#পাতা_বাহার
লেখনী: #বেলা_শেখ
#পর্ব-৩ (প্রথম অংশ)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
শুনশান নিরবতা বিরাজ করছে আশপাশে। অন্ধকার রজনীতে চাঁদের ম্লান আলোয় আবছা আলোকিত পরিবেশ। শস্য শ্যামলা ধানের ক্ষেতে চাঁদের ম্লান আলো পড়ছে। হালকা ঝিরিঝিরি বাতাসে দোদুল্যমান ধানের ক্ষেত, উপরে বড় গোলাকার জোৎস্না! বিশাল সারি সারি ধান ক্ষেতের চতুর্দিকে বড় বড় গাছের ছায়া। তারকারাজি মিটমিটিয়ে হাসছে। এ যেন এক স্বর্গীয় দৃশ্য! বিনা আলোয় ধানের ক্ষেতের মাঝখানে বসে সচক্ষে অনুভূত করলে তনু মন জুড়ে শীতল স্রোত বইয়ে যায়! গা ছমছম করে সাথে অনেকটা ভালোলাগার অনুভূতি।
পাতাদের বাড়ি নগর থেকে খানিক দূরে। রাস্তার ধারে। ফসলি জমি ভরাট করে বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। শুধু তারাই নয় তাদের বাড়ির আশেপাশের সব বাড়িই ফসলি জমিতে। বাড়ির পিছনেই ফসলি ক্ষেত। পাতাদের একতলা বাড়ি। পাতা বিছানায় শুয়ে আছে। তার বিছানার সাথেই জানালা। সেই জানালায় বাইরের স্বর্গীয় দৃশ্যবলী দেখা যাচ্ছে। চাইলেই সে গিয়ে অনুভবও করতে পারে। কিন্তু সে খুবই ভিতু তাই একা যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভবই বলা যায়। তার রুমের আলোও জ্বলছে। সে আলো জ্বালিয়েই ঘুমোয়! অন্ধকারে তার ফোবিয়া আছে। আর তাছাড়াও তার যাওয়ার মন নেই। সে জানালার দিকে আরেকটু সেটে যায়। এক হাত জানালার গ্রিলে রাখে। মায়ের কথাগুলো কানে বাজছে এখনো। তার জীবনটা এমন কেন? সব থেকেও যে তার কিছুই নেই! বড় দুই ভাই বোনের মতো বাবা মার কাছে আবদার করতে পারে না! তাদের মতো ভালোবাসাও পায় না। আদৌ তাকে ভালোবাসে তো! ভালোবাসলে নিশ্চয়ই জন্মের পর অন্যের কাছে রেখে আসতো না!
এভাবে যেকোনো ডিভোর্সি লোকদের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগতো না। এমন না যে সে তাদের উপর বোঝা হয়ে আছে। মাস শেষ বিশ হাজার টাকার ষোলো হাজার মায়ের হাতে দেয়। নিজের হাতখরচা বাবদ চারহাজার রাখে। এবাড়িতে সে এক আগাছার মতো । যাকে তার বাবা মা চায় নি। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এসে গেছিল। কেটে দূরেও ঠেলে দিয়েছিল! কিন্ত বোঝা স্বরুপ আবার ঠায় হয়। পাতার একটা সংসারের শখ। সে নিজের একটা সংসার চায়। যেখানে সব তার হবে। কেউ দূরছাই করতে পারবে না। একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী! যে তাকে আগলে রাখবে! তার জন্য একটু পাগলামি করবে! রোমান্টিক হবে! তাকে চোখে হারাবে! আর. আর. আরো অনেক কিছু! শশুর, শাশুড়ি, ননদ ,দেবর! সবাই তাকে স্নেহ সম্মান দুটো করবে। তার সে স্বপ্ন বোধহয় স্বপ্নই থেকে যাবে। তার কপালে বোধহয় কোনো ডিভোর্সিই নাচছে। তার ভালো সম্বন্ধ আসে নি এমন না! এসেছে বেশ কিছু। তবে তাদের চাহিদাও অনেক। আজকাল তো যৌতুক নেই! সেটা উঠে গেছে। এখন তো শুধু পাত্রের মুরুব্বি গোছের লোকেরা পাত্রীর ভালোর জন্য ,ভালো থাকার জন্য উপহার চায়! এই যেমন- ‘ছেলের ঘর সাজানোর জন্য সোফার সেট! ড্রেসিন টেবিল! আলমারি! সহ আরো বিভিন্ন সামগ্রী! এগুলো তো আপনাদের মেয়েরই থাকবে! শুধু ছেলের জন্য মটরসাইকেল!’
‘ছেলের চাকরি নিতে অনেক টাকা দিতে হয়েছে আপনারা কিছু হেল্প করুন। এই যেমন দশ বিশ লাখ! কামাই করে তো আপনার মেয়েকেই খাওয়াবে!:
‘ ছেলের চাকরি কনফার্ম। শুধু কিছু টাকা দিলেই জয়েন করবে! আমরা জোগাড় করেছি শুধু কিছু টাকা শর্ট আছে। আপনারা বারো লাখ দিন। সব সেটেল্ড।’
পাতার হাসি পায়। কি অভিনব পদ্ধতি যৌতুক নেয়ার!
_______
রাতের খাবার খেতে বসেছে সরকার পরিবার। সকলেই উপস্থিত আছে ভোর ছাড়া। অরুণের ছোট বোন আদুরি বসেছে অরুণের পাশে। সে প্লেটের রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে অরুণকে বলল,
-” বড় ভাইয়া আমার কিছু টাকা লাগবে। আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে ট্যুরে যাবে। কক্সবাজারে! আমিও যাবো! তোমরা কিন্তু না করতে পারবে না। না করলেও শুনবো না। চাঁদা এখনো ঠিক হয় নি। তবে বড় ভাইয়া চাঁদার টাকা তুমি দেবে। আর এডভোকেট সাহেব আপনি শপিং আর হাত খরচ দিবেন। আগেই বলে রাখলাম কিন্তু?”
আসমা বেগমের পছন্দ হলো না।তিনি মেয়েকে বললেন,
-” আদু কক্সবাজার অনেক দূরে। আর ভার্সিটি থেকে অনেক ছেলেপেলে যাবে! আজকালকার ছেলেদের ভরসা নেই। আর তোর বান্ধবীরাও কেমন যেন! ওদেরও ভরসা নেই। কোথাও যাওয়া হবে না তোর!”
আদুরির খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। চোখ ভরে আসে। নাক টেনে বলে,
-” মা আমি এখন ছোট নই । নিজের খেয়াল রাখতে জানি। আর আমাদের স্যারেরাও যাচ্ছে। আর ভাইয়ারাও তো গিয়েছিল তাদের সময়। আমিও যাব! আরিয়ান ভাইয়া বোঝাও না মাকে?”
আরিয়ান মাকে বোঝায়,
-” মা যাক না! এখনই তো ওদের এনজয় করার সময়! ঘুরতে গেলে এক্সপেরিয়েন্স হয়! আর স্যারেরা যাচ্ছে তো। আমি ওর স্যারদের সাথে কথা বলে নেব! কোনো প্রবলেম হবে না!”
অরুণ বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বলে,
-” ছোট মা যেতে দাও! ছোটু খুবই স্ট্রং। নিজের প্রটেক্ট নিজেই করতে জানে। আর স্যারেরা সেফটি নিয়েই যাবে। ছেলে মেয়েদের বাস আলাদা আলাদা ভাবে যাবে।তাই না?”
আদুরি মাথা নাড়িয়ে জানায় আলাদাই যাবে।
আসমা বেগম খানিকটা নরম হয়ে বলে,
-” আচ্ছা তোমরা যখন বলছো তবে যাবে! তবে কোনো সমস্যা হলে দেখিস কি করি আদু?”
আদু হেসে ভাইদের ইশারা করে ধন্যবাদ জানায়। মাকে বলে,
-” ইনশাআল্লাহ কিছু হবে না মায় সুইট মম!”
আসমা বেগম মুচকি হাসে। অরুণের দিকে চেয়ে বলে,
-” ভোরকে ডাকো খেয়ে নিক। তখন ওভাবে মেরে একদম ঠিক কর নি!”
অরুণ এখনো প্লেটে খাবারে হাত দেয় নি। মিনু সবার প্লেটেই দুটো করে রুটি, অমলেট আর মাংসের ঝুড়া ভাজি দিয়েছে। সবার আলাদা বাটিতে ডালও দিয়েছে। রুবি মেয়েকে কোলে বসিয়ে রুটি ছোট ছোট করে ছিঁড়ে খাইয়ে দিচ্ছে। রূপম ঘুমিয়ে। সে অরুণের দিকে তাকিয়ে বলে,
-” ভাইয়া আপনি কাজটা ভালো করেন নি! ভোর আনিকা দুজনেই ছোট। খেলতে খেলতে পড়ে গেছে হয়তো! ওদের ছোটদের মধ্যে বাজবে! ওরাই আবার গলা জড়িয়ে ঘুরবে! তাই বলে ছেলেটাকে মারবেন? আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি!”
অরুণ গম্ভীর। রুবির কোলে আনিকার দিকে চায়।
-” ওটা প্রাপ্য ছিল ওর। আনি মামনির অনেকটা লেগেছে। আর শাসন না করলে পরবর্তীতে আরো বেশি দুষ্টুমি করবে। পরে নাগাল না পাওয়া যায়!”
আরিয়ান পানি পান করে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
-” বুঝতে পারছি। তুই আমাদের উপরের রাগটা বাচ্চাটার উপর ঝাড়লি! আমি আর মা ওভাবে বলি নি তোকে!”
অরুণ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
-” কি বলছিস এসব! মোটেও না। আসলে ও স্কুলেও একটা ছেলেকে ধাক্কা দিয়েছিল। ছেলেটার কপাল কেটে গেছে অল্প! আবার বাড়িতেও! তাই রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল! মিনু আপা যাও ভোরকে ডেকে আনো?”
মিনু পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। অরুণের কথায় চলে যায়। আদুরি কাঠের টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে গালে হাত দিয়ে বলে,
-” বড় ভাইয়া? এভাবে আর কতদিন চলবে? তোমার পুরো লাইফ পড়ে আছে এখনো। ভোরটাও ছোট্ট। তোমার বিয়েটা করে নেওয়া উচিত! তিন বছর কম সময় না!”
অরুণ শান্ত দৃষ্টিতে আদুরির দিকে চায়। বাকি সবাই অরুণের দিকে। অরুণ কিছু বলে না। কি বলবে! রুবি মেয়েকে পানি পান করিয়ে গ্লাস টেবিলে রেখে বলে,
-” ভাইয়া আদুরি ঠিক বলেছে। তিন বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ আপনি তিন বছর আগেই আটকে আছেন! আপনি কি বর্ষা ভাবির জন্য এখনো ওয়েট করে আছেন? তাকে আবার ফিরিয়ে আনার…”
তাকে থামিয়ে দিয়ে অরুণ চোয়াল শক্ত করে বলে,
-” ডোন্ট কল হার ভাবি। সি ইজ নাথিং টু মি।একবার থুতু ফেললে সে থুতু তুলে পুনরায় কেউ মুখে আনে না।”
আরিয়ান মুচকি হাসে। তার ভাইকে সে চেনে।আগা গোড়া জেদ আর গোস্বায় ভরা। প্রাক্তন প্রেমিকা ,স্ত্রী যেটাই বলুক হাজার পায়ে পড়ে মাফ চাইলেও ফিরে চাইবে না।সে সিরিয়াস হয়ে বলে,
-” তাহলে মুভ অন কর? তোর প্রাক্তন তো নেক্সট ইয়ারেই নতুন বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছিল। শুনেছি বিয়েও করেছে! বাচ্চাও আছে মে বি! অথচ তুই? দেখ এভাবে একা থাকা যায় না। এখন কোনো মতে চালিয়ে নিলেও কয়েকবছর পর বুঝতে পারবি জীবনে লাইফ পার্টনার কতটা ইম্পর্টেন্ট। জীবনে একা চলা কষ্টকর। ছেলে নিজের লাইফ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে! আর তুই একলা! একাকিত্বের গভীরে ডুবে যাবি! ভাই যে একা থাকে সেই বোঝে একাকিত্বের যন্ত্রণা! আমি তুমি সেটা ভাবতেও পারি না। মানব জীবনে সবাই স্বার্থপর! এই যে আমরাও তো! ছেলে মেয়ে বড় হবে! ভালো পড়ালেখার ফেসিলিটির জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হবে!চলেও যাবো। তুই একা হয়ে যাবি না?”
অরুণ রুটি নাড়াচাড়া করছে। একাকিত্ব কতটা ভয়াবহ কিছুটা হলেও অনুভব করেছে এমনকি করছেও।
আসমা চুপ করে ছিলেন এতক্ষণ। এবার তিনিও মুখ খুললেন,
-” আচ্ছা তুমি একাই কাটিয়ে দিলে পুরোটা জীবন! কিন্তু ভোর? দুই আড়াই বছর বয়সেই মা ছেড়ে চলে গেছে। মায়ের ভালোবাসা মমতা কতটুকু পেয়েছে? আর পাঁচটা ছেলের মতো ও তো মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার রাখে! নিজের জন্য না হলেও ওর জন্য একটা মা তো আনতেও পারো?”
অরুণ আসমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে,
-” পারি! কিন্তু সেটা সৎ মা হবে। আর সেই মা ওকে মা’য়ের মতই ভালোবাসবে তার তো গ্যারান্টি নেই তাই না ছোটমা?”
আসমা বেগমের মুখটা মলিন হয়ে যায়। অরুণ খানিকটা হাসে। আদুরি বলে,
-” ভাই আমরা দেখে শুনে খোঁজ খবর নিয়ে তবেই না আনবো নতুন ভাবি?”
__
-” আব্বা? তোমার আব্বায় ডাকে খাইয়ে লও?”
ভোর পরনের গেঞ্জিটা টেনে চোখ মুছে নাক মুছলো। মিনু এগিয়ে এসে আঁচল দিয়ে মুছে দেয়। তখন ওভাবে ভোরকে নিয়ে সরাসরি রুমে আসে। যে যাই বলুক না কেন ছেলেটাকে সে ছেলের মতো ভালোবাসে। ছোট্ট ভোর কাঁদতে কাঁদতে তাকে বলছিল,
-” আমি কিছু করিনি খালা!”
মিনু তাকে শান্ত করায় বুকে জড়িয়ে।ভোর শান্ত হয় তবে একটু পরপর ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
-” আমি খাব না খালা! তুমি যাও!”
মিনু হেসে তার গালে চুমু দিয়ে বলে,
-” ভোর আব্বা তোমার বাবা তাইলে আরো রাইগে যাইবে! চল?”
ভোর মুখ ফুলিয়ে বিছানা থেকে নামলো। মিনুর পিছু পিছু চলল।
___
অরুণ আদুরির কথায় ভ্রু কুঁচকে চায়
-” আমি এখনি ওসব ভাবতে চাচ্ছি না!”
আরিয়ান মুখে রুটি পুরে বলে,
-” তোকে ভাবতে হবে না। তুই শুধু কবুল বলবি ব্যস। ভালো ভাবি খোঁজার দায়িত্ব আমাদের! যে ভোরকেও ভালোবাসবে আর তোকেও!”
বলেই মুচকি হাসে। আদুরিসহ বাকি সবাই হাসে। আসমা বেগমের মুখটা খানিক মলিন। অরুণ চোখ রাঙায় ওদের, ওরা থোরাই কেয়ার করে। অরুণ ভোরকে মিনুর পিছন পিছন আসতে দেখে বলে,
-” ভোরের সামনে যেন এসব কথা না ওঠে!”
রুবি বলে,
-” কেন? ওর আগে জানা উচিত ভাইয়া! নইলে বাজে ইফেক্ট পরবে!”
-” সময় হোক!”
বলে ভোরের দিকে চায় অরুণ। চোখ নাক মুখ ফুলে লাল টকটক অরছে যেন টোকা দিলেই রক্ত বেরোবে। টি শার্টে সর্দি লেগে আছে। তার বুকটা ভারি হয়ে যায়। ছেলেটাকে ওভাবে মারা বড্ড অনুচিত হয়েছে।ভোর বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে এই আশায় যে নিত্যদিনের মতো তাকে ডেকে কোলে বসিয়ে আদর করে খাইয়ে দিবে। কিন্তু বাবা কিছু না বলায় ছোট্ট ভোর নাক টেনে চেয়ারে বসে। কাঠের ডাইনিং টেবিল সাথে কাঠের বড় বড় রাজকীয় কেদারা। ভোর সেথায় বসলে শুধু মাথা টুকু দেখা যায়। তাই দাঁড়িয়ে পড়ল সে, দাঁড়িয়েই খাবে। অরুণ ছেলের অভিমান বোঝে।
-” আমার কাছে আসো খাইয়ে দিচ্ছি!”
ভোর মনে মনে বেশ খুশি হয়। নামতে নিবে তখনই আদুরি গিয়ে ভোরকে কোলে নিয়ে গালে চুমু দিয়ে বলে,
-” রাজকুমারকে আজ আমি খাইয়ে দিব! কেমন হবে?”
আদর পাগল ভোর খুশি হয়ে বলে,
-” খুব ভালো!”
আদুরি অরুণের পাশে বসে ভোরকে কোলে বসিয়ে অল্প রুটি ছিঁড়ে অমলেট দিয়ে খাইয়ে দেয়। ভোর হাসিমুখে খেয়ে নেয়। একটু আগের কথা যেন ভুলেই বসেছে। অরুণ ছেলের খাওয়া দেখে তবেই মুখে রুটি তোলে। এতক্ষণ তার গলা দিয়ে খাবার নামতো না।
আরিয়ানের খাওয়া শেষ। সে চেয়ারে পা তুলে বসে আনিকাকে কোলে নেয়। সে ঘুমিয়ে। রুবি খাওয়া শুরু করে। আরিয়ান বলে,
-” ভোর বাবা তোমার মা চাই?”
ভোর বোঝে না। তার প্রশ্নত্তক চাহনি দেখে আরিয়ান পুনরায় বলে,
-” আম্মু চাই তোমার?”
ভোর বাবার দিকে চায়। অরুণও তার দিকেই চেয়ে।
-” আব্বু তো বলে আব্বুই আব্বু আবার আব্বুই আম্মু!”
অরুণ প্লেটে নজর দেয়।আরিয়ান হেসে বলে,
-” তোমার জন্য তোমার আব্বু একটা ভালো আম্মু নিয়ে আসবে। যে তোমাকে অন্নেক আদর করবে ও ভালোবাসবে!”
ভালোবাসা ও আদরের কথা শুনে ভোরের চোখ যেন উজ্জীবিত হয়ে উঠে।
-” সত্যি?”
আরিয়ান মাথা নাড়ল। ভোর খুশি হয় বেশ। বাবার দিকে কয়েকবার পিটপিট করে চায়।অরুণ তাকায় না। খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। ভোর অল্প খেয়েই আভারির ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। অরুণ খেয়ে নিয়ে ভাইয়ের সাথে টুকটাক কথা বলে আভারির দোরে গিয়ে কড়া নাড়ে।আভারি ভিতর থেকে আওয়াজ দেয়,
-” ভিতরে আসুন স্যার!”
অরুণ ভিতরে ঢুকে। ভোর উপুড় হয়ে বালিশে মুখ লুকিয়ে শুয়ে আছে। অরুণ ডাক দেয় ছেলেকে।
-” ভোর? আব্বু?”
ভোর ওভাবেই শুয়ে থাকে। সারা দেয় না।অরুণ আরো কয়েকবার ডাকে। আভারি বলে,
-” ঘুমিয়েছে বোধহয়!”
অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভোরকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা দেয়। ভোর তবুও নড়ে না। রুমের কাছাকাছি গিয়ে অরুণ ফিসফিসিয়ে বলে,
-” আমি জানি তুমি ঘুমাও নি!”
ভোর হালকা নড়ে ওঠে। অরুণের গম্ভীর মুখশ্রীতে হালকা হাসির রেখা ফুটে । তবে সেটা ক্ষিণ। ভিতরে নিয়ে গিয়ে ওয়াশ রুমে গিয়ে ভোরকে ব্রাশ করিয়ে দিয়ে নিজেও ব্রাশ করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। ভোর চোখ বুজেই ছিল । শুধু ই- করে দন্তপাটি বের করেছিল। অরুণ ছেলেকে শুইয়ে দিয়ে পরনের টি শার্ট খুলে লাইট ওফ করে ছেলের পাশে শোয়। ভোর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে। অরুণ ডাক দেয়,
-” আব্বু? ভোর? আমার জান? আমার সোনা? আমার মানিক? আমার কলিজা?”
এতো নরম এত মোলায়েম আদুরে কণ্ঠ কেউ কখনো শুনেছে অরুণের মুখে ?নাহ উপর ওয়ালা আর ভোর ছাড়া ছাড়া কেউ না! ভোর তবুও সারা দেয় না। অরুণ তাকে টেনে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেয় শক্ত করে। ভোর ছোটাছুটি করে না। শান্ত হয়ে বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে থাকে। অরুণ ছেলের মাথা তুলে পুরো মুখ জুড়ে চুমু খায়। ভোরের পরনের টি শার্ট খুলে দিয়ে বাহুতে ঠোঁট বুলিয়ে বলে,
-” আব্বু খুব স্যরি আব্বু! অনেক ব্যাথা পেয়েছো? হুম? তুমি আনি মামুনিকে ফেলে দিয়েছো কেন? ও তো অনেক ব্যথা পেয়েছে। হাত ছিলে গেছে। আব্বু? আব্বু?”
অরুণ বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
-” ফেলে দেই নি আমি তোমার মামুনিকে!”
বলে অরুণের ঘারে মুখ গুজে সব কিছু খুলে বলে। অরুণ সব শুনে ছেলেকে আরেকটু মিশিয়ে নেয়। মাথায় চুমু দিয়ে বলে,
-” এই কথাগুলো তখন বলতে পারো নি? আর তখন ওভাবে আনিকে রেখে চলে আসা ঠিক হয় নি তোমার!”
ভোর বাবার ঘার থেকে মাথা তুলে বাবার পেটের উপর বসে গাল ফুলিয়ে বলে,
-” তোমার মতে আমি তো কিছুই ঠিক করি না ! হুম!”
অরুণ হেসে ভোরের পেটে কাতুকুতু দেয়।
-” আব্বু এটা কিন্তু ঠিক না?”
বলেই খিলখিলিয়ে হাসতে লাগলো। তার হাসি যেন থামছেই না। হাসছে আর ছটফট করছে কাতুকুতুর চোটে। ছেলের হাসিতে অরুণের বুকটা খানিক হালকা হয়। কাতুকুতু দেয়া থামিয়ে ছেলেকে বুকে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। ভোর বাবাকে জড়িয়ে থাকে। ওভাবেই শুয়ে থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করে,
-” আব্বু তুমি সত্যিই আমার জন্য আম্মু আনবে?”
অরুণের হাত থেমে যায়। ভোর আবার বলে,
-” তাহলে খুব ভালো হবে। সবার মতো আমারও আম্মু হবে! ইয়ে! আমাকে অনেক ভালোবাসবে! খাইয়ে দেবে! ঘুম পাড়িয়ে দেবে! গোসল করিয়ে দেবে! স্কুল ড্রেস পড়িয়ে দেবে আবার পাল্টিয়েও দেবে! চাচিমনি যেভাবে আনি ও রুপকে আদর করে আমাকেও করবে! আমরা একসাথে কার্টুনও দেখবো একসাথে। রাতে তুমি আম্মু আর মাঝখানে আমি ঘুমাবো। আমি আম্মুর বুকে ঘুমাবো তোমার বুকেও ঘুমাবো তবে বেশিক্ষণ কিন্তু নয়! তুমি রাগ করবে আব্বু? রাগ করবে না কিন্তু!”
আরো কতশত বায়না তার মা’য়েকে ঘিরে অথচ তার নির্দয় জন্মধারীনি এই ছোট্ট মাসুম বাচ্চাকে রেখে কিভাবে ডিভোর্স নিয়ে চলে যায় বিদেশ ভুঁইয়া! ক্যারিয়ার শক্ত করতে!
আর ছেলেটা মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার কত আকাঙ্ক্ষায়!কি করবে সে! ভাবতে ভাবতে চোখের কার্নিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু বেয়ে পড়ে।
চলবে ….
#পাতা_বাহার
লেখনীতে :#বেলা_শেখ
#পর্ব-৩ ( শেষ অংশ)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
সকাল বেলা। আজ সূর্য মামার দেখা নেই।মেঘে ঢাকা দিগন্ত। কেমন একটা গম্ভীর ভাব বিরাজমান। তবে সরকার বাড়িতে রোজকারের মতো পাখির কলকাকলিতে মুখরিত সাতসকাল। অরুণ সরকার রোজকারের মতো ফজর ওয়াক্তেই ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে হাঁটতে বের হয়। আজও তার ব্যতিক্রম হয় নি। একঘন্টা হেঁটে বাড়ি ফিরে গোসল সেরে নেয়। আগে নিয়মতান্ত্রিক জিমে গেলেও এখন আর যাওয়া হয়ে ওঠে না। বাড়িতেই জিমের কিছু যন্ত্রপাতি যেমন ট্রেডমিল, ডাম্বেল ইত্যাদি আছে সেগুলোও ব্যবহার করা হয় না আজকাল ব্যস্ততার ভিড়ে। অরুণ গোসল করে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ভোরকে কয়েকবার ডাক দেয়! ভোর বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতে আবার যেমন তেমনি। অরুণ ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়ায় পাশে তাকাতেই টবের দিকে নজর আসে। তাদের বাড়িতে অধিকাংশ ফার্নিচার কাঠের। বাবার ডিজাইন করে বানানো। আর রুমের ভিতরে, বেলকনিতে ড্রয়িং রুমে প্রায় সব খানেই টবে গাছ লাগানো! সে টবে বিভিন্ন ধরনের ফুল, ঔষধি গাছ। অরুণের রুমেও আছে বেশ কয়েকটি আর বেলকনি জুড়েও! কলিয়াস, জিজি প্লান্ট, ফিগ প্লান্ট, এরিকা পাম, এলোভেরা, স্পাইডার প্লান্ট, ফিলোডেনড্রন ইত্যাদি। অরুণ ওয়াশরুম থেকে মগ ভর্তি পানি এনে গাছ গুলোতে দেয়। অল্প পানি হাতে নিয়ে ঘুমন্ত ছেলের মুখে ছিটিয়ে বলে,
-” আব্বু ওঠো? সকাল হয়েছে সেই কখন! স্কুলে যেতে হবে তো!”
ভোর পিট পিট করে চোখ খুলে উঠে বসে হাই তুলতে তুলতে বলে,
-” এত জলদি সকাল হয়ে গেল? একটু আগেই না ঘুমালাম!”
অরুণ পানির মগ রেখে এসে ভোরকে কোলে নিয়ে বেলকনিতে যায়!
-” দেখ সকাল হয়ে গেছে! যদিও তোমার সূর্য মামা আজ ওঠেই নি!”
ভোর বাবার কাঁধে মাথা রেখে বলে,
-” আব্বু ঘুম পাচ্ছে আমার!”
অরুণ হেসে ছেলের পিঠে চাপড় দিয়ে বলে,
-” চলো তোমাকে গোসল করিয়ে দেই! ঘুম পালিয়ে যাবে!”
-” না না আব্বু! এখন করবো না গোসল। স্কুল থেকে ফিরে করব। তখন অনেক গরম লাগে!”
-” এখন গোসল করলে স্কুলে ভালো লাগবে। সেখানেও তো গরম। সকাল বেলা গোসল করলে সারাদিন মনটা ফুরফুরে থাকে আব্বু। আর তাছাড়াও দুপুরে তোমায় কে গোসল করিয়ে দেবে?”
ভোরের মুখটা মলিন হয়ে আসে। তার মলিন মুখ দেখে অরুণের মন খারাপ হয়।
-” আব্বু আমি একাই করে নেব গোসল!”
অরুণ রুমে ঢুকে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে,
-” কখনো একা একা গোসল করার চিন্তা মাথায় আনবে না। তুমি খুব ছোট! বাথরুমে সাবান পানি মাখিয়ে ফেলো। পা পিছলে গেলে? তাছাড়া ফ্লোরটাও পিচ্ছিল!”
ভোর মাথা নাড়ে।
-” আব্বু দাদিকে বললে গোসল করিয়ে দেবে তো!”
অরুণ ছেলেকে বাথরুমের ছোট টুলের উপর বসিয়ে দিয়ে কল ছাড়ে বালতি ভরতে। মলিন মুখে বলে,
-” তোমার দাদি বয়স্ক মানুষ! ছোটমাকে কাজে বলা ঠিক হবে? তার তো এখন রেস্ট করার সময়!”
-” দাদি তো আনিকা রুপমকেও গোসল করিয়ে দেয়! আমাকে দিলে কি এমন হবে!”
অরুণ ভোরের গায়ে পানি দিয়ে বলে,
-” আমি করিয়ে দিচ্ছি তো আব্বু।”
ভোর মুখ গোমড়া করে বলে,
-” বুঝতে পেরেছি! তোমার মাকে দিয়ে কাজ করাব বলে তোমার হিংসে হচ্ছে! আমার আম্মুকে আসতে দাও? আম্মুকে বলব শুধু আমার কাজ করবে ,আমাকে ভালোবাসবে! আব্বুর কাজ করবেও না , ভালোও বাসবে না!”
অরুণের হাত থেমে যায়। শান্ত দৃষ্টিতে ছেলের মাসুম নিষ্পাপ মুখশ্রীর দিকে চায়। যেই মুখশ্রী তাকে এক আকাশ সমান ভালোবাসার আভাস দেখা দেয়,যে মুখশ্রী তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন! আবার সেই মুখশ্রীই তাকে যন্ত্রণার সমুদ্রের গভীরতায় নিক্ষেপ করে! দেখিয়ে দেয় সে কতটা হতভাগা ছেলে সাথে বাবাও !
_____
পাতা স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নেয়। তাদের স্কুলে স্টুডেন্টসদের সাথে সাথে টিচারদেরও নির্ধারিত ড্রেস আছে। ছেলে বাচ্চাদের স্কাই ব্লু শার্ট কালো প্যান্ট আর মেয়ে বাচ্চাদের স্কাই ব্লু স্কার্ট , হোয়াইট শার্ট ও প্যান্ট। সোল্ডার, বেল্ট, টাই এগুলো নেভি ব্লু। আর টিচারদের স্কাই ব্লু রঙের শাড়ি সাদা ব্লাউজ মেয়েদের সালোয়ার কামিজ বা বোরখাও পড়তে পারে নিয়ম মেনে আর ছেলেদের কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট। পাতা শাড়ি পরে মাথায় হিজাব বেঁধে নেয়। হাতে ঘড়ি পড়ে হ্যাঙ্গিং ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তুলে নিয়ে পানির পটটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে আসে। তার মা লাবনী আক্তার রান্না করছে। পাতার স্কুল বাসা থেকে একটু দূরে হওয়ায় জলদি বের হতে হয়। পাতা পটে পানি ভরতে ভরতে বলে,
-” মা রান্না কতদূর? আমি কি টিফিন নিয়ে যেতে পারবো?”
লাবনী আক্তার কড়াইয়ে ডিম ছেড়ে খুন্তি দিয়ে উল্টাতে উল্টাতে বলল,
-” কাজের মেয়ে পাইছোস আমায়! একটা কাজ করবি না শুধু তৈয়ার তা খাবি! সকালে উঠে কাজে তো একটু হাতও বাটাইতে পারিস! তা না! খিচুড়ি রেঁধেছি ডাল চাউল দিয়ে! ডিম ভাজছি।বাটি এনে নিয়ে যা। আর শোন র্য্যাকের ভিতরে কেকের প্যাকেট আছে দুই পিস খেয়ে পানি খেয়ে যা!”
পাতার মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। একটু যত্নে তার তনুমনে ভালোলাগা ছেয়ে গেলো। সচরাচর সে সকালে হালকা পাতলা বাসি খাবার খেয়েই বেড়িয়ে যায়। লাবনী আক্তার রান্না শেষ হতে তার অনেক দেড়ি হয়ে যায় । তাই ঘরে যা থাকে তাই মুখে দিয়ে যায়। স্কুল তিনটা পর্যন্ত। সব টিচার টিফিন নিয়ে যায়। সেও নিয়ে যায় বাড়ি থেকে, যেদিন রান্নাটা জলদি হয়। নইলে হোটেল থেকে রুটি অমলেট বাটিতে ভরে নিয়ে যায়।
আজ অনেক দিন পর বাড়ি থেকে টিফিন নিবে। লাস্ট কবে নিয়েছিল সে ভূলেই গেছে। সে টিফিন বক্স নিয়ে আসে। লাবনী আক্তার বক্সে খিচুড়ি দিয়ে অর্ধেক ডিম ভাজি দেয়। পাতা খুশি হয়। যদিও খিচুড়ি তার একটুও পছন্দ না। পাতা বক্সের ঢাকনা খুলে রেখে ড্রয়িং রুমের টি টেবিলে রাখে ফ্যানের নিচে একটু ঠান্ডা হওয়ার জন্য। যে গরম গন্ধ না উঠে যায়। তারপর কেকের প্যাকেট থেকে দুই পিস কেক নিয়ে বাকিটা রেখে আসে। কেক খেয়ে পানি পান করে।
আতিকুর রহমান রুম থেকে বেরিয়ে খবরের কাগজ সহ ড্রয়িং রুমে বসে। পাতার দিকে তাকিয়ে বলে,
-” তোমার আব্বু ফোন করেছিল!”
পাতার গলায় পানি আটকে যায়। বিষম খায়। পানি ছিটিয়ে পড়ে বাইরে। আতিকুর রহমান নাক সিঁটকায়। পাতা নিজের মাথায় আলতো করে থাপ্পড় দিয়ে কেশে নিজেকে সামলে বলে,
-” কি বললো?”
আতিকুর রহমান পেপার মেলে মুখের সামনে ধরে বলে,
-” তোমায় কিছুদিনের জন্য ওবাড়ি যেতে বললো!”
-” আব্বু স্কুল ছুটি নেই এর মধ্যে। আর ওখান থেকেও বেশ দূরে হয়। ছুটি হলে পড়ে যাবো।”
-” তাহলে তার সাথে কথা বলে নিও!”
আতিকুর পেপারে নজর রেখেই বলে। পাতা মাথা নাড়ে। লুবমান সোফায় বসে বলে,
-” খালু শুধু তোকেই যেতে বলে পাতু, অথচ তুই কর্মজীবী ব্যস্ত নারী। আমি বেকার আমায় তো বলে না!”
পাতা টিফিন আটকে নিয়ে ব্যাগে ভরে বলে,
-” বুঝলি ভাই! সব মায়া! এককালে পালিত মেয়ে ছিলাম তাদের ঘরে! ওখানেই বড় হয়েছি। মেয়ের মতোই ভালোবাসতো। নিজের ছেলে মেয়ে আসায় ভালোবাসা কমতে থাকে। তবে একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। এখনো একটু হলেও বাসে! আব্বু ভাই আসছি আমি!”
বলেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হয়ে যায়। আতিকুর রহমান পেপার নামিয়ে পাতার প্রস্তান দেখে। লুবমান বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
-” বাবা পাতাকে খালা খালুকে না দিলেও পারতে! ওতটাও অভাব ছিলো না তোমার!”
_____
ব্যাস্ত সড়ক। শা শা গাড়ি চলছে পুড়ো রাস্তা জুড়ে। যাত্রি পার হওয়ার অবকাশ নেই। মেইন রোড বলে কথা। যাত্রি পার হওয়ার জন্য জেব্রাক্রসিং নেই তবে নির্দিষ্ট দূরত্বে ওভার ব্রিজ আছে উপর দিয়ে শুধু মানুষ চলাচলের জন্য। সিগন্যালও আছে। পাতা সিগনালে বাইকে বসে। আশে পাশে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ তাকে ডাকছে বেশ সময় ধরেই এমন ফিল হচ্ছে। কিন্তু নাহ কাউকেই নজরে আসে নি। পাতা হেলমেটের গ্লাস উঠিয়ে পাশে তাকায়! তখনই শুনতে পায় কেউ সত্যিই ডাকছে। ছোট ছোট হাত নাড়িয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকছে,
-” মিস? পাতা মিস? এই দিকে তাকান? আমি ভোর? মিস?”
চারপাশের হর্ণ মানুষ, যানবাহনের শব্দে আওয়াজ বেশি শোনা যাচ্ছে না। পাতা সরু নজরে চায়। প্রাইভেট কারের জানালার গ্লাস অর্ধেক উঠানো। সেই ফাঁকের মধ্যেই হাত বের করে ডাকছে! কেউ বার বার তাকে ভিতরে নেয়ার চেষ্টা করছে। ভোর শুনছেই না।
সিগন্যাল শেষ হয়ে যাওয়ায় সব গাড়ি চলতে থাকে। পিছনের গাড়ির হর্ণের আওয়াজে পাতা বাইক স্টার্ট করে ফুটপাতের সাইড দিয়ে ধীরে চালাতে থাকে। ভোরদের গাড়ির স্পিডও কমে পাতার বাইকের সামনে থেমে যায়। পাতা বাইক নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াতেই ভোর মাথা বের করে বলে,
-” আসসালামুয়ালাইকুম মিস! কেমন আছেন? আপনাকে কখন থেকে ডাকছি শুনছেন’ই না! আমার গলা ব্যথা হয়ে গেছে।”
পাতা সালামের উত্তর নিয়ে হাত বাড়িয়ে ভোরের গাল টিপে বলে,
-” শুনতে পাই নি আমি। তবে মনে হচ্ছিল কেউ ডাকছে আশেপাশে তাকিয়েও ছিলাম। তা ভোর সরকার কেন ডাকছিলে?”
ভোর মিষ্টি হেসে বলে,
-” এমনিতেই! মিস আপনার বাইকে আমায় লিফট দিবেন?”
পাতা তার গাল টিপে বলে,
-” কেন নয়! তবে আপনি তো গাড়িতেই যাচ্ছিলেন! কোনো সমস্যা?”
ভোর মাথা নেড়ে না বোঝায়। পাশ থেকে কেউ ভোরকে ভিতরে নিয়ে বলে,
-” ভোর দেড়ি হচ্ছে তোমার স্কুলে! চলো?”
পাতা মাথাটা হালকা এগিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে কে বলছে কথা। ভিতরে অরুণ সরকারকে দেখে সোজা হয়ে বসে। হেলমেটের গ্লাস লাগিয়ে নেয়।
ভোর বাবার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বলে,
-“আব্বু আমি মিসের সাথে স্কুলে যাই? প্লিজ? আমি কখনো বাইকে চড়ি নি! প্লিজ আব্বু?”
অরুণ শান্ত গম্ভীর গলায় বলে,
-” বাইরে অনেক গরম ভোর। আর ধুলোবালি, গাড়ির ধোঁয়া তো আছেই! তুমি গাড়িতেই যাবে ব্যস। কোনো জেদ নয়?”
ভোর নাছোড়বান্দা। সে যাবেই। অরুণকে বার বার অনুরোধ করে। পাতার বেশ মায়া হয়। মা হীন ছেলে কোথায় বাবা একটু এক্সট্রা ভালোবাসবে আবদার পূরণ করবে আদুরে গলায় কথা বলবে! তা না! গম্ভীর হয়ে অর্ডার করছে!
ভোর পিট পিট করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
-” আব্বু প্লিজ? মিস আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন না আব্বুকে?”
পাতা হচকচিয়ে যায়। সে বোঝাবে এই তাগড়া ষাঁড় কে। কোথায় সে এইটুকুনুই শরীরের বিড়াল শাবক যার আচড় দেয়ার নখ পর্যন্ত নেই আর কোথায় ওই লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ ষাঁড় তথা পুরুষ। তাকে নজরেই না ভষ্ম করে দেয়! তবুও স্টুডেন্টের সামনে ইজ্জত রক্ষা করতে আমতা আমতা করে বলে,
-” স্যার যেতে দিন না! আমি দেখেশুনে ধীরেই বাইক চালাবো।”
অরুণ গ্লাসটা পুরো নামিয়ে বাইকে বসা ছেলের মিসের দিকে চায়। মুখ দেখতে পায় না হেলমেট পড়ায় তবে গ্লাসের ভিতরে চোখ দেখা যাচ্ছে। অরুণের দৃষ্টি মহাভারতের শাকুনীর দৃষ্টির মতো লাগে পাতার কাছে। খানিকটা ঘাবরিয়ে যায়। বড়লোক ও সম্মানীয় মানুষ, প্রিন্সিপাল ম্যামের পরিচিত তাই স্যার সম্মোধন করেছে। ভুল হয়েছে কি? সে তড়িঘড়ি করে বাইক স্টার্ট করে বলে,
-” ভোর তোমার আব্বুর সাথেই যাও এই চার পা ওয়ালা গাড়িতে। এসি আছে আরামে যাবে গরমও লাগবে না। আর আমার বাইকে গরম লাগবে তারপর তুমি ছোটও ধরে রাখতে পারবে না! আসছি কেমন?”
ভোর ছলছল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে তার বাহু ঝাঁকিয়ে বলে,
-” আব্বু প্লিজ?”
অরুণ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এ কেমন জেদ।
-” ভোর তোমার মিস তোমাকে নিবে না দেখ চলে যাচ্ছে!”
পাতা বাইক স্টার্ট দিয়ে চোখ বড় বড় করে চায় অরুণ সরকারের দিকে! তাকে কালারিং বানাচ্ছে ছোট্ট বাচ্চার কাছে! হেলমেটের গ্লাস উপরে তুলে বলে,
-” আশ্চর্য! মি. ভোরের বাবা আমি কখন বললাম নেব না? আপনিই তো ছেলেকে আমার সাথে পাঠাতে চাচ্ছেন না! যেন আমি কোনো ছেলে ধরা!”
শেষের কথাটা বিড়বিড় করে বলে পাতা। অরুণ চোখ ছোট ছোট করে চায় পাতার দিকে। শারীরিক দিক ও কথাবার্তায় নিতান্তই কমবয়সী মনে হচ্ছে। আর স্যার থেকে মি. ভোরের বাবা! এ কেমন সম্মোধন? ভোর বাবার বাহু ঝাঁকিয়ে অনুরোধ করছে বারংবার।
-” দেখুন মিস লতা না পাতা?”
পাতা মুখ মোচরায়।
-” মি. ভোরের বাবা! লতা আমার বোনের নাম। আমার নাম পাতা । প-এ আ- কার পা, ত-এ আ-কার তা! পাতা সিম্পল।”
অরুণ বিরক্ত হয় বেশ,
-” মিস পাতাবাহার! শুনুন বাইক সাবধানে ও ধীরে চালাবেন বলে দিলাম! ভোর কখনো বাইকে চড়ে নি।”
ভোর বাবার পারমিশন পেয়ে খুশি হয়ে বাবার গালে চুমু খায়। অরুণ ছেলের কপালে চুমু দিয়ে দরজা খুলে ভোরকে নামিয়ে দিল। ভোর পাতার পিছনে বসে পাতার পেট জড়িয়ে পিঠে মাথা রাখে। পাতা বলে,
-” ভোর সরকার শক্ত করে ধরবে কেমন? আর প্রবলেম হলে বলবে!”
ভোর মাথা নাড়ে। পাতা বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে যায়। অরুণ ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে ড্রাইভারকে বলে,
-” ফলো হার!”
আভারি ফ্রন্ট সিটে বসে। স্কুল চলাকালীন সময় ভোরের সাথে স্কুলেই থাকে সে! এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল।
-” স্যার ম্যাডামটা ভালোই! সব বাচ্চাদেরই আদর করে! বাচ্চারা তাকে অনেক পছন্দ করে!”
অরুণ আভারির দিকে তাকিয়ে বলে,
-” বেশ খবর রেখেছ দেখছি আভারি ভাই?”
আভারি মাথা চুলকে হেসে বলে,
-” সব গার্জেনরা আলোচনা করে তো কানে আসে! তবে ম্যাডামটা একটু কিপ্টা মনে হয়!”
-” কি করে বুঝলে?”
-” সবাই বলাবলি করে তো! চাকরি করে নাস্তে একটি জুতাই পড়ে আসে! প্রতিদিন টিফিনেও নাকি শুধু রুটি ডিম! হাতে পুরনো ঘড়ি! ব্যাগটাও পুরনো! কতটাকা বেতন পায় অথচ..”
অরুণ জানালার কাঁচে হাত রেখে মাথা ঠেকিয়ে সামনে তাকায়। মিস পাতাবাহার তার ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে।
-” আভারি ভাই একজোড়া জুতো বছর খানিক পায়ে দিলে? একই টিফিন রোজ খেলে? ব্যাগ , ঘড়ি পুরনো হলেই কিপ্টে হয়ে যায় কেউ? বুঝলে আভারি শুধু বেতন পেলাম আর ইচ্ছে মাফিক খরচ করলাম! সবার পরিস্থিতি এক হবে ? পরিস্থিতি বিবেচনা করে খরচ করতে হয়!”
আভারি বুঝল।
-” স্যার সবাই বলছিল আমি..”
-” তুমিও তো বললে? শোন লোকজন দূর থেকে দেখে পরিস্থিতি বিবেচনা না করে বস্তা বস্তা সমালোচনা করে হাসি ঠাট্টা করতে পারে! পারে না তাদের পাশে থেকে সাহস যোগাতে! বাস্তবতা অনেক কঠিন আভারি ভাই! আমার ছেলের পিছনে মাসে যত টাকা না খরচ করি, তার চেয়ে কম টাকায় অনেকে পুরো সংসার সামলাতে পারে।”
__
-” মিস আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
ভোরের কথায় পাতা হেসে বলে,
-” কেন?”
-” এই যে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আর গতকালের জন্যও!”
-” তোমার বাবা বকেছিল তোমায়?
-” একটু একটু।”
-” ওহ! দেখো আজকের জেদের জন্যও বকবে। তোমার বাবা একটা নাক উঁচু লোক। দেখ এখনো পিছন পিছন আসছে। আমি কি তোমাকে কিডন্যাপ করব নাকি!”
ছোট ভোর খানিক ভেবে বলল,
-” আমার আব্বুর নাক তো ঠিকই আছে। উঁচু না। কাক্কুকে নামিয়ে দেবে স্কুলে তাই আসছে।”
পাতা হাসে খানিক। ড্রাইভে মনোযোগ দেয়। কিছু সময় পর মলিন স্বরে জিজ্ঞেস করে,
-” তোমার আব্বু তোমাকে অনেক ভালোবাসে তাই না?”
ভোর হাত প্রসারিত করে বলে
-“অনেক। আব্বু বলেছে গাড়ি চালানোর সময় কথা বলতে নেই।”
বলেই কোমড় জড়িয়ে ধরে। পাতা আর কিছু জিজ্ঞাসা করে না। হেসে বাইক চালানোয় মনোযোগ দেয়।
চলবে….