#পাতা_বাহার
#বেলা_শেখ
#পর্ব – ১
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গুসুর ফুসুর করছে। পাতা দূর থেকে লক্ষ করে এগিয়ে আসতেই বুঝতে পারে গন্ডগোল বেশ বড়োসড়োই। সে ভিড় ঠেলে সামনে যায়। একটা বাচ্চার মা কাঁদছে তার বাচ্চাকে জড়িয়ে। বাচ্চাটাও কাঁদছে তার কপালে অল্প রক্তের ছিটা ফোঁটা। আর পাশে আরেকটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে! চোখ মুখ লাল হয়ে আছে তার। যেন টোকা দিলেই ফেটে রক্ত বের হবে। তখনই ক্রন্দনরত মা পাশের ছেলেটাকে রেগে বলছে,
-” এই বদমাইশ ছেলে? কি করলে? আমার বাচ্চাটার মাথা ফেটে দিলে? এতটুকু বাচ্চা গুন্ডামি করো? বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া ছেলে! বাবার পাওয়ার দেখাও?”
পাতা বাচ্চাটার মাকে বলে ,
-” বকাঝকা পড়ে হবে। এই কেউ অফিস রুম থেকে ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে আসো সাথে পানিও এনো? আর ভোর সরকার ওকে মেরেছো কেন?”
ভোর সরকার নামক ছেলেটি মিসের দিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টে কেঁদে কোমড় জড়িয়ে ধরে। পাতা ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় । নিচু হয়ে বাচ্চাটির মুখ তুলে চোখের পানি মুছে দেয়। বাচ্চাটি আবারো তার গলা জড়িয়ে কান্না জুড়ে দেয়। পাতা তার পিঠে হাত বুলিয়ে বলে,
-” বন্ধুকে নিজেই ব্যথা দিয়ে আবার কাঁদছো? মেরেছো কেন?কি হয়েছে ভোর বলো ?
ভোর ছেলেটি পাতাকে ওভাবে জড়িয়েই বলে,
-” মিস আমি ওকে মারি নি!!”
-” ভোর আবার মিথ্যা বলছো?”
রোহানের মা ধমকের সুরে বলে। পাতা তাকে ইশারা করে শান্ত হতে। তিনি চুপ করে যায়।ভোর ক্রন্দনরত গলায় আবার বলতে শুরু করে,
-” আমি সত্যি বলছি মিস। ও আমাকে লেগপুল করছিল! বলছিল আমার মা নাকি ভেগে গেছে অন্য লোকের সাথে! আমার সাথে ও আর খেলবে না। আমি নাকি পঁচা ছেলে। আমি ওকে মানা করি ও শুনছিলই না। ভেগে যাওয়া মায়ের ছেলে বলে লেগপুল করছিল। আমি ওকে থামাতে ধাক্কা দিই। ও ব্যথা পাবে ভাবি নি মিস। নইলে কখনো দিতাম না।”
ভোর ক্রন্দনরত গলায় আটকে আটকে বলে সব। পাতা রোহানের দিকে তাকায়। রোহান কান্না বন্ধ করে বলে,
-” মিস, মা বলছিল তখন ইশানের আম্মুর কাছে।”
পাতা এবার রোহানের মায়ের দিকে চায়। তিনি নজর লুকানো চেষ্টা করে। ততক্ষণে একজন পানি ও ফাস্ট এইড বক্স এনে পাতার কাছে দেয়। পাতা ভোরকে নিজের থেকে আলাদা করে পুনরায় গাল মুছে দিয়ে বলে,
-” হয়েছে আর কাঁদতে হবে না। আমি রোহানকে বকে দেব।”
ভোর মাথা ঝাঁকায়। তখনই একটা অর্ধ বয়স্ক লোক এসে ভোরকে ডাকে,
-” ভোর বাবা?”
ভোর সেদিকে তাকিয়ে বলে,
-” কাক্কু আব্বুকে বলবে না বলো?”
লোকটি করুণ চোখে চায়। পাতা পানি দিয়ে রোহানের ক্ষত জায়গা পরিস্কার করে তুলোয় স্যাভলন ভরিয়ে সেখানে রেখে বলে,
-” অল্প কেটেছে। ফাস্ট স্ট্রিপ দিলেই হবে। রোহান বন্ধুকে কেউ কষ্ট দেয়? ও কত কষ্ট পেয়েছে? আর বলবে না কেমন ? তুমি তো একটা গুড বয়!
বলে রোহানের গালে একটা চুমু দেয়। ভোর পিটপিট নজরে সেটা দেখে।
-” আর মিসেস রুমা ভোর ইচ্ছে করে ধাক্কা দেয় নি ভুলবশত লেগেছে। আর ভোরের মায়ের ব্যপারে গসিপ করার কোনো রাইট নেই আপনাদের। কি হয় গসিপ করে? ক্ষনিকের আনন্দের জন্য আপনারা মনুষ্যত্ব ভুলে বসেন। আর এজ আ ক্লাস টিচার আমি জানি ভোরের বাবা মা’র মধ্যে মিউচুয়াল ডিভোর্স হয়েছে। এসব গসিপ করা বন্ধ করুন দয়া করে।”
মহিলাটি মাথা নিচু করে বলে,
-” স্যরি মিস। আমরা ওভাবে বলি নি। রোহান হয়তো একটু শুনেই বলে ফেলেছে। ভোর আন্টি স্যরি হ্যা?”
ভোর মাথা নাড়ে। সে এখন অর্ধ বয়স্ক লোকটির কোলে চড়ে। পাতা তার গাল টিপে বলে,
-” ক্লাসে যাও। আর কখনো কারো কথায় কান দেবে না। তুমি স্ট্রং আর গুড বয় না?”
বলে অফিস রুমের দিকে পা বাড়ালে ভোর বলে,
-” মিস রোহানকে আদর করলেন আমাকে কেন নয়?”
পাতা চোখ ছোট ছোট করে ভোরের কাছে যায়। ভোর মাথা নিচু করে ‘স্যরি’ বলে। পাতা হেসে তার দু গালে দুটো চুমু দিয়ে চলে যায়। ভোর সেদিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।
-” ভোর বাবা কে হয় উনি?”
ভোর মলিন মুখে বলে,
-” আমার টিচার। খুব ভালো উনি। সবাইকে আদর করে। ভারি কাক্কু তুমি কিন্তু বাবাকে রোহানের কথা বলবে না! প্রমিজ করো?”
লোকটির নাম আভারি। ভোর তাকে ভারি কাক্কু বলে ডাকে। আভারি মুখটা কাঁচুমাচু করে বলে,
-” বাবা আসলে..”
ভোর কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
-” তুমি বাবাকে বলে দিয়েছো?”
লোকটি মাথা নাড়ে। ভোর মন খারাপ করে তার কোল থেকে নেমে যায়। তখনই পিয়ন এসে বলে,
-” তোমাকে প্রিন্সিপাল ম্যাডাম ডাকে! যাও ভোর? আর আপনাদের কেও।”
শেষের টা রোহানের মাকে বলে।
____
রাজধানীর স্বনামধন্য স্কুলের মধ্যে ‘সানশাইন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল’ একটি নামকরা স্কুল। এই স্কুলের প্রিন্সিপাল মিসেস সাবরিন সাবিনা খুবই ন্যায় নীতিবান মহিলা। তার বাবা এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি মারা যাওয়ার পর মিসেস সাবিনা বেশ কয়েকবছর যাবত এই স্কুলের দায়িত্ব পালন করছেন। এজ আ প্রিন্সিপাল তিনি খুবই স্ট্রিক্ট পারসন। বাট মানুষ হিসেবে খুবই নরম ও সৎ।
তার কেবিনে দাঁড়িয়ে আছে পাতা। পাতা এই স্কুলের একজন টিচার। নতুন জয়েন করেছে। এক বছরও হয় নি। তবে সব স্টুডেন্টস তাকে বেশ পছন্দ করে। এরইমধ্যে রুমে আসার পারমিশন চায় রোহানের আম্মু। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম পারমিশন দিলে তিনি প্রবেশ করে। তার কোলে রোহান আর পিছনে কুটুর কুটুর করে ভোর প্রবেশ করে। ভোরের পেছনে আভারি । প্রিন্সিপাল ম্যাডাম আভারিকে দেখিয়ে বলে,
-” হু ইজ হি?”
ভোর আভারির হাত ধরে বলে,
-” আমার কাক্কু। ”
আভারি ম্যাডামকে সালাম দিয়ে বলে,
-” আমি ভোড় বাবার বাড়িতে কাজ করি। ভোরের দেখাশোনা করি ,স্কুলে নিয়ে আসি।”
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম টেবিল থেকে চশমাটা তুলে চোখে পড়ে বললেন,
-” ওহ। মিস পাতা, আপনি বলুন ? রোহান আর ভোরের মধ্যে কি হয়েছে? আপনি তো সেখানেই ছিলেন।”
পাতা একে একে সবটা খুলে বলে। প্রিন্সিপাল গম্ভীর মুখে সব শুনে বললেন,
-” মিসেস রুমা আমাদের স্কুলের গেস্ট রুম কোনো গসিপ খানা নয়। বাচ্চারা অনুকরণ প্রিয় হয় । তারা কিন্তু বড়দের দেখেই সব শেখে। তাই বাচ্চাদের শেখানোর আগে আমার মনে হয় গার্ডিয়ানদের ম্যানার্স শেখানো উচিত। আমি আশা করছি আপনি ভুল বুঝতে পেরেছেন। আর ভোর তোমার উচিত হয় নি তাকে ধাক্কা দেওয়ার। ও তোমাকে পেরেশান করছিল। টিচারের কাছে জানাতে পারতে। আগে খেয়াল রাখবে। সব এখানেই মিটমাট হয়ে গেল। কারো কোনো কথা থাকলে বলতে পারেন?
সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কারো কোনো সমস্যা নেই হয়তো। তাই পাতা প্রিন্সিপালকে বলে,
-” নো ম্যাম।”
-” আপনারা তাহলে যেতে পারেন। আর মিস পাতা ধন্যবাদ সব কিছু ভালো ভাবে হ্যান্ডেল করারা জন্য। ”
পাতা মুচকি হেসে কিছু বলবে ,এর পূর্বে বাইরে থেকে গম্ভীর স্বরে কেউ ভিতরে আসার পারমিশন চায়।
-” মে আই কাম ইন ম্যাম?”
ভোর চোখ বড় বড় করে পাতার ওপাশে গিয়ে আঁচল দিয়ে মুখটি ঢাকে। পাতা ভ্রু কুঁচকে চায় তার দিকে। ভোর ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করার ইশারা করে। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বলে,
-” ইয়েস কাম ইন।”
সবাই দরজায় তাকায় আগত ব্যাক্তিকে দেখার অভিপ্রায়। পাতাও ব্যতিক্রম নয় সেও চায় সেদিকে। দেখতে পায় ,স্যুটবুট পরা এক লোক ভিতরে আসে। তার ফরমাল ড্রেসাপ চেহারার গাম্ভীর্য ভাব দেখে বোঝা যায় ধর্নাঢ্য পরিবারের কেউ। সে সালাম দেয় প্রিন্সিপাল ম্যামকে। প্রিন্সিপাল ম্যাম সালামের উত্তর নিয়ে হেসে বলে,
-” সিট মি. অরুণ সরকার। হাউ আর ইউ?”
অরুণ পাতার আঁচলে লুকিয়ে থাকা ভোরকে দেখে নেয়। পাশে দাড়ানো রোহানকেও দেখে, তার কপালে ব্যান্ডেজও দেখে নিয়ে বসে যায় চেয়ারে। গাম্ভীর্য বজায় রেখে উত্তর দেয়,
-” আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
-” ভালো। তা আপনি হঠাৎ? কোনো দরকার ছিল বুঝি?”
অরুণ আভারির দিকে তাকায়। আভারি চোখের ইশারায় রোহানকে দেখতে বলে। অরুণ রোহান ও তার মা দুজনকেই দেখে প্রিন্সিপাল কে বলে,
-” ভোর নাকি দুষ্টুমি করেছে?”
প্রিন্সিপাল আভারি ও অরুণের চোখাচোখি দেখে সব বুঝে যায় আভারি নামক লোকটাই ডেকে এনেছে। সে মুচকি হেসে বলল,
-” বাচ্চারা দুষ্টুমি করবে নাতো কারা করবে? বাচ্চার বাবা?”
-” ম্যাম দুষ্টুমি আর কারো মাথা ফাটিয়ে দেয়া আলাদা ব্যাপার! আমার ছেলে দেখে তাকে কিছু বলবেন না এমনটা নয়!”
প্রিন্সিপাল ভ্রু কুঁচকে বলে,
-” আমাকে তোমার পক্ষপাতীত্ব করা ম্যাম মনে হয়? বাচ্চার বাবা তুমি হও আর অন্য কেউ আমার কাছে সব বাচ্চারাই সমান।”
অরুণ এবার খানিকটা নরম হয়ে বলে,
-” আমি সেটা বলতে চাই নি! ভোর ওই ছেলেটার কপালে জখম করিয়ে দেয় নি?”
-” সেটা একটা সামান্য এক্সিডেন্ট। গুরুতর কিছু হয় নি। আর আমরা হ্যান্ডেল করেছি। গুরুতর হলে তোমাকে অবশ্যই জানাতাম। আর আমরা জানি ভোর কেমন। ও কখনো দুষ্টুমি করে না। হি ইজ আ গুড বয়। বকবে না ওকে।”
অরুণ শান্ত হয়। আভারি ফোন করে বলেছিল ভোর নাকি একটা বাচ্চার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। শুনে তার ঘাম ছুটে গিয়েছিল। ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং ছিল তার। মিটিং ক্যান্সেল করে তাড়াহুড়ো করে নিজেই ড্রাইভ করে এসেছে। সে লম্বা শ্বাস নিয়ে উঠে রোহানের কাছে গিয়ে ওর মায়ের কাছ থেকে নিয়ে কোলে তুলে নেয়। কপালে চুমু দিয়ে বলে,
-” স্যরি আঙ্কেল! ভোরের হয়ে আমি স্যরি বলছি। বেশি ব্যাথা পেয়েছো?”
রোহান মাথা নাড়ে পায় নি বেশি। অরুণ মিসেস রুমাকে বলে,
-” আই এম এক্সট্রিমলি স্যরি ফর দ্যাট! আমি ভোরকে বুঝিয়ে বলব। কিছু মনে করবেন না।”
মিসেস রুনা আমতা আমতা করে বলল,
-” ইটস ওকে। স্যরি বলতে হবে না। ভুলে হয়ে গেছে।”
রুমা ঘাবড়িয়ে যায়। এখন ভোরের মায়ের কথা না উঠলে হয়। পাতা নিশ্চুপ হয়ে সব পর্যবেক্ষণ করে। ভোর তার আঁচলে লুকিয়ে। মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে বাবাকে দেখছে। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। পাতা আঁচল টেনে নিয়ে ভোরকে কোলে তুলে নেয়। ভোর পাতার গলা জড়িয়ে গলায় মুখ গুঁজে লুকায়। পাতার সুরসুরি হচ্ছে। সে বলে,
-” ভোর ভয় পাচ্ছ কেন? তোমার বাবা কিচ্ছু বলবে না তো!”
অরুণসহ সবাই পাতার দিকে চায়। পাতা হালকা হাসে। যাকে বলে ব্যাক্কেলের হাসি। পাতা কেমন একটা সিচুয়েশনে পড়লো। এই ছেলেটি এত চিপকু কেন? হোয়াই?
ভোর ফিসফিসিয়ে বলে,
-” না মিস বকবে অনেক। এখানে না বকলেও বাড়িতে গিয়ে বকবে!!”
পাতা অরুণের দিকে চায়। অরুণও তাকায়। দুজনেই অপ্রস্তুত হয়। প্রিন্সিপাল মিস হেসে বলে,
-” ভোর বকবে না। বাড়ি গেলেও না। যদি বকে তাহলে আমায় জানাবে তোমার বাবাকে পানিশমেন্ট দিব! ঠিকাছে?”
ভোর ওভাবেই মাথা নাড়ায়। পাতার কোল থেকে নেমে আভারির কোলে উঠে। অরুণ চোখ মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। আভারিকে যাওয়ার ইশারা করে। আভারি চলে যায়। অরুণ রোহানকে নামিয়ে দিয়ে প্রিন্সিপাল কে বলে,
-” ম্যাম আসি । ভালো থাকবেন। আসসালামুয়ালাইকুম।”
প্রিন্সিপাল মাথা নাড়ে। অরুণ বেড়িয়ে যায়। তার পিছন পিছন পাতাও বেরিয়ে আসে। টিচার্স রুমের সামনে পর্যন্ত দুজন আগে পিছুই যায়। পাতা সেখানে থেমে অরুনকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-” বাচ্চাটাকে বকবেন না। ওর কোনো দোষ ছিল না। আর..”
অরুণ পিছনে ঘুরে হাত ঘড়ি দেখে নিয়ে পাতার দিকে চেয়ে বলে,
-” বাচ্চা আমার, তার ভালোমন্দ দেখার দায়িত্বও আমার।”
বলেই গট গট করে চলে যায়। পাতা আহম্মক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে অপমান করে গেল। টিচার হিসেবে না হয় কিছু বলেছেই, আর বাচ্চাটাও ভয় পাচ্ছিল। তাই! অথচ মুখের উপরে কেমন করে কথা শুনিয়ে গেল।
-” শালা উজবুক। বড়লোক মানুষ অথচ মন ছোটলোক। শালা!”
বিড়বিড় করে টিচার রুমে বসে। একটু পরেই ক্লাসে যেতে হবে।
_____
গাড়িতে পিন পিন নিরাবতা। শা শা করে গাড়ি চলছে। মাঝে মাঝে হর্ণ বেজে চলেছে। আশেপাশের যানবাহনের প্যা পু আওয়াজ ভেসে আসছে। অরুণ শক্ত গম্ভীর মুখে ড্রাইভ করছে। আভারি ও ভোর পিছনের সিটে বসে। ভোর আভারির কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। অরুণ এসির পাওয়ার টা বাড়িয়ে দিল। আভারিকে বলে,
-” ঘটনা খুলে বলো আভারি ভাই?”
আভারি ভোরের মাথায় হাত বুলিয়ে সব খুলে বলে। সব শুনে অরুনের মুখটা নরম হয়ে আসে। শান্ত ভঙ্গিতে দক্ষ হাতে ড্রাইভ করছে। সামনের দিকে চেয়ে বলে,
-” আভারি ভাই আমার ছেলেটা আমার ভাগ্য পেল কেন, বলোতো?”
আভারি অরুণের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি জবাব দিবে? তার নরম মনটা হু হু করে উঠলো। অরুণ জবাবের আশাও করে নি। কি জবাব আছে এর!
কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ির গেটের সামনে আসে। দাঁড়োয়ান সালাম দিয়ে গেট খুলে দেয়। অরুণ গাড়ি নিয়ে গ্যারেজে রেখে নিজেই দরজা খুলে বেরিয়ে পিছনের দরজা খুলে আভারির কোল থেকে ভোরকে কোলে নেয়। কপালে গালে চুমুতে ভরিয়ে দিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নেয়। গ্যারেজ থেকে বের হয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। ড্রয়িং রুমে বসে ছিলেন আসমা বেগম। অরুণের কোলে ভোরকে দেখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
-” অরুণ ভোরের কি হয়েছে? ওর স্কুল তো আরেকটু দেড়িতে ছুটি হয়। আর তুমিই বা অফিস থেকে অসময়ে?”
অরুণ স্বভাবসুলভ তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
-” কিছু হয় নি ছোট মা! পরে কথা বলব। ভোর ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসি।”
বলেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে। নিজের রুমে ঢুকে দরজা পা দিয়ে চাপিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় ভোরকে। পাঁচ বছরের বাচ্চা ভোর। নার্সারিতে পড়ে। অরুণ ভোরের গলার টাই খুলে দিল। পায়ের কেডস ,মুজো, পরনের শার্ট খুলে পাশে রাখে। এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দেয়। তারপর ছেলের শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু দিয়ে ছেলের দিকে তাকায়। কত মিষ্টি ছেলে তার। গোলগাল মুখের আদল। গাল ফুলো, ঠোঁট দুটো টকটকে। চোখ দুটো বড় , চোখের পাপড়ি কালো ঘন। চোখের নিচে গালের উপরের দিকে একটা কালো তিল। ফর্সা আদলে তিলটা যেন ফুটে ওঠে। ফোনের রিংটোনে তার ধ্যান ভঙ্গ হয়। ছেলের চুলের মাঝে হাত বুলিয়ে অরুণ পকেট থেকে ফোন বের করে কানে ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে,
-” স্যার?”
-” বলো সুজন?”
-” স্যার আপনি কি আসতে পারবেন? মি. খসরূল একটু ঝামেলা করছে স্যাডেন মিটিং ক্যান্সেল করায়।”
-” আসছি।”
বলেই কল কেটে। ড্রাইভারকে কল করে।
-” হ্যালো কারিম?”
-” জী স্যার! ”
-” কোথায় তুমি?”
-” ভোর বাবার স্কুলে যাচ্ছি। একটু পরেই ছুটি হবে। কেন স্যার?”
-” সেখানে যেতে হবে না। আমি নিয়ে এসেছি। তুমি বাড়িতে আসো। আমি বেরুবো।”
-” ওকে স্যার।”
অরুণ ফোন কেটে ছেলের গালে চুমু দিয়ে ব্লেজার খুলে ছেলের পাশে শুয়ে পড়ে। একটু বিশ্রাম নেয়া যাক তার ব্যস্ততম রুটিনে।
________
-” আভারি কি হয়েছে?”
আসমা বেগমের কথা শুনে আভারি খানিকটা মাথা তুলে বলে,
-” ভোর বাবা তার বন্ধুর লগে ঝগড়া করছিল। আমি স্যার রে ফোন কইরা বলছিলাম তাই ইস্কুলে গেছিল। আসলে আমি মনে করেছিলাম মারামারি করছে তই জন্যি!”
-” বুঝতে পেরেছি। যাও এখন।”
_____
মরহুম অনিক সরকারের তিন ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে অরুণ সরকার । তার রেখে যাওয়া কম্পানি সামলায়। মেজ ছেলে আরিয়ান সরকার একজন উকিল। আরিয়ান বিবাহিত তার স্ত্রী রুবি একজন ব্যাংকার । দুটো বাচ্চা আছে রুপম ও আর মেয়ে অনিকা। অনিক সরকারের ছোট মেয়ে আদুরি ভার্সিটি পড়ুয়া স্টুডেন্ট। আর তার স্ত্রী আসমা বেগম। তাদের বাড়িতে কাজ করে আভারি ও তার স্ত্রি মিনু। তারা এবাড়িতেই থাকে।
____
আভারি রান্না ঘরে গেলে তার স্ত্রী মিনু বলে,
-” বাজারে যাওতো একটু। ভোর বাবার নুডুলস ফুরাইয়ে গেছে। উঠে খাইবার চাইলে কি দিমু?”
আভারি চলে যায়। বাচ্চাটার জন্য মায়া হয় বেশ।নিঃসন্তান তারা।এই বাচ্চা দিয়েই যেন বাচ্চার অভাব কিছুটা পূরণ হয়। তারা কাজের লোক এবাড়ির! অথচ তাকে ভারি কাক্কু ও মিনুকে খালা বলে ডাকে। সারাটা দিন তাদের সাথেই থাকে। তার আর মিনুর পিছনে ঘুর ঘুর করে। আসমা বেগম বকা দেয় তবুও শোনে না।
____
গ্রীষ্ম কালের বিকেল। কাঠফাঁটা রোদে জনজীবন নাজেহাল। এত গরমে ঘর থেকে বের হওয়াই যায় না যেন। ঘরে বসে ফ্যানের নিচে অবস্থান করেই গা ঘেমে নেয়ে একাকার।তো বাইরের অবস্থা কেমন এটা না বললেই চলে! পাতা নিজের স্কুটিটা বাড়ির সামনে বাগানের ধারে রেখে হেলমেট খুলতে খুলতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেল বাজায়। পাতার মা লাবনী আক্তার দরজার খুলে মেয়েকে দেখে হাসি মুখে বলে,
-” এসে গেছিস?”
পাতা হেলমেট হাতে মাকে ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকে টি টেবিলের উপর হেলমেটটা রেখে জবাব দেয়,
-” দেখতেই তো পাচ্ছো। ”
লাবনী আক্তার দরজা লাগিয়ে এসে বলে,
-” সব সময় ত্যরামো! একটু বাজারে যাতো? কিছু বাজার আনা লাগতো। তোর বাবার আসার দেড়ি আছে অনেক। এখুনি লাগবে!”
পাতা সোফায় বসে মলিন মুখে মাকে বলে,
-” মাত্র আসলাম আমি!লুব ভাই কোথায় তাকে বলো?”
লাবনী আক্তার ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে গ্লাসে ঢেলে পাতার দিকে বাড়িয়ে বলল,
-” লুবমান ঘুমিয়ে আছে। তুই যা না?”
পাতা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে বলে,
-” তো ডেকে দাও?”
-” ছেলেটার ঘুম ভাঙিয়ে দেব? থাক একটু ঘুমাক না! ক্লান্ত হয়তো!
-” তোমার ছেলে ঘরে বসে থেকেই ক্লান্ত হয় আর আমি সারাদিন খেটে এসেও ক্লান্ত হই না তাই না?”
লাবনী ভ্রু কুঁচকে বলে,
-” এসি রুমে বসে বসে বাচ্চাদেরই তো পড়াস! ক্লান্তির কি আছে? আর দু টাকা রোজগার করিস বলে ছেলেটাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবি?”
পাতা শান্ত চোখে মায়ের দিকে চায়। পানি না পান করে টেবিলে রেখে বলল,
-” লিস্ট করো কি কি আনাবে। আমি চেঞ্জ করে আসছি। তোমার ছেলে ঘুমাক।”
বলে উঠে রুমের দিকে যায়। লাবনী আক্তার খাতা কলম বের করে লিস্ট করতে বসে।
চলবে….