিয়ার ডাক আসে৷
দিয়া;; আরুশি আপু আমি পাচ্ছি না, কোথায় ফোন?
আরুশি;; আরে টেবিলের ওপরই তো রাখা আছে।
দিয়া;; ধুর ছাই আমি পাচ্ছি না তো।
আরুশি;; আগের মতোই অকর্মা আছিস।
দিয়া;; কিইইই?
আরুশি;; তোর মাথা আমি আসছি। দাড়া একটু। আইরাত তুমি এখানে বোস একটু আমি আসছি কেমন।
আইরাত;; আচ্ছা আপু।
আরুশি দিয়ার কাছে চলে যায়। আর আইরাত সেখানে বসে পরে। তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরই দুম করে কারেন্ট চলে যায়। অর্থাৎ পুরো বাড়ির মিটার ডাউন। চারিদিকে কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার ছেয়ে গেলো। আর কেমন একটা গা ছমছমে ভাব। বাড়ির মানুষের কথা চারিদিকে বাজছে। কারেন্ট গেতেই অয়ন বুঝলো কৌশল গিয়ে মেইন সুইচ অফ করে দিয়েছে। ব্যাস যেই পুরো বাড়িতে কারেন্ট গিয়েছে তখন অয়ন সোজা আরুশির রুমে চলে যায়। গিয়েই সামনে থাকা মানুষের শক্ত ভাবে মুখ চেপে ধরে। অনেক ছটফট করছে, নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু ছাড়া পাচ্ছে না। অয়ন কিছু বুঝছে না যে আরুশি এতো ছটফট কেন করছে। নাকি সে ভয় পাচ্ছে। তাই অয়ন কানের কাছে গিয়ে বলে ওঠে…
অয়ন;; ভয় পেয়ো না আরুশি আমি অয়ন। রহিতের কাছে নিয়ে যেতে এসেছি।
অয়নের এই কথা বলার পরও অনেক বেশি ছুটাছুটি করছে। এভাবে থাকলে ধরা পরে যাবে। অবশেষে আর কোন উপায় না পেয়ে অয়ন ক্লোরোফোম টা তার মুখের সামনে স্প্রে করে দেয়। মূহুর্তেই শান্ত হয়ে যায় ছটফট করতে থাকা মানুষ টা। অয়ন কোন রকমে সবার চোখের আড়ালে রুম থেকে তাকে বের করে আনে। তখন কৌশলও এসে পরে। কিছুটা ধরাধরি করে আর লুকিয়ে চুড়িয়ে একদম বাড়ির বাইরে এসে পরে। বাড়ির ভেতরে এখনো কারেন্ট আসে নি। তাই অনেক কোলাহল চলছে। অয়ন আর কৌশল তাড়াহুড়ো করে বাইরে বের হয়ে পরে। যেন বাড়ির বাইরে আসলেই তারা প্রাণে বাচে। তবে কৌশল যখন বাড়ির মেইন সুইচ অফ করতে এসেছিলো তখন একটা বুদ্ধিমানের কাজ করছে জিপ টা এনে সোজা সামনে রেখে দিয়ে গিয়েছিলো। তাই অজ্ঞান করে তাকে ভেতর থেকে নিয়ে বাইরের আসার সাথে সাথেই জিপের পেছন সীটে আস্তে করে বসিয়ে দেয়। তখনই দেখে যে হাতে লাইট নিয়ে কিছু লোক এইদিকে আসছে।
অয়ন;; এই রে ওরা তো এইদিকেই আসছে রে।
কৌশল;; শোন না আমি না একটা কাজ করে ফেলেছি তাড়াহুড়োয়।
অয়ন;; কি করেছিস?
কৌশল;; বাড়ির মিটার টা এতো জোরেই টান দিয়েছি যে ওটা না কিছুটা ভেংে নড়বড়ে হয়ে গেছে। ঠিক করার জন্য লোক আনতে হবে।
অয়ন;; তাতে আমাদের কি আমাদের কাজ তো হয়েছে নাকি।
কৌশল;; এই দেখ লোক গুলো এইদিকেই আসছে।
অয়ন;; শোন শোন আরুশির মুখ টা ঢেকে দে জলদি। দেখে ফেললে সর্বনাস।
কৌশল একটা সাদা কাপড় দিয়ে মুখ টা দ্রুত ঢেকে দেয়। এছাড়াও ভেতরে বাইরে সব ঝাপসা অবস্থা।
লোক গুলো যখন অয়ন আর কৌশলের পাশ কেটে যাচ্ছিলো তখন তারা এমন একটা ভাব ধরে যে তারা গল্প করছে৷ পরে লোকগুলোর চলে যেতেই অয়ন আর কৌশল ঘোড়ার বেগে ছুটে জিপে উঠে বসে পরে। তারপর সোজা আব্রাহামের গেস্ট হাউজে চলে যায়। সেখানেই আব্রাহাম আর রহিত আছে। অয়ন আর কৌশল খুশিও হচ্ছে আর সাথে কিছুটা নারভাসও। কেননা এই প্রথম তারা এমন কোন কাজ করলো। প্রায় আধাঘন্টা পর তারা গেস্ট হাউজে চলে আসে। বেশ দ্রুত এসেছে তারা। গেস্ট হাউজের সামনে এসেই তারা জিপ থামায়। তারপর আবার আরুশিকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়। রহিত করিডরে দাঁড়িয়ে ছিলো। নিচে তাকিয়ে দেখে যে অয়ন আর কৌশল এসে পরেছে। রহিত দৌড়িয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়।
রহিত;; আব্রাহাম এসে গেছে ওরা।
আব্রাহাম;; দরজা খুলে দে।
দরজা খুলে দাড়াতেই অয়ন আর কৌশল ভেতরে আসে। তারপর আরুশিকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
অয়ন;; নে ভাই তোর জীবন এনে দিয়েছি। এবার শান্ত হ।
রহিত;; থ্যাংকস ভাই।
কৌশল;; যে একটা ধকল গিয়েছে বাবা। জানিস কতো কান্ড করে একে নিয়ে আসতে হয়েছে। এবার নে দেখ প্রাণ ভরে তোর প্রাণ ভোমড়া কে।
আব্রাহাম বসে বসে ড্রিং খাচ্ছে আর এদের কান্ড দেখছে। রহিত তো পারছে না খুশিতে কেদে দিতে। অয়ন আর কৌশল একটু হাফ ছেড়ে দিয়ে বসে। রহিত আর দেরি না করে আরুশির কাছে চলে যায়। গিয়েই তার মুখের ওপরের কাপড় টা সরিয়ে দেয়। রহিত এতোক্ষন খুশির জোরে কান্না করছিলো কিন্তু এবার, এবার সে সত্যি কেদে দেয়। সবাই অবাক হয়ে রহিতের দিকে তাকায়।
কৌশল;; এ্যাহ এভাবে কাদছিস কেন কি হয়েছে?
অয়ন;; কি হলো আবার?
রহিত;; হারামজাদা রা এই কাকে তুলে এনেছিস তোরা?
কৌশল;; কাকে আবার আরুশিকে!
রহিত;; ওরে তোরা কি জীবনে আরুশিকে দেখিস নি। এই কোন এংগেল থেকে আরুশি লাগে। এই আরুশি না। চোখের মাথা খেয়েছিস বলদ সব।
অয়ন;; কি বলিস।
অয়ন আর কৌশল দ্রুত গিয়ে রহিতের পাশে দাঁড়ায়। দেখে যে হ্যাঁ সত্যি রহিত যা বলছে তা ঠিক। এই আরুশি না। তাদের এমন আজগুবি কথা শুনে আব্রাহাম আর না পেরে ড্রিং ছেড়ে উঠে গিয়ে তাদের কাছে যায়। তবে বাকি সবার সাথে আব্রাহাম যেন এবার বেশ শক খায়। অর্থাৎ যাকে তারা আরুশি ভেবে নিয়ে এসেছিলো সে আরুশি না বরং আইরাত। দিয়া অন্য রুমে গিয়েছিলো কাজে, দিয়ার দ্বারা হচ্ছিলো না তাই আরুশি নিজেই উঠে দিয়ার কাছে যায়। আর তখন রুমে আইরাত একাই ছিলো। আর অন্ধকারে তার আইরাতকেই আরুশিকে ভেবে তুলে এনেছে। আব্রাহাম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আইরাতের দিকে। সে ভাবে নি যে আইরাতকে সে এভাবে দেখতে পারবে। এটাকে কয়িন্সিডেন্স বলবে না ভুল। যাই হোক আইরাত এসেছে তো আব্রাহামের কাছে। আইরাতের চুল গুলো এলোমেলো, মুখের ওপর আছড়ে পরেছে। একদম নিষ্পাপ লাগছে দেখতে। আব্রাহাম মুচকি হেসে আইরাতের দিকে তাকিয়ে আছে, এ যেন এক আলাদা খুশি লাগছে মনের মাঝে। তবে মূহুর্তের মাঝেই নিজের চারিপাশে এই তিন গাধার বকবকানি শুনে আব্রাহামের মাথা গরম হয়ে যায়। আব্রাহাম এমন জোরে একটা ধমক দেয় যে তারা তিন জনেই চুপ হয়ে যায়।
আব্রাহাম;; চুপ একদম চুপ। তোরা কি মানুষের কাতারে পরস। গাধারখাটুনি খাটতে হলো এতোক্ষন ভরা। একটা কাজ ঠিক মতো করতে পারিস না। মাথায় গবর ভরা। দেখে কাজ করতে পারিস না। মন টা চাইছে তোদের দুইজন কে এখানে পুতে দিতে (কৌশল আর অয়নের উদ্দেশ্যে)
আব্রাহাম রাগে অয়ন আর কৌশলের মাথার পেছনে টাস করে থাপ্পর মারে।
রহিত;; এখন আমার কি হবে রে, আরুশির তো বিয়ে হয়ে যাবে রে।
আব্রাহাম;; এই চুপ কর তো কানের পোকা খাস না।
অয়ন;; তাহলে এই মেয়ের কি করবো? (আইরাতের উদ্দেশ্যে)
আব্রাহাম;; ওকে নিয়ে তোদের ভাবতে হবে না। এই একবার এখানে এসেছে তো এসেছেই। এর জন্য আমি আছি।
আব্রাহাম আইরাতের চেয়ারের দুই পাশে দুই হাত রেখে তার দিকে ঝুকে পরে। আস্তে করে বলে ওঠে
আব্রাহাম;; বলেছিলাম না যে আমাদের খুব তাড়াতাড়ি ই আবার দেখা হবে।
আব্রাহাম তার হাত দিয়ে আইরাতের মুখের ওপর থেকে চুল গুলো সরিয়ে দেয়। আইরাতের এমন মায়া ভরা মুখ টা যেন বরাবরই আব্রাহামের মন কে এলোমেলো করে দেয়। যাই হোক আব্রাহাম আইরাতকে পাজাকোলে তুলে নিলো। তারপর তার রুমে চলে যায়। গিয়ে বেডের ওপর শুইয়ে দেয় তাকে। আইরাতের দিকে বেশ ঝুকে তার চুল গুলো কানের পিঠে গুজে দেয় আব্রাহাম। এক নজর আইরাতের সারামুখে চোখ ঘুড়িয়ে মুচকি হেসে এসে পরে। আবার এসে দেখে অয়ন আর কৌশল মাথা চুল্কাচ্ছে। তাদের দেখলেই এখন আব্রাহামের মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে।
আব্রাহাম;; অকর্মার ঢেকি এক একটা।
আব্রাহামের ধমক খেয়ে আবার চুপ মেরে যায় তারা।
আব্রাহাম;; এর থেকে ভালো হতো যে আমি নিজেই যদি চলে গেতাম।
রহিত;; এখন?
আব্রাহাম;; চল দেখি।
আব্রাহাম অয়নের কাছ থেকে জিপের চাবি নিয়ে আবার বের হয়ে পরে। মুখে একটা কালো কালারের মাস্ক পরে নেয় আব্রাহাম। রহিত কে নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হয়ে পরে। আর বলে রেখে যায় যে, আব্রাহাম যতোক্ষন পর্যন্ত ফিরে না আসে তারা কেউ যেন আইরাতের সেই রুমে না যায়। আব্রাহাম আর রহিত জিপে বসে পরে।
আব্রাহাম;; রহিত?
রহিত;; হ্যাঁ
আব্রাহাম;; আরুশির নাম্বারে ফোন লাগা আর ফোন আমাকে দে।
রহিত;; আচ্ছা।
রহিত ফোন লাগায় আরুশিকে। প্রথম বার ফোন বেজে কেটে যায়। পরে আবার ফোন দিলে আরুশি ধরে। দিয়া হয়তো নিচে। সবার সাথে আছে। আর কারেন্ট ও এসে পরেছে এতোক্ষনে। কিছু সময়ের মাঝেই কাজি এসে বিয়ে পড়ানো শুরু করে দিবে। আরুশি কথা বলছিলো তখন তার মা আসে আরুশিকে নিয়ে যেতে। এইতো কাজ হলো। আরুশি দ্রুত ফোন কেটে দেয়। আরুশির মা তাকে নিয়ে নিচে নেমে পরে। কাজি এসে পরেছে। কাজির সামনে আরুশিকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে তো আরুশি চিন্তায় শেষ। আর কোন পথ না পেয়ে আরুশি চিল্লিয়ে ওঠে। আরুশির মা দ্রুত তার কাছে যায়। আরুশি তার প্রচন্ড পেট ব্যাথা হওয়ার ভান ধরে। যেন নড়তেই পারছে না ব্যাথায় এমন। আরুশির মা তাকে নিয়ে ধরে ধরে রুমে যায়। আরুশি রুমে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয়। তখনই রহিতের ফোন আসে। তবে এবার আব্রাহাম কথা বলছে। এক হাত দিয়ে ড্রাইভ করছে আরেক হাত দিয়ে কথা বলছে। যদিও ড্রাইভ করার সময় ফোনে কথা বলা ঠিক না তবুও এখন আর কোন উপায় নেই।
আরুশি;; হ্যালো
আব্রাহাম;; হ্যালো আরুশি। আমি রহিতের ফ্রেন্ড।
আরুশি;; জ্বি ভাইয়া।
আব্রাহাম;; আমার কথা ধ্যান দিয়ে শুনো।
আরুশি;; হুমম
আব্রাহাম;; তুমি এখন কোথায়?
আরুশি;; আমার রুমে।
আব্রাহাম;; ভেতরে এখন কাউকেই আসতে দিও না ওকে। আর তোমার রুমের বা দরজার সামনে কোন জায়গা বা বারান্দা আছে যেটা দিয়ে তুমি ওপর থেকে নিচে নামতে পারবে?
আরুশি;; জ্বি ভাইয়া, একটা করিডর আছে তবে বেশ ছোট।
আব্রাহাম;; তুমি নামতে পারবে তো?
আরুশি;; জ্বি ভাইয়া
আব্রাহাম;; That’s it… এবার শুনো তোমার রুমের কোন বড়ো সড়ো কাপড় আছে?
আরুশি;; জ্বি আছে।
আব্রাহাম;; দুই তিনটা কাপড় একসাথে বাধো যেন তুমি ওপর থেকে নিচে সহজেই নামতে পারো।
আরুশি;; আচ্ছা।
আব্রাহাম;; তারপর করিডরে এসে দাড়াও। আমি আর রহিত আসছি। রহিত তোমার বাড়ির পেছনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকবে তারপর তুমি ওর সাথে এসে পরবে বাইরে। তারপর চলে আসবে বুঝতে পেরেছো আমার কথা?!
আরুশি;; আচ্ছা ভাইয়া।
আরুশি ফোন কেটে দেয়। যা করতে হবে খুব দ্রুত করতে হবে। যখন তখন কেউ চলে আসতে পারে। আরুশি আর কোন উপায় না পেয়ে বিছানার চাদর আর জানালার পর্দা বেধে নিলো। আব্রাহাম প্রচুর জোরে জিপ ড্রাইভ করছে। ৭ মিনিট চলে যায়। বাইরে থেকে ডাক দিলে আরুশি চমকে উঠে। আরুশি আর কিছু টাইম চেয়ে নেয় তাদের কাছ থেকে। একটু পর বাইরে হর্ণের শব্দে আরুশি বাইরে যায়। দেখে রহিত নিচে দাঁড়িয়ে আছে আর গেটের বাইরেই গাড়ির মতো কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। আরুশির মুখে হাসি ফুটে ওঠে। আরুশি আর দেরি না করে কাপড় বেয়ে করিডর দিয়ে নিচে নেমে পরে। আরুশির মাথার ঘোমটা টা আটকে পরলে সে সেটা রুমে ফেলে রেখেই এসে পরে। খুব সাবধানে নিচে নেমে পরে। অতঃপর আরুশি রহিতের কাছে এসে পরে৷ রহিত সাথে সাথে জড়িয়ে ধরে তাকে। তারপর আরুশি আর রহিত জিপে উঠে পরে। আর আব্রাহাম হাওয়ার বেগে ছুটে চলে। এদিকে আরুশি বের হচ্ছে না দেখে দরজার বাইরে তার মা চিন্তা করছে। তবে এখন কেন জানি আরুশির মায়ের খটকা লাগে ব্যাপার টা। উনি দরজা ঠেলেই ভেতরে চলে যায়। গিয়েই দেখে আরুশি নেই তার ঘোমটা টা পরে আছে নিচে। করিডরের পাশে কাপড় পরে আছে অনেক বড়ো৷ যা বুঝার আরুশির মা বুঝে গেলো। তিনি তার দুই হাত দিয়ে কানে কাছে ধরে চিল্লিয়ে উঠে…..
কুসুম বেগম;; আরুশিইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইইই রেএএএএএএএএএএএএএএএএএএএএএএএএএএ।
।
।
আব্রাহাম রহিত আর আরুশিকে নিজের গেস্ট হাউজে এনে পরে। মূহুর্তেই কাজি কে ডেকে আনে অয়ন। তারপর রহিত আর আরুশির বিয়ে দিয়ে দেয়। আরুশি আর রহিতের মুখে হাসি ঝুলছে।
আব্রাহাম;; দেখলি এভাবে ভাগাতে হয়।
কৌশল;; খুব অভিজ্ঞতা তাই না।
আব্রাহাম;; হ্যাঁ, সব কিছুরই আছে। তোদের মতো নাকি।
রহিত;; Thanks yaar তুই না থাকলে হয়তো আমাদের বিয়ে টাই হতো না।
আব্রাহাম;; থ্যাংকস দিয়ে আর লজ্জা দিস না।
আরুশি;; অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।
আব্রাহাম;; ওয়েলকাম বোনু। Wish you both a happy married life ❤️…
রহিত আরুশিকে নিয়ে তার বাড়িতে চলে গেলো। আস্তে আস্তে অয়ন আর কৌশল ও চলে যায়। এবার আব্রাহামের মাথায় আইরাতের খেয়াল আসে। সে বাকা হেসে আইরাতের রুমে চলে যায়। গিয়ে দেখে আইরাত এখনো শুয়ে আছে। জ্ঞান ফিরে নি তার। আব্রাহাম গিয়ে আইরাতের দিকে নিচু হয়ে ঝুকে দাঁড়ায়। সারা মুখে চোখ বুলাচ্ছে সে। যাক ভালোই হয়েছে, ভুল করে হলেও আইরাত আব্রাহামের কাছে এসেছে তো। আব্রাহাম এটা ভেবেই বাকা হাসে। কিন্তু সেইদিকে বিয়ে বাড়ি যেন আর বিয়ে বাড়ি রইলো না। তুলকালাম কান্ড বেধে গেছে ওখানে।
।
।
।
।
চলবে~
#নেশাক্ত_ভালোবাসা
#লেখিকাঃ Tamanna Islam
#পর্বঃ ০৫
আরুশিকে তো তার বিয়ের আসর থেকে ভাগিয়ে নিয়ে এসে রহিতের সাথে আব্রাহাম বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। আর এতো বড়ো একটা কান্ড করার পর অবশ্যই কেউ চুপ বা শান্ত হয়ে থাকবে না। আর আরুশির যে বাপ পুরাই কষাই। বিয়ের আসর থেকে এই যে আরুশির মা আরুশিকে নিয়ে ওপরে রুমে গেলো আর তো আসার নাম গন্ধ নেই। এদিকে পাত্রপক্ষরা কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছে। আর আরুশির বাপের মাথা গরম। ওপরে রুমে আরুশির মা তো এক চিৎকার দিয়েই শেষ। তিনি দ্রুত নিচে নেমে আসেন। আরুশির বাবা আতাউর আরুশির মা কে এভাবে দ্রুত পায়ে নিচে নামতে দেখে বেশ অবাক হয়। তিনি উঠে গিয়ে আরুশির মায়ের কাছে যান।
আতাউর;; কি হয়েছে কুসুম এমন ঘাবড়ে আছো কেন? আরুশি কোথায়। আরে জলদি ওকে আনো বিয়ের সময় তো চলে যাচ্ছে।
কুসুম;; কোথা থেকে আনবো ওকে। আরুশি পালিয়ে গেছে।
আতাউর;; কিহহহ,, কি বলছো এই সব। কীভাবে পালালো?
কুসুম;; আরে রুমের দরজা খুলছে না দেখে আমি ভাবলাম আমি নিজেই ভেতরে গিয়ে দেখি। গিয়ে দেখি ওরনা নিচে পরে আছে আর বাইরের দিকে বড়ো পর্দা ঝুলছে। পালিয়ে গেছে ও।
আতাউর;; এখন, এখন কি হবে। আমি সবার সামনে মুখ কীভাবে দেখাবো। আমার নাক কাটা গেছে তোমার একমাত্র মেয়ের জন্য।
কুসুম;; শোন ঘরের ছেলেমেয়েদের এত্তো কড়া শাসনে রাখলে এমনই হবে। আরুশি যাকে পছন্দ করতো সে কি খারাপ ছিলো নাকি। নিজের বিজনেস আছে, দেখতে ভালো, পছন্দ করে আমাদের মেয়েকে। সমস্যা টা কোথায় ছিলো। কিন্তু না তুমি মেনে নিলে না। নিজের স্বার্থ, শুধু মাত্র নিজের স্বার্থের কথা ভেবে মাঝবয়স্ক একটা লোকের সাথে আরুশির বিয়ে দিতে চলেছিলে। রহিত যদি একটা লাফাঙা হতো বা বেকার হতো তাহলে একটা কথা ছিলো। সবদিক দিয়েই ভালো ছেলে কে কেউ মানা করে দেয়। নিজের স্বার্থের জন্য বিয়ে দিচ্ছিলে মেয়েটার। আর শুনে রাখো আজ সবার সামনে তোমার মাথা নিচু হবে শুধু তোমার দোষের কারণেই।
আতাউর;; তোমার মেয়েকে পেলে আমি কেটে টুকরো টুকরো করে জলে ভাসিয়ে দিবে।
কুসুম;; তুমি জীবনেও সুধরাবে না। এবার সামলাও সব।
এই বলেই এক রাশ রাগ আর জেদ নিয়ে কুসুম বেগম চলে গেলেন। আর এদিকে তো আতাউর ভেবে পাচ্ছে না যে সবাইকে কি বলবে। এতো বড়ো বিয়ে বাড়ি,এতো গুলো লোকজন সবার সামনে কি করে। ভাবতেই লজ্জা লাগছে তার। আর এদিকে দিয়া আইরাতকে খুজতে খুজতে হয়রান। মেয়েটা কোথায় যে গেলো। গত বিশ মিনিট যাবৎ খুঁজে বেড়াচ্ছে। একদিক দিয়ে যেমন আইরাতের জন্য চিন্তা হচ্ছে তেমন রাগও লাগছে। এতো গুলো মানুষের মাঝে কোথায় চলে গেলো না বলে কয়েই। আর বিয়ের সময় প্রায় শেষ এখন বাড়ি যাবে। দেরি করে বাড়ি গেলে আইরাতের চাচি আইরাতকে আস্তো চিবিয়ে খাবে। দিয়া হন্ন হয়ে আইরাত কে খুঁজে চলেছে তবে তখনই কারো চিল্লানোর আওয়াজে দিয়া থেমে যায়। চিল্লা-চিল্লির শব্দ যেখান থেকে আসছে সেখানে গেতেই দিয়া বেশ অবাক হয়। হবু জামাই একদম আরুশির বাপের সাথে মারামারি লাগার উপক্রম। দিয়ার এমন সিন দেখে হাসি যেন আর সইছে না। এটাই প্রব্লেম সিরিয়াস মোমেন্টে হেসে দেওয়া। অবশ্য আইরাতই শিখিয়েছে তাকে। আইরাতের সাথে থাকতে থাকতে তার প্রভার পরেছে। কিন্তু আশে পাশের মানুষের কথা যখন দিয়া শুনে তখন চিন্তায় তার তো পরাণ পাখি উড়েই গেলো। আরুশি নাকি পালিয়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে পালালো, কখন পালালো আর কার সাথেই বা পালালো? তখন দিয়ার মনে পরে আরুশির প্রেমিকের কথা। দিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব কিছুই ভাবছিলো তখন বিকট শব্দে চমকে উঠে সামনে তাকায় দেখে যে জামাই অনেক বড়ো একটা স্টীলের থালা রাগে চটকিয়ে দিয়েছে। আর আরুশির বাবা সাথে সাথে জামাই এর কলার খামছে ধরে। অবস্থা বেগতিক। সবাই গিয়ে হুড়মুড় করে থামায়। অবশেষে আর কি বিয়ে ভেংে গেলো। পাত্রপক্ষ রাগে দুঃখে চলে গিয়েছে। আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে সব মানুষ প্রস্থান করতে লাগলো। আতাউর এক জায়গায় বসে রাগে ফুসছেন। কিন্তু দিয়া তো এখনো আইরাতকে পেলো না। সে গিয়ে আবার সারা বাড়িতে খুজতে লাগলো। খুজতে খুজতে দিয়া কুসুম বেগমের সামনে পরে যায়।
কুসুম;; আরে দিয়া কি হয়েছে, কাউকে খুজছিস নাকি?
দিয়া;; আন্টি আইরাত আছে না আমার সাথে যে এসেছিলো। তাকে কোথাও পাচ্ছি না।
কুসুম;; আরে এখানেই হয়তো আছে কোথায়। ভালো ভাবে দেখ পেয়ে যাবি। চিন্তা করিস না।
দিয়া;; আন্টি আধাঘন্টা ধরে খুজছি। নেই কোথাও। বাসায় জানে আইরাত কাজ করছে এখন যদি ওকে ছাড়া আমি যাই তাহলে ওর বাড়ির লোকজন শেষ। আর আইরাতের একটা চাচি আছে উনি তো আইরাতকে মেরেই ফেলবেন।
কুসুম;; কি বলিস, আচ্ছা আয় তো দেখি কোথায় গেলো মেয়ে টা।
দিয়া আর কুসুম বেগম মিলে আইরাতকে খুজতে লাগলো। কিন্তু আইরাত যখন সেখানেই নেই তাহলে হাজার খুজেও কাজ হবে না। দিয়া আর কুসুম বেগম নিচে হলরুমে এসে থেমে পরেন। আতাউরের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝড়ছে। এত্তো রাগ। তা কুসুম বেগম খেয়াল করেন। আর দিয়া এদিক ওদিক তাকাতাকি করছে আইরাতের জন্য।
তখনই আতাউর রেগে বলে উঠেন…
আতাউর;; এমন মেয়ে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া বেশ ভালো। সবার সামনে আমার নাক কাটিয়ে গেলো।
কুসুম;; শোন আমাদের মেয়ে কোন খারাপ ছেলে কে পছন্দ করেনি। এখন তোমার অনেক রাগ কারণ তোমার স্বার্থ হাসিল হয় নি।
আতাউর;; চুপ করো। আরুশি একা কখনোই এই বিয়ে বাড়ি থেকে একা পালিয়ে যেতে পারবে না। ওর পক্ষে সম্ভব না।
কুসুম;; কি বলতে চাইছো তুমি?
আতাউর;; কেউ একজন ওকে সাহায্য করেছে। অবশ্যই করেছে নয়তো এটা একজনের কর্ম নয়।
আতাউর এগুলো বলছিলো তখনই দিয়া তার আন্টি কে ইশারা করে যে আইরাতকে তো এখনো পেলো না। আর এটা আতাউরের চোখ এড়ায় নি। সে বলে উঠে…
আতাউর;; দিয়া…!
দিয়া;; জ্বি আংকেল।
আতাউর;; তোমার সাথে যেই মেয়েটা মানে তোমার বোন এসেছিলো সে কোথায়?
দিয়া;; আংকেল ওকেই কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। কোথাও যে চলে গেলো না বলেই। প্রায় অবেকক্ষন যাবৎ খুজছি কিন্তু পাচ্ছি না।
আতাউর;; পালিয়ে গেছে।
দিয়া;; কি?
আতাউর;; হ্যাঁ পালিয়ে গেছে। আরুশি পালিয়ে গেছে আর সাথে তোমার ওই বোনও। নয়তো একই সময়ে দু দুটো মেয়ে বাড়ি থেকে কীভাবে গায়েব হয়ে যেতে পারে। তাও আবার একই সময়ে। তোমার ওই বোনই আরুশিকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে৷
আতাউরের কথা শুনে দিয়ার রাগও হয় আর বেশ চিন্তাও। কিন্তু আইরাত যে জীবনে এমন কোন কাজ করবে না তা দিয়া জানে। আর দিয়ার সাথে আজই আইরাতের প্রথম দেখা আর আজই আইরাত কীভাবে পালিয়ে যেতে সাহায্য করবে তাকে। যেই মেয়ে কখনো একটা মশা পর্যন্ত মানে নি সে কিনা বিয়ের আসর থেকে মেয়ে কে নিয়ে পালাবে। ভাবা যায় এগুলা।
আতাউর;; ওই মেয়ে, ওই মেয়েই আরুশিকে নিয়ে পালিয়েছে। আরুশিকে ওর প্রেমিকের কাছে যেতে সাহায্য করেছে। সব কিছু তারা মিলে করেছে।
এবার যেন দিয়া আর চুপ করে থাকতে পেলো না, প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার।
দিয়া;; ব্যাস আংকেল অনেক হয়েছে। অনেক বলেছেন। আপনার কী মনে হয় আপনি মুখ দিয়ে যা বলবেন তাই শুনে নিবো। অনেক বলেছেন। আর একটা কথা আপনি আইরাতের ব্যাপারে বলবেন না। আইরাত আরুশি আপু কে আজ প্রথম দেখলো। আর আমিই জানতাম না যে আরুশি আপু কাউকে পছন্দ করে সেখানে আইরাত কীভাবে ওকে হেল্প করবে। আইরাত তেমন মেয়েই না। আর এতো লোকজনের ভীড়ে সে আরুশি আপু কে হেল্প করবে প্রশ্নই আসে না। আর কথা রইলো পালিয়ে যাওয়ার তো কোন মেয়েই চাইবে না নিজের বয়সের দ্বীগুণ একজনের সাথে নিজের বিয়ে হোক। আজ নিজের দোষে আপনার এই হাল। আমারই ভুল হয়েছে যে নিজের সাথে আইরাতকে এখানে এনেছিলাম। দয়া করে আইরাতকে আর দোষ দিবেন না। আইরাতের কথা ছেড়ে নিজের মেয়েকে খুজুন। আসলে কি আরুশি আপু পালিয়ে অনেক ভালোই করেছে।
দিয়া রাগে আগুন হয়ে আছে। আর এই কথা বলেই সে বিয়ে বাড়ি থেকে সোজা বের হয়ে পরে। পুরো বাড়ি ৩-৪ বার চক্কর কাটা শেষ তবে আইরাত নেই। এবার যেন দিয়া আইরাতের চিন্তায় আসর হয়ে যাচ্ছে। আইরাতের চাচা আর চাচি কে কি বলবে সে। আর কোন উপায় না পেয়ে দিয়া কাপাকাপা হাতে আইরাতের চাচা ইকবাল কে ফোন দেয়।
দিয়া;; হ হ হ্যালো..
ইকবাল;; আরে দিয়া যে কেমন আছো মা?
দিয়া;; আংকেল আসলে আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো জরুরী।
ইকবাল;; হ্যাঁ হ্যাঁ বলো।
দিয়া;; আসলে আংকেল আইরাত আজ হোটেলে যায় নি।
ইকবাল;; মানে?
দিয়া;; আসলে আংকেল ভার্সিটি শেষে আইরাত আমার সাথেই ছিলো। হোটেলে কাজে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু আমিই যেতে দেই নি। আমার এক কাজিনের বিয়ে ছিলো তো তাই সেখানে আইরাতকে নিয়ে এসেছিলাম। তবে দূর্ভাগ্যবশত বিয়ে টা হয় নি। ভেংে গিয়েছে। তবে একটা সমস্যা হয়েছে।
ইকবাল;; কি হয়েছে? (চিন্তিত হয়ে)
দিয়া;; আইরাতকে না কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মানে আমি সবাইকে জিজ্ঞেস করেছি, সব জায়গায় খুজেছি কিন্তু আইরাতকে কোথাও পাচ্ছি না। জানি না কোথায় চলে গেলো।
ইকবাল;; কি, এইসব কি বলছো দিয়া। আইরাত তো তাহলে সারাদিন তোমার সাথেই ছিলো তাই না। তাহলে না বলেই কোথায় যাবে। আইরাত তো মনে হয় সেখানে কাউকে চিনেও না তাহলে কোথায় গেলো মেয়েটা?
দিয়া;; সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না আংকেল। আর আমাকে মাফ করবেন আমি আসলে আপনাকে না বলেই আইরাতকে নিজের সাথে নিয়ে এসে পরেছি। আংকেল আই এম সরি।
ইকবাল;; না না দিয়া এভাবে বলো না মা। আমি জানি তুমি আইরাতের কতো ক্লোজ। তুমি আইরাতের মন্দ চাইবে না। এতে দোষ নেই তোমার। কিন্তু কথা হচ্ছে মেয়েটা কোথায়। আইরাতের চাচি এমনিতেই মেয়েটাকে কথা শুনায় আজ তো শেষ করে দিবে।
ইকবাল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত বেজে চলেছে এগারো টা।
ইকবাল;; এগারো টা বাজে। এতো রাত অচেনা একটা জায়গা। চিন্তা হচ্ছে। খারাপ কিছু হলো না তো।
দিয়া;; না আংকেল আপনি চিন্তা করবেন না। দেখি কি করা যায়।
ইকবাল;; আচ্ছা।
ইকবাল ফোন কাটতেই পেছন ঘুড়ে দেখে যে কলি দাঁড়িয়ে আছে৷ ওইযে বলে না যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যাে হয়। কলি নিজের কোমড়ে দুইহাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইকবাল তাকে এক রকম ইগনোর করেই পাশ কেটে চলে আসে। আস্তে আস্তে ঘড়ির কাটা বারো টার ঘরে গিয়ে আটকে পরে। হলরুমে আইরাতের চাচা চাচি বসে আছে, একদম চুপ। আর এই নীরবতায় ঘড়ির কাটা টা বারো তার ঘরে গিয়ে ঢং ঢং আওয়াজ করে উঠলো। চিন্তায় অবস্থা খারাপ সবার। ইকবার বসে ছিলো, নিজের সামনে এক কাপ চা রাখা। সেটাও ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে ইকবাল জলদি করে ফোন টা রিসিভ করে। দিয়ার ফোন।
ইকবাল;; হ্যালো দিয়া পেয়েছো আইরাত কে?
দিয়া;; না আংকেল এখনো পায় নি। আমি গাড়িতে। সব জায়গারই খোজ রাখছি। কিন্তু আইরাতকে পাচ্ছি না।
ইকবাল;; আচ্ছা দিয়া পুলিশে জানালে কেমন হয়?
দিয়া;; আংকেল ২৪ ঘন্টার আগে পুলিশ কোন মিসিং কেস ফাইল করবে না। আমাদের একটু ওয়েট করতে হবে।
আইরাতের চিন্তায় তার চাচার যেন প্রেসার বেড়ে গেলো। দিয়া কোন রকমে আইরাতের চাচাকে শান্ত করে ফোন টা রেখে দেয়। আর তখনই আইরাতের চাচি চিল্লিয়ে ওঠে….
কলি;; পালিয়ে গেছে তাই না, আমাদের মুখে চুন কালি মেখে পরের এক পোলার সাথে পালিয়ে গেছে তোমার এই আদরের লাডলি আইরাত। আগেই বলেছিলাম কোন ছেলে টেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দাও কিন্তু না উনি পড়াশোনা করবেন। বাইরে কাজে পাঠালে। না জানি কেমন কেমন ছেলেদের সাথে ঘুড়ে বেড়ায়। এবার ফল ভোগ করো।
ইকবাল;; আহা, কলি। থামো তো একটু। মেয়েটাকে পাওয়া যাচ্ছে না কোথায় একটু শন্তির কথা বলবে তা না সব আজাইরা কথা।
কলি;; এখন না সবাই ছি ছি করবে আমাদের ওপর। তখন শান্তির বাণি শুনো বেশি করে।
ইকবাল;; চুপ করো কলি। বাবা-মা মরা মেয়েটা। যখন থেকে মেয়েটা আমাদের সাথে থাকা শুরু করেছে মেয়েটাকে কোন না কোন ভাবে তুমি কথা শুনাও। মেনে নিতে পারো না। আর আইরাত পালাবে। এটা কি বললে তুমি নিজেই একবার ভেবে দেখো তো। গায়েব হয়েছে আইরাত। আচ্ছা আইরাতের কথা বাদই দাও আজ যা হয়েছে তা যদি তোমার ছেলে রনিতের সাথে হতো তাহলেও কি তুমি এই ধরনের কথা বলতে যে রনিত একটা মেয়ে কে নিয়ে পালিয়েছে। আল্লাহ’র ওয়াস্তে চুপ করো কলি। যত্তসব।
এই কথা বলেই ইকবাল উঠে পরে চলে যায়। আর কলি মুখকে বিষ বানিয়ে দিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে।
।
।
।
ক্লোরোফোমের ডোজ টা অনেক বেশিই তীব্র ছিলো তাই সহজে আইরাতের জ্ঞান ফিরে নি। আরুশি আর রহিতের বিয়ে হয়ে যাওয়ার প্রায় আরো এক ঘন্টা পর আইরতের জ্ঞান ফিরে। ধীরে ধীরে আইরাতে চোখ মেলে তাকায়। মাথাটা আগের থেকে অনেকটাই ভার ভার লাগছে। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। তবুও কোন রকম করে নিজের চোখ মেলে তালায়। মাথা টা তুলতে যাবে তখন একটু ঘুড়ে ওঠে। নিজের এক হাত দিয়ে মাথার এক পাশে খানিক ধরে চোখ মুখ সব কুচকে ফেলে। আরেক হাতের ওপর ভর দিয়ে কোন রকমে উঠে বসে। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। মাথা চেপে ধরে। আইরাত একটা বিছানার ওপর আছে আর তখন সেই হুট করেই সারাঘরে অন্ধকার হয়ে যাওয়া, কারো তার মুখ শক্ত ভাবে চেপে ধরা সবই যেন আইরাতের সামনে ভেসে ওঠে। আর তখনই আইরাতের হুশ আসে। চোখ গুলো বড়ো বড়ো হয়ে যায়। নিজের চারিপাশে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখে একটা বড়সড় বিছানার ওপর সাদা চাঁদরে মুড়ে রয়েছে সে। নিজের দিকে তাকিয়ে ফট করে চাদর টা সরিয়ে ফেলে। এ কোথায় সে, বিয়ে বাড়িতে না ছিলো। তাহলে এখানে কি করে। এবার আইরাত পুরো ঘরে একবার চোখ বুলায়। সাদা কালারের জিনিস সব থেকে বেশি। দেওয়াল গুলো সাদা, জালানার পর্দা গুলো সাদা। অর্থাৎ বেড সিড থেকে শুরু করে একদম কার্পেট পর্যন্ত সব কিছুই সাদা। আর তার ওপর খুব এক্সপেন্সিভ জিনিসপত্র ঘরের সবদিকে। দেখেই বুঝা যায় যে যেই এখানে থাকে সে খুব শৌখিন প্রকৃতির একজন। যাই হোক আইরাত উঠে পরে। উঠে নিজের দিকে একবার তাকায়। নাহ, সব ঠিকই আছে। তারপর আইরাত সোজা দরজার কাছে চলে যায়, দরজায় ধাক্কাতে থাকে কিন্তু তা বাইরে থেকে বন্ধ করা। আইরাত গলা ছেড়ে অনেক বার দিয়া দিয়া বলে ডাক দেয় কিন্তু কোন সাড়াশব্দ নেই। মাথাটা হ্যাং মেরে আছে। আইরাত গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ায়। জানালার পর্দা টা সরিয়ে বাইরে তাকাতেই আইরাতের মাথা টা যেন আরেক দফা চক্কর দিয়ে ওঠে। জানালার বাইরে মানুষ গুলো কে নিতান্তই ক্ষুদ্র পিপড়ের মিতো লাগছে। তার মানে এই যে আইরাত খুব সুউচ্চ একটা বিল্ডিং এ আছে। আইরাত তা বুঝতে পেলো। তখনই আইরাতের কানে কারো পায়ের শব্দ আসে। যেন কেউ ভারি ভারি কদম ফেলে ঠক ঠক শব্দ করে এইদিকেই আসছে। না চাইতেও আইরাতের ভেতর একটা ভয় কাজ করছে৷ আইরাত জানালা থেকে এসে আবার বিছানার ওপর গিয়ে বসে। দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে। আশে পাশে কোন ঘড়িও নেই যাতে দেখতে পারে যে আসলে কটা বাজে। অনেক রাত, বাসায় হিলয়তো সবাই চিন্তায় মরছে আর দিয়া ও না জানি কোথায় কোথায় তাকে খুজছে আর বকছে। এগুলো ভাবছিলো আইরাত হঠাৎ তার কানে সিটি বাজানোর শব্দ আসে। আইরাত কপাল কুচকে এই শব্দের উৎস খুজছে। কিন্তু আওয়াজ যেন বেড়েই চলেছে। অর্থাৎ সিটি দিয়ে কেউ কোন গানের সুর তুলছে। আইরাত দরজার দিকে এক নয়নে তাকিয়ে আছে।
—- বাহার ছে কোয়ি আন্দার না আ সাকে, আন্দার ছে কোয়ি বাহার না যা সাকে। ছোচো কাভি এছা হো তো ক্যায়া হো, ছোচো কাভি এছা হো তো ক্যায়া হো। হাম-তুম এক কামড়ে ম্যা বান্দ হো ওর চাবি খো যায়ে~~।
এমন অদ্ভুত মার্কা গান শুনে আইরাতের কপালে যেন চিন্তার ভাজ আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তখনই দরজা খুলে ভেতরে কেউ একজন প্রবেশ করে। ব্যাক্তিটিকে দেখে আইরাতের মুখ হা হয়ে গেলো আর চোখ গুলো রসগোল্লা।
আব্রাহাম;; হে হায় বেইব… (হাত টা কে একটু ওপরে তুলে)
আইরাত;; আ আ আপনি, এখানে মানে কী করে। আপনি এখানে কি করছেন?
আব্রাহাম;; আমার গেস হাউজে থেকেই আমাকেই বলছো আমি এখানে কিভাবে এলাম..!
আইরাত আবার নিজের চারিপাশে তাকায়।
আইরাত;; এটা আপনার গেস্ট হাউজ?
আব্রাহাম;; অবশ্যই।
আইরাত;; তো আমি এখানে কি করছি। আমি কীভাবে এখানে এলাম?
আব্রাহাম;; আহা, তুমি আসো নি তোমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।
আইরাত;; নিয়ে আসা হয়েছে মানে…!
আব্রাহাম;; হ্যাঁ আসলে ভুলবশত।
আইরাত;; মানে কি?
আব্রাহাম;; ক্লিয়ার করছি। মানে নিয়ে আসতে গিয়েছিলো এক মেয়ে কে আর ভুল করে নিয়ে এসেছে আরেক মেয়ে কে।
আইরাত;; আশ্চর্য তো, ভুল করে আমাকে কেন আনবেন। আর এক্সিউজ মি ওটা একটা বিয়ে বাড়ি ছিলো। বিয়ে বাড়িতে কাকে তুলে আনতে গিয়েছিলেন। আর আরুশি আপু, আপুর তো আজ বিয়ে তাহ……..
আব্রাহাম;; আরুশিকেই নিয়ে আসতে গিয়েছিলো কিন্তু ভুলে তুমি এসে পরেছো। আর আরুশির বিয়ে হয়ে গেছে। ওকে নিয়ে এসেছি আমি আর বিয়েও অনেক আগেই শেষ।
আইরাত;; কার সাথে বিয়ে হলো আর কীভাবে হলো?
আব্রাহাম;; আমার ফ্রেন্ড রহিতের সাথে। কেননা আরুশি আর রহিত একে ওপর কে ভালোবাসে৷
আইরাত;; তার মানে আরুশি আপু যাকে ভালোবাসে সে আপনার ফ্রেন্ড হয়?
আব্রাহাম;; একদম ঠিক।
আইরাত;; আচ্ছা যাই হোক। বিয়ে তো হয়েই গিয়েছে এবার প্লিজ আমাকে যেতে দিন। বাসায় হয়তো সবাই আমার জন্য চিন্তা করছে। কাউকে বলে আসিনি। বাসায় যেতে হবে নয়তো অনেক ঝামেলা হয়ে যাবে প্লিজ যেতে দিন আমায়।
আব্রাহাম;; ন্যাহ, এতো সহজেই কি করে যেতে দেই বেইবি।
আইরাত;; লিসেন আমার নাম আছে একটা আইরাত। এইসব আজগুবি নামে আমায় ডাকবেন না। আর যেতে দিন আমায় আমি বাড়ি যাবো।
আব্রাহাম;; এখন কি গাছ তলায় আছো নাকি।
আইরাত;; আমি এখানে থাকবো না, বাড়ি যাবো।
এই কথা বলেই আইরাত পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে যেতে ধরে। বেশি দূর যেতে পারে নি তার আগেই আব্রাহাম খপ করে আইরাতের হাত ধরে ফেলে তাকে ঘুড়িয়ে নিজের কাছে আনে। আইরাত হুট করেই এমন কান্ডে অবাক, কি থেকে কি হয়ে গেলো সব মাথার ওপর দিয়ে গেলো। আইরাতের পিঠ আব্রাহামের সাথে ঠেকে আছে। আর আব্রাহাম আইরাতের দুই হাত এক করে নিজের এক হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে। আব্রাহাম আইরাতের কানের কাছে এসে ধীর গলায় বলে…
আব্রাহাম;; আমার এখানে আমার অনুমতি ছাড়া একটা পাতা পর্যন্ত নড়ে না আর তুমি এখান থেকে পালিয়ে যাবে। ভাবলে কীভাবে। তুমি আমার কাছে থাকবে। যতক্ষন না আমি বলছি ততক্ষণ তুমি এখান থেকে কোত্থাও যেতে পারবে না।
আব্রাহামের এমন কান্ডে আর এমন গলায় আইরাতের শিরদাঁড়া গুলো যেন দাঁড়িয়ে পরলো। মুখের আওয়াজ আপনা আপনিই থেমে গেছে। আব্রাহাম আইরাতের অবস্থা খেয়াল করতে পেরে মুচকি হাসে। আইরাত এবার নড়াচড়া শুরু করে দেয় ছাড়া পাওয়ার জন্য।
আব্রাহাম;; তুমি এখানেই থাকবে আমার কাছে।
আব্রাহাম আইরাতের এলোমেলো চুল গুলোর দিকে এক নজর দেয় তারপর তাতে নিজের নাক মুখ সব ডুবিয়ে দেয়। আইরাত কাপছে পুরো। আব্রাহাম তো আইরাতের চুলের ঘ্রাণ নিতে ব্যাস্ত। আইরাত বুঝলো যে আব্রাহামের বাধন তার হাত গুলোর ওপর থেকে ঢিলা হয়ে এসেছে তাই সে ধাক্কা দিয়ে আব্রাহামের কাছ থেকে দূরে সরে আসে। আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে বড়ো বড়ো দম ছাড়ছে সে। আব্রাহাম ব্যাপার টা বুঝতে পেরে বাকা হাসে। তারপর কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে একটা ড্রয়ারের সামনে যায়, সেখান থেকে একটা রিভলবার বের করে তাতে বুকেট লোড করতে থাকে। আইরাত হা হয়ে তাকিয়ে আছে। বুলেট লোড করে একবার চেক করে নেয় আব্রাহাম তারপর আইরাতের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে…
আব্রাহাম;; এখানেই থাকো আমি তোমার প্রয়োজনীয় সব পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর হ্যাঁ ভুল করেও এখান থেকে পালানোর চেষ্টা তুমি করবে না কারণ তুমি তা পারবে না।
এই বলেই আব্রাহাম দ্রুত পায়ে রুম থেকে চলে গেলো। যাওয়ার সময় দরজা টা লাগিয়ে দিয়ে গেলো। দরজা লাগিয়ে দিচ্ছে তা টে পেয়ে আইরাত দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে ধাক্কাতে থাকে কিন্তু লাভ হয় না কোনো। আইরাত আবার চিন্তা মাখা মুখ নিয়ে বিছানার ওপর ধপ করে বসে পরে। মাথা তো নয় যেন চিন্তার পাহাড় হয়ে আছে। না জানি বাড়িতে সবাই কি করছে। তার চাচা চাচি, দিয়া কি করছে। আইরাতের রাগ লাগছে অনেক এই আব্রাহামের ওপর। রাগ সামলাতে না পেরে আইরাত কেদে দেয়। তার রাগ গুলো যেন কান্নায় পরিণত হয়েছে।
।
।
।
।
চলবে~